*(৯৬)শ্রীরামানন্দ রায়,কাষ্ঠ পুত্তলিকা*
*🪷🪷বিবিধ কথা🪷🪷*
🌷🌷🌷🌷🌷🌷🌷🌷
*🌻শ্রীরায় রামানন্দ বললেন, "প্রভো! দশদিন এখানে থাকন"।মহাপ্রভু বললেন, "দশদিন কেন" যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন তোমার সঙ্গে থাকব।এই বলে পরম দয়াল এখানে তাঁর একটি মনের কথা জানালেন,তিনি বললেন=*
*"নীলাচলে তুমি আমি রহিব একসঙ্গে।*
*সুখে গোঙাইব কাল কৃষ্ণকথা-রঙ্গে।।"*
*🍀আপাতদৃষ্টে রামরায় বিষয়ী, মহাপ্রভু সন্ন্যাসী। কিন্তু রামরায় প্রাকৃত বিষয়ে বিষয়ী হতেন, তবে শ্রীগৌরসুন্দর তাঁকে কখনও এরকম কথা বলতেন না।রামরায়ের নানারকম বৈভব,অনন্ত ঐশ্চর্য্য,বিলাসের হাজার উপাদান। গৌরহরি তাঁকে বলছেন, "নীলাচলে তুমি আমি একসঙ্গে থাকব, এবং কৃষ্ণকথারঙ্গে সুখে দিন অতিবাহিত করব।শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য সর্বজ্ঞ, তিনি জানেন রামরায় বিষয়ী হয়েও বিষয়াসক্তির লেশাভাস বিবর্জিত, পরম বৈরাগ্যপূর্ণ ও শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের প্রেমরসসাগরে নিত্য ডুবে আছেন। বৃন্দাবন রসমাধুর্য্যই তাঁর সুখের একমাত্র বস্তু।তাই গৌরহরি তাঁর প্রিয়তম ভক্তকে জানালেন,উভয়ে নীলাচলে একত্র থাকবেন, এবং কৃষ্ণকথারস-রঙ্গে কাল অতিবাহিত করবেন।কি রকম কৃষ্ণকথারঙ্গে উভয়ে নীলাচলে সুখে সময় কাটাতেন,শ্রীচরিতামৃতের অন্ত্যলীলায় তাঁর কিছু কিছু আভাস জানতে পারা যায়।মধুময়ী কৃষ্ণকথায় যে কি সুখ আছে,আমরা তা বুঝতে পারি না-- সে সুখ আমাদের জ্ঞানের অতীত।মহাপ্রভু বিদ্যানগরে এসে কৃষ্ণকথার সাথী পেলেন,শেষ লীলায় যে সুখে যে ভাবে দিন-রাত্রি বিভোর থাকবেন, তার কিঞ্চিৎ আভাস এই প্রিয়তম সাথীকে জানালেন, এবং স্পষ্ট ভাষায় বললেন "নীলাচলে আমরা একত্র থাকব, আর কৃষ্ণকথারঙ্গে সুখে দিন কাটাব।*
*🌷বৈষ্ণবের ভজন চিররসময়। অখিল রসামৃতমূর্তি রসিকশেখর শ্রীভগবান বৈষ্ণবের উপাস্য।তাঁর লীলাকথা চির মধুর ও অনন্ত রসরঙ্গময়ী।রসের ভজন একাকী হয় না--সাথী চাই,সাথী ভিন্ন রসের পুষ্টি হয় না।ইষ্টগোষ্ঠী ছাড়া কৃষ্ণকথারঙ্গের আস্বাদ উথলিয়ে উঠে না। নীলাচলে কৃষ্ণ কথারঙ্গে যে অকৈতব বা অকপট প্রেমের উৎস (উৎপত্তি স্থল) উথলিয়ে উঠেছিল,তার স্মরণ মনন ও ধ্যান করাই জীবের অতি শ্রেষ্ঠ সাধন।বিরহ-ব্যাকুল ভাবনিধি মহাপ্রভুর রাধাভাব, কৃষ্ণপ্রেম-উন্মাদিনী শ্রীমতীর মতো প্রেমবিহ্ললতা, বাহ্য জ্ঞানের পূর্ণ বিলাপ,সতত(সর্বদা) শ্রীকৃষ্ণ স্ফূর্তি, প্রাণবল্লভ শ্যামসুন্দরের বিরহে হা-হুতাশ, স্বরূপ দামোদরের সুললিত লীলারসময়ী গীতির আশ্বাস,আর শ্রীরামরায়ের কৃষ্ণকথায় সান্ত্বনা প্রভৃতিতে নীলাচলে ব্রজরস উথলিয়ে উঠেছিল, সেই রসসুধা-মহাসাগরের বিন্দুমাত্র হৃদয়ে ধারণা করতে পারলেও কৃষ্ণ কথারস-রঙ্গতরঙ্গের কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যেতে পারে।রসিক ভক্তের নিভৃত নিত্যসঙ্গ ছাড়া কৃষ্ণকথার মাধুর্য্য-সুখ-আস্বাদ-লাভ করা যায় না।এখানে কৃপাময় পাঠকগণ প্রদ্যুম্ন মিশ্রের কৃষ্ণকথা শ্রবণে আগ্রহের বিষয় একবার মনে করুন।*
*🍀প্রদ্যুম্ন মিশ্র একদিন কৃষ্ণকথা শোনার জন্য শ্রীমন্মহাপ্রভুর কাছে উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা করলেন=*
*"কৃষ্ণকথা শুনিবার মোর ইচ্ছা হয়।*
*কৃষ্ণকথা কহ মোরে হইয়া সদয়।।*
*🌺এইকথার উত্তরে প্রেমময় মহাপ্রভু যা বললেন, তা শ্রবণ করুন=*
*"প্রভু কহে কৃষ্ণকথা আমি নাহি জানি।*
*সবে রামানন্দ জানে তার মুখে শুনি।।*
*ভাগ্য তোমার -- কৃষ্ণকথা শুনিতে হয় মন।*
*রামানন্দ পাশে যাহ করহ শ্রবণ।।"*
*🌷পরম কৃষ্ণ উপদেশ দাতা মহাপ্রভু বলছেন,ঠাকুর!তুমি আমার কাছে কৃষ্ণকথা শুনতে এসেছ, আমি সন্ন্যাসী,কৃষ্ণকথার কি জানি? শুদ্ধ সত্য কৃষ্ণকথা শুনতে সাধ হলে শ্রীরামরায়ের মুখে আমি কৃষ্ণকথা শুনে থাকি। তোমার যে কৃষ্ণকথা শুনত সাধ হয়েছে,এটি তোমার পরম সৌভাগ্য। তুমি রামানন্দ রায়ের কাছে যাও,তিনি তোমাকে কৃষ্ণকথা শুনাবেন।এইসব কথা পরে বিস্তৃত ভাবে আলোচনা হবে।*
*🌻শ্রীরামরায় ভজনতত্ত্ব ও কৃষ্ণকথাতত্ত্ব সম্বন্ধে কেমন অধিকারী ছিলেন শ্রীমহাপ্রভুর এই কথাই তার যথেষ্ট প্রমাণ।শ্রীচরিতামৃতের অন্ত্যলীলা পাঠে জানা যায় শ্রীরামরায় সুমধুর কৃষ্ণকথা বলে মহাপ্রভুর কৃষ্ণবিরহ-ব্যথা প্রশমিত(শান্ত) করতেন। শ্রীরামরায়ের প্রার্থনায় মহাপ্রভু আরও কয়েক দিন তাঁর ভবনে থাকতে রাজী হলেন।সন্ধ্যাকালে রামরায় ও মহাপ্রভু আবার ইষ্টগোষ্ঠী কথা আরম্ভ করলেন।গৌরহরি রামরায়কে পরমার্থ তত্ত্ব সম্বাপ্রশ্ন করতে লাগলেন, আর রায় মহাশয় সেটির যথাযথ উত্তর দিলেন।এখানে সামান্য কয়টি প্রশ্ন উত্তরের উল্লেখ করা যাচ্ছে, যথা=*
*মহাপ্রভু=বিদ্যার মধ্যে কোন বিদ্যা সার?*
*রামরায়=একমাত্র কৃষ্ণ-ভক্তিই বিদ্যা, তাছাড়া আর বিদ্যা নাই।*
*🍀বিদ্যতে তত্ত্বং অনয়া ইতি বিদ্যা। অর্থ্যাৎ যারদ্বারা তত্ত্ব জানা যায়, তাইই বিদ্যা। নাগোজী ভট্ট বলেন "পরমোত্তমপুরুষার্থসাধনভূতা বিদ্যা ব্রহ্মজ্ঞানরূপা" অর্থ্যাৎ পরম উত্তম পুরুষার্থসাধনস্বরূপিনী বিদ্যা ব্রহ্মজ্ঞানরূপিনী।*
*🌹বিষ্ণুপুরাণে বিদ্যা শব্দের যে অর্থ করা হয়েছে তা এই=*
*"অঙ্গানি বেদাশ্চত্বারো মীমাংসা ন্যায় বিস্তরঃ।*
*ধর্মশাস্ত্রং পুরাণঞ্চ বিদ্যাহ্যেতা শ্চতুর্দশ।।*
*আয়ুর্বেদো ধনুর্বেদো গান্ধর্বশ্চেতি তে ত্রয়ঃ।*
*অর্থশাস্ত্রং চতুর্থঞ্চ বিদ্যাহ্যষ্টা দশৈবতাঃ।।"*
*🌻অর্থ্যাৎ অঙ্গসমূহ (শিক্ষা,কল্প, ব্যাকরণ,নিরুক্ত,জ্যোতিষ,ছন্দঃ) চার বেদ (ঋক্, সাম,যজু,অথর্ব) মীমাংসা,ন্যায়,ধর্মশাস্ত্র,পুরাণ, আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ব ও অর্থশাস্ত্র এই অষ্টাদশ বিদ্যা। কিন্তু এই সব শাস্ত্র বিদ্যা হয়েও প্রকৃতপক্ষে পরা বিদ্যা নয়,কেননা এতদ্বারা পরম তত্ত্ব অর্থ্যাৎ শ্রীভগবতত্ত্ব জানা যায় না।ধর্মশাস্ত্র ও পুরাণাদি পাঠ করলেই ধার্মিক হওয়া যায় না। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের আধুনিক কোন সংস্ককরণের টীকায় লেখা হয়েছে ---, "এখানে কৃষ্ণভক্তিবিদ্যা বলতে কৃষ্ণভক্তি প্রতিপাদক(যুক্তি প্রমাণ দ্বারা) শাস্ত্র।শাস্ত্রজ্ঞান ছাড়া যথাযথ ভক্তিস্বরূপ জানা যায় না,এই জন্য কৃষ্ণভক্তি প্রতিপাদক শাস্ত্র অভ্যাসই যথার্থ বিদ্যা।*
*🌹এই ব্যাখ্যা সমীচীন(সংগত) নয়। কৃষ্ণভক্তি প্রতিপাদক শাস্ত্র অভ্যাস করলেই পরাবিদ্যা (পরমাবিদ্যা) লাভ হল একথা বলা অসঙ্গত।কেননা, "ন ধর্মশাস্ত্রং পঠতীতি কারণম্" প্রভৃতি কথা সত্যের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। প্রায়শ্চিত্ত প্রকরণে লিখিত আছে*
*"কিম্ বেদৈঃ কিমু যা শাস্ত্রৈ কিমুতীর্থনিষেবণৈঃ।*
*বিষ্ণুভক্তিবিহীনানাং •••••••••• কিমধ্বয়ৈঃ।।*
*☘গরুড় পুরাণে পাওয়া যায় =*
*"••••••• শ্বতোহপি বেদানাং সর্বশাস্ত্রার্থবেদ্যপি।*
*যো ন সর্বশ্বরে •••• ••••• বিদ্যাং পুরুষা দমম্।।*
*🌹সুতরাং ভক্তিশাস্ত্রের অভ্যাস করলে ভক্তিলাভ হয় না।শাস্ত্রাভ্যাস বিদ্যা নহে,ভক্তিই বিদ্যা।*
*🌳শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটককারও তাইই বলেছেন। যথা=*
*"হরিভক্তিরেব ন পুনঃ বেদাদিনিঞ্চাততা।"*
*🍀টীকাতে লিখা হয়েছে "হরিভক্তিরেব বিদ্যা" অর্থ্যাৎ হরিভক্তিই প্রকৃত বিদ্যা, বেদাদি শাস্ত্রে পান্ডিত্যের নাম বিদ্যা নহে।*
*🌷ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেই যে ভক্তি জন্মে,আর তা না করলেই যে ভক্তি জন্মে না এর কোন প্রমাণ নাই। পঞ্চম বর্ষীয় বালক প্রহ্লাদ ভক্তাবতার ; তিনি কোন ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন করেননি?আসল কথা এই যে ভক্তি দ্বারাই তাঁকে সর্বতোভাবে জানা যায়, এই জন্য ভক্তিই শ্রেষ্ঠবিদ্যা। ভগবানের শ্রীমুখের কথা এই যে=*
*"ভক্ত্যা মামতিজানাতি বাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ।"*
*🍁শ্রীধরস্বামী গীতার টীকায় বলেছেন, ভক্তি দ্বারায় পরম তত্ত্বকে উত্তমরূপে জানা যায় বলে ভক্তি জ্ঞানেরই পরাবস্থাবিশেষ। সুতরাং ভক্তিই প্রকৃত পরাবিদ্যা।*
🦚🪷🌷🙏🦚🪷🌷🙏🦚🪷🌷🙏🦚