✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🔙 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 দ্বিতীয় ভাগ 🙏 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/08/jagannath2.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২১. সাধ বেশ 🌹 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
সাধ বেশ :-
জগন্নাথ ভোজনরসিক দেবতা। তিনি খেতে ভালোবাসেন। লোকবিশ্বাস রয়েছে, ভগবান বিষ্ণু উত্তর ভারতের বদ্রীনাথধামের সুশীতল জলে মহাস্নান করেন, দক্ষিণ ভারতের রামেশ্বরম্-ধামে ধ্যান বা পূজা গ্রহণ করেন, পূর্ব ভারতের পুরীধামে ছাপান্ন রকমের ভোগ-ব্যঞ্জন ভোজন করেন, পশ্চিম ভারতের দ্বারকাধামে জগৎ সংসার শাসন করেন এবং বিশ্রাম করেন। জগন্নাথ দিনে পাঁচবার বিভিন্ন রকমের নৈবেদ্য ও ভোগ গ্রহণ করেন। ভোজনের পর জগন্নাথ কাপড় পরিবর্তন করেন। এই সময়ের শৃঙ্গারই জগন্নাথের সাধ বেশ নামে পরিচিত। প্রতিদিন পাঁচবার করে সাধ বেশ আয়োজিত হয়। সাধারণত নরম রেশমের কাপড় ও ফুলের মালায় জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র সেজে ওঠেন। এই বেশে ব্যবহৃত কাপড়গুলি বড়লাগী পট নামে পরিচিত। সপ্তাহের প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন রঙের বড়লাগী পটে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের অপূর্ব শৃঙ্গার হয়। তবে প্রতিটি বারের জন্য নির্দিষ্ট রঙ রয়েছে। যথা — রবিবারে ব্যবহার করা হয় নিটোল লাল রঙের বড়লাগী পট। রবিবার সূর্যের বার। সোমবার ব্যবহার করা হয় সাদা রঙের বড়লাগী পট। সোমবারের বড়লাগী পটটি সাদা হলেও এর ওপরে কালো রঙের বিভিন্ন অলংকরণ দেখা যায়। সোমবার চন্দ্রের বার। জগন্নাথ চন্দ্র-সূর্য বড় ভালোবাসেন। জগন্নাথের বিভিন্ন বেশে কাগজের বা শোলার বা ধাতুর চন্দ্র-সূর্য তাঁর মাথায় শোভা পায়। মঙ্গলবারের বড়লাগী পটটি অনেকটা বিশেষ। পঞ্চরঙ্গী রঙের বড়লাগী পটে এই দিনে জগন্নাথ সাজেন। পঞ্চরঙ্গী পটে হলুদ, নীল, লাল, সবুজ ও কালো রঙের ছড়াছড়ি থাকে। এই রেশমী বড়লাগী পটের ধুতি ওড়িশার ব্রাহ্মণসমাজে খুব জনপ্রিয়। অব্রাহ্মণ মানুষেরাও পঞ্চরঙ্গী পটের ব্যবহার করেন। বুধবারে ব্যবহার করা হয় মৃদু নীল বা আকাশী নীল রঙের বড়লাগী পট। এই রঙটি জগন্নাথের বিশালত্বের সাক্ষ্য দেয়। অনেকের মতে বুধবারে জগন্নাথ সবুজ রঙের কাপড়ও পছন্দ করেন। বৃহস্পতিবার বা গুরুবার শ্রীমন্দিরের অন্যতম বিশেষ বার। এই দিনে সমগ্র ওড়িশায় ভগবতী লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা হয়। ঘরে ঘরে জগন্নাথপ্রিয়া লক্ষ্মী বা শ্রীদেবীর আরাধনা হয়। লক্ষ্মীপুরাণ পঠিত হয় ঘরে ঘরে। বৃহস্পতিবারে জগন্নাথ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় রঙ হলুদ বা পীত বর্ণের বড়লাগী পট পরেন। জগন্নাথের বন্দনায় গাওয়া হয়, “জয় শঙ্খগদাধর নীলকলেবর পীতপটাম্বর দেহিপদম্।” এবং “চন্দনচর্চিত নীলকলেবর পীতবসন বনমালিন্৷” জগন্নাথকে উজ্জ্বল হলুদ বস্ত্রে, সুভদ্রাকে রক্তিম লাল বস্ত্রে ও বলভদ্রকে ঘন নীল বস্ত্রে সাজাতে অনেক ভক্তই ভালোবাসেন। শুক্রবারের বড়লাগী পটের জন্য নির্ধারিত রয়েছে সাদা রঙ। সাদা রঙ পবিত্রতা, শান্তি, দেবপ্রীতি ও নির্ভরতার প্রতীক। শনিবারে জগন্নাথ কালচে নীল বা বেগুনী রঙের বড়লাগী পটে সাজেন। শ্রীমন্দিরের আলো-অন্ধকারে জগন্নাথের শনিবারের বড়লাগী পটের রঙটি কালো রঙ বলে ভ্রম হয়। লোকবিশ্বাস রয়েছে, জগন্নাথ সাত দিনে যথাক্রমে রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিগ্রহকে নিয়ন্ত্রণ করেন। জগন্নাথের শৃঙ্গারের সাত রঙ এই সাত গ্রহের রঙের প্রতীক। আরেকটি জনপ্রিয় মত রয়েছে, জগন্নাথ স্বয়ং সূর্যস্বরূপ। তাঁর সাত দিনের সাত রঙের কাপড় সূর্যের সাত রঙের প্রকাশ করে। জগন্নাথ বহুভাবময় দেবতা। তিনি বৈচিত্র্যময়, তিনি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের আহ্বায়ক দেবতা। তাঁর থেকেই বৈচিত্র্যের সূচনা, তাঁর মধ্যেই বৈচিত্র্যের লয়।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২২. বড় শৃঙ্গার বেশ 🌷 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের দৈনন্দিন বেশ ও শৃঙ্গারের মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বেশ তাঁদের বড় শৃঙ্গার বেশ। সারাদিনের শেষে জগন্নাথ বড় শৃঙ্গার বেশে সেজে ওঠেন। বড় শৃঙ্গার বেশে জগন্নাথ হয়ে ওঠেন নয়নাভিরাম, নয়নবিমোহন। জগন্নাথ এমনিতেই অনির্বচনীয় সুন্দর, তার ওপর তিনি যখন বড় শৃঙ্গার বেশ ধারণ করেন তখন তাঁর থেকে চোখ ফেরানো যায় না। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বড় শৃঙ্গার বেশ প্রতি রাতে রাত্রি পহুড়ার (রাত্রির শেষ অনুষ্ঠান) ঠিক আগে আয়োজন করা হয়। বড় শৃঙ্গার বেশের মূল উপাদান দুই ধরনের। প্রথমটি হলো গীতগোবিন্দ খান্দুয়া পট (এক ধরনের রেশমী কাপড়) ও দ্বিতীয়টি ফুলের তৈরি বিভিন্ন অলংকার। ফুলের অলংকারগুলি তুলসী ও রকমারী ফুল দিয়ে তৈরি করা হয়। ঐতিহ্যবাহী রীতিতে বহুকাল ধরে একই মাপের ফুলের অলংকারগুলি তৈরি করা হয়। বড় শৃঙ্গার বেশে জগন্নাথের অনুরূপভাবে সেজে ওঠেন সুভদ্রা ও বলভদ্র।
জগন্নাথের মাথায় কানঢাকা টুপির মতো করে রেশমী কাপড় আবৃত করা হয়। অবশ্য জগন্নাথের মুখাবয়ব সম্পূর্ণ অনাবৃত থাকে। এই কাপড়টির নাম শ্রীকাপড়। শ্রীকাপড় শুধুমাত্র বিগ্রহের মস্তকের অংশই সাজাতে ব্যবহৃত হয়। জগন্নাথের মাথা থেকে পাশ ঘুরে হাতের অংশ পর্যন্ত শ্রীকাপড় শোভিত হয়। জগন্নাথের বাকি শরীর সাজানো হয় মিহি রেশমী সুতোয় বোনা খান্দুয়া পটে। বড় শৃঙ্গার বেশে জগন্নাথের কপালে দেখা যায় পুষ্পতিলক। ঠিক এর ওপরে থাকে চন্দ্রিকা ও অলকপান্তি। এই দুটি অলংকার কপালের মাঝখান থেকে ঝুলে থাকে সামনের দিকে। চন্দ্রিকা ও অলকপান্তির দুপাশ থেকে একাধিক মালা জগন্নাথের শিরোদেশ ঢেকে রাখে। নাকচানা ও নাকুসি সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলে থাকে জগন্নাথের ডান নাকার ওপরে। এই অলংকারকে অনেকে গুনা-ঝুম্পাও বলেন। বড় শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথের বাহুতে অনেকটা পদ্মের আকৃতিতে তৈরি বিভিন্ন ফুল সমন্বিত করপল্লব অলংকার সাজানো হয়। বলভদ্রের বাহুতেও করপল্লব অলংকার দেখা যায়। তবে সুভদ্রা দেবীকে এই অলংকারে সাজানো হয় না। জগন্নাথের কানে ফুলের তৈরি মকর আকৃতির কুণ্ডল পরানো হয়। এই অলংকারের প্রথাগত নাম মকরকুণ্ডল। জগন্নাথের বুকের কাছে ঝুলে থাকে হৃদপদক নামের আরও একটি ফুলের বড় মাপের অলংকার। জগন্নাথের গলায়, বুকে দেখা যায় অজস্র ফুলের মালা। এই মালাগুলি এক একটি প্রায় বারো ফুট লম্বা। একইভাবে তুলসীর মালাও পরানো হয়। এই ধরনের মালাগুলি কোনোটি জগন্নাথের হাত থেকে শুরু করে তাঁর সমগ্র শরীর শোভিত করে অন্যহাতেও শেষ হয়। বড় শৃঙ্গার বেশে পদ্মের মালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মনে করা হয় আচার্য শঙ্করের সময়কালেই জগন্নাথের বড় শৃঙ্গার বেশ শুরু হয়েছিল। এই তথ্য যদি প্রামাণিক হয়, তবে জগন্নাথের বড় শৃঙ্গার বেশও প্রায় এক হাজার দুইশো বছরের প্রাচীন একটি বেশ। বড় শৃঙ্গার বেশের সমাপ্ত হতে অনেকক্ষণ সময় লাগে। রত্নসিংহাসনের জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম বড় শৃঙ্গারের পর বিশ্রাম করেন। কিন্তু দেবতাদের শয়নের আগে শরীর শীতল করার জন্য চন্দনের সেবা গ্রহণ করেন। ভক্তরা জগন্নাথের এই ফুলের অলংকার ও পোশাক ভিত্তিক শৃঙ্গার দেখার জন্য অধীর আগ্রহে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকে। বড় শৃঙ্গার বেশের সময়ে কবি জয়দেব গোস্বামীর ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে কয়েকটি পদ জগন্নাথকে শোনানো হয় :
শ্রিতকমলাকুচমণ্ডল ধৃতকুণ্ডল কলিতললিতবনমালা।
জয় জয় দেব হরে।।
দিনমণিমণ্ডলমণ্ডন ভবখণ্ডন মুনিজনমানসহংস।
জয় জয় দেব হরে।।
কালিয়বিষধরগঞ্জন জনরঞ্জন যদুকুলনলিনদিনেশ।
জয় জয় দেব হরে।।
মধুমুরনরকবিনাশন গরুড়াসন সুরকুলকেলিনিদান।
জয় জয় দেব হরে।।
অমলকমলদললোচন ভবমোচন ত্রিভুবনভবননিধান।
জয় জয় দেব হরে।।
জনকসুতাকৃতভূষণ জিতদূষণ সমরশমিতদশকণ্ঠ।
জয় জয় দেব হরে।।
জনকসুতাকৃতভূষণ জিতদূষণ সমরশমিতদশকণ্ঠ।
জয় জয় দেব হবে।।
অভিনবজলধরসুন্দর ধৃতমন্দর শ্রীমুখচন্দ্রচকোর।
জয় জয় দেব হরে।।
তব চরণে প্রণতা বয়মিতি ভাবয় কুরু কুশলং প্রণতেষু।
জয় জয় দেব হরে।।
শ্রীজয়দেকেবেরিদং কুরুতে মুদং মঙ্গলমুজ্জলগীতি।
জয় জয় দেব হরে।।
জয়দেবকৃত এই পদটি প্রাচীন গুর্জ্জরীরাগে আধারিত। এই বিষয়ে উৎকলে আরও একটি প্রাচীন লোকবিশ্বাস রয়েছে জগন্নাথ অন্যান্য সেবায় যত না তুষ্ট হন তার চেয়ে বেশি তুষ্ট হন গীতগোবিন্দ গীত হলে। মধুরগীতি পদাবলীর কবি জয়দেবের কাব্যের ভাষা মাধুর্যে ভরপুর, মনোমুগ্ধকারী। দীর্ঘদিন শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত দেবদাসীরা গীতগোবিন্দ গেয়ে জগন্নাথকে প্রীতি দিতেন। জগন্নাথের দেবদাসীরা ছিলেন জগন্নাথের জায়া। বর্তমানে শ্রীমন্দিরে কঠোরভাবে দেবদাসী প্রথা বন্ধ করা হয়েছে। এখন জগন্নাথের প্রত্যক্ষ সেবকরাই নিত্যদিন জগন্নাথকে গীতগোবিন্দ শোনান। বলা হয়ে থাকে অনঙ্গভীম দেবের রাজত্বকালে শ্রীমন্দিরে গীতগোবিন্দ গীত হওয়া শুরু হয়েছিল। তবে এই বিষয়ে ভীষণ মতভেদ রয়েছে। জয়দেবের ওপর বাঙালি ও ওড়িআ জাতি সমান অধিকার দাবি করে। ওড়িআগণ বিশ্বাস করেন কবি জয়দেব কটকের কেন্দুলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বাঙালিগণের বিশ্বাস জয়দেব বঙ্গের বীরভূমের কেন্দুলির ভূমিপুত্র। এই বিতর্ক আজও চলছে। কলকাতার জাতীয় সংরক্ষণশালায় কবি জয়দেবকে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন বীরভূমের বাসিন্দা বলা হয়েছে। বস্তুত উৎকল ও বঙ্গ দুই প্রদেশই কবি জয়দেবের মতো প্রতিভাবান কবির ওপর নিজের দাবি ছেড়ে দিতে রাজি নয়। তবে শ্রীমন্দিরে গীতগোবিন্দ কাব্যের এতটা সম্মান থাকার পরেও দৃঢ়ভাবে জগন্নাথের কৃষ্ণরূপের প্রতিষ্ঠার কোনো আয়োজন উৎকলে নেই। পুরীতে জগন্নাথকে বৃন্দাবনী বংশীধর কৃষ্ণ রূপে প্রতিষ্ঠার চেয়ে শঙ্খ-চক্রধারী বিষ্ণু রূপে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা রয়েছে। জগন্নাথ-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমের বা সমাজ অননুমোদিত স্বীকৃতি নেই ওড়িশার জগন্নাথ-ধর্মসভ্যতায়। শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের অন্যতম প্রতিনিধি দেবতা মদনমোহনের সঙ্গে শ্রীদেবীর রুক্মিনী রূপে বিবাহের রীতি রয়েছে। শ্রীক্ষেত্রে রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের পরকীয়া সম্পর্ক প্রায় অননুমোদিত। জয়দেবের গীতগোবিন্দ নিত্যপাঠ্য হলেও তা শুধুমাত্র প্রিয়পাঠের বিষয় হিসেবেই সীমাবদ্ধ। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে গজপতি মহারাজ প্রতাপরুদ্র দেব ঘোষণা করেন শ্রীমন্দিরে শুধুমাত্র গীতগোবিন্দই সর্বাধিক মান্যতা ও গীত হবে, অন্য কোনো সঙ্গীত এর সমান গুরুত্ব পাবে না। সঙ্গীত রূপে জয়দেবের গীতগোবিন্দ গ্রহণযোগ্য হলেও গীতগোবিন্দের বার্তা, তত্ত্ব শ্রীমন্দিরে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি। এমনকি কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দের বর্ণনা অনুযায়ী মহাবিষ্ণুর দশাবতারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার সঙ্গেও শ্রীমন্দিরের জগন্নাথভাবনার মিল নেই। সিংহদ্বারের পতিতপাবন বিগ্রহের জানালার ঠিক ওপরে বিষ্ণুর যে দশাবতার পট রয়েছে সেখানে বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে জগন্নাথকে দেখানো হয়েছে, গৌতম বুদ্ধকে নয়। একই আয়োজন ছিল সিংহদ্বারের মূল ফটকের বাইরে দিকে পাথরের ব্লকে তৈরি দশাবতার বিগ্রহেও। এই ব্লকটি মন্দির সংস্কারের সময় খুলে নেওয়া হয়েছিল, তারপর আর লাগানো হয়নি।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২৩. গজানন বেশ 🐘 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
গজানন বেশ :-
স্কন্দপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডের অন্তর্গত পুরুষোত্তমমাহাত্ম্য বা জগন্নাথ কাহিনী অনুসারে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে শ্রীমৎ নারায়ণ দারুবিগ্রহে মানুষের সঙ্গে লীলাবিলাসের জন্য জ্যৈষ্ঠ মাসের পবিত্র পূর্ণিমা তিথিতে (স্নানপূর্ণিমা) ভগবান জগন্নাথ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই পৌরাণিক বৃত্তান্তের সূত্র ধরে আজও পুরুষোত্তমক্ষেত্রে পবিত্র স্নানযাত্রার দিনে জগন্নাথের জন্মতিথি স্মরণে বিপুল সমারোহ করে মহোৎসব পালিত হয়। শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনের দেবগণ সেদিন সকালে শ্রীমন্দির থেকে সুসজ্জিত স্নানমঞ্চে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা সেদিন বহুক্ষণ স্নানমঞ্চে বিরাজমান থাকেন ও সর্বজনগম্য হয়ে ওঠেন। স্নানপূর্ণিমায় জগন্নাথদেব পবিত্র ১০৮ কলসের সুগন্ধি শীতল জলে মহাস্নান করেন। স্নানযাত্রার পবিত্র তিথিতে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের মূল বিগ্রহের মহাস্নান হয়। বছরের অন্য সব তিথিতেই জগন্নাথের নিত্যপূজার সময় বিগ্রহের সামনে রাখা ধাতুসজ্জিত নির্মল দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবিতে জগন্নাথের স্নান অনুষ্ঠিত হয়। এই রীতিতে ভারতীয় অনেক প্রাচীন মন্দিরেই দেবতার স্নানের রীতি রয়েছে। অনেক প্রাচীন মন্দিরে দর্পণে স্নান ভিন্ন শালগ্রাম শিলা, বাণেশ্বর শিবলিঙ্গ, দেব-দেবীর যন্ত্র, মূল বিগ্রহের অপেক্ষাকৃত ছোট ধাতুবিগ্রহ স্নানের রীতিও রয়েছে। জগন্নাথ সংস্কৃতিতে বৈদিক ও লৌকিক রীতির মিশ্রণ রয়েছে। স্নানযাত্রায় ব্যবহৃত কলসগুলি স্বর্ণকূপের জলে ভর্তি করা হয়। স্নানমঞ্চে বিরাজমান অবস্থায় সেই জলেই জগন্নাথ স্নান করেন। বছরের বাকি সাধারণ ও বিশেষ তিথিগুলির স্নান অনুষ্ঠানের চেয়ে এই তিথির বিশেষ স্নানের গুরুত্ব এখানেই। রত্নসিংহাসন থেকে দেববিগ্রহ স্নানমঞ্চে স্নানান্তরিত করে তাঁদের স্নানমঞ্চের উপযোগী পোশাকে সাজানো হয়। মহাস্নানের পর তাঁরা অবসর যাপনের উপযোগী পোশাক পরেন ও পরে আবার শৃঙ্গার করেন। সেদিন মহাস্নানের পর দেবগণ স্নানমঞ্চেই পূজা, সেবা, ভোগ ও আরতি গ্রহণ করেন। জগন্নাথ নিজের জন্মদিনে তাঁর ভক্তদের মাঝে অনেকক্ষণ বসে থাকেন। জগন্নাথ ও তাঁর ভক্তদের পারস্পরিক মিলন-বিহ্বলতা বাড়তেই থাকে। সেদিন সন্ধ্যার আগে থেকে জগন্নাথ ও বলভদ্র গজ বেশ বা গজানন বেশ বা গণেশ বেশে সাজতে শুরু করেন। জগন্নাথ ও বলভদ্রের গজ বেশে শ্রীবিগ্রহে হাতির মাথার আকৃতির সজ্জা সংযুক্ত হয়। এই বিশেষ বেশে ব্যবহার করা হয় কাপড়, কাগজ, শোলা, বেতের লাঠি, বাঁশের লাঠি, জরি ইত্যাদি। জগন্নাথের সজ্জায় কৃষ্ণবর্ণে ও বলভদ্রের সজ্জায় শ্বেতবর্ণের প্রাধান্য দেখা যায়। এই বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের বিগ্রহে হাতির মতো দীর্ঘ কান ও শুঁড় দেখা যায়। তবে জগন্নাথের হাতের অংশে বা পায়ের দিকে কোনো অঙ্গ সংযোজন করা হয় না। জগন্নাথ ও বলভদ্রের হাতের অংশে পদ্মের পাপড়ি বিশিষ্ট বালা সজ্জিত হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্রের শুঁড় মুখের অংশ থেকে সোজা নেমে এসে শেষ প্রান্তে একদিকে ঝুলে থাকে। জগন্নাথ ও বলভদ্রের এই রকমের সজ্জায় জগন্নাথকে গণেশরূপে পূজা করা করা হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র গজ বেশে সজ্জিত হলেও সুভদ্রা দেবী গজ বেশে সাজেন না। তিনি একই সময়ে পদ্মবেশের অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হন। সমস্ত সন্ধ্যাকালীন সেবা-পূজা তাঁরা এই বেশেই গ্রহণ করেন। পরে স্নানপূর্ণিমার মধ্যরাতে আকাশে চাঁদ প্রায় মধ্যগগনে এলে উৎকলের হৃদয়সম্রাট জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার শ্রীবিগ্রহ স্নানমঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে শ্রীমন্দিরের অভ্যন্তরের গোপন অনবসর সেবাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সূর্যালোকহীন অন্ধকার ঘরে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা অবসরহীন সেবা গ্রহণ করেন। লোকমুখে প্রচলিত লোকবিশ্বাস রয়েছে এই কদিন তাদের আরাধ্য দেবতা জগন্নাথ জ্বরলীলা করেন। অনবসর সেবাকক্ষে রুদ্ধদ্বার অবস্থায় তাঁরা তিন ভাইবোন একটানা চোদ্দ দিনের জন্য সাধারণ জনতার পার্থিব চোখের আড়ালে অবস্থান করেন। এই সময় ওড়িশার সকলে মনের চোখে জগন্নাথকে দেখার অভ্যাস করেন। এই কয়েকদিন দেবগণ মন্দিরের অভ্যন্তরে গোপন কক্ষে অবস্থান করেন এবং দেবগণের অনবসর কালের নির্দিষ্ট সেবায়ত ব্যতীত কাউকেই মন্দিরের এই নির্দিষ্ট কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এমনকি পুরীর গজপতি মহারাজাও এই কয়েকদিন জ্বরলীলাময় মগ্ন দেবতার দর্শন করতে পারেন না।
জগন্নাথের গজ বেশ শৃঙ্গার প্রচলনের সঙ্গে জগন্নাথের দক্ষিণ ভারতীয় ভক্ত গণপতি ভট্টের উপাখ্যান জড়িত রয়েছে। দাক্ষিণাত্যের বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের অধিবাসী গণপতি ভট্ট ছিলেন সিদ্ধিবিনায়ক গণেশের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি স্নানযাত্রায় অংশ গ্রহণ করতে জগন্নাথক্ষেত্র পুরীধামে এসেছিলেন। তিনি পুরীতে আগমনের আগে লোকমুখে শুনেছিলেন, জগন্নাথ স্বয়ং ভক্তের বাঞ্ছাকল্পতরু। তিনি স্নানমঞ্চে বিরাজমান অবস্থায় গণেশরূপে প্রকাশিত হন। গণপতি ভট্ট সবই বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি জানতেন স্নানযাত্রার পবিত্র তিথিই জগন্নাথের জন্মতিথি। এমন পবিত্র তিথিতে স্নানমঞ্চে বিরাজমান জগন্নাথের মধ্যে নিজের ইষ্টমূর্তি দেখার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন গণপতি ভট্ট। কিন্তু যখন তিনি স্নানমঞ্চের সামনে এসে দেখলেন, মহাপ্রভু জগন্নাথের শীর্ষভাগে হাতির মাথা নেই, জগন্নাথের মধ্যে গণেশের প্রকাশ নেই, তখন তিনি খুবই হতাশ হয়ে স্নন ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করেছিলেন। এই জন্মে এখনও তার ইষ্টমূর্তি দর্শন হলো না বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। গণপতি ভট্টকে শান্ত করার জন্য স্বয়ং জগন্নাথ সাধারণ ব্রাহ্মণের রূপ গ্রহণ করেছিলেন এবং ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশেই তিনি গণপতি ভট্টের কাছে গিয়েছিলেন। স্নানমঞ্চে জগন্নাথকে গণপতি রূপে দর্শন না পেরে গণপতি ভট্ট শ্রীমন্দির অঞ্চল ত্যাগ করে গমন করেছিলেন। তিনি পুরীনগরী ছেড়ে যাওয়ার মতো পরিকল্পনা মনে মনে গ্রহণ করেছিলেন। ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে জগন্নাথ গণপতি ভট্টকে আবার জগন্নাথ বিগ্রহের সামনে যেতে রাজি করান। সন্ধ্যায় গণপতি ভট্ট জগন্নাথের সামনে গিয়ে দেখেছিলেন, জগন্নাথ মহাপ্রভু গণেশরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গণপতি ভট্ট জগন্নাথের নামসংকীর্তন করতে করতে বিহ্বল হয়ে যেতে থাকেন। জগন্নাথের গজ বেশ তাঁর ভক্তাধীন রূপের স্মারক। বাঞ্ছাকল্পতরু জগন্নাথ এই রূপে ভক্তের ঐহিক ও পারৈহিক সমস্ত সৎকামনা পূরণ করেন।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২৪. নব যৌবন বেশ 🌼 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
নব যৌবন বেশ :-
পবিত্র স্নানযাত্রা তিথিতে দীর্ঘক্ষণ ধরে একশো আট ধাতব কলসের ঠাণ্ডা জলে মহাস্নান করে ও সেই অবস্থায় অনেকক্ষণ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমার রাতেই জগন্নাথ জ্বরলীলা শুরু করেন। এই সময় তিনি একটানা পনেরো দিন শ্রীমন্দিরের অতি গোপন অনবসর সেবাকক্ষে রুদ্ধদ্বার অবস্থায় থাকেন। প্রথম নয়দিন তিনি জ্বরলীলা করেন ও দশম দিন থেকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। পনেরোতম দিনে এসে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই পক্ষব্যাপী সময়ে জগন্নাথ বিভিন্ন ভেষজ পাচন, ওষুধ ও পথ্য সেবা নেন। এসবের পদ্ধতি অতি গুপ্তভাবে রাখা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে অনবসর সেবার রীতিপদ্ধতি প্রকাশিত করা হয় না। জগন্নাথের এই সময়পর্বের সেবাপদ্ধতিকে অনবসর সেবা বলা হয় কারণ, এই কয়েকদিন ধরে জগন্নাথের অবসরহীনভাবে সেবাশুশ্রূষা চলে। বাস্তবিকই এই সেবাটি অক্লান্ত পরিশ্রমের। জগন্নাথের অনবসর সেবার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহের মূল উপাদান নিমদারু। স্নানযাত্রার পবিত্র তিথিতে সেই দারুবিগ্রহে জগন্নাথের স্নান, অভিষেক ইত্যাদি হয়। ফলে, দারুবিগ্রহগুলি এত কলসের জলে ভীষণভাবে আর্দ্র হয়ে ওঠে। তদুপরি আষাঢ় মাসে প্রকৃতিতে বর্ষার আগমনে বাতাসে জ্বলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে দারুবিগ্রহের আগের মতো শুকিয়ে পূর্বরূপে ফিরে আসতে সময় লাগে। তাছাড়া জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার শ্রীবিগ্রহের মূল উপাদান নিমদারু হলেও, নিমদারুর স্তরের ওপরে আরও কয়েকটি স্তরের বিভিন্ন উপাদান লেপন করা হয়। এর ফলে দারুবিগ্রহের যত্ন বৃদ্ধি পায় ও বিগ্রহগুলি প্রাকৃতিক ক্ষয়ের থেকেও রক্ষা পায়। পুরীধামের কতিপয় প্রাচীন বিগ্রহ শিল্পালয়ে এই ধরনের সপ্তস্তরে তৈরি শ্রীবিগ্রহ আজও সন্ধান করলে পাওয়া যায়। জগন্নাথ বিগ্রহের বাহ্যিক স্তরগুলি জলের সংস্পর্শে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিগ্রহগুলি প্রাকৃতিক আলোতে বা সূর্যালোকে রেখে শুষ্ক করা হয় না। শ্রীবিগ্রহের অঙ্গরাগহীন মহাকায় ভক্তের কাছে বাঞ্ছিত নয়। ফলে এই পনের দিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের পরিচিত সর্বজনীন হৃদয়গ্রাহী রূপ ফিরিয়ে আনা হয়।
অনবসর সেবাকক্ষে একটানা পনেরো দিনের অক্লান্ত সেবাযত্নে সুস্থ হয়ে ওঠার পরে মহাপ্রভু জগন্নাথ ও তাঁর ভাইবোন বলভদ্র-সুভদ্রার সঙ্গে তাঁদের যৌবনের সুশ্রী চেহারা ফিরে পান এবং তাঁরা আবার তাঁদের হৃদয়বিহারী ভক্তদের চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে দর্শন দিতে আসেন। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার এই চিরপুরাতন ও চিরনতুন চেহারায় ফিরে আসার দিনে তাঁদের সজ্জা বা রূপকে নবযৌবন বেশ বলা হয়। আরেকটি লোকপ্রচলিত মত রয়েছে, স্নানযাত্রার দিন জগন্নাথের জন্ম, সেদিন থেকে পরবর্তী পনেরো দিনে তিনি এক এক কলা করে ষোলো কলায় পূর্ণ হন। এই ষোলটি দিন এক এক বছরের স্মারক। স্নানযাত্রা থেকে পরবর্তী পনেরো দিন পার করে তিনি যৌবনে অভিষিক্ত হন। এরপরেই চলে তাঁর গুণ্ডিচা (বৃন্দাবন) বিহার। দারুবিগ্রহে জগন্নাথের দেহের সজীবতা উদযাপন করতে নবযৌবন বেশ যথেষ্ট সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। দৈতাপতিগণ জগন্নাথের ‘চকা চকা’ আঁখি রঙ করেন। ভক্তরা যেমন জগন্নাথকে চোখ বড় বড় করে দেখেও আশ মেটাতে পারেন না, তেমন মহাপ্রভু জগন্নাথও তাঁর হৃদয়ে অনাবিল আনন্দের উৎসসম ভক্তদের দেখেন বড় বড় চোখে। ভক্তের সামান্য ত্যাগ, ভালোবাসা, ভক্তিকে তিনি অনেক বড় করে দেখেন বলেই তাঁর চোখ দুটি এত বড়। তাঁর ভক্ত তাঁর দিকে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়, তিনিও তাঁর ভক্তদের চোখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যান। ভগবান ও ভক্তের এই পারস্পরিক ভালোবাসার নির্দশন রূপে দেখা যায় জগন্নাথের দীর্ঘ অদর্শনের পর তিনি নবযৌবন বেশে প্রকাশিত হলে লক্ষ লক্ষ ভক্ত তাঁকে দেখতে ব্যাকুল হয়ে ছুটে আসেন শ্রীমন্দিরে। জগন্নাথের নবযৌবন বেশে সজ্জিত হয়ে শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনে বিরাজমান রূপটির আয়োজন হয় বেলা আড়াইটের পর থেকে। জগন্নাথের নবযৌবন বেশের সময় থেকেই সিংহদ্বারে বিরাজমান পতিতপাবন বিগ্রহেরও দর্শন শুরু হয়।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২৫. তাহিয়া লাগি বেশ 🥀 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
তাহিয়া লাগি বেশ :-
শ্রীক্ষেত্রেশ্বর পুরুষোত্তম জগন্নাথ তাঁর নিত্যলীলাবিলাসে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তিথিতে বৈচিত্র্যময় হয়ে ভক্তদের হৃদয়ে অনাবিল আনন্দ প্রবাহিত করেন। তিনি কখনও সোনার অলংকারে রাজাধিরাজ রূপে প্রকাশিত হন, আবার কখনও ফুলসাজে গোপনায়ক রূপেও প্রকাশিত হন। তিনি কখনও ভাব বিমোহিত ভক্তের বয়ে আনা শুকনো ফুলকে সদ্য ফোটা ফুলে পরিণত করে সাজেন, আবার কখনও ফুলের অনুকরণে তৈরি করা শোলার ফুলের সজ্জায় সজ্জিত হয়েও সমানভাবে আনন্দ মিছিল করেন। জগন্নাথ ভাবগ্রাহী জনার্দন। তাঁর দুই চোখের দিকে তাকিয়ে তদ্ভাবরঞ্জিত হয়েই ভক্তরা উল্লসিত হয়ে পড়েন। তিনি সোনায় সাজলেন কি সাধারণ উপাচারে সাজলেন তা তুচ্ছ হয়ে যায়। জগন্নাথ স্বয়ং পরশপাথরের মতো, তাঁকে যে স্পর্শ করে বা যা তাঁর স্পর্শ লাভ করে সবই সোনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে যায়।
প্রতি বছর আষাঢ় মাসে পবিত্র রথযাত্রার সময়ে পুরীর শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ মহাপ্রভুর তাহিয়া লাগি বেশ অনুষ্ঠান পালন করা হয়। রত্নসিংহাসনের প্রধান তিন দেবতা জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র তাহিয়া নামক একটি বিশেষ ধরনের মুকুট পরেন। তাহিয়া বেশের এই মুকুট জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের একমাত্র অলংকার বা সজ্জার উপকরণ যা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের পর রত্নসিংহাসনের প্রধান দেবদেবীরা ভক্তদের মধ্যে দান করেন। জগন্নাথের তাহিয়া বেশে প্রতি বছর একাধিক তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই তিথিগুলি হলো স্নানপূর্ণিমা, রথযাত্রা, বহুড়া যাত্রা (পুনর্যাত্রা, প্রচলিত শব্দ উল্টোরথ) এবং নীলাদ্রী বিজয়ের তিথি। এই চারটি তিথিতে শ্রীমন্দিরের নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে জগন্নাথের যাত্রাকালে হাল্কা সাজের সুন্দর তাহিয়া বেশ শৃঙ্গারে রত্নসিংহাসনের প্রধান দেবতাদের পরিধান করানো হয়। সুদর্শন চক্র, ভূদেবী, শ্রীদেবী ও নীলমাধব বিগ্রহে এই বৈচিত্র্য সেভাবে দেখা যায় না।
জগন্নাথদেব যখন মাথায় তাহিয়া মুকুট পরে তাহিয়া বেশ শৃঙ্গারে সজ্জিত হয়ে শ্রীমন্দিরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে ভক্তদের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ান তখন জগন্নাথের ভক্তদের হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে সমগ্র শ্রীক্ষেত্রে আনন্দের জোয়ার আসে। তাহিয়া বেশে সুসজ্জিত হয়ে প্রথমে দেখা দেন অনন্তাবতার বলভদ্রদেব, তাঁর ঠিক পরেই আসেন যোগমায়া দেবী সুভদ্রা। তাঁদের দুজনের এই সজ্জায় প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের জগন্নাথ দর্শনজনিত উন্মাদনা সপ্তমে চড়ে যায়। অবশেষে অজস্র ভক্তহৃদয়ের অধিপতি জগন্নাথ তাহিয়ায় সজ্জিত হয়ে দেখা দেন। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের তাহিয়া বেশে একস্থান থেকে অন্য স্থানে গমন ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে অন্যতম চিত্তাকর্ষক ঘটনা। এই বেশে জগন্নাথ ভক্তদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। জগন্নাথ তাঁর প্রায় অন্য সব বেশেই রত্নসিংহাসনে বসে ভক্তদের সঙ্গে দেখা করেন। সেক্ষেত্রে ভক্তরা শ্রীমন্দিরে গিয়ে জগন্নাথকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন। কিন্তু তাহিয়া বেশটি বিপরীত ঘটনা ঘটায়। তাহিয়ার সাজে সজ্জিত জগন্নাথ তাঁর ভাই-বোনের সঙ্গে শ্রীমন্দির থেকে বাইরে এসে ভক্তদের সঙ্গে মিলিত হন। তাহিয়া বেশে সুসজ্জিত জগন্নাথের অভিযাত্রার একটি অতি ছোট বর্ণনা চৈতন্যজীবনীকার কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এর মধ্যলীলায় পাওয়া যায় :
বলিষ্ঠ দয়িতাগণ যেন মত্ত হাতী।
জগন্নাথ বিজয় করায় করি হাতাহাতি।
কতক দয়িতা করে স্কন্ধ আলম্বন।
কতক দয়িতা ধরে শ্রীপদ্মচরণ।।
কটিতটে বদ্ধ দৃঢ় স্থূল পট্টডোরী।
দুই দিকে দয়িতাগণ উঠায় তাহা ধরি।।
উচ্চ দৃঢ় তুলী সব পাতি স্থানে স্থানে।
এক তুলী হৈতে ত্বরায় আর তুলীতে আনে।।
প্রভু-পদাঘাতে তুলী হয় খণ্ড খণ্ড।
তুলা সব উড়ি যায় শব্দ হয় প্রচণ্ড।।
বিশ্বম্ভর জগন্নাথে কে চালাইতে পারে।
আপন ইচ্ছায় চলে করিতে বিহারে।।
এই অংশটি জগন্নাথের শ্রীমন্দির থেকে বাইরে এসে রথে ওঠার দৃশ্য। জগন্নাথের এই গমন অনেকখানি দুলে দুলে। জগন্নাথের মুকুটের অংশে তাহিয়াটি এই দুলকিচালে যাত্রাকালে খুব ঝাঁকুনি পায়। জগন্নাথের দুলে দুলে চলার তালে তালে তাঁর তাহিয়াটি একবার সামনে একবার পিছনে করে অতি দ্রুত দোলা খেতে থাকে। তাহিয়ায় এভাবে বহুবার ঝাঁকুনি লাগতে থাকায় তাহিয়ার বিভিন্ন অংশ আলগা হয়ে খসে পড়তে থাকে। জগন্নাথের ভক্তরা জগন্নাথের ব্যবহৃত তাহিয়ার পড়ে যাওয়া টুকরোগুলি নিজেদের বাড়ির কোনো পবিত্র স্থানে, গৃহদেবতার ঘরে, ঘরের নির্দিষ্ট পূজাস্থানে দারুব্রহ্ম ভগবানের স্পর্শধন্য স্মারকটি সংরক্ষিত করে রাখে। আবার অনেকে গৃহনির্মাণ বা মন্দির নির্মাণ করার সময় ভিত্তিতে জগন্নাথের তাহিয়ার টুকরো পরম শ্রদ্ধায় গেঁথেদেয়। সাধারণত মঙ্গলদ্রব্য ও ঈশ্বরের আশীর্বাদ রূপে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে এই রীতির মান্যতা রয়েছে।
তাহিয়া নামে পরিচিত জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এই বিশেষ গড়নের মুকুটটি মূলত বেত, বাঁশের লাঠি, রঙিন কাগজ, সোলার ফুল, টাটকা প্রাকৃতিক ফুল এবং রঙ (ন্যূনতম পক্ষে লাল রঙ এবং দস্তার রঙের ব্যবহার করা হয়) দিয়ে তৈরি। তাহিয়া মুকুটটি শ্রীবিগ্রহত্রয়ের মাথায় সুসজ্জিত হয় শ্রীমন্দিরের ভেতরেই, যখন তাঁকে শ্রীমন্দির থেকে তিনটি পৃথক রথে একে একে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রথযাত্রার যাত্রাপথের শেষ অবধি এটি শ্রীবিগ্রহত্রয়ের সঙ্গেই থাকে। চাহিয়া মুকুট ওজনে অপেক্ষাকৃত হালকা হওয়ায় বাতাসের চাপে ও জগন্নাথের গমনের ছন্দে মুকুটটি সামনে-পেছনে করে নির্দিষ্ট ছন্দে দোলা খায়। শ্রীমন্দিরের পক্ষ থেকে জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত দক্ষ শিল্পী কারিগরদের ওপরেই তাহিয়া বেলের উপকরণগুলি প্রস্তুত করার ভার অর্পণ করা হয়। তাহিয়া মুকুটটি অনেকখানি সুপারি গাছের পাতার মতো আকারে দেখতে। জগন্নাথ ও বলরামের তাহিয়া মুকুটটি উচ্চতায় প্রায় ছয় ফুট এবং পরিধিতে প্রায়ে সাড়ে আট ফুট। ভগবতী সুভদ্রার তাহিয়ার মাপ একটু ছোট। তাহিয়াকে নির্দিষ্ট শিল্পসম্মত আকৃতি দেওয়ার জন্য একসঙ্গে তিনটি করে কাঁচা বাঁশের কাঠি সুতির সুতো দিয়ে একসঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। অজস্র ছোট ও বড় কাঁচা বাঁশের লাঠি এই বেশ নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বাঁশের কাঠির পাশাপাশি একটু শক্ত ধরনের বেত কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবহার করা হয়। এর ফলে তাহিয়াটি আরও মজবুত হয় এবং রথযাত্রার ভূয়সি হুল্লোড়েও তাহিয়া মুকুটটি ভেঙে যাওয়ার ভয় কমে যায়। টাটকা তাজা জুঁইফুল ছাড়াও সোলা দিয়ে তৈরি ফুলও ব্যবহার করা হয়। তবে সোলা দিয়ে তৈরি তাহিয়ার ঠিক শীর্ষ অংশে কদম্ব ফুলের সারি প্রতিটি তাহিয়া মুকুটের শোভা ও সৌন্দর্য অনেকগুণ বাড়িয়ে তোলে। পুরীর জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহ ছয় ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার। প্রায় সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার জগন্নাথ বিগ্রহের মাথায় এত বড় ও উচ্চতা বিশিষ্ট মুকুটটি আরও মনোরঞ্জক দেখায়। জগন্নাথদেব রথে ওঠার সময় তাহিয়া ছাড়া আর কোনও মূল্যবান অলংকার পরেন না। অর্থাৎ একটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি এই সময় শৃঙ্গার করেন। এই বেশে জগন্নাথ সহজ-সুন্দর, তিনি সাধারণ সজ্জায় সজ্জিত হয়ে জনসাধারণের প্রিয়ধন হয়ে ওঠেন।
জগন্নাথের তাহিয়া বেশের প্রবর্তনের সঙ্গে তাঁর ভক্তপ্রবর রঘুর কাহিনী অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত রয়েছে। জগন্নাথের প্রেমধনে মত্ত ভক্ত রঘু পুরীর শ্রীমন্দিরের সিংহদ্বারের কাছে আকাশের জ্বলন্ত সূর্যের নীচে শ্রীমৎ মহাপ্রভু জগন্নাথের ধ্যান করছিলেন। পুরীর তৎকালীন গজপতি মহারাজা রাজা ছাতার আচ্ছাদনের (ওড়িশার বিশেষ ধরনের ছাতা তাতি) মাধ্যমে জগন্নাথের ভগবৎচিন্তায় মগ্ন ভক্তদের সূর্যের প্রখর উত্তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য সেবাস্বরূপ ছায়া সরবরাহ করতেন। গজপতি মহারাজা একই ভাবে জগন্নাথের ভক্ত রঘুর জন্যও একটি ছাতা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় তপস্বী সাধকদের বিশ্বাস রয়েছে, পক্ষী ও সন্ত কিছুই সঞ্চয় করেন না। সন্ত রঘুও গজপতি মহারাজা প্রদত্ত সুন্দর কারুকার্যময় ছাতার কোনও ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব না করে সেটিকে অবহেলায় ফেলে দিলেন। গজপতি মহারাজা পরদিন সকালে আবার ভক্ত রঘুকে আগের অবস্থায় ধ্যানস্থ দেখে আবার তাঁর জন্য একই রকমের সুন্দর ছাতার ছায়া তৈরি করে দিলেন। কিন্তু এবার ঘটল অন্য ঘটনা। যখন ভক্ত রঘু আচ্ছাদনটা টেনে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, তখন শ্রীনাথ জগন্নাথ ভক্ত রঘুর সামনে উপস্থিত হলেন। রঘু আনন্দে বিস্ময়ে চিৎকার করে বললেন, “হে মহাপ্রভু জগন্নাথ, হে প্রভু, আপনি আমার মাথায় আচ্ছাদন দিয়েছিলেন, এবার আমি আপনার মাথায় তাহিয়া দিয়ে আবৃত রাখব।” সেই ঘটনার পর থেকে ভক্ত রঘু রত্নসিংহাসনের দেবদেবীদের বিশেষ বিশেষ তিথিতে বিশেষ বিশেষ যাত্রার জন্য তাহিয়ার নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ করতেন। অবশ্য এই কিংবদন্তির আরেকটি রূপে পাওয়া যায়, জগন্নাথ মহাপ্রভু তাঁর অন্যতম প্রিয় সাধকের ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং ভক্ত রঘুর সামনে বালগোপাল রূপে উপস্থিত হন। সেখানে বালগোপাল রূপী জগন্নাথ তাঁর ভক্ত রঘুর পিছনে ছাতা ধরে অলক্ষ্য পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন। জগন্নাথের বালগোপাল সম বিগ্রহ এখনও ওড়িশার কিছু ঘরে দেখা যায়। এই ঘটনার পর থেকে ভক্ত রঘু আষাঢ়ের দিব্যরথযাত্রার সময় জগন্নাথের সজ্জা সংক্রান্ত তাহিয়া সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়ধন জগন্নাথকে।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২৬. রাজরাজেশ্বর সোনা বেশ 👑 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
👑 রাজরাজেশ্বর সোনা বেশ :-
রাজরাজেশ্বর জগতের নাথ জগন্নাথ মহাপ্রভুর সমস্ত বিশেষ বেশ শৃঙ্গারের মধ্যে বহু সোনার অলংকারে সজ্জিত পোশাক বা সোনা বেশ (ওড়িশা উচ্চারণে সুনা বেশ) সবচেয়ে আকর্ষণীয়। জগন্নাথ মহাপ্রভুকে সমগ্র বিশ্বের রাজা বলা হয়। যিনি সমগ্র বিশ্বের রাজা সমস্ত বিশ্বের সবকিছুই তাঁর সম্পদ। এমন কিছুই নেই যা তাঁর নেই। শুধুমাত্র একটি পৃথিবী নয় অজস্র সৌরমণ্ডলের সবকিছুই তাঁর। ভাগবতের ব্রহ্মসংহিতায় তিনিই কৃষ্ণরূপে এই তত্ত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। জগন্নাথ মহাপ্রভুর সোনা বেশ শৃঙ্গারে তাঁর সম্পদের কণামাত্র প্রতিফলিত হয়। সমগ্র বিশ্বই যাঁর সম্পদ সামান্য কয়েকটা সোনার অলংকার যে তাঁর কাছে অতি নগন্য সম্পদ। কিন্তু পার্থিব বস্তুজীবনের দৃষ্টিতে জগন্নাথের সোনা বেশ বাস্তবিকই শ্রীমন্দিরে দেবতার বিত্ত, বৈভব ও ধনের প্রমাণ রাখে।
জগন্নাথের সোনা বেশ তাঁর রাজা বেশ, রাজরাজেশ্বর বেশ ও রাজাধিরাজ বেশ নামেও পরিচিত। সোনার বহুবিধ অলংকারে সজ্জিত জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার সোনা বেশ বছরে পাঁচবার পাঁচটি বিশেষ তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই পবিত্র তিথিগুলি হলো আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের একাদশী, আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের দশমী বা দশহরা (দশেরা বা বিজয়া দশমী), কার্তিক পূর্ণিমা বা রাসপূর্ণিমা, পৌষ পূর্ণিমা ও মাঘ পূর্ণিমা। রথযাত্রা উৎসব পরবর্তী আষাঢ়ের শুক্লা একাদশী তিথিতেই একমাত্র জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার সোনা বেশ শ্রীমন্দিরের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়। এই তিথিতে তাঁরা শ্রীমন্দিরের সিংহদ্বারের বাইরে নিজ নিজ রথে বিরাজমান অবস্থায় সোনা বেশ গ্রহণ করেন। গুণ্ডিচা প্রত্যাগত অভ্রভেদী রথে বিরাজমান জগন্নাথের শ্রীমন্দিরে প্রবেশের আগে এই সমারোহপূর্ণ সোনা বেশ তাঁর প্রতিপত্তির বার্তা দেয়। জগন্নাথ উৎকলের ভূমির ও উৎকলবাসীর হৃদয়ের রাজা। বাকি চারটি তিথির সোনা বেশ অনুষ্ঠিত হয় শ্রীমন্দিরের ভেতরে। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রত্নসিংহাসনে বিরাজমান অবস্থায় সোনা বেশ গ্রহণ করেন।
উৎকলের প্রাচীন রাজা অনঙ্গভীম দেবের শাসন তথা রাজত্বকালে তিনি মহাপ্রভু জগন্নাথকে উৎকল সম্রাট বা সমগ্র জাতির প্রভু হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন হয়েছিল। মহারাজা অনঙ্গভীম দেব পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের নির্মাণের কাজ শুরু করিয়েছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর একেবারে শেষ প্রান্তে পুরীর বর্তমান শ্রীমন্দিরের কাজ সমাপ্ত হয়।ততদিনে পুরীর শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। জগন্নাথের শ্রীমন্দিরের ইতিহাস অনুসারে, জগন্নাথের সোনা বেশের প্রাচীন পরিচয় পাওয়া যায়, গজপতি মহারাজা কপিলেন্দ্রদেবের যুগে জগন্নাথের প্রথম সোনা বেশ আয়োজন করা হয়েছিল। রাজা কপিলেন্দ্রদেব দাক্ষিণাত্য বিজয়ের পর গৃহভূমে ফেরার সময় মোট ষোলটি হাতি বোঝাই করে তাঁর আরাধ্য দেবতা জগন্নাথের জন্য বিবিধ ভেট এনেছিলেন। মাদলা পাঁজিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যে ১৪৬০ সালে গজপতি কপিলেন্দ্র দেবা মহাপ্রভু জগন্নাথ ও ভগবতী জয়দুর্গার আশীর্বাদে দক্ষিণ ভারতের রাজার ওপর বিজয় লাভ করে লব্ধ সম্পদের সিংহভাগ ওড়িশায় ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। অর্জিত সমস্ত সম্পদ তিনি নিজে ভোগ করতে চাননি। তিনি সমস্ত সম্পদ আরাধ্য জগন্নাথকে দান করেছিলেন। তিনি যে সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন সেগুলিতে হীরা, জহরত, সোনা ও রূপার ভাগ ছিল অনেকখানি। তিনি মন্দিরের সেবায়েত বা পুরোহিতদের রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষে দেব-দেবীদের শোভিত করার জন্য যে সোনা ও হীরা দিয়েছিলেন তা দিয়েই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ অলংকারে সজ্জিত করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই থেকে রত্নসিংহাসনের দেবতারা অর্থাৎ জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা প্রতি বছর বহুড়া যাত্রার পরে এই প্রাচীন গহনা দিয়ে সজ্জিত হয়ে আসছেন।
জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার যাবতীয় গহনা সারা বছর শ্রীমন্দিরের প্রশাসন, কার্যকর্তাদের মাধ্যমে শ্রীমন্দিরের গোপন ‘ভিতর ভাণ্ডারঘরে’ রক্ষা করা হয়। জগন্নাথের রত্নভাণ্ডারে দেবোত্তর দেড় শতাধিক সোনার গয়না রয়েছে। সোনা বেশের সময় জগন্নাথ ও বলভদ্র সোনার তৈরি হাত-পা ধারণ করেন। সুভদ্রা বিগ্রহে হাত-পায়ের সংযোজন হয় না। তিনটি বিগ্রহকে মাথায় অপূর্ব মুকুট, বাহুতে তাগাদি, কণ্ঠে রত্নহার দিয়ে সাজানো হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র কপালে ধাতুর তৈরি তিলক সেবা করেন। সোনা বেশের সময় জগন্নাথ শঙ্খ ও চক্র এবং বলভদ্র হল ও মষুল ধারণ করেন। সোনার তৈরি চন্দ্রসূর্য, সূর্যমুখী ফুল, পদ্ম ফুল দিয়েও বিগ্রহ সজ্জা করানো হয়। জগন্নাথের এই বেশ ভক্তদের স্মরণ করিয়ে দেয় তিনিই জগতের রাজা। একজন প্রকৃত রাজার কাছে যেমন প্রতিটি প্রজাই তাঁর নিজের সন্তান সমান, তেমনই জগন্নাথের রাজ্যে প্রতিটি ভক্তই তাঁর সন্তান, অমৃতের পুত্র। তিনি জগতের পালনকর্তা।
পুনশ্চ : আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে আয়োজিত জগন্নাথের সোনা বেশ শৃঙ্গারেই ভিন্ন নামে আশ্বিনের শুক্লপক্ষের দশমী বা বিজয়া দশমীতে রাজ বেশ, কার্তিকের পূর্ণিমা বা রাসপূর্ণিমায় রাজরাজেশ্বর বেশ, পৌষের পূর্ণিমায় রাজাধিরাজ বেশ, ফাল্গুনের পূর্ণিমা বা দোলযাত্রায় রাজা বেশ নামে পরিচিত। সরলভাবে বলা যেতে পারে, উল্লিখিত প্রতিটি বেশই জগন্নাথের সোনা বেশ। নাম ও আচার অনুষ্ঠানে কিছু পার্থক্য থাকলেও এই বেশগুলির মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২৭. প্রলম্বাসুর বধ বেশ 🏹 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🏹 প্রলম্বাসুর বধ বেশ:-
ত্রেতাযুগে জগতের নাথ নারায়ণ রামচন্দ্র রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর লীলাবর্ধনে জন্ম নিয়েছিলেন অনন্তনাগ লক্ষ্মণ রূপে। অনন্তনাগ নারায়ণের নিত্যসেবক। ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র তাঁর জীবনে অনেক এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাতে শেষাবধি রামচন্দ্র কষ্টে দুঃখে দীর্ণ হয়েছিলেন। রামচন্দ্রের জীবনের সর্বাবস্থায় লক্ষ্মণ তাঁর সহযোগী হয়েছিলেন। রামচন্দ্রের কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত ঠিক মনের মতো না হলেও লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের কোনো কাজের বিরোধিতা করেননি। ভাতৃ-আজ্ঞাকে তিনি চিরকাল মাথায় বহন করেছেন। ত্রেতাযুগে লীলাবসানের পর অনন্তাবতার লক্ষ্মণ বৈকুণ্ঠে এসে নারায়ণের কাছে অভিযোগ করেন, ত্রেতাযুগে অনন্তনাগ রামচন্দ্রের অনুজ লক্ষ্মণ রূপে জন্মগ্রহণ করে চিরকাল রামচন্দ্রের আজ্ঞাবহ ছিলেন। অনুজ হওয়ার জন্য রামচন্দ্রের কোনো কাজ রামচন্দ্রেরই ক্ষতিসাধক হচ্ছে বুঝেও লক্ষ্মণকে চুপ থাকতে হয়েছে। তাই অনন্তনাগ বৈকুণ্ঠে নারায়ণকে সশক্তিক দেখে অনুরোধ করেন, আগামী অবতারে তিনি নারায়ণের অনুজ হয়ে নয়, বরং অগ্রজ হয়ে জন্ম নিতে চান। যাতে প্রয়োজনে লোকাচার মেনে নিজের শাসনে তিনি নারায়ণকে সঙ্কট থেকে আগলে রাখতে পারেন। অনন্তনাগের মনের ভাব বুঝতে পেরে নারায়ণ তাতে সম্মতি দেন। দ্বাপর যুগে জগন্নাথ নারায়ণ কংসের অত্যাচার থেকে ভূদেবীকে রক্ষা করতে ধরাধামে কৃষ্ণরূপে আবির্ভূত হন। কৃষ্ণের জন্মের কিছুকাল আগে তাঁর অগ্রজ বলরাম রূপে আবির্ভূত হন অনন্তনাগ। বলরাম জন্মগ্রহণ করেন বৃন্দাবনের নন্দরাজগৃহে মাতা রোহিনী দেবীর গর্ভে ও কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন মধুরা নগরীতে রাজা কংসের কারাগারে মাতা দেবকীর গর্ভে। অষ্টমীর গভীর রাত্রে কৃষ্ণের জন্মের পর দৈবের সহায়তায় যাদবরাজ বসুদেব নিজের সন্তানকে তাঁর বিশ্বাসভাজন মিত্র নন্দরাজের গৃহে সুরক্ষিত রাখার বন্দোবস্ত করে মথুরায় ফিরে আসেন। কৃষ্ণ-বলরামের লীলাবিলাসে বৃন্দাবনধাম হয়ে ওঠে দ্বাপরের বৈকুণ্ঠপুর। দ্বাপর যুগে জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁদের বাল্যলীলায় সমগ্র বৃন্দাবনের ভূমি মাতিয়ে তুলেছিলেন। জগন্নাথ-কৃষ্ণ ও অনন্ত-বলরামের বৃন্দাবনলীলায় বৈষ্ণবীয় পঞ্চরসের প্রতিটি পর্বেরই নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে।
মথুরার রাজা কংস দৈববাণী শুনেছিলেন তার ভগিনী দেবকীর গর্ভজাত অষ্টম সন্তান তার বিনাশ করবে। দেবকীর গর্ভজাত অষ্টম সন্তান কংসের বিনাশ করবে জেনেও অত্যাচারী কংস দেবকীর পরপর ছয়টি সন্তানকে জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করে। দেবকীর সপ্তম সন্তান তাঁর গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়। অবশেষে দেবকীর গর্ভে স্বয়ং ভগবান জন্ম গ্রহণ করেন। বসুদেব তাঁদের অষ্টম সন্তানকে রক্ষা করতে সমর্থ হলেও দেবকী দীর্ঘদিন সেই সংবাদ জানতে পারেননি। অবশেষে দেবকীর অষ্টম সন্তান কৃষ্ণের মহিমার কথা বৃন্দাবন ছাপিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে মথুরায় কংস ভীত হয়ে ওঠেন। প্রাণভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত কংস দৈববাণীর কথা ভুলে যেতে পারেননি। তিনি শিশু কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য তার অনুগামী অসুর ও রাক্ষসদের একে একে বৃন্দাবনে কৃষ্ণ ও বলরামকে হত্যার জন্য পাঠাতে থাকেন। কিন্তু যিনি পূর্ণব্রহ্ম জগন্নাথের বিনাশ তিনি না চাইলে আর কে ঘটাবে! বাল্যাবস্থা থেকেই কৃষ্ণ ও বলরাম কংসের প্রেরিত সমস্ত দুষ্টজনকে অবলীলায় সংহারে সমর্থ হন।
মথুরারাজ কংসের আজ্ঞাবহ হয়ে প্রতাপশালী বহুরূপধর অসুর প্রলম্ব কংসের কালরূপ কৃষ্ণের সন্ধানে যমুনার তীরবর্তী বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন। প্রলম্বাসুর কৃষ্ণকে চিনত না, আগে সে কোনোদিন কৃষ্ণকে দেখেওনি। বৃন্দাবনে গিয়ে প্রলম্বাসুর নিজের বিকট রূপ মায়ায় আবৃত করে একজন শিশুর রূপ ধারণ করে। প্রলম্বাসুরের ইচ্ছা ছিল বন্ধুর বেশে কৃষ্ণের সঙ্গে মিশে কৃষ্ণের বিনাশ সাধন করে তার প্রভু কংসের সাহায্য করা। মায়ায় শিশুর ছদ্মবেশে প্রলম্বাসুর অনায়াসে গোপবালক দলের মধ্যে মিশে যেতে সমর্থ হন। শিশুরা সরলমতি তারা কেউই বুঝতে পারেনি এই নব্যাগত শিশুটি তাদের মধ্যে কারও একজনের ক্ষতিসাধন করতে এসেছে।
বৃন্দাবনের মূলধন গাভীদের তৃণভূমিতে চড়তে দিয়ে গোপবালকগণ ও কৃষ্ণ-বলরাম নিজেদের নিত্যনতুন খেলায় মেতে উঠলেন। শিশুর ছদ্মবেশে আসা প্রলম্ব অসুর এক নতুন খেলার পরামর্শ দেয়। বালকেরা দুদিকে দুই দলে ভাগ হয়ে খেলবে। খেলার শেষে যে দল হারবে সেই দল অন্য দলকে কাঁধে করে এক প্রান্ত অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বহন করবে। এই খেলার পরামর্শে সকলেই রাজি হয়। কিন্তু দুইটি দলের মধ্যে যে দলপতি দরকার। কৃষ্ণ ও বলরাম দুই জনে যে দলে থাকবে সেই দলকে হারায় কার সাধ্যি! অতএব কৃষ্ণ ও বলরাম দুই দলের দলপতি হলেন। খেলা হলো সমানে সমানে। এই খেলায় কৃষ্ণের দলকে হারিয়ে জয়ী হলো বলরামের দল। বলরামের দলে হৈ হৈ করে আনন্দ হলো। শর্ত মতো কৃষ্ণের দলের শিশুরা বলরামের দলের শিশুদের কাঁধে তুলে অন্য প্রান্তের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল। এই সুযোগে শিশুর ছদ্মবেশী প্রলম্বাসুর বলরামকে কাঁধে তুলে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করে দিল। প্রলম্বাসুর বলরামকে কৃষ্ণ ভেবে ভুল করেছিল। প্রলম্বাসুর বলরামকে কাঁধে নিয়ে যত এগায় ততই শিশু বলরামের ভার বৃদ্ধি পেতে থাকে। যে বলরাম স্বয়ং বিশ্বম্ভর ভগবানের অংশ তাঁর ভার বহন করা সামান্য কথা নাকি! যথারীতি শিশুর ছদ্মবেশে থাকা প্রলম্বাসুর দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। একপ্রকার বাধ্য হয়ে শেষে প্রলম্বাসুর নিজের আসল বিকট মূর্তি ধারণ করল। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেল সমস্ত গোপবালক। ভয়ে তারা অন্যত্র গমন করল। এই সুযোগে কৃষ্ণ ও বলরাম নিজের আত্মশক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে প্রলম্বাসুরকে সংযত করলেন। বলরাম ভীষণ আঘাতে আঘাতে প্রলম্বাসুরকে মুক্তি দানে ধন্য করলেন। প্রলম্বাসুর বলরামের হাতে মৃত্যুলাভ করে বিষ্ণুলোকে গমন করল।
শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা প্রতি বছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে প্রলম্বাসুর বধ বেশে সুসজ্জিত হন। এই বেশে মূলত বলভদ্রদেবের পোশাকেই বৈচিত্র্য বেশি থাকে। জগন্নাথ ও সুভদ্রা আষাঢ়ের রথযাত্রা পরবর্তী স্বর্ণ বেশ বা সোনা বেশের (সুনা বেশ বা Suna besh) অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হন। প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথদেব অজস্র সোনার অলংকারে সজ্জিত হন। জগন্নাথ বিগ্রহে দুটি হাত সংযুক্ত করা হয়। জগন্নাথের দুই হাতের মধ্যে দক্ষিণ হাতে সুদর্শন চক্র ও বাম হাতে পাঞ্চজন্য শঙ্খ শোভা পায়। এই বেশে জগন্নাথের দুই পা দেখা যায়। দেখে মনে হয় জগন্নাথ রত্নবেদীতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এই বেশের সময়ে জগন্নাথকে মূলত পীতাম্বরে সাজানো হয়। জগন্নাথের দুই পাশে ভূদেবী ও শ্রীদেবী থাকেন। সুভদ্রা দেবীর পোশাকে বৈচিত্র্য দেখা যায় না। সোনা বেশের মতো অজস্র অলংকারেই মূলত এই বেশে সুভদ্রা দেবীর শৃঙ্গার হয়। সুভদ্রা দেবী রক্তাম্বরে সাজেন। প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারে সবচেয়ে বৈচিত্র্য দেখা যায় বলরাম বিগ্রহে। বলভদ্রদেবের ঠিক সামনে দুই হাত দুপাশে প্রসারিত সশস্ত্র প্রলম্বাসুরকে দেখা যায়। প্রায় চার ফুট উচ্চতার কাঠের তৈরি সবুজ রঙের ভীষণ দর্শন প্রলম্বাসুরের কাঁধ বেষ্টিত অবস্থায় বলরামের দুই পা দেখা যায়। বলরাম বিগ্রহেও সংযোজন করা হয় দুটি হাত। বলরাম তাঁর দুই হাতের মধ্যে দক্ষিণ হাতে মুষল ও বাম হাতে হল শোভিত হয়। প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারের সময়ে বলরামকে নীলাম্বরে সজ্জিত করা হয়। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গার অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথের মধ্যাহ্ন ধূপা (মধ্যাহ্নকালীন ভোগরাগ) অনুষ্ঠানের পর। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বিগ্রহগুলি শোলা, রঙিন কাগজ, চকচকে জরি ও অজস্র ফুলের সাজে সাজানো হয়। সমগ্র সজ্জা সাজাতে প্রায় চার ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
জগন্নাথ ও বলভদ্র ভগবানের প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারের মধ্যে দিয়ে বার্তা পাওয়া যায়, ভগবানকে আমরা যেভাবে চাই সেভাবেই পাই। প্রলম্বাসুর জগন্নাথ-বলরামের সঙ্গে যতক্ষণ সখ্যভাবে আনন্দ করেছিল, ততক্ষণ ভগবানও তার সঙ্গে সখ্যভাব বজায় রেখেছেন। কিন্তু যখনই প্রলম্বাসুর বৈরীভাবে প্রভুর কৃপাদৃষ্টি থেকে সরে যেতে ইচ্ছুক হলো তখন বলভদ্রদেবের রোষানলে তার মৃত্যু নেমে এলো। জগন্নাথ কল্পতরু। তাঁর কাছে যে যে-ভাব নিয়ে আসে সে সে-ভাবেই প্রভুকে পায়। জগন্নাথকে প্রাণে মনে ভালবাসলে জগন্নাথ তাঁর ভক্তের জন্য ভালোবাসার দুইহাত বাড়িয়ে দেন। ভক্তবিলাসী জগন্নাথ জগতের নাথ হয়েও বিশুদ্ধ ভক্তের নিষ্কাম বিশুদ্ধ ভালবাসার কাঙাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২৮. কৃষ্ণ-বলরাম বেশ 🌷 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
কৃষ্ণ-বলরাম বেশ :-
শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত নির্দিষ্ট বেশগুলির মধ্যে কৃষ্ণভাবময় যে বেশগুলির শৃঙ্গারে জগন্নাথ ও কৃষ্ণের অদ্বৈত ভাব প্রকাশিত হয় তার মধ্যে অন্যতম জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রের কৃষ্ণ-বলরাম বেশ। জগন্নাথের শৃঙ্গারে ব্যবহৃত অজস্র বেশ শৃঙ্গারের মধ্যে কৃষ্ণ-বলরাম বেশটি রত্নসিংহাসনস্থ ত্রি-দেবদেবীর বাস্তবিকই আকর্ষণীয় পোশাক। হিন্দু বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের ত্রয়োদশীতে জগন্নাথ মহাপ্রভুর মধ্যাহ্ন ধুপের পর অনন্তাবতার বলভদ্রকে দ্বাপর যুগের বলরাম, পূর্ণব্রহ্ম জগন্নাথকে দ্বাপর যুগের কৃষ্ণ এবং ভগবতী সুভদ্রা মহারানীকে দ্বাপরের যোগমায়া দেবীর সাজসজ্জা পরিধান করানো হয়।
বৃন্দাবনের কৃষ্ণলীলায় ভগবানের শৈশবকালে পোষ্য গবাদি পশুদের সঙ্গে নিয়ে শিশু কৃষ্ণ ও শিশু বলরামের আনন্দময় সুখের সময়গুলি জগন্নাথ ও বলভদ্রের এই বেশভূষায় স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। কৃষ্ণ-বলরাম বেশ শৃঙ্গারে ব্যবহৃত বেশিরভাগ উপকরণ ও সাজসজ্জা শোলা, রঙিন জরি, নরম ও শক্ত বেত, বিভিন্ন রঙের কাপড় এবং ভেসজ আঠা ইত্যাদি ব্যবহার করে অতি যত্নে প্রস্তুত করা হয়। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার পোশাক পুরীরই এই শ্রেণির বিশেষজ্ঞ কারিগরগণ দক্ষতার সঙ্গে পরম্পরায় প্রস্তুত করেন। প্রতিটি উপকরণের নির্দিষ্ট মাপ রয়েছে। কৃষ্ণ-বলরাম বেশ শৃঙ্গারে মহাপ্রভু জগন্নাথ এবং প্রভু বলভদ্রের শ্রীঅঙ্গে দুটি করে হাত সংযোজন করা হয় এবং মা সুভদ্রা দেবীর জন্য তৈরি করা হয় চার হাত। ত্রিবিগ্রহের জন্য নির্মিত এই আট হাতের প্রতিটির নির্দিষ্ট ভঙ্গী রয়েছে। কৃষ্ণ-বলরাম বেশে ভগবতী সুভদ্রা দেবী শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনে রাখা কাঠের অপূর্ব শিল্পময় সিংহাসনে পদ্মাসনের পদ্ধতিতে বসেন। আছেন যা সজ্জায় আবৃত। উজ্জ্বল লাল রঙের বস্ত্রে আবৃত থাকেন সুভদ্রা দেবী। দেবীর এই শৃঙ্গারে পদ্মাসনরত দুখানি অতসীবর্ণের পা সংযোজন করা হয়। দেবীর পায়ের পাতা ওপরের দিকে দেখা যায়। এই বেশে শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথ মণিময় সুন্দর মুকুট দিয়ে সজ্জিত হন। জগন্নাথ ত্রিভঙ্গ ছন্দে পদবিন্যাস করে দাঁড়িয়ে থাকেন। জগন্নাথের বিগ্রহে দুইটি কৃষ্ণবর্ণের পা সংযোজন করা হয়। জগন্নাথের এই বেশে তিনি দক্ষিণ হাতে বাঁশি এবং বাম হাতে একটি প্রস্ফুটিত পদ্মফুল ধারণ করেন। জগন্নাথের অনুরূপভাবে বলভদ্রও ত্রিভঙ্গ ছন্দে দাঁড়িয়ে তাঁর দক্ষিণ হাতে শিঙা এবং বাম হাতে একটি পদ্মফুল ধারণ করেন। এই বেশে বলভদ্রদেবের বিগ্রহে দুটি শ্বেতবর্ণের পা সংযোজন করা হয়। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বিগ্রহ মুকুট, ফুলের নোলক, চন্দন, বিবিধ মালা, সোনার চন্দ্রসূর্য, বিবিধ অলংকার, কাপড়, উত্তরীয়-চাদর প্রভৃতি উপকরণে সেজে ওঠে। এই বেশে দেবী সুভদ্রার চার হাতে যথাক্রমে অভয়া মুদ্রা, বর মুদ্রা, পাশ ও অঙ্কুশ শোভা পায়। কৃষ্ণ-বলরাম বেশে শ্রীবিগ্রহের সঙ্গে দেখা যায় নন্দ রাজা, উপানন্দ, বাসুদেব, কৃষ্ণ ও বলরামের অজস্র সখা অর্থাৎ গোপ বালকবৃন্দ, গোপীগণ, প্রজাপতি ব্রহ্মা, দেবরাজ ইন্দ্র, দেবর্ষি নারদা, মাতা রোহিনী, মাতা যশোদা ইত্যাদির বিগ্রহ। এই বিগ্রহগুলি জগন্নাথ ও বলভদ্র উভয়েই পার্শ্বদেশে শোভা পায়। এছাড়াও কৃষ্ণ-বলরাম বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের দুই পাশে দুইটি করে মোট চারটি গাভী দেখা যায়। শ্রীমন্দিরের ত্রিদেবদেবী কৃষ্ণ-বলরাম বেশে থাকাকালীন সন্ধ্যা ধুপ পূজা উদ্যাপন শুরু হয়। হাজার হাজার ভক্ত জগন্নাথের কৃষ্ণ-বলরাম বেশভূষা দেখার অপেক্ষা করেন। গভীর রাত পর্যন্ত জগন্নাথ এই বিশেষ বেশে থাকেন। জগন্নাথের শয়নের পূর্বে এই পোশাক বদল করে সাধারণ পোশাক পরানো হয়। অনেক বছর আগে জগন্নাথের এই বেশের পরিবর্তে ‘গিরিগোবর্দ্ধন’ বেশে দেবতার শৃঙ্গার হতো। কিছু সমস্যার জন্য জগন্নাথের গিরিগোবর্দ্ধন বেশে বন্ধ হয়ে যায় ও সেই বেশের অনুসঙ্গ বহনকারী কৃষ্ণ-বলরাম বেশ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। ওড়িশার কটক শহরের এক জমিদার পরিবার থেকে জগন্নাথের এই বেশ শৃঙ্গারের ব্যয়ভার বহনের সুযোগ নেওয়া হয়ে আসছে দীর্ঘদিন।
জগন্নাথের কৃষ্ণ-বলরাম বেশের মাধ্যমে জগন্নাথ ও কৃষ্ণের অভিন্নতার তত্ত্ব অনেক মজবুত হয়েছে। এই বেশ কত বছরের প্রাচীন তার হিসেব পাওয়া যায় না। ‘জগন্নাথাষ্টকম্’-এ বর্ণিত জগন্নাথের কৃষ্ণভাবের সঙ্গে এই বেশের সংযোগ রয়েছে। এছাড়াও জগন্নাথের কৃষ্ণ-বলরাম বেশের মাধ্যমে ভক্তের কাছে বার্তা আসে, ভগবান যুগে যুগে সৎজীবন যাপনকারী মানুষের কল্যাণে তাদের মাঝেই অবতীর্ণ হন। নরশরীর পরিগ্রহ করে লীলাময় ভগবান লীলাবিলাসে আসেন। চারিদিকে যখন অধর্ম বয় তখন তিনি ধর্মের ধ্বজা নিজে বহন করতে আসেন। মন্থনের সময় মাটিতে জলে সব এক হয়ে থাকে, সময়ে স্থির হয়ে মাটি নীচে স্থির হয় ও জল ওপরে স্থির হয়। জগন্নাথ পূর্ণব্রহ্ম। সাক্ষাৎ দারুব্রহ্ম তিনি। তিনি পূর্ণব্রহ্ম পরমাত্মা হয়েও বিবিধ লীলাবিলাসের জন্য আমাদের মতো সাধারণ জীবাত্মার সঙ্গে থাকেন। তিনি পূর্ণ, তিনি আমাদের অপূর্ণতাগুলিকে নিজগুণ পূর্ণ করে তোলেন। কিন্তু এর জন্য তাঁর প্রতি আমাদের নিষ্কাম মনোবৃত্তি ও সাধনার প্রয়োজন।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ২৯. বনভোজী বেশ 🍁 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
বনভোজী বেশ :-
ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতির অজস্র লোককাহিনী ও বাংলার কবি বিশ্বম্ভর দাসের জগন্নাথমঙ্গলে কৃষ্ণের বাল্যলীলাকে জগন্নাথেরই বাল্যলীলার সঙ্গে একাত্ম করে তোলার প্রচেষ্টা হয়েছে। জগন্নাথের পৃথকভাবে কোনো বাল্যলীলার বর্ণনা সংস্কৃত স্কন্দপুরাণে পাওয়া যায় না। জগন্নাথভাগবতেও এর উল্লেখ নেই। কৃষ্ণের বৃন্দাবনী বাল্যলীলা বৈচিত্র্য ভরপুর। সহজ সরল সাধ্য ও সাধনার লীলামাধুর্যে কৃষ্ণের বাল্যলীলা ভক্তের আহ্লাদের বিষয় হয়ে ওঠে। কৃষ্ণ ও বলরামের বাল্যলীলার বিশেষত গোষ্ঠীলীলার ঘটনার সঙ্গে জগন্নাথের বনভোজী বেশ শৃঙ্গারের মিল রয়েছে। জগন্নাথের বনভোজী বেশ অনুষ্ঠিত হয় ভদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের দশমী তিথিতে। শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম এই দিনে এমনভাবে সজ্জিত হন যে, দেখে মনে হয় যেন তাঁরা কোনও এক বনভোজনে (চড়ুইভাতি বা পিকনিক) অংশ নিতে চলেছেন। পুরীতে জগন্নাথদেবের শ্রীমন্দিরে শ্রীকৃষ্ণ-জন্মাষ্টমী তিথির পরে ভগবান কৃষ্ণের প্রায় সমস্ত উল্লেখযোগ্য বাল্যলীলা বা ক্রিয়াকলাপ জগন্নাথের মধ্যে দিয়েই পরিচালিত হয়। যদিও কৃষ্ণ ও জগন্নাথের জন্মতিথি ভিন্ন ভিন্ন। কৃষ্ণের জন্মতিথি ভাদ্র কৃষ্ণাষ্টমীতে ও জগন্নাথের জন্মতিথি জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা বা স্নানযাত্রার পূর্ণিমার তিথিতে। শ্রীক্ষেত্রে কৃষ্ণের জন্মতিথি থেকে কয়েকদিন কৃষ্ণের লীলা বিষয়ে একাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে গোপবালকদের সঙ্গে বনভোজন, কলিবিকা, বকাসুর বধ, অঘাসুর বধ, কালিয়দমন, প্রলম্বাসুর বধ পালা অনুষ্ঠিত হয়। কৃষ্ণলীলার এই আখ্যানগুলির সবকটি জগন্নাথের বেশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।
জগন্নাথ মহাপ্রভুর বনভোজী বেশ একাধারে দারুতনুধর জগন্নাথের অন্যতম বিশেষ অনুগ্রহ ও কৃষ্ণের লীলার মনোরম-প্রেমময় অভিমুখটির পরিচয় বহন করে। জগন্নাথ ও তাঁর বড় দাউ (দাদা) বলভদ্র তাঁদের সহচর দেবগণ ও গোপাল বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে বৃন্দাবনের বনে বনভোজনে মান। কৃষ্ণ-বলরামের বন্ধুগণও গোপাল নামেই পরিচিত। এই সূত্র থেকে চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দের আশীর্বাদধন্য বাংলার শ্রীপাটগুলিতে দ্বাদশ গোপালের ধারণা এসেছে। বনভোজনে বনের ফল সহজলভ্য হলেও জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁদের ঘর থেকেই সুস্বাদু খাদ্য সঙ্গে বহন করে নিয়ে যান। বনভোজী বেশে দেবতারা বহন করেন ক্ষীর, সর, ননী প্রভৃতি সুস্বাদু ভোজন। এই ভোজ্যদ্রব্যের অধিকাংশই গোপজীবনে সহজলভ্য। ভাগবতেও কৃষ্ণ ও বলরামের বনভোজনের দৃশ্য রয়েছে। কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের সখাদের সঙ্গে আত্ম-পরের হিসাব, উচ্চ-নীচের হিসাব ভুলে গিয়ে একাত্ম হয়ে একত্র বিহার, ক্রীড়া ও ভোজনে মেতেছিলেন। বৃন্দাবনের বনে বনে সখ্যরসের ফল্গুধারা বয়ে গিয়েছিল। সখ্যরসে ঈশ্বর ও ভক্ত সমান সমান। দু’জনের মধ্যে অপূর্ব বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ভাগবতের এই ঘটনার ঠিক অনুরূপ দৃশ্যটি মহাপ্রভু জগন্নাথের বনভোজী বেশে ধরা রয়েছে। জগন্নাথের বনভোজী বেশে শৃঙ্গার সন্ধ্যা আরতির পরে শুরু হয় এবং সন্ধ্যাধুপের সমাপ্তি পর্যন্ত এই বেশ জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার শ্রীঅঙ্গে থাকে। প্রাকৃতিক শোলা, নরম বেত ও বিবিধ কাপড়ের তৈরি ফুলের পাপড়ি বলভদ্র ও জগন্নাথের মাথার চুড়ার সঙ্গে সুচারুভাবে সংযুক্ত থাকে। জগন্নাথের হাতে একটি বনচারীর লাঠি এবং এক হাতে জগন্নাথ দই ও অন্যান্য খাদ্যে ভরপুর একটি রূপোর বাটি ঝুলিয়ে ধারণ করেন। জগন্নাথের মতো ঠিক একইভাবে সাজেন বলভদ্রদেব। এই বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের হাত ও পা সংযোজন করা হয়। দেবী সুভদ্রার সাজে বৈচিত্র্য থাকে না। সুভদ্রা দেবীকে সোনা বেশ বা স্বর্ণ বেশের অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হতে দেখা যায়। এছাড়াও, জগন্নাথ ও বলভদ্রের সামনে গোচারণ লীলার স্মারক রূপে কাঠের তৈরি সাদা রঙের একটি গরু এবং একটি বাছুর উপস্থিত থাকে। ভাদ্র মাসে কদমফুল সহজেই পাওয়া যায়। তাই জগন্নাথের বনভোজী বেশে কদমফুলের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়াও ওড়িশার সাবেকি সাজের সোনার অলংকারে অলংকৃত করা হয় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে।
জগন্নাথের বনভোজী বেশ তাঁর সখারূপের পরিচয় বহন করে। তিনি শুধু ভক্তের আরাধ্য দেবতা নন, বরং তিনি ভক্তের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার মতো অভিন্নহৃদয় বন্ধু। ব্রজের গোপবালকরা জগন্নাথ-কৃষ্ণকে আপনজন ভেবেছিলেন। তাঁরা খেলতে খেলতে কখনও কৃষ্ণ-বলরামের কাঁধে চেপেছেন, আবার কখনও তাঁদেরই কাঁধে তুলে আনন্দ করেছেন। কখনও তাঁরা কৃষ্ণ-বলরামের সঙ্গে একপাত্রে আহার করেছেন, কখনও একত্র শয়ন করেছেন। বন্ধুত্ব কোনো লোকাচার মানে না। সাধারণ সমাজবিধির বাইরে গিয়ে তাই জগন্নাথ মহাপ্রভু বনভোজী লীলায় মাতেন। তিনি নিজেই আমাদের বৈধী পূজার বাইরে গিয়ে আপনভাবে ভাবিত হয়ে তাঁকে ধরার নির্দেশ দেন। তাঁকে অনুভব করার জন্য বিধিবদ্ধ নানা নিয়মে তাঁর পূজা করা, একবার তাঁকে অনুভব করতে শিখলে সমাজবিধি, পূজাবিধি সব তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন জগন্নাথ ভক্তের কাছে তদ্ভাবরঞ্জিত হয়েই ধরা দেন।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 ৩০. কালীয়দলন বেশ 🐍 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 তৃতীয় ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath3.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🐍কালীয়দলন বেশ :-
জগন্নাথকে বৈদ্যনাথও বলা হয়। তিনি জীবনের ঐহিক ও পারৈহিক উভয় প্রকারের বিষই হরণ করে জীবকে নির্বিষ ও সুস্থ করে তোলেন। তিনি উত্তম বৈদ্যদের একজন। তিনি ভক্তের কলুষ হরণ করেন। তিনি শ্রীক্ষেত্রে আগত সকল ভক্তের কলিকলুষ নাশ করেন। বৈচিত্র্যময় জগন্নাথের চরিত্রের এই ভাবটি গাথা রয়েছে তাঁর কালীয়দলন বেশের মধ্যে। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে শ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথকে কালীয়দলন বেশে শৃঙ্গার করানো হয়। মধ্যাহ্ন ধুপের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার কিছু পরে, শ্রীমৎ মহাপ্রভু জগন্নাথের কালীয়দলন বেশভূষার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়।
কালীয়দলনের ইতিবৃত্ত পাওয়া যায় কৃষ্ণকাহিনিতে কৃষ্ণের বাল্যলীলার আখ্যানে। কৃষ্ণের গোষ্ঠজীবনের সময়পর্বে কালীয় নাগ সপরিবারে যমুনা নদীতে এসে বসবাস করতে থাকে। কালীয় নাগের প্রবৃত্তি ছিল বড় হিংসাত্মক। যমুনায় কেউ স্নান ও জল পান করতে আসুক সেই বিষয়ে কালীয় নাগের ভীষণ বিদ্বেষ ছিল। বৃন্দাবনের যে যে যমুনার জল ব্যবহার করতে গিয়েছিল, কালীয় নাগের প্রকোপে তাদের সকলেরই প্রাণ সংশয় হয়েছিল। বৃন্দাবনের অনেকেই এই বিপদে পড়েছেন জানতে পেরে কৃষ্ণ বৃন্দাবনের এই গণসমস্যা নিবারণ করতে অগ্রসর হন। তিনি যমুনার জলে নেমে কালীয় নাগকে প্রতিহত করতে চান। কৃষ্ণ যমুনার জলে নামার সঙ্গে সঙ্গে কালীয় নাগ সচেতন হয়ে ওঠে ও তার বিদ্বেষী মনে হিংস্র ভাব জেগে ওঠে। যমুনার জলে কৃষ্ণ ও কালীয় নাগের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ চলতে থাকে। যমুনার বিষাক্ত জল প্রবলভাবে দোলা খেতে থাকে। অনেকক্ষণ ধরে যমুনার জলে কৃষ্ণ ও কালীয় নাগের মধ্যে ভীষণ লড়াই চলতে থাকে। কৃষ্ণের রণমূর্তির আঘাতে কালীয় নাগের অঙ্গ থেকে রক্ত বের হতে শুরু করে। সেই বিষতুল্য লাল রক্তে যমুনার জলও লাল হতে শুরু করে। যমুনা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বলরাম, কৃষ্ণ ও বলরামের অজস্র সখা, অজস্র গোপ ও গোপী, মা যশোদা, নন্দরাজ, শ্রীমতী রাধা ও তাঁর সখীগণ সকলেই কৃষ্ণের জন্য দুশ্চিন্তা করতে থাকেন। এমন সময় যমুনার জলে লাল রক্তের আভাস পাওয়া মাত্র বৃন্দাবনে কৃষ্ণের জন্য সকলে হাহাকার করে ওঠে। এঁদের অনেকেই জানতেন কৃষ্ণ সাধারণ মানুষ নন, তিনি স্বয়ং নারায়ণ। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই কৃষ্ণকে নিজের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসেন বলেই তাঁর জন্য দুশ্চিন্তা করেন। বহুভাবময় কৃষ্ণ-জগন্নাথ, তাঁর বহুভাবময় ভক্ত। অবশেষে বৃন্দাবনের সকলের সমস্ত দুশ্চিন্তা নস্যাৎ করে দিয়ে কৃষ্ণ কালীয় নাগের সঙ্গে যমুনার জলে ভেসে ওঠেন। যমুনার জলেই কালীয় নাগের ভীষণ ফণাগুলির ওপর কৃষ্ণ নৃত্য শুরু করেন। নটবর কৃষ্ণের নৃত্যের ছন্দে তালে পদাঘাতে ধীরে ধীরে কালীয় নাগ দুর্বল হতে শুরু করে। কালীয় নাগের একটি ফণা থেকে আরেকটি ফণায় কৃষ্ণের পায়ের আঘাত পড়তে পড়তেই কালীয় নাগের প্রাণ যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। ক্রমশ কালীয় নাগ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে শুরু করে। কিন্তু কৃষ্ণের ক্রোধ তখনও শান্ত হয়নি। কৃষ্ণ আরও প্রবলতর গতিতে কালীয় নাগের ফণা থেকে ফণায় দ্রুততর পদবিন্যাসে নৃত্য করতে শুরু করেন। কালীয় নাগের মুখ থেকে রক্তপাত হতে শুরু করে। কালীয় নাগের এই অবস্থা দেখে তার স্ত্রীগণ কৃষ্ণের কাছে কালীয় নাগের হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করতে থাকে। কালীয় নাগের স্ত্রীগণের স্তব, স্তুতি ও প্রার্থনায় কৃষ্ণের ক্রোধ নিয়ন্ত্রনে আসে। কৃষ্ণ আগের থেকে শান্ত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ এক হাতে কালীয় নাগের লেজ ধরে তাকে সম্পূর্ণরূপে সংযত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কালীয় নাগের মাথায় কৃষ্ণের পদচিহ্ন তৈরি হয়। কৃষ্ণ কালীয় নাগকে আশীর্বাদ করেন তাঁর এই পদচিহ্ন দেখে পক্ষীরাজ গরুড় মহারাজ আর কোনোদিনই সপরিবারে কালীয়কে কোনো ক্ষতি করবে না। কৃষ্ণের নির্দেশনা অনুযায়ী কালীয় নাগ সপরিবারে যমুনা নদী ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করে। যমুনার দূষিত জল এক নিমেষে দূষণমুক্ত হয় কৃষ্ণের কৃপায়। যমুনা নদীর ওপর নির্ভরশীল সমগ্র জনজীবনে জলবাহিত বিষের ভয় নষ্ট হয়ে যায়। দ্বাপর যুগের এই মহিমাময় বৃত্তান্তটি স্মরণে রেখে আজও শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের কালীয় দলন বেশে শৃঙ্গার করানো হয়। কৃষ্ণের জীবনের কালীয় দলনের আখ্যানটিকে আধুনিক পরিবেশবাদী দৃষ্টিতে জলদূষণ রোধের আখ্যান।
কালীয়দলন বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্র বিগ্রহে কাঠের তৈরি পা ও হাত সংযোজন করা হয়। এই বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্র উভয়ের বিগ্রহই দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। কালীয়দলন বেশে শৃঙ্গারে জগন্নাথের দক্ষিণ হাতে পদ্ম ফুল শোভা পায়। বাম হাতে তিনি কালীয় নাগের লেজের শেষভাগ ধরে তাকে দমন করেন। জগন্নাথের দুই পা কালীয় নাগের ফণার ওপর স্থিত দেখা যায়। জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহ এমন ভঙ্গিমায় সাজানো হয় যে, তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি কালীয় নাগের মাথায় দাঁড়িয়ে তার লেজের শেষভাগ ধরে তাকে দমন করছেন। জগন্নাথের কালীদলন বেশ শৃঙ্গারের সময় তাঁর দক্ষিণ হাতে পদ্ম ফুলের পরিবর্তে ভোজ্য দ্রব্য ( অমৃতের লাড্ডু) ও বাঁশি দেওয়ার রীতিও রয়েছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট রীতি পাওয়া যায় না। জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের সময় ভগবতী সুভদ্রা দেবী সোনা বেশের অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হন। জগন্নাথ ছাড়া আর বলভদ্রদেবের বিগ্রহেই যা একটু বৈচিত্র্য দেখা যায়। বলরামের দক্ষিণ হাতে ভোজ্য দ্রব্য (অমৃতের লাড্ডু) ও বাম হাতে পদ্ম ফুল দেখা যায়। এই বেশে বলরামের হাতেও কখনও মুষল, হল ও শিঙা দেখা যায়।
জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারে ব্যবহৃত কালীয় নাগের দৈর্ঘ্য প্রায় ত্রিশ ফুট। এই নাগের শরীরটি শ্রীমন্দিরের নির্দিষ্ট দর্জি শ্রেণির কারিগররা রেশম, জরি, বেত এবং কাপড় ব্যবহার করে তৈরি করেন। কালীয় নাগ তৈরিতে কালো, নীল, গাঢ় সবুজ রঙের ব্যবহার দেখা যায়। কালীয় নাগের সম্পূর্ণ শরীর মূলত কালো রঙের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। কালীয় নাগের শরীরটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, নাগটিকে সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ভঙ্গীতে প্রয়োজন অনুসারে বাঁকানো যায়। জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের সময় কালীয় নাগকে জগন্নাথের রত্নসিংহাসনের ওপরের অংশে এনে এমনভাবে সাজানো হয় তাতে নাগের মাথাটি জগন্নাথের বিগ্রহে সংযোজিত কৃষ্ণবর্ণের কাঠের পায়ের ঠিক নীচে থাকে এবং নাগের লেজটি দেবতার হাতে থাকে। বলভদ্র বিগ্রহের সামনে দু’পাশে দুটি বৃন্দাবনী গাভী দেখা যায়। ওড়িশায় লোকবিশ্বাস রয়েছে, কালীয়দলন বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের হাতে ধরা অমৃতের লাড্ডুর প্রসাদে শরীরে বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। জগন্নাথ ও বলভদ্রের স্পর্শধন্য এই অমৃতের লাড্ডু ভক্ষণ করলে সর্পদংশনের ভয় নাশ হয়। খুব সম্ভবত এই লোকবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে, প্রাচীনকালের ওড়িশা অঞ্চলের সাপের উৎদ্রবের ভয় থেকে। বঙ্গদেশে সর্পভীতি ও সর্পদংশন জনিত অপঘাতের ভয় থেকে যেমন মনসা দেবীর পূজার প্রসার ঘটেছিল, তেমন একই সমাজ মানস থেকে ওড়িশায় জগন্নাথের কালীয়দমন বেশের প্রতি সাধারণ জনতার আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ওড়িশাবাসী ও জগন্নাথ-সংস্কৃতি সচেতন অজস্র মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন জগন্নাথ মহাপ্রভুর কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের দর্শনমাত্রে শরীরে পার্থিব ও অপার্থিব সমস্ত বিষ নাশ হয়, কঠিন বিষময় দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করেন স্বয়ং জগন্নাথ। এই বিশ্বাসেই অজস্র জগন্নাথের ভক্ত জীবনে অন্তত একবার জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের সময় তাঁকে দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। উৎকলের জনতা মনের আনন্দে কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’-এর অংশবিশেষ গেয়ে ওঠে, “কালিয়বিষধরগঞ্জন জনরঞ্জন।/ যদুকুলনলিনদিনেশ জয় জয় দেব হরে।।”
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🔜 ক্রমাগত 👉 শ্রীশ্রীজগন্নাথ লীলামৃত 📝 চতুর্থ ভাগ 🙇 শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত চরণে অসংখ্যকোটি প্রণাম 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/10/jagannath4.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
꧁ 👇📖 সূচীপত্র 🙏 শ্রী মৃন্ময় নন্দী 📖👇꧂
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*••••━❀꧁👇 📖 সূচীপত্র 📖 👇꧂❀┅••••*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*••••━❀꧁👇📚 PDF গ্রন্থ 📚👇꧂❀┅••••*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ
হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রীরাধেগোবিন্দ।।
*••••┉━❀꧁ 🙏 জয় জগন্নাথ 🙏 ꧂❀━┅••••*
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥
*••••┉━❀꧁ 🙏 জয় রাধাকান্ত 🙏 ꧂ ❀━┅••••*
🌷❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🌷
🏵️❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🏵️
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
