*🌻মধ্যাহ্ন লীলা সূর্য্য পূজা গৌরচন্দ্রিকা🌻*
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
*হেম সঞে অতি গোরা,সুমধুর হাস থোরা,*
*জগজন নয়ন আনন্দ।*
*পিরীতি মূরতি কিয়ে,রূপ স্বরূপ ধর,*
*ঐছন প্রতি অঙ্গ বন্ধ।।*
*আজু কিয়ে নবদ্বীপ চন্দ্র।*
*কামিনী কাম, কলিত তছু মানস,*
*গতি অছু গজ জিনি মন্দ।।*
*মাঝ দিনহি পুনঃ,বসনে আবৃত তনু,*
*কহ তহিঁ পূজব সূর।*
*কম্প পুলক ঘাম,স্বরভঙ্গ অনুপাম,*
*নয়নহি জল পরিপূর।।*
*বাম ভূজহি, বসনে মুখ ঝাঁপই,*
*বাম নয়নে ঘন চায়।*
*রাধা মোহন দাস, চিতে অভিলাষই,*
*সোই চরণ জনু পায়।।*
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
*🌻প্রথম পদ🌻*
*রাধিকা রূপসী,লইয়া তুলসী,কহয়ে মরম কথা।*
*কাননে গমন,করহ এখন,নাগর শেখর যথা।।*
*সময় বুঝিয়া,সরস হইয়া,মিলিবে নাগর কান।*
*চতুর নিকটে,কহিবে কপটে,রাখিবে আপন মান।।*
*তুলসী উলসী,মনেতে হরষি,চলিলা রাইয়ের বোলে।*
*তাম্বুল কর্পূর,লৈয়া ফুলহার,মিলিলা সরসী কূলে।।*
*দেখিয়া তুলসী,নাগর উলসী,যতনে বসায় কাছে।*
*আপন আকুলি,কহিয়া সকলি,রাইয়ের গমন পুছে।।*
*এ ধনি চতুরী,না কর চাতুরী,আমার শপথি তোরে।*
*রাধার কুশল,কহিয়া সকল,শীতল করহ মোরে।।*
*সে যে বিনোদিনী,দিবস রজনী,অন্তরে খেলয়ে মোর।*
*শুতিলে স্বপনে,দেখিয়ে সেজনে,শপতি করিয়ে তোর।।*
*তুলসী চাতুরা,কহয়ে মধুরা,কাতর দেখিয়া কান।*
*তুষিয়া তাহারে,চলিলা সত্বরে,রাখিয়া আপন মান।।*
*বীরা বৃন্দা আসি,রাই রসে বসি,সাজাইল নিজ মনে।*
*করি সমাপন,আসিতে ভবন,তুলসী মিলিলা বনে।।*
*হাস পরিহাসে,রাইক আবাসে,আইলা সকল সখি।*
*শেখর সহিতে,বারতা শুনিতে,সজল রাধার আঁখি।।*
*🌼দ্বিতীয় পদ🌼*
*তুলসী বচনে,সব সখিগণে,দেব পূজিবার তরে।*
*বিধি অগোচর,নানা উপহার,পূজন ভাজন করে।।*
*চিনি ফেনি কলা,মাখন রসালা,রেউড়ি কদম্বা তিলা।*
*পুরি পুয়া খাজা,পেড়া সর ভাজা,রাধিকা করিয়া ছিলা।।*
*অমৃত কেলিকা,আদি সে লাডুকা,সঘৃত মুদগ ঝুরি।*
*দেবতা পূজনে,করিয়া যতনে,বুঁদি রসকরা খিরি।।*
*অগোর চন্দন,ভরিলা ভাজন,সুগন্ধি ফুলের মালা।*
*অতুল অমূল,কর্পূর তাম্বুল,সাজাল সকল ডালা।।*
*সঙ্গিনী রঙ্গিনী,রূপ তরঙ্গিণী,বসিয়া মন্দির মাঝে।*
*মদন মোহন,মোহিতে যতন,করিলা রাইক সাজে।।*
*সভারে সত্বর,করিলা শেখর,দেখিয়া উছর বেলা।*
*জটিলা চরণ,করিয়া বন্দন,চলিলা সকল বালা।।*
*🌻ব্যাখ্যা🌻*
*অদ্য মহাভাবস্বরূপিনী,বৃষভানু নন্দিনী, শ্রীমতীরাধাঠাকুরাণী সখিগণ সঙ্গে নিয়ে আপন মরম কথা বলছেন।* *আজকে যেন শ্রীমতীর অন্তরে চরম ব্যথা,কেন?* *প্রত্যহ রাধার প্রাণবল্লভ গোচারচে যাবার সময় যাবটের নিকট পথ দিয়ে অগ্রসর হন।* *আজও সেই পথ দিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন,কিন্তু কার্য্য বশতঃ তাঁর প্রাণবল্লভের বদন দর্শন হয় নাই,তাতেই শ্রীমতীর অন্তরে চরম ব্যথা।* *তাই আজ বিনোদিনী বলছেন,ওরে সখি আজ আমার চরম দুর্দিন।* *আমার কোন কিছুতেই মন বসছে না,বল,বল সখি এখন আমি কি করব।* *আপরদিকে শ্রীগোবিন্দের একই দশা।* *কানাই সুবলের হাত ধরে বনের ভিতরে টেনে নিয়ে এসে বলছেন,সুবল!আজ আমার মন ভাল লাগছে না।*বার বার তোর বদন দর্শন করছি আর আমার প্রাণপ্রিয়তমার কথা মনে পড়ছে।*
*বল মরম সখা একন আমি কি করব।*
*🌻প্রথম পদের ব্যাখ্যা🌻*
*সখিসঙ্গে নানান কথোপকথনের মধ্যে হঠাৎ তুলসী এসে উপস্থিত হলেন।*তুলসীকে দেখে রাধার মন কিছুটা হালকা হল।*তুলসীকে কাছে বসিয়ে রাইধনি নিজের মনের কথা বলছেন।* *আজ আমার মন খুবই খারাপ,তুই এখুনি কাননে যা,গিয়ে দেখে আয় আমার প্রাণপ্রিয়তম কেমন আছে,* *তবে আমি তোকে পাঠিয়েছি বুঝতে দিবি না, এমনভাবে কথা বলবি যেন দুইপক্ষের মান সম্মান বজায় থাকে।* *কর্পূর মিশ্রিত তাম্বুল ও ফুলের হার হাতে নিয়ে তুলসী আনন্দেত মনে কাননে চললেন।* *বনে তুলসীকে দেখে গোবিন্দ বললেন,রাইধনি আমার কেমন আছে,* *বল তুলসী?* *সদাসর্বদা রাইধনি আমার মনের ভিতরে খেলা করে।* *গোবিন্দের ব্যাকুলতা দেখে তুলসী বললেন,তোমার মতই রাইধনি আছে বলিয়া সেখান থেকে চলে গেলেন।* *ঐদিকে রাধা ধৈর্য্যহীন হয়েছেন।*রাধার আর ধৈর্য্য ধরে না,* *চরম ব্যাকুলা হয়েছেন,সখিগণ বারংবার বলছেন রাধ!অপরাহ্নে তোর প্রাণ বল্লভ এইপথ দিয়েই যাবে,* *তখন তুই মন ভরে তোর বঁধূকে দর্শন করবি।* *একটু ধৈর্য্য ধর।যখন এপথ দিয়ে যাবে তখন তোর বিরহ-তাপিত প্রাণ সুশীতল করবি।* *এইকথা বলতে বলতেই তুলসী ফিরে এলো।বঁধূর বার্তা শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।* *তখন সবসখীগণ রাধাকে ছলনা করতে বললেন,কি ছলনা?রাধা তখন উচ্চৈস্বরে কাঁদতে লাগলেন,* *ক্রন্দন শুনে জটিলা,কুটিলা এলেন এসে জিজ্ঞাসা করলেন বৌমা কি হয়েছে কাঁদছ কেন?* *যতকথা জটিলা বলছেন ততই জোরে জোরে রাই কাঁদছেন,* *তখন কুটিলা বলছে দেহের কোথাও ব্যথা করছে,জড়িবুটি এনে দিব?* *এইকথা শুনে ফুঁপরে ফুঁপরে কাঁদতে লাগলেন।* *জটিলা কাছে এসে সোহাগ করে বললেন,বৌ বলো কি হয়েছে,রাধা তখন বললেন,মা! আমি শেষ রজনীতে খুবই খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।* *জটিলা বললে কি খারাপ স্বপ্ন?রাধা বললেন,* *ভোরবেলার স্বপ্ন না কি সত্যি হয়,তাইনা মা?* *জটিলা বললেন হ্যাঁ বৌ ঠিক বলেছ।* *এবারে রাধা কান্না থামিয়ে বললেন যে,মা স্বপ্নে দেখলাম আমি যদি আজ বনে গিয়ে সূর্য্য মন্দিরে পূজা না করি তাহলে আপনার পুত্রের চরম অমঙ্গল হবে।* *তারসঙ্গে গৃহের সকলের অকল্যাণ হবে।* *বলুন মা এখন আমি কি করব?* *সখীগণ রাধার কথা শুনে হাসি চেপে রাখতে পারছেন না,হাসতেও পারছেন না।* *জটিলা তখন বললেন আমার পুত্রের মঙ্গলের জন্য সূর্য্য পূজার সমস্ত উপকরণ নিয়ে সূর্য্য মন্দিরে যাও।*
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
*🌻🌻দ্বিতীয় পদের ব্যাখ্যা🌻🌻
*সূর্য্য পূজন করবার জন্য নানা উপহার ও নৈবেদ্য ডালায় সাজিয়ে জটিলার চরণ বন্দন করে সকল আহিরীবালা সূর্য্য পূজা করবার জন্য* *কানন অভিমুখে যাত্রা করলেন।* *কিন্তু কুটিলমতি কুটিলার মন স্থির রইল না।* *মনে মনে বদভাবনা ভাবতে লাগল।*
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
*🌻🌻🌻তৃতীয় পদ🌻🌻🌻*
*কুসুমিত কুঞ্জ,কলপতরু কানন,*
*মণিময় মন্ডপ মাঝ।*
*আইলা কলাবতী,সবজন সঙ্গতি,*
*করে লয়ে পূজন সাজ।।*
*কুঙ্কুম চন্দন, কেশর অনুপম,*
*চম্পক মালতী মাল।*
*বহুবিধ বনফুল,নীর সুশীতল,*
*বহু উপহার রসাল।।*
*🌻যেন মনে হচ্ছে নানা ফুলে ফুলে একটি ফুলের কুঞ্জ নির্মাণ হয়েছে।* *সেই নির্মিত কুসুম কুঞ্জ কলপতরু কাননে পরিণত হয়েছে, সে কল্পতরুর কাছে যা চাইবে বা বাসনা করবে তাহাই পূর্ণ হবে।* *সব মিলিয়ে যেন এক মণিময় মন্ডপ তৈরী হয়েছে।* *কলাবতী(রাধা) সকল সখীগণের সঙ্গে হাতে পূজোর উপকরণ নিয়ে এই মণিময় কাননে এষে উপস্থিত হলেন।*
*ভানু ভবনে ধরি,রাখাল সারি সারি,*
*দধি ঘৃত রতন প্রদীপ।*
*সহচর মেলি,কেলি কলাবতী,*
*বৈঠল দেব সমীপ।।*
*নিজ রসে ভাসি,হাসি ধনি বোলই,*
*শুনহ কানন দেবী।*
*দেব পূজন বিধি,যে জন জানয়ে,*
*তাহিক আনহ সেবি।।*
*🌻যত ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগোতে লাগলেন দেখলেন সূর্য্য মন্দিরের সামনে সারি সারি রাখালগণ খেলা করছে।* *রাইধনি অতঃপর সূর্য্য মন্দিরে গিয়ে সকল সখীবৃন্দসহ বসলেন।* *সূর্য্য মন্দিরে গিয়ে দেখলেন কোন পুরোহিত নেই,* *কেমন করে হবে?সূর্য্য পূজোতো অছিলা, রাইধনি কাননদেবীকে বললেন,হে কাননদেবী সূর্য্য পূজা অছিলা মাত্র,* *তবুও না জানি কখন কি হয়,* *সূর্য্য পূজার অছিলায় যখন এসেছি একজন পুরোহিতের প্রয়োজন।* *সেই পুরোহিতকে সামনে রেখে মনের আশা পূরণ করব।*
*রাইক চরিত,জানিয়া শেখর,*
*যাই মিলল বটু পাশে।*
*বচন বিশেষে,লেই মধুমঙ্গল,*
*আওয়ালি দেব আওয়াসে।।*
*🌻রাইধনি মনের বাসনা জেনে পদকর্তা শেখর,চললেন বটুকে (মধুমঙ্গল) ডাকতে।*মধুমঙ্গলকে নানা কথার মাধ্যমে ডেকে এনে সূর্য্য মন্দিরের পেছনে একটি কুঞ্জ আছে সেখানে বসালেন।* *আর বনের মধ্যে রাধাসহ সখীগণকে দেখে গোবিন্দের আর আনন্দ ধরে না।* *সঙ্গে রয়েছে নানাবিধ পূজোপকরণ ফল ফুল মিষ্টি মিষ্টান্ন দেখে বটুর খুবই আনন্দ হল।*
*🌻সূর্য্য পূজা চতুর্থ পদ🌻*
*তারে দেখি,মনে সুখী,এল্যায় মাথার কেশ।*
*রসিক নাগর,রসের সাগর,ব্রাহ্মণের বেশ।।*
*গলে পাটা,ভালে ফোঁটা,কোশাকুশি করে।*
*ছোট কাছা,মোটা কোঁচা,কটি আঁটি পরে।।*
*লইয়া পুঁথি,হইয়া যতি,আইলা দেবের ঘরে।।*
*পূজার সজ্জ,দেখি দ্বিজ,মন সন্ সন্ করে।*
*নিরখি লাড়,হরিষ বড়,বোলে বারংবার।*
*আইস সভে,পূজহ দেবে,রৈতে নারি আর।।*
*হেরি বটু,করি চাটু,কহে সুধামুখী।*
*নাগর পানে,চায় সঘনে,বটু কটু দেখি।।*
*করি যতন,ধরি আসন,বটু বসাইলা।*
*রাই এর সঙ্গী,রঙ্গের রঙ্গী,মোদক দেখাইলা।।*
*অথির জানি,বিনোদিনী,মোদক দিলা করে।*
*আসন বসন,ভূষণ দিয়া,বটু বরণ করে।।*
*ছন্দ ধরি,রঙ্গ করি,কহে কুন্দলতা*
*ভানুর কোলে,কানু খেলে,এই সে ভাল কথা।।*
*নষ্ট লোকে,দুষ্ট কথা,কহিল বুড়ির কানে।*
*রুষ্ট হৈয়া,দুষ্ট মেয়ে,আইলা পূজা স্থানে।।*
*সবে মিলি,করে কেলি,বসি পূজার ঘরে।*
*দেখি বুড়ি,শেখর সারি,সভায় সতর করে।।*
*🌻শ্রীকৃষ্ণ দেবমন্দিরের পেছনে গিয়া অঘটন ঘটন পটিয়সী যোগমায়াকে আহ্বান করলেন, এবং বললেন মা আমায় পুরোহিতের সাজের সমস্ত বেশ সজ্জা দাও, কথা মত সমস্ত বেশ পেলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ পুরোহিতের বেশ ধারণ পূর্বক মন্দিরে প্রবেশ করলেন,সঙ্গে নিলেন বটুকে।*
*তারপর পুরোহিতের বেশে সকল সখীগণকে রাধাসহ মন্দিরে ডাকলেন।* *সঙ্গে বটু আছে, সূর্য্য পূজার জন্য যে নানারকম ফল,মিষ্টি মিষ্টান্ন আছে তা দেখে বটুর মন সন্ সন্ করছে,কখন খেতে পাব।* *বটুর ভাব বুঝে রাধার এক সখী বটু লাড়(লাড্ডু) দেখিয়ে খানিক দূরে নিয়ে গেল,আর রাধা সনে কৃষ্ণকে একাসনে বসালেন।* *অন্যদিকে সেই কুটিলা,মায়ের কানে দুষ্টকথা লাগিয়ে মায়ের মনকে বিষময় করে তুললে,কুটিলার কথা বিশ্বাস করে, জটিলা বলছেন,কি মা কুটিলা!কি কথা বল?কুটিলা বলল,মা তোর বৌমা সূর্য্য পূজা করতে যাইনি,তোর রূপবতী বৌমা ঐ ছোড়া কালুয়ার সঙ্গে দেখা করে ফষ্টিনষ্টি করবার জন্য বনে গিয়াছে।* *ভাবাবিষ্ট পদকর্তা শেখর বললেন,তোমরা সাবধান হও,জটিলা,কুটিলা ও আয়ান তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।*
*অতএব সাবধান।*
*সতর=সতর্ক, সভায়=সকলকে।*
*🌻পঞ্চম পদ🌻*
*আয়ান বড় চতুর,সদা মাথা ঠার।*
*মায়ের সনে,আইলা বনে,কহিতে কথা দঢ়।।*
*হরিষ বিষাদ,ভাল মন্দ,মনে মনে গুণে।*
*রায়ের পিরীতি,বুঝিতে তথি,বসিলা মন্ডপ কোণে।।*
*শুশুড়ি আড়ে,জানি ডরে,ভীত ভেল ধনি।*
*গায়ের বসন,খসয়ে সঘন,না নিঃস্বরে বাণী।।*
*বিপদ অতি,বুঝয়ে তথি,কহে সকল নারী।*
*গোপত কথা,বেকত হইল,এবে কিবা করি।।*
*রাধা কাতর,ডরে বিকল,মনে বিচার করে।*
*দুষ্ট মতি,দেখি পতি,না জানি কি করে।।*
*কয় সে বটু,হইয়া পটু,ব্রহ্মচারী শ্যাম।*
*আয়ান ভেড়ে,পালাক ডরে,ঐছে কর কাম।।*
*কানু তখন,ভানু হইয়া,ফুলের ভিতর যাঞা।*.
*যখন যেমন,তখন তেমন,কহে কথা রৈয়া।।*
*শুন রাধা,পতি ব্রতা,কেনে কর স্তুতি।*
*বুড়ির পাপে,জ্বলিনু তাপে,মারিব তোমার পতি।।*
*কোলের কুমার,স্বজন যত,গাই ভঞিষা আর।*
*কি জামাতা,আনি হেথা,করিব ছারখার।।*
*অতি বটু,করে চাটু,বসি দেবের ঘরে।*
*করজোড়ে,বেদ পড়ে,দেব মানাবার তরে।।*
*শেখর আগে,বর মাগে,শুন দিবাকর।*
*সে-না বুড়ি,মরুক পুড়ি,রাখ রাধার ঘর।।*
*🌻কুটিলা,মা ও দাদার মনে রাধার নামে আজে বাজে কথা বলে মা ও দাদার মন বিষাক্ত করে তুলেছে।* *কিন্তু আয়ান ঘোষ বড়ই চতুরলোক,শক্তিদেবীর আরাধনা করেন,তাঁর মনের কোন এককোণে রাধার প্রতি চরম বিশ্বাস জন্মে রয়েছে।* *আয়ান জানে,কুটিলা কুটিলমতি,ভাল কিছু দেখতে পাই না।* *তাই অভিমন্যু কুটিলার কথায় সূর্য্য মন্দিরে যাচ্ছেন বটে,তবে রাধার প্রতি চরম বিশ্বাস রেখে।* *দেব মন্দিরের পাশে এসে আয়ান দাঁড়াইলেন।* *ঘটনা সত্য না মিথ্যে যাচাই করবার জন্যে।* *এবারে রাধারাণী,শাশুড়ি,ননদিনী ও পতিকে দেখে বেশ ভীত হলেন,* *সকল সখীগণ ও রাধারাণী বললেন,* *যে আমি আমার প্রাণবল্লভের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।* *এই গোপনকথা আমরা কয়জন ছাড়া কেহ জানে না,তবে তারা কি ভাবে জানল?* *আমার পতি আয়ানঘোষ শাক্ত আরাধনা করেন,সে বড়ই বদরাগী মানুষ,না জানি কি হবে!* *তখন বটু রাধারাণীর কথা শুনে রেগেমেগে কৃষ্ণকে বললেন,ঐ আয়ান ভেড়ে (আয়ান একজন কাপুরুষ)দুষ্ট কুটিলার কথা শুনে এখানে এসেছে,তার উপযুক্ত ব্যবস্থা কর।* *"কৃষ্ণকৃপা জগতময়" কোনদিন তিনি ভক্তের মান-সম্মানকে নত হতে দেন না।* *তাই সূর্য্য পূজা ছলে রাইধনি ঘর হতে কাননে এসেছে তা সত্য প্রমাণ করবার জন্য,গোবিন্দ একটি ফুলের মধ্যে ভানুরূপে রইলেন।* *আর রাধাকে বললেন,হে রাধে! এই বুড়ি অর্থ্যাৎ জটিলার জন্যে আজ আমরা আনন্দ হতে বঞ্চিত হলাম।* *তোমার ঐ ঘরের পতি,জটিলাকেও মারব।* *ছাড়ব না,ঐ জটিলা বুড়ি তার ছেলে ও মেয়েকে গরু,মহিষ করে রেখেছে।*
*সকলকে আমি উপযুক্ত শিক্ষা দিব।* *অন্যদিকে বটু তাদের ভয়ে দেবমন্দিরে বেদ পাঠ করছেন।*
*কেন?বিপদ হতে উদ্ধার হবার জন্য।* *পদকর্তা শেখর দাস সূর্য্যদেবের কাছে বর প্রার্থনা করছেন,* *হে সূর্য্যদেব!যারা আমার গোবিন্দ ভজনে বাধা প্রদান করে তারা পুড়ে মরুক।*
*দঢ়=দৃঢ়,বেকত=ব্যক্ত,*
*🌻সূর্য্য পূজার বিরাম পদ🌻*
*করযুড়ি কহে ধনি,শুন দেব দিনমণি,*
*জনম সেবন কৈলুঁ তোর।*
*ধন জন পরিবার,সব হবে ছারখার,*
*এই সে কপালে ছিল মোর।।*
*দিনমণি কর আগমন।*
*পতি যদি মরে যাবে,তবে মোর কিনা হবে,*
*কোন কাজে রাখিব পরাণ।।*
*দেবর ননদ মোরা,বাসে যেন আঁখিতারা,*
*শাশুড়ি সোহাগ করে সদা।*
*এঁরা সব মরে যাবে,আমারে দেখিতে হবে,*
*এ তাপে কেমনে জীবে রাধা।।*
*বিষাদে বিষন্ন মন,ডাকে সতী নারায়ণ,*
*বটু চটু করে তার পাশে।*
*রাধার বদন দেখি,বিকল হইল সখি,*
*বিকট কপট দেব হাসে।।*
*ধনির বিনয় শুনি,কহে দেব দিনমণি,*
*প্রসন্ন হইলুঁ তোর তরে।*
*ধনে জনে পূর্ণ হৈয়া,থাক সতী পতি লৈয়া,*
*আপদ না হবে তোর ঘরে।।*
*দেব দয়াময় দেখি,আনন্দ হইল সখি,*
*ধনি বৈসে আসন ভিড়িয়া।*
*নাগর মোহিনী ধনি,পূজে দেব দিনমণি,*
*বটু দেই সুমন্ত্র পড়িয়া।।*
*ধূপ দীপ গন্ধ মালা,দিয়ে দেব পূজে বালা,*
*আর কত শত উপহার।*
*বটু সুখে মন্ত্র পড়ে,সঘনে হুঙ্কার ছাড়ে,*
*দেখি বুড়ি হৈল চমৎকার।।*
*নানা উপহারে ধনি,পূজা কৈলা দিনমণি,*
*অবশেষে মাগে এক বর।*
*যদি হৈলা অনুকূল,পড়ুক মাথার ফুল,*
*তবে সে ঘুচয়ে সব ডর।।*
*হাসি দেব মাথা নাড়ে,ঝরঝর ফুল পড়ে,*
*হুলাহুলি দেয় নারীগণে।*
*দেখিয়া দেবের মুখ,বাড়িল সবার সুখ*
*আশীষ মাগয়ে জনে জনে।।*
*সভার শিরে দিয়া হাত,বটু করে আশীর্বাদ,*
*জনম আয়তি হৈয়া থাক।*
*এই দেব নিরঞ্জন,পুরুক সবার মন*
*নৈবেদ্য প্রসাদ কিছু চাখ।।*
*বসনে বান্ধিল সব,না রাখিল একলব,*
*লৈয়া চলিল আন বনে।*
*হিয়ায় সামাইল ডর,কাঁপে বুড়ি থর থর,*
*আয়ান আসান পাইল মনে।।*
*পুতেরে ঠারিয়া বুড়ি,পলাইল গুড়িগুড়ি,*
*পথ বিপথ নাহি মানে।*
*উলটি পালটা চায়,বসন না রহে কায়,*
*রাধিকা দেখয়ে পাছে বনে।।*
*দোঁহে আসি বৈসে ঘরে,রাই কে প্রশংসা করে,*
*মাথায় আঘাত সদা করে।*
*নিষেধ করিল মায়,এককথা না কই কায়,*
*ঘরে আইলে মানাইও সবারে।।*
*শেখর হাসিয়া কয়,আর কিছু নাহি ভয়,*
*মোর বোলে কর পরতীত।*
*বিলাস মন্দিরে চল,কৌতুকে পাশক খেল,*
*সকলে সুথির কর চিত।।*
**************************************
*🌻🌻🌻ব্যাখ্যা🌻🌻🌻*
*সূর্য্য পূজা,বিরাম পদের ব্যাখ্যা*
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
*প্রাণ গোবিন্দের ক্রোধান্বিত ভাব দেখে রাধার ভয় হল।* *রাধা দিনমণিকে বলছেন,হে সূর্য্যদেব!সারাজীবন আমি তোমার সেবা করে চলেছি,আজ আমার এই পরিণতি হল?* *আমার পরিবার পরিজন সকলেই ভস্মীভূত হয়ে যাবে?* *আর তা আমায় চোখের সামনে দেখতে হবে?* *হায়!হায়! কি দুর্ভাগ্য কপাল আমার।* *হে সূর্য্যদেব!পতি বিনা সতীর কি মূল্য আছে বল?বেহুলা সতী তাঁর পতির প্রাণ রক্ষা করেছিলেন,সাবিত্রী সতী হয়ে যমরাজের সঙ্গে লড়াই করে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।*
*আর আমার পতি যদি জীবিত না থাকে,তাহলে আমার জীবনের আর কি থাকবে?* *আমার বাঁচার থেকে মরণ ভাল।* *আমার দেবর,ননদি,যতই যা কিছু বলুক না কেন,তবুও তারা আমাকে খুব ভালবাসে।* *আর শাশুড়ী আমার খুবই ভাল, রাধার এই সকল কথা শুনে দিনমণি প্রসন্ন হলেন।* *বললেন,হে বিনোদিনী!তোমার ভয় পাবার কোন কারণ নেই, তোমার পরিবার,পরিজন,দেবর,ননদি, ও শাশুড়ীর কোন ক্ষতি হবে না।* *তুমি মহানন্দে তাদের নিয়ে থাকবে।* *রাইধনি বললেন,হে সূর্য্যদেব!আমার পরিবারের বিশ্বাস ভাজনের জন্য, যদি সত্য সত্যই আমার প্রতি তুষ্ট হয়ে থাক,তোমার মস্তকের ফুল যেন আমার হাতে পড়ে।* *তা দেখে সকলেই খুশী হবে,* *বলা মাত্রই ফুল হাতে পড়ল,* *তা দেখে পরিবারের সকলেই খুব আনন্দ পেলেন, কিন্তু জটিলা ও কুটিলা ভয় পেয়ে সেখান হতে পালিয়ে গেলেন।* *আয়ান ভীষণ আনন্দ পেলেন, ও রাধাকে নিয়ে গৃহে ফিরে এলেন, গৃহে সকলেই রাধার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন।*
*🌻এখানেই রইল সূর্য্য পূজা পালা🌻* (ভুল ভ্রান্তি মার্জনীয়)