কলিযুগ পাবনবতার শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু এই জগতের সকল জীবকে উদ্ধারের জন্য মহামূল্য সম্পদ গোলক হইতে ভূলোকে সকলেই মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন , এই মহামূল্য সম্পদটি হলো মহামন্ত্র নাম যা তারক ব্রহ্ম নাম(বৈষ্ণব চুরামনি শিব এবং সকল জগতের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মদেবের ইষ্ট নাম) নামেও পরিচিত।
"ব্রহ্মা-আদি দেব যাঁরে ধ্যানে নাহি পায়।
সে ধনে বঞ্চিত হলে কি হবে উপায়।"
শ্রীমন্ মহাপ্রভু তিনি দেখলেন পূজা-যাগ-যজ্ঞ সকলের পক্ষে সম্ভব নহে কারণ এসব সকল কিছু বাস্তবে অর্থসাপেক্ষ তাই সকল শ্রেণীকে, সকল বর্ণকে, না আর্থবান, না দারিদ্র কোন ভেদাভেদ না করিয়া সকলকে একটি সম্পদের মাধ্যমে জন্ম চক্র হইতে উদ্ধারের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। সমাজের সব থেকে পিছিয়ে পরা মানুষকেও তিনি কৃপা দান করেছেন এবং সকলকে মহামন্ত্র নাম আশ্রয় গ্রহণের উপদেশ দিয়েছেন। শ্রীমন্ মহাপ্রভু ছিলেন ন্যায় শাস্ত্রের একজন বড়ো পণ্ডিত। তৎকালীন সময়ে এই সমগ্র ভারতবর্ষের সর্বোপরি পণ্ডিত কেশব কাশ্মীরি তেনার চরণে স্বরণ নেন।
শ্রীমন্ মহাপ্রভু বহু গ্রন্থ অধ্যায়ন করিয়া মূল তত্ব প্রকাশ করলেন, সকল কলির জীবকে উপদেশ দিলেন ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তাই সকল ভক্তগণ অনাদির আদি শ্রীগোবিন্দের স্মরন গ্রহণ করুন এবং শ্রীমহামন্ত্র নামের গুণ কীর্তন করুন।
ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্।।
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্ ।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ।।
(বৃহন্নারদীয় পুরাণ)
কলিকালে নামরূপে কৃষ্ণ অবতার ।
নাম হৈতে হয় সর্বজগৎ-নিস্তার ।।
দার্ঢ্য লাগি ‘হরে র্নাম-উক্তি তিনবার ।
জড় লোক বুঝাইতে পুনঃ ‘এব’-কার ।।
‘কেবল’ শব্দে পুনরপি নিশ্চয়-করণ ।
জ্ঞান-যোগ-তপ-কর্ম-আদি নিবারণ ।।
অন্যথা যে মানে, তার নাহিক নিস্তার ।
নাহি, নাহি, নাহি-তিন উক্ত ‘এব’-কার ।।
(চৈঃ চঃ আ ১৭/২১-২৫)
এই মহামন্ত্র জপ্য ও কীর্তনীয়
আপনে সবারে প্রভু করে উপদেশে ।
কৃষ্ণ-নাম মহা-মন্ত্র শুনহ হরিষে- ।।
‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ।।
প্রভু বলে, - “কহিলাম এই মহামন্ত্র ।
ইহা জপ’ গিয়া সবে করিয়া নির্বন্ধ ।।
ইহা হৈতে সর্ব-সিদ্ধি হইবে সবার ।
সর্বক্ষণ বল’ ইথে বিধি নাহি আর ।।
কি ভোজনে, কি শয়নে, কিবা জাগরণে ।
অহর্নিশি চিন্ত কৃষ্ণ বলহ বদনে ।।
দশ-পাঁচ মিলি’ নিজে দ্বারেতে বসিয়া ।
কীর্তন করহ সবে হাতে তালি দিয়া ।।
সন্ধ্যা হৈলে আপনার দ্বারে সবে মিলি’ ।
কীর্তন করেন সবে দিয়া করতালি ।।
এই মত নগরে নগরে সংকীর্তন ।
করাইতে লাগিলেন শচীর নন্দন।।
(চৈঃ ভাঃ মধ্যঃ)
"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।"
এই মহামন্ত্র নিত্য জপকীর্তন করাই এই কলিযুগের যুগধর্ম।
হরি শব্দের অর্থ ‘যিনি হরণ করেণ’ অর্থাৎ ভগবান আমাদের সকল জড়-জাগতিক কামনা বাসনা হরণ করে শুদ্ধ ভক্তি দান করেন।
শ্রীশিবজি শ্রীনারদমুনির কাছে হরিনাম মাহাত্ম্য বর্ণন:-
একসময়, স্বর্গের মন্দাকিনীর তীরে শ্রীনারদমুনি মহাদেবের কাছে শ্রীকৃষ্ণমন্ত্র লাভ করলেন। তারপর নারদ ও মহাদেব শিব এব স্থানে এসে পৌছলেন যেখানে পার্বতীদেবী, কার্ত্তিক ও গণেশ বসেছিলেন। সেখানে মহাকাল, নন্দী, বীরভদ্র, সিদ্ধ মহর্ষিগণ ও সনকাদি মুনিগণ এসে বসলেন। বাক্যালাপে প্রসঙ্গ ক্রমে নারদমুনি মহাদেবকে বললেন, হে ভগবান, যে জ্ঞান কর্মফলচক্তে আবদ্ধ করায় না, যে জ্ঞান সর্ববেদের সার, সেই বিষয়ে আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে আমাকে বলুন।
মহাদেব বললেন, হে নারদ, পঞ্চরাত্র নামে এক অনুপম জ্ঞান (পুরাণ সূত্র বা বীজ) পূর্বে গোলেকে বিরজার তটে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মাকে প্রদান করেছিলেন, তারপর নিরাময় ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মা এই পুরাণ বীজ জপ করতে লাগলেন পরে পুষ্করনামক মহাতীর্থে ব্রহ্মা অনন্তর র্ধম্মদেবকে অর্পণ করেন । অনন্তর র্ধম্মদেব প্রীতি পূর্বক পুত্র নারায়ণকে প্রদান করিলেন, পরে নারায়ণ সেই পুরাণ বীজ দেবর্ষি নারদকে প্রদান করিলেন। দেবর্ষি নারদ সেই বিশাল পুরাণ সুত্র (বীজ) গঙ্গা তীরে শিষ্য ব্যাসদেবকে প্রদান করেন পরে ব্যাসদেব পুত্র শুকদেবকে সেই জ্ঞ্যান প্রদান করেন।
হে নারদ, এই জ্ঞান সবার আদি, সর্ববেদের সার, অতি মনোহর। জগৎ সংসারে যত মত আছে, যত মন্ত্র আছে, যত কর্ম আছে, যত কর্মচক্র আছে, সেই সমস্ত কিছুর সারাৎসার, সর্বকর্মচক্রের মুক্তির পন্থা হচ্ছে একমাত্র পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মসেবা। নিখিল মহাবিশ্বে একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই নিত্য বিদ্যমান। আর অন্য সমস্ত কিছুই তাঁর প্রয়োজন সিদ্ধির জন্যই উৎপন্ন হয়েছে। বিশ্বের সবাই তাঁরই মায়ায় মোহিত। এক কৃষ্ণ তাঁর অনন্ত রূপ, তাঁর অনন্ত গুণ, তাঁর অনন্ত কীর্তি এবং তাঁর অনন্ত জ্ঞান।
হে নারদ, তাঁর সৃষ্ট জড় বিচিত্র বিশ্বও অনন্ত। এই বিশ্বের সব জায়গা ক্ষুদ্র, বৃহৎ, মধ্যম শ্রেণীর নানা জাতীয় জীবে পরিপূর্ণ। সেই জীবগুলি কর্মশীল। কর্মের ফলস্বরূপ তারা সুখ-দুঃখ ভোগ করছে। সবান্তরাত্মা ভগবান প্রত্যেক জীবের সাক্ষীরূপে বিদ্যমান। জীবের বুদ্ধি আছে। সেই বুদ্ধিশক্তি নিদ্রা, তন্দ্রা, দয়া, শ্রদ্ধা, তুষ্টি, পুষ্টি, ক্ষমা,ক্ষুধা, লজ্জা, তৃষ্ণা, ইচ্ছা, চিন্তা, জরা, প্রভৃতি নাম ধারণ করে।
অনুচরেরা যেমন রাজার অনুগামী হয়, সেরকম এই সব শক্তি জীবের অনুগামী হয়ে থাকে। চিন্তা ও জরা সর্বদা জীবের শোভা ও পুষ্টির ব্যাঘাত করে। ব্রহ্মান্ডমধ্যে জীব যে স্থুল দেহ ধারণ করে কর্ম করছে সেই দেহটি পাঞ্চভৌতিক অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বাতস ও আকাশ দিয়ে তৈরি। এই দেহ ধ্বংস হলে দেহটি পঞ্চভূতের মধ্যে মিশে যায়। প্রায় জীবই এই জগৎ সংসারে ভ্রান্তিবশে মায়ামোহিত হয়ে রোদন করতে থাকে। কিন্তু যারা সাধু ব্যক্তি, তাঁরা নিত্য সত্য অভয়প্রদ এবং জন্মমৃত্যুজরা-অপহারী শ্রীকৃষ্ণের চরণকমল সেবা করেন।
হে নারদ, এই বিশ্ব স্বপ্নের মতো অনিত্য। অতএব এতে বিমোহিত না হয়ে আনন্দের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম ভজনা করো। এই হচ্ছে প্রথম জ্ঞান।
এবার দ্বিতীয় জ্ঞানের কথা শ্রবণ করো। জ্ঞানী ব্যাক্তিরা মুক্তি বাসনা করেন। সাধূ পন্ডিত ব্যক্তিদের পরামামুক্তি সততেই বাঞ্চিত। কিন্তু সমস্ত মুক্তি শ্রীকৃষ্ণভক্তির কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয়। মুক্তি কৃষ্ণভক্তির ষোলভাগের একভাগও আকর্ষণীয় নয়। কৃষ্ণভক্ত-সংসর্গের ফলে কারও হৃদয়ে ঐকান্তিক কৃষ্ণভক্তি জাগ্রত হয়।
মাঠের মাঝে বৃক্ষের বীজ যেমন অঙ্কুরিত হয় জল পেলে, তেমনই হৃদয় মধ্যে ভক্তিবৃক্ষের অঙ্কুর প্রকাশিত হয় ভক্তসঙ্গ পেলে। ভক্তসঙ্গে কৃষ্ণকথা আলাপে ভক্তি জাগ্রত হয়। আবার রৌদ্র মধ্যে অঙ্কুর যেমন শুকিয়ে যায়, তেমনই অভক্তজনের সঙ্গে সর্বদা সংলাপে ভক্তি শুষ্কতা প্রাপ্ত হয়। এই জন্যে বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সর্বদা ভক্তজনের সঙ্গে আলাপ করেন।
হে নারদ, সোনা যেমন নিকৃষ্ট ধাতুর সংযোগে মলিনতা প্রাপ্ত হয়, তেমনই সৎ ব্যক্তিও সংসারের দুর্বুদ্ধি লোকের সংস্পর্শে মন্দ হয়ে যায়। এজন্য সর্বদা নিরন্তর ভক্তিপূর্বক শ্রীকৃষ্ণভজনে যুক্ত থাকাই কর্তব্য।
ভক্তিপূর্বক কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণবের কাছ থেকে তার কৃষ্ণমন্ত্র গ্রহণ করা উচিত। কখনও অভক্ত অবৈষ্ণবের কাছ থেকে নয়। সংসারে যারা কৃষ্ণনিন্দুক, কৃষ্ণবিমুখ, কৃষ্ণভক্ত নিন্দুক, তারা অশুচি ও পাপিষ্ঠ। কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত ব্যক্তি শত পুরুষ সহ নেজেকে উদ্ধার করে।
হে নারদ, পূর্বে কৃষ্ণের আলয় গোলোকে বিরজাতীরে ক্ষীরের মতো অমল জলে আমি শ্রীকৃষ্ণ মন্ত্র জপ করেছি। নিত্য আমি কৃষ্ণমত্র জপ করি। পার্বতী, কার্তিক গনেশ সবসময়ই কৃষ্ণনাম কীর্তন করে থাকে।
হে নারদ, লোকে দুর্দিনের অভিজ্ঞতার কথা বলে ও স্মরণ করে। মেঘে আচ্ছন্ন অন্ধকার দিনকে আমি দুর্দিন বলি না। যেই দিন কৃষ্ণকথা হয় না, আমি সেই দিনকে দুর্দিন বলে থাকি। লোকে কোনও কর্মে অসফল হলে দুঃখিত হয়, হাহুতাশ করে। কিন্তু হে নারদ, যেই দিন ক্ষণকালও অমৃত্যতুল্য কৃষ্ণকথা হয় না, শ্রীকৃষ্ণের কীর্তনবিহীন সেই দিনটিকে নিষ্ফল বলে মানি এবং কাল সেদিনের অনর্থক আয়ু হরণ করে। কৃষ্ণকথাই আনন্দময়, কৃষ্ণকথাই মঙ্গলময়।
হে নারদ, সাপেরা গরুড়কে দেখলে যেমন পালিয়ে যায়, পাপরাশিও তেমনই কৃষ্ণতীর্তনকারীর কাছ থেকে পালিয়ে যায়। পূর্বে ব্রহ্মা শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে কৃষ্ণমন্ত্র লাভ করেন, তাতে সৃষ্টির কারণভূত নির্মল জ্ঞান প্রাপ্ত হন। বিধাতা নাম প্রাপ্ত হন। কৃষ্ণমন্ত্র কোটিবার জপ করতে করতে অনন্দদেবের সহস্র মস্তক হয়।
হে নারদ, পূর্বে একসময় কৃষ্ণপ্রিয়া রাধিকার গর্ভে এক স্বর্ণময় ডিম্ব উৎপন্ন হয়, গোলোকধাম থেকে আগত সেই ডিম্ব দ্বিখন্ডিত হয়ে ভেঙ্গে যায় এবং মহার্ণবে পতিত হয়। সেই ডিম্ব থেকে মহাবিষ্ণু আবির্ভূত হয়ে মহাজলে শয়ন করলেন। মহাবিষ্ণুর লোমকূপ থেকে আলাদা আলাদা ভাবে পৃথক জলরাশি উদ্ভব হয়ে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হল। সেগুলি সপ্ত আবরণীযুক্ত এক-একটি ব্রহ্মান্ড।
ব্রহ্মান্ডের মধ্যে মধ্যস্থানে ভূলোক। ভূলোকের ঊর্ধ্বদিকে যথাক্রমে ভুবর্লোক, স্বর্গলোক, জনলোক, মহর্লোক, তপোলোক ও সত্যলোক। আর ভুলোকের নিম্নদিকে যথাক্রমে অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাললোক রয়েছে। সত্যলোকের বামদিকে ধ্রুবলোক, পাতাললোকের ডানদিকে নরক লোক রয়েছে।
হে নারদ, মধ্যস্থানের ভূলোকে ভারতবর্ষ বিখ্যাত। ভারতবর্ষের মধ্যে বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়। ভারতবর্ষ যেরূপ মাহাত্ম্যপূর্ণ, অন্য স্থান ততটা নয়। বহু পুণ্যফলে কারও ভারতবর্ষে মনুষ্য জন্ম লাভের সৌভাগ্য হয়। মানুষদের মধ্যে তাঁরাই মহান বা বিদ্ধান, যাঁরা শ্রীকৃষ্ণ পাদপদ্ম ভজনা করেন। মানবজীবন পেয়েও জীব যদি শ্রীকৃষ্ণভজনা না করে তবে তার চেয়ে আর বিড়ম্বনা কি? শ্রীকৃষ্ণভজনহীন তার জন্ম অনর্থক, তার গর্ভযাতনা বৃথা, তার অনিত্য শরীর নিষ্ফল, তার জীবন ব্যর্থ। সে জীবম্মৃত।
হে নারদ, এই ভারতে যে ব্যক্তি প্রত্যহ শ্রীহরির পাদোদক ও নৈবদ্য ভক্ষণ করেন, কৃষ্ণমন্ত্র গ্রহণ করেন, তিনি জীবম্মুক্ত হন। তাঁর পদধুলিতে পৃথিবী পবিত্রা হন।
হে নারদ, এবার তৃতীয় জ্ঞানের কথা শ্রবণ করো। শ্রীকৃষ্ণের অনন্ত গুণের কথা কেউই বর্ণনা করতে সমর্থ নয়। যা তুমি শুনতে পাবে, সবই কিঞ্চিৎ কথা মাত্র। আমি শুধু এইটুকু জানি যে, শ্রীকৃষ্ণ অপেক্ষা আর কেউই আদিপুরুষ নেই, আর কেউই পরম আরাধ্য নেই। তাঁর অপেক্ষা জ্ঞানী বা যোগীও কেউ নেই। তাঁর অপেক্ষা সবার পরিপালক জনকও আর কেউ নেই। তাঁর অপেক্ষা বলবানম কীর্তিমান, দয়ালু ও ভক্তবৎসল আর কেউ নেই। যে মায়াদেবী অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডকে মোহিত করেন তিনিও শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখে স্তব করতে অক্ষম এবং অতি ভীতা হন। বাক্যের অধিষ্ঠাত্রী স্বরস্বতীদেবীও শ্রীকৃষ্ণের স্তব করতে সমর্থ না হয়ে জড়প্রায় হয়ে যান।
হে নারদ, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ জীবের হিত বাসনায় গুরুরূপ ধারণ করে থাকেন কিংবা কাউকে তাঁর প্রতিনিধি করে প্রেরণ করেন। গুরুদেব তুষ্ট হলে স্বয়ং ভগবানও তুষ্ট হন। ভগবান তুষ্ট হলে ত্রিজগৎ তুষ্ট হয়। গুরুই ব্রহ্মা, গুরুই বিষ্ণু, গুরুই মহাদেব। হরি রুষ্ট হলে গুরুদেব সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর অনুগামীকে রক্ষা করতে সমর্থ হন। কিন্তু গুরুদেব রুষ্ট হলে কেউই তাকে রক্ষা করতে সমর্থ নয়।
হে নারদ, যা থেকে কৃষ্ণভক্তি জন্মে তাকেই মন্ত্র বলা যায়। কৃষ্ণই বন্ধু, কৃষ্ণই পিতা। আর কৃষ্ণভক্তিই মৈত্রী ও জননী। গুরুদেব কৃষ্ণপ্রাপ্তির পথ প্রদর্শন করান। হে নারদ, তুমি প্রকৃতির অতীত রাধানাথ শ্রীকৃষ্ণকে ভজনা করো। জগতে যে ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণভক্তি অনুশীলন শিক্ষা না দিয়ে অন্য পথ প্রদর্শন করেন, তিনি কখনই গুরু নন। তাঁকে পারমার্থিক গুরুরুপে কখনই গ্রহণ করা উচিত নয়। অধিকন্তু তাঁকে মহা শত্রু বলে মনে করা কর্তব্য। কৃষ্ণভক্তি পন্থা অনুসরণহীন ব্যক্তি যিনি গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে নিত্য আরাধিত হন, তিনি শিষ্যহত্যার ফল লাভ করেন। আর সেই তথাকথিত শিষ্যের জন্মও বিফল হয়।
এই আমি তোমাকে চতুর্থ জ্ঞানের কথা বললাম।
নারদ প্রশ্ন করলেন, হে ভগবান, ভক্তরা কৃষ্ণভক্তি করে, যোগীরা জ্যোতির ধ্যান করে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি যথার্থ পথ?
আরও পড়ুনঃ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করার নিয়ম
শিব বললেন, যাঁরা নিগুণ ব্রহ্মে বিলীন হতে চায়, তারাই ব্রহ্মজ্যোতির ধ্যান করে। তাঁরা ভগবানের শরীর বা আকার স্বীকার করে না। কেননা শরীর মানেই জড়, ব্রহ্ম মানেই চিন্ময়; দেহমাত্রই গুণে আসক্ত, অতএব নিগুণ চিন্ময়ত্বের সম্ভাবনা নেই- এই জ্ঞান তারা কেবল ব্রহ্মজ্যোতির ধ্যান করে। কিন্তু সনৎকুমার প্রভৃতি আমাদের দ্বারা তা আদৌ সম্মত নয়। সমস্ত ব্রহ্মজ্যোতির উৎস হচ্ছেন সনাতন পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ। তাই ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান করেন, নিরাকার ব্রহ্মজ্যোতির ধ্যান করেন না। শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গজ্যোতিই নিরাকার বলা যায়। সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান-আরাধনা করাই যথার্থ পন্থা।
চার যুগের মহামন্ত্র:-
সত্যযুগ
"নারায়ণ পরাবেদা নারায়ণ পরাক্ষরা।
নারায়ণ পরামুক্তি নারায়ণ পরাগতি"॥
ত্রেতাযুগ
"রাম নারায়ণানন্ত মুকুন্দ মধুসূদন।
কৃষ্ণ কেশব সংসারে হরে বৈকুণ্ঠ বামন"॥
দ্বাপর যুগ
"হরে মুরারে মধুকৈটভারে ।
গোপাল গোবিন্দ মুকুন্দ সৌরে।।
যজ্ঞেশ্বর নারায়ণ কৃষ্ণ বিষ্ণু।
নিরাশ্রয়ং মাং জগদীশ রক্ষ"॥
কলিযুগ
"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে" ॥
শ্রীমন্ মহাপ্রভুর তেনার লীলা কালে তিন গুরুর স্মরন নেন ১. দীক্ষা গুরু- শ্রীপাদ মধবেন্দ্র পুরীর প্রিয়তম শিষ্য শ্রীপাদ ঈশ্বর পুরী( দীক্ষা গ্রহণের স্থান শ্রীধাম গয়া)।
২. সন্যাস (ভেক) গুরু- শ্রীপাদ কেশব ভারতী (সন্যাস গ্রহণ এর স্থান শ্রীধাম কাটোয়া। এই স্থান হইতে সর্ব প্রথম নদীয়া বিহারী শ্রীগৌড় হরির "শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য" নামের প্রকাশ)।
৩. শিক্ষা গুরু- শ্রীপাদ গোপাল গুরু গোস্বামী (শ্রীমান মহাপ্রভু শ্রীশ্রীগম্ভীরা লীলায় যেনাকে সর্বোপরি বাৎসল্য স্নেহ দান করেন সেই শ্রীপাদ গোপাল গুরু গোস্বামীর এক তত্ব শুনিবার পর মহাপ্রভু স্বয়ং গোপালকে গুরু হিসাবে স্বীকার করেন এবং এই জগতের মূল আচার্য্য রূপে স্থাপন করলেন *শ্রীধাম পুরী / নীলাচল)*।
ভজনের পূর্বে শ্রীশ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এবং শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর স্মরন ছাড়া যুগল রস আস্বাদন হওয়া কখনই সম্ভব নহে। তাই শ্রীমন্ মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের পর শ্রীপাদ গোপাল গুরু গোস্বামী এবং সকল পারিষদগণ সহিত শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য এবং শ্রীনিত্যানন্দ এবং শ্রীরাধাকৃষ্ণ একত্রে স্মরণের নিমিত্তে এবং মহাপ্রভুর আত্মপ্রীতির নিমিত্তে এই নাম প্রকট করেন। তাই তিনি সর্বপ্রথম শ্রীমান মহাপ্রভুর ও নিত্যানন্দ প্রভূর অবতারের স্বীকার স্বরুপ এই নাম জগতে প্রকাশ করেন।
যথা --
"শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ ।
হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রীরাধেগোবিন্দ।।"
এই মহামন্ত্র নাম বর্তমানে অনেক গুলি প্রাচীন লীলাস্থলীতে প্রকাশ হইয়া থাকে।
১. শ্রীশ্রী রাধাকান্ত মঠ / শ্রী গম্ভীরা(শ্রীধাম পুরী)- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর ভজন স্থলীতে এই নাম অখন্ড রূপে প্রকাশ পায়।
২. শ্রীশ্রী সিদ্ধ বকুল মঠ(শ্রীধাম পুরী) - শ্রীশ্রী নামাচার্য্য হরিদাস প্রভুর ভজন কুঠিরে এই নাম অখন্ড রূপে প্রকাশ পায়।
৩. শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ বাড়ি(শ্রীধাম কাটোয়া)- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর সন্যাস মন্ত্র গ্রহণের লীলা স্থালিতে এই নাম আশ্রিত।এই লীলা স্থলীতে নদেরচাঁদ নিমাইয়ের শ্রীবিশ্বম্ভর মিশ্র হইতে সর্বপ্রথম "শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্য" নামের প্রকাশ পায়।
৪. শ্রীশ্রী মহাপ্রভু মন্দির (শ্রীধাম অম্বিকা কানলা)- শ্রীমন্ মহাপ্রভুর প্রিয় পার্ষদ গৌরীদাস পণ্ডিতের লীলা স্থলীতে এই নাম প্রকাশ পায়।
এছাড়াও বহু মঠ , মন্দিরে এই নামের আশ্রয় গ্রহন করিয়া থাকে এবং সমগ্র বক্রেস্বর পরিবার এবং শ্যামানন্দ পরিবার এই নামের আশ্রিত।