✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় রাধা-দামোদর, এই দামোদর সম্বন্ধে সামান্য কিছু আস্বাদন হোক।*
*🌻শ্রীমদ্ভাগবত, একাদশ স্কন্ধে শ্রীভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধবকে বলেছেন---হে উদ্ধব ! যোগ, বৈরাগ্য, ধর্ম্ম, জপ, তপস্যা, দান প্রভৃতি কিছুতেই আমাকে কেহ বশীভূত করতে পারে না, আমি একমাত্র প্রেমভক্তিরই অধীন। (এই প্রেমভক্তির কথনই আস্বাদন করব)।*
*🌻নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্যপ্রেমাধার নন্দ ও যশোদা,তাঁদের এই নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্যপ্রেম লাভ করবার জন্য কোনও প্রকার সাধনানুষ্ঠান করেন নাই বটে, কিন্তু তাই বলে তাঁরা সাধনানুষ্ঠের লোভ ছাড়তে পারেন নাই। তাঁরা নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্য প্রেমাধার হয়েও বাৎসল্যপ্রেম লাভ করবার লালসান্বিত হন এবং দ্রোণ ও ধরারূপে ব্রহ্মান্ডে জন্মগ্রহণ করে ব্রহ্মার আদেশে ব্রজে বাস এবং গো-পালনাদি দ্বারা গো-পালন-পরায়ণ শ্রীভগবানের প্রীতিবিধান করে তাঁর সহিত বাৎসল্য প্রেমের সম্বন্ধ এবং তদুপযুক্ত ব্যবহারের অধিকারী হতে চেষ্টা করেন। (জ্ঞানসিদ্ধ জ্ঞানী, যোগসিদ্ধ যোগী, এবং কর্মফলপ্রাপ্ত কর্মিগণের জ্ঞান, যোগ ও কর্মসাধনার জন্য লালসা হয় না, কিন্তু ভক্তিসিদ্ধ প্রেমবান্ ভক্তগণ প্রেমে পরিপূর্ণ হয়েও অপূর্ণের মত সাধন ভক্তির অনুষ্ঠান করে থাকেন। ইহা প্রেমেরই এক বিচিত্র স্বভাব। প্রেমবান্ ভক্তগণ কখনও ভগবানের প্রেমসেবা করে তৃপ্তিলাভ করতে পারেন না, সেইজন্য তাঁরা অতৃপ্ত হয়ে আবার প্রেমলাভ করবার জন্য সাধক ভক্তের মত সাধন ভক্তির অনুষ্ঠান করে থাকেন। (ফলপ্রাপ্তৌ সত্যাং সাধনেচ্ছানুপপত্তেঃ)। অর্থাৎ সিদ্ধিপ্রাপ্তি হ'লে আর সাধনেচ্ছার উদয় হয় না। (এই চিরপ্রচলিত প্রথা এবং কথা প্রেমবান্ ভক্ত ব্যতীত সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, কিন্তু প্রেমবান্ ভক্ত এই চিরপ্রচলিত যুক্তিপূর্ণ সদুক্তির বহির্ভূত ; প্রেমবান্ ভক্ত কখনও প্রেমলাভের অভিমান করতে পারেন না। প্রেমই প্রেমবান্ ভক্তের হৃদয় দৈন্য ও অপূর্ণতা দ্বারা পরিপূর্ণ করে অভিমান এবং তৃপ্তিকে দূরে সরিয়ে রাখে।সেইজন্য প্রেমবান্ ভক্ত প্রেমে পরিপূর্ণ হয়েও সর্বদাই অপূর্ণ এবং কৃষ্ণসেবা-রস-সিন্ধুতে নিত্য নিমগ্ন থেকেও সর্বদাই অতৃপ্ত, সেইজন্যই তাঁরা সিদ্ধ হয়েও সাধনানুষ্ঠানে বিরত হতে পারেন না)।*
*জয় বাৎসল্য প্রেমবতী মা যশোমতী ও প্রেমবান্ শ্রীনন্দের জয়🙏*
*ক্রমাগত, এক মাস দামবন্ধন লীলা নিয়ে আলোচনা করিব।*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় রাধা-দামোদর, এই দামোদর ও বাৎসল্য প্রেমবতী মা যশোমতীর সম্বন্ধে সামান্য কিছু আস্বাদন হোক।*
*পর্ব-সংখ্যা=০২*
*🌻নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্য প্রেমাধার নন্দ ও যশোদা, তাঁদের নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্যপ্রেমে অনাদিকাল হতেই স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিতৃমাতৃভাবে লালনপালনরূপ সেবারসে নিমগ্ন থেকেও প্রেমের অতৃপ্ত স্বভাব বশতঃ তাঁরা অংশরূপে ব্রহ্মান্ডে জন্মগ্রহণ করে ব্রহ্মার আদেশে সাধনভক্তির অনুষ্ঠানে রত হন এবং বাৎসল্যপ্রেমলাভ করবার জন্য ব্রহ্মার নিকট বর প্রার্থনা করেন।পূর্বকথিত দ্রোণ ও ধরাই নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্যপ্রেমাধার নন্দ ও যশোদার অংশ।নিত্যসিদ্ধ প্রেমাধার নন্দ ও যশোদার অংশ হয়েও কিন্তু তাঁদের কখনও নন্দ ও যশোদার সহিত নিজেদের অভেদ ভাবনা মনে আসে নাই, কিংবা কখনও সিদ্ধির অভিমানও আসে নাই।তাঁরা নন্দ ও যশোদার নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্য প্রেমকে দৃষ্টান্তরূপে লক্ষ্য করে ব্রহ্মার আদেশে সাধনা অনুষ্ঠানে রত হন এবং বাৎসল্য প্রেম লাভ করবার জন্য ব্রহ্মার কাছে বর প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মা তাঁদেরকে নন্দ ও যশোদার অংশ জেনেও তাঁদের প্রেমপ্রাপ্তির ব্যাকুলতা দেখে তাঁদেরকে বর দান করে আশ্বস্ত করেছিলেন। (কোন রাজপুত্র যদি কোনও কারণ বশতঃ শৈশব অবস্থায় রাজপুরী হতে সুদূর অরণ্যে নির্বাসিত হন ও অরণ্যবাসীগণ কর্তৃক লালিত পালিত বয়ঃপ্রাপ্ত হ'লে তাঁর পূর্ব অবস্থায় বিজ্ঞ কোনও ব্যক্তির নিকট ধনলাভের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন,তাহলে সেই ব্যক্তি তাঁকে রাজপুত্র জেনে তাঁর অবশ্যপ্রাপ্ত রাজ্যলাভের জন্য যেমন আশীর্বাদ করে থাকেন এবং রাজপুত্রও তাঁর আশীর্বাদ বাক্যে পরম প্রীতিলাভ করেন,),দ্রোণ ও ধরাকে বর দান করা ব্রহ্মার পক্ষেও ঠিক সেইরকমই হয়েছে। ব্রহ্মা জানেন যে,দ্রোণ ও ধরা নন্দ ও যশোদার অংশ এবং বাৎসল্যপ্রেম তাঁদের নিত্যসিদ্ধ বস্তু ; তবুও প্রেমের অতৃপ্তি স্বভাব বশতঃ তাঁরা প্রেমপ্রাপ্তির জন্য লালায়িত হয়েছেন, এ সময়ে তাঁদেরকে বাৎসল্য প্রেমলাভের বর দান করলে তাঁরা অবশ্যই আশ্বস্ত হবেন ও পরম প্রীতিলাভ করবেন।সেইজন্যই ব্রহ্মা দ্রোণ ও ধরার প্রার্থনা অনুসারে তাঁদের অবশ্য প্রাপ্য বাৎসল্যপ্রেম লাভের জন্য বর দান করেছেন।নচেৎ যে-ব্রহ্মা শ্রীবৃন্দাবনের কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি যে কোনও দেহে জন্মগ্রহণ করবার জন্য লালায়িত হয়ে নন্দ-নন্দনের নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁর দেওয়া বরে কি দ্রোণ এবং ধরা নন্দ ও যশোদা হয়েছিলেন।ব্রহ্মার বরে কিংবা কৃতিত্বে জগৎসৃষ্টি হতে পারে, জগৎ-পিতার পিতা ও মাতা কারও সৃষ্ট বস্তু নহেন,তাঁরা বাৎসল্য প্রেমপাত্ররূপে নিত্যসিদ্ধ। সুতরাং স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যসিদ্ধ পিতামাতা নন্দ ও যশোদা অনাদিকাল হতেই বাৎসল্যপ্রেমে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবাধিকারী আছেন এবং শ্রীভগবান অখিল ব্রহ্মান্ড পালক হয়েও বালকরূপে তাঁদের বাৎসল্য প্রেমরসাস্বাদন করছেন।*
*ক্রমাগত*
*নন্দ ও যশোদা সম্বন্ধে জানতে পারলে পরবর্তী আস্বাদন মধুর হবে।*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কথন আস্বাদন করিব।*
*পর্ব সংখ্যা--০৩*
*🌻বাৎসল্যবতী ব্রজরমণীগণ প্রায় প্রত্যহই যশোদার কাছে এসে যশোদা-নন্দনের ক্ষীর, নবনীতাদি চুরির অভিযোগ জানিয়ে যায়। যদিও তাঁদের যশোদা-নন্দনের উপর কোন প্রকার দ্বেষ নাই কিংবা তাঁর চুরি করাতে তাঁরা অসন্তুষ্ট নন, বরং তাঁরা যশোদা-নন্দনের চুরি করা চাতুর্য্যে আনন্দিতই হন, তবুও তাঁদের যশোদার কাছে গোপালের চুরির কথা প্রকাশ করার উদ্দেশ্য এই যে, যশোদাও এই আনন্দের কিছু অংশ উপভোগ করে তৃপ্তিলাভ করুন। যাইহোক, ব্রজরমণীগণের নিকট পুনঃ পুনঃ নিজপুত্রের ক্ষীর নবনীতাদি চুরির কথা শুনে বাৎসল্যপ্রেম-মহোদধি নন্দরাজ-গেহিনী যশোদা মনে মনে চিন্তা করলেন যে, আমার পুত্র কিজন্য প্রত্যহ প্রতিবাসিনী ব্রজরমণীগণের ঘরে গিয়ে ক্ষীর সর মাখন নবনীতাদি চুরি করে খায় ? বালক বয়সেই সে এমন চৌর্য্যচাতুর্য্য কেমন করে শিক্ষা করল ? আমার ঘরে তো ক্ষীর নবনীতাদির অভাব নাই, তবুও আমার পুত্র কেন চুরি করে খায় ?*
*বাৎসল্যপ্রেমবতী যশোদা মনে মনে এই রকম নানাপ্রকার বিতর্ক করে পরিশেষে নিশ্চয় করলেন যে, আমার গৃহদাসীগণ যে ক্ষীর নবনী ইত্যাদি প্রস্তুত করে,তা গোপালের খেয়ে বোধ হয় তৃপ্তি হয় না।সেই জন্যই সে ক্ষুধার্ত হয়ে ব্রজরমণীগণের ঘরের সুখাদ্য ক্ষীর নবনীতাদি চুরি করে খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্তি করে।ব্রজরমণীগণ সকলেই পরমানন্দে বিভোর হয়ে যায় এবং ক্ষীর নবনীতাদি খাইবার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু আমার পুত্র বড়ই লজ্জাশীল, সে কখনও কারও সামনে কিছু খেতে পারে না, নির্জন স্থান না পেলে সে কিছুই খেতে চাই না। (চরম ভজনের কথা এখানে বলা হয়েছে, ভজন বস্তুটি লোক দেখান নহে, যেমন শ্রীমন্মহাপ্রভু সেই গম্ভীরার ছোট একটি কক্ষে অন্তরঙ্গ সখা রায়-রামানন্দ ও স্বরূপদামোদরকে নিয়ে "রসাস্বাদন" করেছিলেন, তেমনি নবদ্বীপে বিরহিনী বিষ্ণুপ্রিয়া তাঁর দুই অন্তরঙ্গা সখী কাঞ্চনা ও অমিতাকে নিয়ে নবদ্বীপ গম্ভীরা মন্দিরে ভজন করেছিলেন, কখন? যখন শচীদেবী ইহলোক ত্যাগ করে স্ব-লোকে চলেগিয়েছিলেন তার পর হতে)।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলা।*
*পর্ব-সংখ্যা--০৪*
*🌻নির্জন স্থান না পেলে কিছুই খেতে চাই না।সেইজন্য সে ব্রজ- রমণীগণের পুনঃ পুনঃ অনুরোধ সত্ত্বেও তাদের সম্মুখে কিছু খায় না,তারা স্থানান্তরে গমন করলে না বোলে খাওয়া মানে চুরি করে খাওয়া।ইহাতে তার কিছুমাত্র দোষ নাই,ক্ষুধার তাড়নাতেই সে এই অন্যায় কাজ করে থাকে ; কিন্তু অবোধ বালক তা অন্যায় বলে বুঝতে পারে না।তাকে উদর পূরণ করে খেতে দিলেই সে আর কখঅমন কুকার্য্য করবে না। কিন্তু আমার গৃহদাসীগণের তৈরী ক্ষীর-নবনীতাদিতে তার তৃপ্তি হয় না, আমি যদি নিজের হাতে তার জন্য ক্ষীর-নবনীতাদি তৈরী করি, তাহলে তা খেয়ে নিশ্চয় তার তৃপ্তিলাভ এবং উদর পূর্ণ হবে,তাহলে সে আর ব্রজরমণীদের ঘরে চুরি করবে না। এই রকম বিবেচনা করে যশোদা স্থির করলেন যে আর গৃহদাসীকে ক্ষীর নবনী ইত্যাদি তৈরী করতে না দিয়ে,তিনিই স্বহস্তে তৈরী করবেন এবং তাঁর পুত্রকে খাওয়াবেন।*
*🍀বাৎসল্যপ্রেমবতী নন্দগেহিণী যশোদা গৃহদাসীগণের তৈরী ক্ষীর নবনী ইত্যাদি ভোজনে নিত্যতৃপ্ত ভগবানের অতৃপ্তি সম্ভাবনা করে, নিজহাতে তৈরী করে খাওয়াইয়ে তাঁর তৃপ্তিসাধন করতে ইচ্ছে করলেন।তাঁর এই অদ্ভুত ধারণা এবং তদুচিত ব্যবহার তাঁর নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্যপ্রেমসিন্ধুরই তরঙ্গোচ্ছ্বাস।এই অপার প্রেম- পারাবারের আধার বলিয়া কৃষ্ণজননী যশোদা নামের সার্থকতা সম্পাদন হয়েছে।যিনি যশঃ দান করেন,তাঁর নাম যশোদা।কৃষ্ণজননী তাঁর বিশুদ্ধ বাৎসল্যপ্রেমে সর্বনিয়ন্তা স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে কোলে ধারণ, তর্জন,তাড়ন, বন্ধন প্রভৃতি করে থাকেন এবং সর্বেশ্বর শ্রীকৃষ্ণও প্রেমিধীনতা অঙ্গীকার করে জগতে ভক্তবৎসল, প্রেমাধীন প্রভৃতি নামে খ্যাত হয়েছেন। কৃষ্ণজননী যশোদার এইরকম বিশুদ্ধ বাৎসল্যপ্রেম এবং তদুচিত ব্যবহারের অধিকার না থাকলে শ্রীভগবানের ভক্তবাৎসল্য, প্রেমাধীনতা প্রভৃতি সদ্-গুণের বিকাশ হবার উপায় ছিল না।বিশেষ কোরে যশোদার বন্ধনে বদ্ধ হয়েই শ্রীভগবানের "দামোদর" নাম জগতে প্রচারিত হয়েছে।সুতরাং যশোদাই তাঁর বিশুদ্ধ বাৎসল্য- প্রেমের ব্যবহারে ভগবানকে ভক্তবাৎসল্য,প্রেমাধীনতা প্রভৃতি যশঃ দান করেছেন। অতএব নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্যপ্রেমবলেই যশোদার "যশোদা" নামের সার্থকতা সম্পাদন হয়েছে। গোপরাজ নন্দও এই বাৎসল্যপ্রেমবলেই সার্থকনামা। তাঁরই বাৎসল্যপ্রেমের আকর্ষণে পরমানন্দঘন-বিগ্রহ শ্রীভগবান নন্দ-নন্দনরূপে জগতে অবতীর্ণ হয়ে জগৎবাসীর আনন্দবিধান করেছেন বা করছেন। সুতরাং নন্দই জগতের এই অপ্রাকৃত পরমানন্দ রসাস্বাদনের ব্যবস্থা করেছেন। "নন্দয়তি জগৎ" "যিনি জগতের আনন্দ বিধান করেন" এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, গোপরাজ নন্দে প্রকটরূপে বতর্মান।অখিলব্রহ্মান্ডপালককে নিজ বালকরূপে জগতে প্রকাশ করে জগতের আনন্দ-বিধাতা নন্দ, এবং বাৎসল্যপ্রেমের ব্যবহারে ভগবানের ভক্তবাৎসল্য প্রভৃতি যশোদাত্রী যশোদার পতি-পত্নীভাবে মিলন প্রকৃতপক্ষেই যোগ্য মিলন এবং এই মিলনই জগতের ভাগ্যাকাশে গোলোকপতির ভূলোক লীলার উদয় করে জগৎকে কৃতার্থ করেছে।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--০৫*
*🌻বাৎসল্যপ্রেমাধার নন্দগেহিণী যশোদা,তাঁর পুত্রকে খাওয়াবার জন্য স্বহস্তে ক্ষীর সর নবনী ইত্যাদি তৈরী করতে দৃঢ়সঙ্কল্প করেও তা কার্য্যে পরিণত করতে পারলেন না, কারণ তাঁর গৃহদাসীগণ কিছুতেই গোপরাজমহিষীকে এই কাজে হস্তক্ষেপ করতে দিতে চান না। তাঁরা যশোদাকে বলেন, আমরা শত শত গৃহদাসী থাকতে কি রাজমহিষীর স্বহস্তে ক্ষীর সর নবনী ইত্যাদি তৈরী করা যুক্তিযুক্ত হয় ? গোপরাজমহিষীর যদি নিজহাতে ক্ষীর সর নবনী তৈরী করতে হয়, তাহলে তাঁরা গৃহ-দাসীগণের গৃহত্যাগ করে বনবাসিনী হওয়াই কর্তব্য। আমাদের প্রাণ থাকতে আমরা কখনই গোপরাজমহিষীকে গৃহকর্ম করতে দিব না। দাসীগণের এইরকম আক্ষেপবাণী শুনে নন্দরাণী কিছুতেই ক্ষীর নবনীতাদি তৈরী করতে অবসর পান না। কিন্তু তিনি নিজে ক্ষীর নবনী তৈরী করবেন, এবং পুত্রকে খাওয়াবেন এই বাসনা ক্ষণে ক্ষণে বলবতী হয়ে তাঁকে একেবারে ব্যাকুল করে তুলতে লাগল।যে যাকে প্রকৃতই ভালবাসে, সে স্বয়ংই তার সেবা করবার জন্য লালায়িত হয়ে থাকে।সেবাতেই ভালবাসার প্রকৃত পরীক্ষা। ভালবাসা থাকলে কিছুতেই প্রতিনিধি দ্বারা কিংবা দাসদাসী দ্বারা সেবা করে তৃপ্তি লাভ করা যায় না।গোপরাজমহিষী যশোদার শত শত গৃহদাসী আছে এবং তারা সকলেই যশোদা-নন্দনের সেবার জন্য ব্যগ্র, কিন্তু প্রেমবতী যশোদা তাতে তৃপ্তিলাভ করতে না পেরে স্বয়ং তাঁর পুত্রের সেবা করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন।প্রতিনিধি কিম্বা দাসদাসীর অভাবে,অগত্যা স্বহস্তে সেবা অনেক জায়গাই দেখা যায়, কিন্তু শত শত দাসদাসী থাকলেও স্বহস্তে সেবার বাসনা প্রেমের প্ররোচনা ব্যতীত কিছুতেই সম্ভবপর হয় না।*
*🍀বিশুদ্ধ মায়ের মনের কথা, বাৎসল্যময়ী যশোদা তাঁর প্রেমস্বভাববশতঃ মনে করেন যে, তাঁর গৃহদাসীগণ মন দিয়ে তাঁর পুত্রের জন্য ক্ষীর নবনী তৈরী করা না এবং সেজন্যই তাঁর পুত্রের নবনীতাদি ভোজনে তৃপ্তিলাভ হয় না ও ক্ষুধা নিবৃত্তি হয় না।সেইজন্যই সে অগত্যা প্রতিবাসিনী গোপরমণীগণের ঘরে নবনী চুরি করে খেয়ে উদর পূর্ণ করে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তা নয়। যশোদার গৃহ-দাসীগণও যশোদানন্দন গোপালকে নিজ গর্ভজাত পুত্র অপেক্ষাও ভালবাসেন।তাঁদের হৃদয়ও বাৎসল্যরসে পরিপূর্ণ। তা না হলে কি তাঁরা যশোদার দাসী হয়ে যশোদানন্দনের বাল্যলীলার সেবাধিকার প্রাপ্ত হতে পারেন? ব্রহ্মাদি দেবগণ পর্যন্ত কখনও যে সেবাধিকার কল্পনা করতেও সক্ষম হন না, আর যশোদার গৃহদাসীগণ সর্বদা অবলীলাক্রমে সেই সমস্ত সেবা করে থাকেন। তারা গোপালকে কোলে ধারণ করেন,দুগ্ধ পান করান ও যশোদানন্দনকে বক্ষে ধারণ করে তাঁর অঙ্গে হস্তমার্জন করে তাঁকে ঘুম পারান।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--০৬*
*🌻গৃহদাসীগণ সময়ে সময়ে মা যশোদার আদেশে তাঁরা যশোদানন্দনকে বাম হাতে ধরে ডান হাত দিয়ে তাঁর অঙ্গমার্জনা করে অঙ্গে লেগে থাকা ধূলো বালি পরিস্কার করে দেন। কারণ গোপাল কখনও হামাগুড়ি, কখনও দৌড়দৌড়ি করে মাটিতে পড়ে যান গায়ে ধূলো বালি লাগে, সেই সব ধূলোবালি গৃহদাসীরা পরিস্কার করে দেন, কত জনমের সুকৃতি থাকলে তবেই তো এইভাবে ভগবানের সেবা করতে পারেন। আবার সময়ে সময়ে তাঁরা* *যশোদানন্দনের বাল্যলীলার চাঞ্চল্য দেখে বকাবকিও করেন। সুতরাং যশোদার গৃহদাসীগণেরও যশোদানন্দনের উপর ভালোবাসা এবং তদুচিত ব্যবহারের অধিকার সামান্য নয়। যশোদার গৃহদাসীগণ প্রাণপণ যত্ন ও আগ্রহেই যশোদানন্দনের ভোজনের জন্য ক্ষীর নবনী ইত্যাদি তৈরী করে থাকেন,সে বিষয়ে তাঁদের কিছুমাত্র ত্রুটি নেই ; কিন্তু মা যশোদা,* *বাৎসল্যপ্রেমের অতৃপ্তিবশতঃ সর্বদাই তাঁর পুত্রের ভোজনে অতৃপ্তি সম্ভাবনা করেন এবং স্বহস্তে ক্ষীর নবনী ইত্যাদি তৈরী করে তাকে খাইয়ে তৃপ্তি করিয়ে তাঁকে সুখী করবার কথা ভাবেন।*
*এই হচ্ছেন বিশুদ্ধ বাৎসল্যময়ী মাতা।*
*🌻পুত্রের সেবা ও তাঁর ইষ্টদেব শ্রীনারায়ণের সেবার জন্য নিজহাতে ক্ষীর নবনী তৈরী করবার সুযোগ পান না।এইভাবে কিছুদিন অতীত হলে মা যশোদার সেই উদ্বেগ ও আগ্রহপূর্ণ বলবতী বাসনা ফলবতী হবার সুযোগ এসে উপস্থিত হল।ভগবানের কোনও সেবার জন্য যদি কারও আন্তরিক বাসনা হয় ও সেই বাসনা পূরণের জন্য তার আন্তরিক আগ্রহ থাকে এবং অপূর্ণতার জন্য চিত্তে উদ্বেগ সঞ্চার হয়, তাহলে ভগবানের কৃপানুমোদনে তার সেই আন্তরিক বাসনা পূরণের অপ্রতিহত বা অবাধ সুযোগ এসে উপস্থিত হয় এবং সেই বাসনা কোটি কোটি গুণে পূর্ণ হয়ে যায়।*
*🌻গোপরাজ নন্দের পিতা পর্জ্জন্য-গোপের সময় হতে প্রতি বৎসর কার্তিক মাসের শুক্ল প্রতিপদে গোবর্দ্ধন পর্বতে মহাসমারোহে ইন্দ্রযাগের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।( এই ইন্দ্রযাগই কৃষ্ণের ইচ্ছায় গোবর্দ্ধনযাগে পরিণত হয়ে অদ্যাপি প্রচলিত আছে এবং বৈষ্ণব সমাজে উহার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। শ্রীমদ্ভাগবত দশম স্কন্ধের চতুর্বিংশাধ্যায়ে ইহার বিস্তৃত বিবরণ জানতে পারা যাবে )।এই মহোৎসবে ব্রজবাসী সমস্ত গোপগণই যোগদান করে থাকেন এবং যজ্ঞানুষ্ঠান, ব্রাহ্মণভোজন প্রভৃতি বহুতর সদনুষ্ঠান হয়ে থাকে।প্রতি বৎসরের ন্যায় এবারও যখন কার্তিক মাসে ইন্দ্রযাগের সময় উপস্থিত হল, তখন গোপরাজ নন্দ এবং ব্রজবাসী গোপগণ ইন্দ্র যাগ অনুষ্ঠানের আয়োজনে রত হলেন।নন্দনন্দের কল্যাণ কামনায় এবার যেন তাঁদের এই যজ্ঞ-অনুষ্ঠান পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশী উৎসাহ প্রকাশ পেল।যজ্ঞের আগের দিনই (কার্তিক অমাবস্যার দিন) গোপরাজ নন্দ এবং ব্রজবাসী গোপগণ গোবর্দ্ধন পর্বততটে উপস্থিত হয়ে পরদিনের মহদনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে আরম্ভ করলেন।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলা।*
*পর্ব-সংখ্যা--০৭*
*🌻গোপরাজ-মহিষী যশোদা এই সুযোগে তাঁর সমস্ত গৃহদাসীগণকে যাগের আগেরদিনে গোবর্দ্ধনে পাঠিয়ে দিলেন এবং বলে দিলেন--- তোমরা সকলে ব্রাহ্মণ ভোজনের জন্য যে সমস্ত তরিতরকারি-ডাল ইত্যাদি পাক হবে,তার যথারীতি আয়োজন করবে। আমি আমার এই চঞ্চল ছেলেকে নিয়ে ঘরে থাকি,কেননা, এই বালক চাঞ্চল্য বশতঃ যাগ এবং ব্রাহ্মণ ভোজনাদির বস্তু নষ্ট কিম্বা অপবিত্র করতে পারে।যশোদার গৃহদাসীগণ যশোদার আদেশে অগত্যা যশোদা-নন্দনের সেবা ছেড়ে ইন্দ্রযাগের কাজ করবার জন্য অমাবস্যার দিন বৈকালেই গোবর্দ্ধনতটে গমন করিল।এবারে যশোদা মনে করলেন, এতদিনে শ্রীনারায়ণের কৃপায় আমার মনোবাসনা পূর্ণ হবার সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। আজ গৃহদাসীগণ কেউই উপস্থিত নাই, (আজ আমি স্বহস্তে আমার পুত্রের জন্য ক্ষীর নবনীতাদি প্রস্তুত করিব। গোপরাজ-নন্দের নবলক্ষ পয়স্বিনী গাভী আছে, তার মধ্যে কয়েকটি সুগন্ধ-তৃণচারিণী,বিপুল পয়স্বিনী গাভী আছে,তাদের স্তন হতে পদ্মগন্ধবিশিষ্ট দুগ্ধ ক্ষরিত হয়।যশোদা সন্ধ্যাকালে স্বহস্তে পদ্মগন্ধবিশিষ্ট দুগ্ধবতী গাভীর সমস্ত দুগ্ধ দোহন করে তা ঘনাবর্তিত করে তাতে অম্ল সংযোগ করে নতুন মৃৎপাত্রে রেখে দিলেন এবং মনে করলেন,ইহাতে যে দধি হবে,তা মন্থন করে যে নবনী পাওয়া যাবে,তাহাই তাঁর পুত্রকে খাওয়াবেন এবং শ্রীভগবানের ভোগের জন্য রাখবেন।ইহা ছাড়াও মা যশোদা,ঘনাবর্তিত দুধে শর্করা ও কর্পূর মিশিয়ে সুগন্ধী ক্ষীরও তৈরী করলেন এবং নানাবিধ সুখাদ্য ভোজ্য দ্রব্য তৈরী করে রাখলেন।এইভাবে বাৎসল্যপ্রেমময়ী মা যশোদা তাঁর পুত্রকে পরদিন খাওয়াবেন বলে নানারকম ব্যবস্থা করে রাখলেন এবং যথাসময়ে তাঁর কোটিপ্রাণপ্রতিম পুত্রকে বক্ষে ধারণ ও মুখে স্তন অর্পণ করে দুগ্ধফেণনিভ (দুধের ফেণার মত অতি)কোমল শয্যাযুক্ত মণিময় পালঙ্কে শয়ন করালেন।*
*🍀সচ্চিদানন্দঘনবিগ্রহ শ্রীগোবিন্দ যশোদার স্তনদুগ্ধ পান করতে করতে যশোদার বক্ষেই নিদ্রিত হয়ে পড়লেন এবং যশোদাও দেখতে দেখতে নিদ্রিত হয়ে পড়লেন। (যোগসিদ্ধ মহাপুরুষগণ নির্বিকল্পক সমাধিযোগে অস্থির চিত্তকে প্রশান্ত করে ও নিত্য-সুস্থির পরমাত্মাকে হৃদয়ে উদ্ভাসিত করে যে পরমানন্দ ভোগ করেন, মা যশোদা তাঁর অস্থির পুত্রের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে তাঁকে নিদ্রাবেশে সুস্থির করিয়ে ও তাঁকে হৃদয়োপরি ধারণ করে তদপেক্ষা কোটি কোটি গুণিত আনন্দরসে নিমগ্ন হয়ে নিদ্রিত হলেন।যোগসিদ্ধ মহাপুরুষগণ নির্বিকল্পক সমাধিযোগে পরমাত্মাকে হৃদয়াভ্যন্তরে ধারণ করেন, কিন্তু বাৎসল্য-প্রেমবতী যশোদা এই নরাকৃতি পরমাত্মাকে হৃদয়ের উপরে ধারণ করে তাঁর সুখস্পর্শের অনুভূতিকে হৃদয় অভ্যন্তরে বিকশিত করলেন,তাতে তাঁর অন্তর ও বাহির এক অপ্রাকৃত পরমানন্দরসে পরিপ্লুত হয়ে গেল। তিনি তাতে বিভোর হয়ে আনন্দনিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে পড়লেন। প্রাকৃত জীবগণ, তাদের দেহ এবং ইন্দ্রিয়ের অবসাদে তমোগুণের বৃত্তিরূপা নিদ্রার অধিকারগত হয়। যোগীগণ সমাধিযোগে পরমাত্ম- সাক্ষাৎকার লাভের বিষয় বিস্মৃত হয়ে স্থির হয়ে যান, কিন্তু প্রেমবান্ ভক্তের সাক্ষাৎ কৃষ্ণের সম্বন্ধ পেয়ে যে নিদ্রাবেশ দেখা যায়,তা এরূপ নয়, তা তাঁদের প্রেমেরই বিচিত্র বিলাস। যাইহোক, কৃষ্ণ-জননী যশোদা কৃষ্ণকে বক্ষে ধারণ করে কিছুক্ষণ নিদ্রিত থাকলেন, কিন্তু রজনীর শেষ যামার্দ্ধ উপস্থিত হলে, নিদ্রাই তাঁকে পরিত্যাগ করে অন্তর্হিত হ'ল, কেননা রজনীর শেষ যামার্দ্ধই দধিমন্থনের সময়।সেই সময়ে দধিমন্থন করিলে বেশী পরিমাণে নবনী উত্থিত হয় এবং সেই নবনী অতি সুস্বাদু হয়।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলা।*
*পর্ব-সংখ্যা--০৮*
*🌻অধিক সময় যদি যশোদা নিদ্রিত থাকেন,তাহলে তাঁর পুত্রের ভোজনের জন্য দধিমন্থন কাজে ব্যাঘাত পড়িবে। এইজন্য সে সময়ে "নিদ্রাই" যশোদার সঙ্গত্যাগ করে অন্তর্হিত হ'ল। কৃষ্ণসেবার সময় উপস্থিত হলে প্রেমবান্ ভক্তগণের সবরকম বিঘ্ন এবং সেবার প্রতিবন্ধকতার অবসান হয়ে যায় এবং তাঁরা পরমানন্দে নিজের অধিকার অনুরূপ সেবায় নিযুক্ত হন।*
*🍀বাৎসল্যপ্রেমবতী যশোদা শেষ রজনীতে জাগ্রত হয়ে অতি মৃদুভাবে কৃষ্ণকে ধরে বক্ষ হতে শোয়ালেন। তাঁকে শয্যায় শয়ন করিয়ে দুই পার্শ্বে পাশবালিশ রেখে তাঁর অঙ্গে মৃদু মৃদু হাত বোলাতে লাগলেন, যাতে নিদ্রাভঙ্গ না হয়।তার পর তাঁকে গাঢ় নিদ্রাবিষ্ট দেখে নিঃশব্দে পালঙ্ক হতে নেমে এলেন। ঘরের কোণে প্রদীপ জ্বালান ছিল, সেই প্রদীপ প্রায় নিভে যাচ্ছিল, তখন মা যশোদা প্রদীপের সলিতা একটু বাড়িয়ে হাতে দীপ নিয়ে পুত্রের কাছে পুনরায় এলেন এবং পুত্রের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে ডানহাতে প্রদীপ ধরে নিয়ে বাম হস্ততলে রেখে নিদ্রিত গোবিন্দের বদনকমলের সম্মুখে তিনবার ঘুরিয়ে ডান হাতে প্রদীপ ধরে বামহাতের তর্জনী এবং অঙ্গুষ্ঠ বা বুড়ো আঙ্গুল যোগে প্রদীপের অগ্রভাগ হতে জ্বলন্ত অবস্থায় সলতের অতি সামান্য অংশ কৃষ্ণের ভ্রূমধ্যে স্পর্শ করিয়ে দিলেন। "বৎস ! নির্ম্মঞ্ছনং তে যামি" "বাপ আমার ! তোর বালাই যাক, তোর সর্বপ্রকার আপদ বিপদ দূরীভূত হোক, তুই পরমসুখে নিদ্রা যা, আমি তোরই ভোজনের জন্য দধিমন্থন করতে চললাম"।যশোদা দুই এক পা অগ্রসর হন আর ফিরে পুত্রের মুখপানে তাকান,এই ভাবে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলেন।*
*🌻বাৎসল্যপ্রেমবতী যশোদা শয়ন ঘরের বাইরে এসে খোলা দরজা দিয়ে তাঁর নিদ্রিত পুত্রকে দেখা যায় এইরকম জায়গায় দধিভান্ড রেখে তাতে মন্থনদন্ড জুড়ে দড়ি সংযোগ করলেন এবং তার কিছুদূর হতে ঘরের সব কিছুই দেখা যায় এইরকম জায়গায় চুল্লিতে আগুন দিয়ে তার উপরে দুধের কড়াই চাপালেন।হালকা আগুনের তাপে কড়ায়ের দুধ গরম হতে লাগল। যশোদাও দধিভান্ডের কাছে বসে মন্থনরজ্জু টানাটানি করে দধিমন্থনে রতা হলেন এবং বারে বারে শয়ন ঘরের দিকে তাকাতে লাগলেন যেন পুত্র কোনভাবেই পালঙ্ক হতে পড়ে না যায়।*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু ভাগবতীয় কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--০৯*
*🌻মা যশোদার বাৎসল্যপ্রেমের পরিভাবিত হৃদয়পটে অখিলব্রহ্মান্ডপালকের বালক-লীলা-বিগ্রহ সর্বদাই অঙ্কিত আছে।তাঁর নব নব ভাবের তুলিকার বিচিত্র কারুকার্য্যে চিত্রাঙ্কিত বালবিগ্রহ, নিত্য নব নব মাধুর্য্য ছড়িয়ে মা যশোদার হৃদয় নব নব ভাবে উদ্ভাসিত ও উল্লসিত।মা যশোদা দধিমন্থনে রত হলে মন্থনরজ্জুর আকর্ষণ ও বিকর্ষণের তালে তালে তাঁর হৃদয়পটে অঙ্কিত বালগোপালও নানা লীলামাধুরী ছড়িয়ে নাচতে আরম্ভ করলেন, তাতে তাঁর মাধুর্য্যসিন্ধু উচ্ছলিত হয়ে মা যশোদার হৃদয় প্লাবিত করে তাঁর মুখ দিয়ে তা গানাকারে নির্গত বা বাহির হতে লাগল। কিন্তু সেই দধিমন্থনধ্বনি মুখরিত রজনী-শেষে নন্দালয়ে নন্দপত্নীর হৃদয় ছাপানো সেই বাৎসল্যের গানের কোন শ্রোতা নেই। কাজেই তাঁর মুখনির্গত গানের ধ্বনি তাঁরই কানের পথে প্রাণে প্রবেশ করে গিয়ে ঝঙ্কার দিতে লাগল এবং প্রাণে আঁকা প্রাণগোপালের ভোজনের জন্য নবনী প্রস্তুত, মুখে বালগোপালের লীলাগান এবং হৃদয়ে বালগোপালের মধুর বাল্যলীলা-স্মৃতি লয়ে তাঁর কায়-মন এবং বাক্য গোপালের ভাবে একতান করে তিনি পরমানন্দে বিভোর হয়ে অবস্থান করতে লাগলেন।*
*🍀শ্রীপাদ শুকদেব গোস্বামী পরীক্ষিতকে বললেন--- হে মহারাজ ! আমার তোমার নিকট যশোদা-নন্দনের যে সমস্ত মধুর বাল্যলীলা বর্ণনা করেছি, দধিমন্থনকালে সেই সমস্ত বাল্যলীলা-কথা মা যশোদার মুখে গানরূপে উচ্চারিত হতে লাগিল। তা ছাড়াও নারদের বীণার তানে,ব্রহ্মার চতুর্বদনে, পঞ্চাননের পঞ্চাননে এবং অনন্তদেবের অনন্তবদনে বালগোপালের যে সমস্ত লীলাগাথা পরিকীর্তিত হয়,তাহাও মা যশোদার বাৎসল্যপ্রেম-পরিভাবিত হৃদয়ে অযাচিতভাবে পরিস্ফুট হয়ে গানাকারে তাঁর মুখ দিয়ে বাহির হতে লাগল।তা ছাড়াও মা যশোদার তদানীন্তন (তখনকার) ভাবোচ্ছ্বাসে তাঁর প্রাণে আঁকা প্রাণগোপালের যে কত শত শত বাল্যলীলা-সুধাসিন্ধু উচ্ছলিত হয়ে তাঁর হৃদয় প্লাবিত করে গানরূপে মুখ দিয়ে বাহির হতে লাগিল এবং তার কত শত শত রসমন্দাকিনীধারা যে তাঁর কর্ণবিবরে বা কানের ভিতরে প্রবিষ্ট বা প্রবেশ হয়ে তাঁর হৃদয়ে কোন ভাবের শত শত অমিয় উৎস উৎসারিত করতে লাগিল, তা স্বয়ং বাগধিষ্ঠাত্রী দেবীরও বর্ণনা করবার সাধ্য আছে কিনা সন্দেহ।*
*🏵দধিমন্থনকালে মা যশোদার বসন ভূষণ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদির যে নিরুপম মাধুরী বিকাশ হয়েছিল, তা বর্ণনার অতীত হলেও বাৎসল্যপ্রেমলিপ্সু সাধক ভক্তগণের তা নিরন্তর চিন্তনীয়। সেই জন্য সেই অসীমসুষমার কিছু ইঙ্গিত জানা নিতান্ত প্রয়োজন।মা যশোদা শয্যা হতে উঠে প্রথমতঃ হাত-মুখ প্রক্ষালন করে রাত্রিবাস বসন পরিবর্তন করে বিচিত্র চারুচিত্রাবলী পরিশোভিত পীত বর্ণের ক্ষৌম (পট্টবস্ত্র বা রেশমী শাড়ী)বসন পরিধান করলেন। তাতে তাঁর ইন্দ্রনীলমণি সদৃশ শ্যামবর্ণ অঙ্গের শোভা যেন আরও ফুটে উঠিল।দধিমন্থনরজ্জুর আকর্ষণ ও বিকর্ষণ (টানাটানি)জন্য অঙ্গ- সঞ্চালনে তাঁর বিশাল কটিতট হতে মসৃণ ক্ষৌম বসন স্খলিত হবার সম্ভাবনায় তিনি কাঞ্চী (কটির আভরণ বিশেষ) দ্বারা শক্তভাবে কটির বসন আবদ্ধ করলেন।মথুরা প্রদেশবাসিনী রমণীগণকে "ঘাগড়া" পরিধান করতে দেখা যায়,তা সূত্র দ্বারা কটিতে বন্ধন করে রাখতে হয়। (শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত, "ক্ষৌমং বাসঃ পৃথুকটিতটে বিভ্রতী সূত্র বদ্ধং"),---মা যশোদা তাঁর " বিশাল কটিতটে সূত্রবদ্ধ ক্ষৌমবসন পরিধান করেছিলেন"। এই শ্লোকাংশ দ্বারা মা যশোদার "ঘাগড়া" পরিধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ( বতর্মানকালেও ব্রজরমণীগণের "ঘাগড়া" পরিধান দেখে মনে হয়, শ্রীকৃষ্ণের প্রকট লীলার সময়েও ব্রজরমণীগণের "ঘাগড়া" পরিধানের রীতির প্রচলন ছিল।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--১০*
*🍀কৃষ্ণজননী যশোদার অঙ্গের বর্ণ সম্বন্ধে কিছু মতভেদ আছে। "ক্রমদীপিকা" গ্রন্থে দেখা যায়, মা যশোদার অঙ্গের বর্ণ ইন্দ্রনীলমণি-সদৃশ শ্যাম ও সুচিক্কণ। "গৌতমীতন্ত্রে" দেখা যায়,--- তিনি গৌরাঙ্গী। গৌরাঙ্গী মা যশোদার কোলে শ্যামাঙ্গ বালগোপালকে দেখতে বড়ই মধুর বোধ হয়। কিন্তু তবুও "ক্রমদীপিকা"র বর্ণনা অনুসারে মা যশোদার শ্যামবর্ণই সমীচীন বলে মনে হয়, কারণ,মাতার বর্ণ এবং মুখের সাদৃশ্য থাকা বালকের পক্ষে যে সুলক্ষণ ইহাই শাস্ত্র প্রসিদ্ধি এবং লোক-প্রসিদ্ধি। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম মধুর নরলীলায় এই সুলক্ষণ না থাকার কোনই হেতু নাই। "অয়ং নেতা সুরম্যাঙ্গেঃ সর্বসল্লক্ষণান্বিতঃ", প্রভৃতি "ভক্তিরসামৃত-সিন্ধু" বচনে শ্রীকৃষ্ণের সর্ববিধ সুলক্ষণেরই পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষ করে লীলাপুরুষোত্তম শ্রীভগবানের পুরুষোচিত সর্ববিধ সদ্-গুণ এবং সুলক্ষণ থাকাই সঙ্গত। ভগবানের নরলীলা বিগ্রহে যদি সর্ববিধ সুলক্ষণ না থাকে তাহলে তা আর কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে ? স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন পৃথিবীতে নরলীলা প্রকট করেছিলেন, তখন ব্রজবাসীগণ সকলেই তাঁকে "যশোদা-নন্দন" বলে জানতেন, কিন্তু ব্রজবাসী ভিন্ন পৃথিবীর অন্যান্য সকলেই তাঁকে দেবকী-নন্দন বলে জানতেন। অক্রূর, উদ্ধব প্রভৃতি ভক্তগণ ব্রজে এসে নন্দ, যশোদা এবং ব্রজবাসীগণের কাছে শ্রীকৃষ্ণের মথুরায় জন্মগ্রহণ বৃত্তান্ত প্রকাশ করেছিলেন।শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তার পর তাঁর পিতা বসুদেব তাঁকে গোপনে নন্দালয়ে রেখে গিয়েছেন, এ সমস্ত বৃত্তান্তও নন্দ, যশোদা এবং ব্রজবাসীগণের তখন কর্ণগোচর হয়েছিল, কিন্তু কৃষ্ণের মুখ ও বর্ণ যশোদার মতন বলে কোন রকম সন্দেহ আসতে পারে নাই। কৃষ্ণের মুখ ও বর্ণ যশোদার মতন বলে সকলেরই দৃঢ় ধারণা ছিল যে কৃষ্ণ নিশ্চয়ই যশোদানন্দন,তাঁকে যাঁরা দেবকীনন্দন বলেন,তাঁরা ভ্রান্ত। মা যশোদা যদি গৌরাঙ্গী হতেন, তাহলে কৃষ্ণের মথুরায় জন্ম, বসুদেব কর্তৃক গোপনে তাঁকে নন্দালয়ে রক্ষা করা প্রভৃতির কথা রটনা হলে কৃষ্ণের বর্ণে এবং মুখে মা যশোদার কোন প্রকার সাদৃশ্য নাই বলে নন্দ, যশোদা এবং ব্রজবাসীগণের মনে ভাবান্তর উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল না।তাতে নন্দ, যশোদা এবং ব্রজবাসীগণের সহিত কৃষ্ণের সম্বন্ধ শিথিল হয়ে পড়িত এবং তাতে ভগবানের প্রেমাধীনতা গুণেরও কিছু লাঘব হয়ে পড়িত। সুতরাং প্রেমাধীন ভগবান বাৎসল্যপ্রেমাধার নন্দ যশোদা এবং প্রেমবান্ ব্রজবাসীগণের সঙ্গে মমতার বন্ধন সুদৃঢ় রাখবার জন্য যে মা যশোদার বর্ণ ও মুখের সাদৃশ্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।বসুদেব, দেবকী এবং মথুরা ও দ্বারকাবাসী যাদবগণ কৃষ্ণকে স্বয়ং ভগবান জেনে তাঁকে ঐশ্বর্য্য জ্ঞান মিশ্রিত প্রীতির সম্বন্ধে গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং সেখানে কৃষ্ণের দেবকীর বর্ণ ও মুখের সাদৃশ্য গ্রহণের কোনও প্রয়োজন নাই। কিন্তু নন্দ, যশোদা এবং ব্রজবাসীগণের বিশুদ্ধ প্রীতির সম্বন্ধ অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্য যশোদার বর্ণ ও মুখসাদৃশ্য প্রেমাধীন ভগবানের পক্ষে অবশ্য গ্রহণীয়। অতএব গৌতমীতন্ত্রে মা যশোদার গৌরবর্ণের উল্লেখ থাকলেও ভগবানের প্রেমাধীনতার দিকে তাকিয়ে ক্রমদীপিকার বর্ণনা অনুসারে মা যশোদাকে কৃষ্ণের ন্যায় ইন্দ্রনীলমণি সদৃশ শ্যামবর্ণ বলে ধারণা করাই যুক্তিসঙ্গত এবং প্রেমলিপ্সু সাধকগণের ভাবের অনুকূল।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু তথ্য ও তত্ত্ব।*
*পর্ব-সংখ্যা--১১*
*🌻সত্য,ত্রেতা,দ্বাপর ও কলি এই চারি যুগের সহস্রবার পরিবর্তনে ব্রহ্মার এক দিন হয়, ব্রহ্মার একদিনে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একবার মাত্র পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন।*
*🌷ব্রহ্মার একদিনে তেঁহ একবার।*
*🌷অবতীর্ণ হৈয়া করে প্রকট বিহার।।চৈঃচঃ।।*
*🌹সুতরাং ব্রহ্মার একদিনের সহস্র দ্বাপর যুগের মধ্যে এক দ্বাপরে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয় এবং নয়শত নিরানব্বই দ্বাপর যুগে যুগাবতাররূপে কৃষ্ণের অংশ জগতে আবির্ভূত হয়ে যুগধর্ম প্রচার করে থাকেন।যে সমস্ত দ্বাপর যুগে যুগাবতাররূপে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়,সে সমস্ত দ্বাপরযুগে কৃষ্ণজননী যশোদাও অংশরূপে আবির্ভূতা হয়ে থাকেন। সুতরাং স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জননী স্বয়ংরূপা যশোদা কৃষ্ণবর্ণা এবং যুগাবতাররূপী কৃষ্ণের জননী-অংশরূপা যশোদা গৌরবর্ণা,এই ভাবে "ক্রমদীপিকা" এবং "গৌতমীয়তন্ত্রে"র মতভেদের সামঞ্জস্য করিলে সম্ভবত নিতান্ত যুক্তিবিরুদ্ধ হয় না। ক্রমদীপিকা এবং গৌতমীয়তন্ত্র এই উভয় গ্রন্থের বচনই গৌড়ীয় বৈষ্ণবাচার্য্যগণ শ্রীহরিভক্তিবিলাস, ষট্-সন্দর্ভ প্রভৃতি গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। সুতরাং এই উভয় গ্রন্থেরই প্রামাণ্য অস্বীকার করবার উপায় নাই।অতএব যুগভেদে উভয় গ্রন্থের মতভেদের সামঞ্জস্য রক্ষা করাই সমীচীন।যে দ্বাপরে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হন,সেই দ্বাপরের কৃষ্ণজননীর রূপ বর্ণনায় "ক্রমদীপিকায়" শ্যাম বর্ণের উল্লেখ আছে এবং যে সমস্ত দ্বাপরে যুগাবতার রূপে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়, সেই দ্বাপরে কৃষ্ণজননীর রূপবর্ণনায় গৌতমীয়তন্ত্রে গৌরবর্ণের উল্লেখ আছে,এইভাবে ক্রমদীপিকা ও গৌতমীয়তন্ত্রের সম্মান রক্ষা করে শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা রসাস্বাদন করাই ভক্তগণের পক্ষে শ্রেয়স্কর।*
*🌻মা যশোদা, বিশুদ্ধ বাৎসল্য প্রেমে পুত্রবুদ্ধিতে কৃষ্ণের সেবা করে থাকেন।তাঁর এই সেবায় কদাপি শ্রীভগবৎসেবা-বুদ্ধি হয় না। মা যশোদার কৃষ্ণসেবা আমাদের দৃষ্টিতে শ্রীভগবৎসেবা হলেও তাঁর বাৎসল্যপ্রেমের দৃষ্টিতে তা তাঁর পুত্রের লালন-পালন ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তবুও তিনি তাঁর পুত্রকে সদ্যোজাত নবনী খাওয়াবার জন্য দধিমন্থন করতে রত হবার পূর্বে রাত্রিবাস বসন অর্থাৎ রাত্রের পরিধান বসন, পরিত্যাগ করে ক্ষৌম বা পট্টবস্ত্র পরিধান করলেন এবং পবিত্রভাবে দধিমন্থন করতে আরম্ভ করলেন।কোনও প্রকার অশুচি অবস্থায় কৃষ্ণ সেবার কাজ করলে অপরাধ হয়,এই ভয়ে সাধক ভক্তগণ যথাসাধ্য এবং যথাশাস্ত্র শুচি হয়েই কৃষ্ণ-সেবায় রত হয়ে থাকেন।কৃষ্ণজননী যশোদার পুত্র লালন-পালনে অপরাধের সম্ভাবনা না থাকলেও অশুচি অবস্থায় দধিমন্থন করলে তা খেয়ে কৃষ্ণের কোন প্রকার ব্যাধি হতে পারে,--- এই আশঙ্কায় তিনি কোনরকম অশুচি অবস্থায় কৃষ্ণের কোনও কাজ করতেন না।প্রেমবান্ ভক্তগণ কৃষ্ণের সাক্ষাৎ সেবার জন্য যে রকম নিয়ম নিষ্ঠা ও শুদ্ধি প্রভৃতির তীব্র দৃষ্টি রাখতে পারেন, প্রেমহীন ব্যক্তি তা কল্পনাতেও আনতে পারে না।নিয়মনিষ্ঠ কিম্বা শৌচাদি অবলম্বনের আলস্যে কিংবা তাতে বিষয় ভোগের অসুবিধা হওয়ায় অনেকেই বলতে পারেন যে, "শ্রীভগবানের নিকট শুচি অশুচির বিচার নেই" এবং তাঁদের এই আলস্যবচন ও সুবিধাবচনের প্রমাণরূপে তাঁরা ব্রহ্মজ্ঞাননিষ্ঠ,জাগতিক স্মৃতিবিহীন যোগসিদ্ধ মহাপুরুষের আচরণ,কিম্বা সখ্যপ্রেমে আত্মহারা গোপবালকগণের কৃষ্ণকে উচ্ছিষ্ট ফল ভোজন করাবার কথার উল্লেখ করতে পারেন বটে, কিন্তু তাতে প্রেমবান্ কিংবা প্রেমলিপ্সু ভক্তগণের পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা নাই।*
*🍀কৃষ্ণজননী যশোদা, দধিমন্থনে রত হয়ে মা যশোদা যে গুনগুন্ করে কৃষ্ণের বাল্যলীলা গুণগান আরম্ভ করেছেন,সেই গানের তালে তালে তাঁর হাতের কঙ্কণ ঝনৎকার শব্দ করতে লাগিল এবং কর্ণের কুন্ডল দোদুল্যমান হতে লাগিল বা দুলতে লাগিল। ইহাতে মনে হয়,মা যশোদার কৃষ্ণসেবায় নিযুক্ত হাতে স্থান পেয়ে কঙ্কণ পরমানন্দে ঝনৎকার ধ্বনি করে নিজের সৌভাগ্য ঘোষণা করছে।কঙ্কণ ধনাঢ্য রমণীগণেরই হস্ত-বিভূষণ হয়ে থাকে। কিন্তু, সেই হাতে প্রায়ই কৃষ্ণসেবার সৌভাগ্য দেখা যায় না,সে হাত প্রায়ই পালিত কুকুরাদির অঙ্গ মার্জনে এবং নানা প্রকার বিলাস-ব্যসনেই নিযুক্ত থাকে, তাই আজ কৃষ্ণ-সেবার্থ দধিমন্থনরতা গোপরাজমহিষীর হাতের কঙ্কণ নিজ সৌভাগ্য-গর্বে গর্বিত হয়ে ঝনৎকার শব্দ করছে এবং কৃষ্ণসেবায় হাতের সফলতা ও কৃষ্ণসেবাবিহীন হাতের নিস্ফলতা ঘোষণা করছে।*
*ক্রমাগত*
*🙏শ্রীরাধাবিনোদ গোস্বামীর ২২ খন্ডে পরিপূর্ণ শ্রীমদ্ভাগবত।*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলা ও কিছু তথ্য ও তত্ত্ব।*
*পর্ব-সংখ্যা--১২*
*🌻মা যশোদার মুখনির্গত কৃষ্ণলীলা-গান মা যশোদার কর্ণে প্রবেশ করছে বলে,তার কুন্ডলও পরমানন্দে দোদুল্যমান হয়ে কৃষ্ণকথা শুনে কর্ণের সফলতার ইঙ্গিত করছে।কুন্ডল, অনেক রমণীরই কানে বিভূষিত করে বটে, কিন্তু কুন্ডলধারিণী কোন রমণীরই কর্ণপথে কৃষ্ণকথার এক বর্ণও প্রবেশ করতে দেখা যায় না। মা যশোদার কর্ণদ্বয় কৃষ্ণকথায় পরিপূর্ণ দেখে তার কানের কুন্ডল একেবারে পরমানন্দে আত্মহারা হয়ে তাই কৃষ্ণগীতির তালে তালে নৃত্য করছে।*
*🍀মন্থন-রজ্জুর আকর্ষণের পরিশ্রমে মা যশোদার বদনে বিন্দু বিন্দু ঘাম বের হয়ে তাঁর কৃষ্ণবাৎসল্যমাখা মুখখানির শোভা বর্দ্ধন করতে লাগিল এবং তাঁর মস্তক সঞ্চালনে মাথার কবরী হতে মালতীর মালা স্খলিত হয়ে তাঁর চরণে পড়তে লাগল।কৃষ্ণসেবারতা কৃষ্ণজননীর মস্তকে অবস্থান করা যুক্তিযুক্ত নয় মনে করেই বোধ হয় মালতীর মালার ফুল তাঁর মস্তক হতে চ্যুত হয়ে চরণে আশ্রয় গ্রহণ করিল। মালতী মালার এই ইঙ্গিতে মনে হয়--- কৃষ্ণসেবায় রত হবার আগে যা মাথায় থাকে,কৃষ্ণ সেবায় রত হলে তাহাই এসে চরণে পতিত হয়।কৃষ্ণসেবা-বিহীন ব্যক্তিগণ কামনা-বাসনার বোঝা মাথায় করে ক্লান্ত হয়ে সংসার পথে বিচরণ করছেন, কিন্তু তাঁরা যদি কৃষ্ণসেবায় রত হন, তাহলে তাঁদের মাথার বোঝা যে চরণে শরণ গ্রহণ করবে,তাতে আর কিছুমাত্রও সন্দেহ নেই।*
*🏵কৃষ্ণজননী তাঁর হৃদয়ের চিন্তা,মুখের গান ও হাতের দধিমন্থন ছাড়া তাঁর আর অন্য কোন ভাবনা নেই।এইভাবে কিয়ৎকাল অতিবাহিত হলে পালঙ্কে শায়িত যশোদানন্দনের সুখনিদ্রার অবসান হল। তিনি দুই হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে "মা" "মা" বলে কান্না করে নিদ্রার জড়তা বিজড়িত স্বরে যশোদাকে ডাকতে ডাকতে শয্যার উপরে উঠে বসিলেন। দধিমন্থনের সময় কৃষ্ণের নিদ্রাভঙ্গ হলে দধিমন্থন কাজে ব্যাঘাত হবে বলে মা যশোদা তাঁকে অতি যত্নে এবং সন্তর্পণে সুকোমল শয্যায় শায়িত রেখে কিছুদূরে আবার যেন গোপালকে দেখা যায় এমন স্থানে দধিমন্থন করছিলেন এবং মৃদু মৃদু গানের শব্দে গোপালের নিদ্রা গাঢ় হয় বলে, তিনি গুনগুন শব্দে গান করছিলেন। কিন্তু যশোদানন্দনের নিদ্রায় গাঢ়তা দূরে থাকুক, তঅন্য দিন অপেক্ষা অনেক আগেই জাগ্রত হলেন।অন্যান্য দিন গোপাল যশোদার বক্ষেই নিদ্রিত থাকেন, সেজন্য তাঁর সেই সুখনিদ্রার কিছুতেই অবসান হয় না এবং যশোদা তাঁকে "ওঠ রে বাপ নীলমণি,খাওরে নবনী,গগনে উঠিল ভানু" বলে কতবার ডেকে তাঁর নিদ্রাভঙ্গ করেন। কিন্তু আজ যশোদা দধিমন্থন করবার জন্য তাঁকে বক্ষ হতে নামিয়ে শয্যায় শায়িত করেছেন এবং তাঁর মুখে যশোদার পিযূষস্রাবি স্তনাগ্র নাই, সুতরাং আজ সেই নিদ্রাতীত পরতত্ত্ববস্তুকে কে নিদ্রিত রাখবে ?যশোদা যখন দধিমন্থন করতে আরম্ভ করেন,তার পর দধিমন্থনের ঘর্ঘর রব, কঙ্কণের ঝনৎকার ধ্বনির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে তাঁর সেই গানধ্বনি যে কত উচ্চতা প্রাপ্ত হয়েছিল,তা তিনি ভাবাবেশে অনুমান করতে পারেন নাই।*
*🌻শ্রীমদ্ভাগবত দশমস্কন্ধ ষট্ চত্বারিংশৎ (৪৬) অধ্যায়ে বর্ণিত আছে,শ্রীকৃষ্ণের সখা উদ্ধব যখন বৃন্দাবনে এসেছিলেন, তখন ব্রজরমণীগণের কৃষ্ণলীলা গান ও তৎসহ দধিমন্থন শব্দ শুনেছিলেন----*
*🌷উদ্-গায়তীনামরবিন্দলোচনং ব্রজাঙ্গনাং দিবমস্পৃশদ্ ধ্বনিঃ।*
*🌷দধ্নশ্চ নির্মন্থনশব্দমিশ্রিতো নিরস্যভে যেন দিশামমঙ্গলম্।।*
*🌻ব্রজ-রমণীগণের কন্ঠনিঃসৃত কৃষ্ণগুণ গানের ধ্বনি,তাঁদের দধিমন্থন শব্দের সহিত মিশ্রিত হয়ে ভূলোক ব্যাপ্ত করে স্বর্লোক স্পর্শ করে এবং তাতে দশদিকের অমঙ্গল দূরীভূত হয়ে যায়।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দাম বন্ধন লীলার বিষয়বস্তু।*
*পর্ব-সংখ্যা--১৩*
*🌻বারংবার কৃষ্ণজননীর কথায় ফিরে আসছে, কৃষ্ণজননী যশোদার হৃদয়ে সবসময়ই কৃষ্ণের বাল্যলীলার স্মৃতি, মুখে তাঁরই লীলা গান এবং হাতে তাঁরই সেবার্থ দধিমন্থন--- এইভাবে কায়,মনঃ এবং বাক্যের কৃষ্ণসম্বন্ধে একতানতা,কৃষ্ণের নিদ্রাভঙ্গের কারণের ইঙ্গিত করছে কিনা তাহাও একটু বিবেচনা করে দেখা মন্দ নয়।যার কায়,মনঃ এবং বাক্য কৃষ্ণের সম্বন্ধে একতান নয়,তার নিকট কৃষ্ণ সর্বদাই নিদ্রিত। কিন্তু শুদ্ধভক্তিযোগের সাধনানুষ্ঠানে কায়,মনঃ এবং বাক্যে কৃষ্ণের সম্বন্ধ গ্রহণ করে একতান হলে নিদ্রিত কৃষ্ণ জাগ্রত হয়ে ডেকে কাছে আসেন। আমরা যদি হাতে কোনও কৃষ্ণসেবার কাজ করি, কিম্বা মুখে কৃষ্ণকথা বলি, তখনও আমাদের মন বিষয় সম্বন্ধ ছাড়ে না,মনে নানারকম বিষয় ভাবনার তরঙ্গ উঠে হৃদয় প্লাবিত করে। অনেক সময়ে হাতে বিষয় কর্ম এবং মুখে বিষয়-আলোচনা থাকা সত্ত্বেও মনে করি " আমার মন তো কৃষ্ণস্মৃতি নিয়েই আছে, মুখে বিষয়-কথা বলতে এবং হাতে বিষয় কাজ করতে দোষ কি ?" অনেক স্মরণনিষ্ঠ সিদ্ধমহাপুরুষকে দেখা যায়, তাঁরা দুই-চারজনে মিলিত হয়ে পরমানন্দ পরনিন্দা-রসাস্বাদন করছেন, কিন্তু জিজ্ঞাসা করলে বলেন, "ভিতরে ভিতরে স্মরণ চলছে"। কোনও কোনও মহাত্মার নিকট উপদেশ পাওয়া যায় যে "কোনও প্রকার বাহ্যাড়ম্বরের কিছুমাত্র দরকার নাই, অন্তরে কৃষ্ণসম্বন্ধ থাকলেই জীব কৃতার্থ হয় "। কিন্তু সকলেরই ইহা বিবেচনা করা উচিত যে আত্ম-বঞ্চনা কিম্বা পর-প্রতারণার জন্য যিনি যে সিদ্ধান্তই স্থাপন করুন না কেন, কায়,মনঃ এবং বাক্য কৃষ্ণসম্বন্ধে একতান না করে কেউ কোনও দিন কৃষ্ণের কোনও সাড়া পেয়েছেন ? অম্বরীষ প্রভৃতি পুরাণ-প্রসিদ্ধ ভক্তচূড়ামণিগণের কায়,মনঃ এবং বাক্য কৃষ্ণের সম্বন্ধে সর্বদাই একতান থাকত বলেই তাঁরা সর্বদা কৃষ্ণের সাড়া পেতেন। শ্রীমদ্ভাগবত নবমস্কন্ধ চতুর্থ অধ্যায়ে অম্বরীষ-চরিত্র প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে,--- "স বৈ মনঃ কৃষ্ণপদারবিন্দয়োর্ব্বচাংসি বৈকুন্ঠগুণানুবর্ণনে।করৌ হরের্ম্মন্দিরমার্জ্জনাদিষু শ্রুতিঞ্চকারাচ্যুত সৎকথোদয়ে"। অর্থাৎ, মহারাজ অম্বরীষের চিত্তভৃঙ্গ সর্বদা হরিচরণ-কমলে মগ্ন থাকিত। তাঁর বাক্য শ্রীগোবিন্দের গুণানুবর্ণনে, হস্তদ্বয় শ্রীগোবিন্দের মন্দির মার্জনে,পূজার জন্য তুলসী পুষ্পাদি চয়নে এবং কর্ণযুগল সদাসর্বদা হরিকথা শ্রবণেই নিযুক্ত থাকত।*
*🍀ইহাতে মহারাজ অম্বরীষের কায়,মনঃ এবং বাক্যের শুদ্ধভক্তির অনুষ্ঠান করে শ্রীভগবৎ-কৃপায় কায়,মনঃ এবং বাক্যের কৃষ্ণসম্বন্ধে একতানতারই পরিচয় পাওয়া যায়। যে সমস্ত ভাগ্যবান্ সাধক-ভক্তগণ কায়,মনঃ এবং বাক্যে শুদ্ধভক্তির অনুষ্ঠান করে শ্রীভগবৎ-কৃপায় কায়,মনঃ এবং বাক্যের একতানতা সম্পাদন করতে পারেন,তাঁরাই জাগ্রত কৃষ্ণের সাড়া পেয়ে কৃতার্থ হন। কায়,মনঃ এবং বাক্যের একতানতা বা একাগ্রতা সম্পাদন না হলে যে কি হয়, তা সকলেরই অনুভূত, সুতরাং সে সম্বন্ধে আর কিছু বলার নেই।*
*🌻সুতরাং কৃষ্ণ আর নিদ্রিত থাকতে না পেরে জেগে উঠলেন এবং "মা" "মা" বলে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু কৃষ্ণের ডাক মা যশোমতী শুনতে পেলেন না, কারণ,তাঁর মুখনিঃসৃত কৃষ্ণলীলাগানের সঙ্গে হাতের কঙ্কণের ঝনৎকার শব্দ এবং দধিমন্থনের ঘর্ঘররব মিশ্রিত হয়ে যে সুর-লোক-সুদুর্লভ সুমধুর রোল উঠিল,তাতে নন্দালয় পরিব্যাপ্ত হয়ে ত্রিদশালয় পর্যন্ত মুখরিত হয়ে গেল।সেই মধুর রবে মা যশোদার কর্ণগত হতে পারল না। অর্থাৎ শুনতে পেলেন না।সত্যই, ব্রজলীলার অপূর্ব মাধুর্য্য-বৈভবের কথা মনে করলে সকলরেই এক অভূতপূর্ব বিস্ময়রসে আবিষ্ট হয়ে পড়তে হয়।যে-ব্রজরাজ-নন্দনকে অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডের কত কোটি কোটি ভক্তগণ হা কৃষ্ণ!হা কৃষ্ণ!বলে ডেকে কোটি জন্মেও সাড়া পান না,আজ তিনি কেঁদে কেঁদে কত করুণ স্বরে মা যশোদাকে ডেকেও সাড়া পাচ্ছেন না। প্রেমবান্ ভক্তের প্রেমের অচিন্ত্য মহাপ্রভাবের নিকট প্রেমাধীন শ্রীভগবানের সর্ববিধ ঐশ্বর্য্যবৈভবের এইরূপেই প্রতি পদে পদে পরাভব স্বীকার করতে হয়।*
*ক্রমাগত*
*🙏জয় জয় বাৎসল্যপ্রেমবতী মা যশোমতীর শ্রীচরণে শত শত কোটি দন্ডবৎ প্রণাম🙏*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার ভাগবতীয় কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--১৪*
*🌻যশোদানন্দন বার বার ডেকেও যখন যশোদার সাড়া পেলেন না,তখন তিনি পালঙ্ক হতে নেমে গা-মোড়া ও চোখ কচলাতে কচলাতে এবং ঠোঁট ফুলিয়ে মৃদু ক্রন্দনের সঙ্গে "মা" "মা" বলে ডাকতে ডাকতে দধিমন্থনরতা জননীর দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন।গমনকালে তাঁর নূপুরের রুণু-রুণু এবং কিঙ্কিণীর কিনি-কিনি রব তাঁর মুখকমল বিনিঃসৃত মৃদু-ক্রন্দন বিজড়িত "মা" "মা" রবের সহিত মিলিত হয়ে তাকে দীর্ঘ করে মা যশোদার কর্ণগত করে দিতে চেষ্টা করেও সফল মনোরথ হতে না পেরে মা যশোদার মুখনিঃসৃত কৃষ্ণলীলা গান,তাঁর হাতের কঙ্কণের ঝনৎকার এবং দধিমন্থনের ঘর্ঘর শব্দের সঙ্গে মিলে গিয়ে তারই মাধুর্য্য বর্ধন করতে লাগিল।*
*🍀মা মা বলে ডেকেও যখন কোন সাড়া পেলেন না, তখন এক পা দুই পা করে মা যশোদার পেছনে এসে দাঁড়ালেন, এবং বাম হাতে যশোদার গলা জড়িয়ে ধরে ডান হাতে মায়ের চিবুক ধরে নিজ দিকে ঘুরিয়ে গদগদ স্বরে বললেন, মা! আর তোকে দধিমন্থন করতে হবে না,তুই আমাকে একটু কোলে কর,ওমা! আমি অনেকক্ষণ তোর কোলে উঠি নাই,মা--- আমার বড়ই ক্ষুধা লেগেছে, আমাকে একটু স্তনপান করতে দে।*
*🌻নানাবিধ বাল্যলীলা-ভঙ্গিতে পরম-মনোহর গোপালের মুখে এই সমস্ত কথা শুনে বাৎসল্যপ্রেমরসে বিগলিত হয়ে যশোদার হৃদয় প্রেমরসে পরিপ্লুত হয়ে গেল,সমুচ্ছলিত পরমানন্দরসোদ্রেকে তাঁর অঙ্গ শিথিল হয়ে আসিল, তিনি শিথিল হাতে মন্থনরজ্জু ধারণ করে মৃদু মৃদু টানতে টানতে বললেন,বাপ্ আমার ! এই তোর জন্যই তো নবনী তৈরী করছি, এখন তোর চাঁদমুখে নবনী দিব এবং তোকে কোলে করব, ক্ষণকাল অপেক্ষা কর বাপ্! এখনই দধিমন্থন শেষ হবে। যশোদার এই স্নেহমাখা কথা উল্লসিত হয়ে গোপাল বললেন, "না, মা! আমি নবনী খাব না, তোর আর দধিমন্থন করতে হবে না।তুই আমাকে কোলে কর।" তখন যশোদা বললেন, আয় আয় বাপ্ আমার! আমার অঞ্চলের ধন।আমি এখনই তোকে কোলে করছি। যশোদা এইকথা বলতে বলতে যেমন দুই একবার মন্থনদড়ি আকর্ষণ করছেন,অমনি গোপাল ডানহাতে মন্থনদন্ড ধরে বললেন, আর কাজ করতে হবে না, আমাকে কোলে কর। যশোদানন্দন যশোদার দধিমন্থন নিবারণ করবার জন্য মন্থনদন্ড ধরিলে, যশোদা একেবারে পরমানন্দে বিভোর হয়ে গেলেন ও বললেন, হ্যাঁ বাপ্ ! মন্থনদন্ড ধরলে যে আর মন্থন করা যায় না, এ সঙ্কেত তোকে কে শিখাল? হ্যাঁরে! এত অল্প বয়সে এত বুদ্ধি তো কোন বালকেরই দেখি নাই, তুই এত বুদ্ধি পেলি কোথায় ? আর যশোদা মনে করলেন, নারায়ণের কৃপালব্ধ পুত্র, তাই নারায়ণের অপার কৃপায় বাল্যকালেই এত বুদ্ধিমান হয়েছে। হে নারায়ণ ! তুমি তোমার এই কৃপাদত্ত পুত্রের দীর্ঘ জীবন দান কর। যশোদা অন্যমনস্ক হয়ে এইরকম চিন্তা করছেন,এমন সময়ে গোপাল যশোদার হাত হতে মন্থনদড়ি টেনে নিয়ে দূরে ফেলে দিলেন এবং বললেন--- ওমা ! আমার কিছুই ভাল লাগে না,তুই আমাকে কোলে কর, আর তোর দধিমন্থনে কাজ নেই। প্রেমময়ী মা যশোদা আর থাকতে পারলেন না,দুই হাত প্রসারিত করে বললেন, আয় বাপ্ আয়! আর আমি দধিমন্থন করব না, আমার আঁচলের ধন আমার কোলে আয়।*
*🌹যশোদা কৃষ্ণকে কোলে নিবার জন্য হাত বাড়ালেই গোপাল ঝাঁপ দিয়ে যেন মায়ের কোলে পড়লেন এবং মাতৃ দুগ্ধ পান করতে লাগলেন।*
*ক্রমাগত*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দাম বন্ধন লীলার কিছু কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--১৫*
*🍀মা যশোমতী এক গৃহমধ্যে উনানে বা চুল্লিতে দুধ গরম করবার জন্য দুধপাত্রে দুধ গরম করছিলেন এবং সেই মৃদু মৃদু আঁচে দুধ গরম হচ্ছিল। এদিকে গোপাল মায়ের শুয়ে মনের সুখে দুগ্ধপান করছেন।মা যশোদা, গোপালকে খাওয়াবার জন্য আগেরদিন রাত্রিতে নিজের হাতে পদ্মগন্ধিনী গাভীর দুগ্ধদোহন করে ভান্ডে রেখেছিলেন,দধিমন্থনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেই দুধ গরম করবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে কৃষ্ণের নিদ্রাভঙ্গ হলে তাঁকে সদ্যোজাত নবনী এবং এই সদ্য গরম দুধ খাওয়াবেন,তাতে তার উদর পূর্ণ এবং তৃপ্তি লাভ হবে।*
*🌻মা যশোদার এই ব্যবস্থায় কোন দোষ নেই বটে, কিন্তু হঠাৎ উনানের আগুনের তাপ বেড়ে যাওয়াই দুধ উথলে পড়বে পড়বে দেখে মা যশোমতি স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি তাড়াতাড়ি কৃষ্ণকে কোল হতে নামিয়ে মাটিতে বসালেন, বললেন, "বাপ্ আমার! তুই ক্ষণকাল অপেক্ষা কর ; আমি শীঘ্রই এসে আবার তোকে কোলে করব ও দুধ পান করাব। কৃষ্ণকে এইকথা বলে কৃষ্ণজননী আর ক্ষণকাল মাত্রও দেরী না করে দ্রুতবেগে দুগ্ধাবর্তন স্থানে গমন করলেন। মা যশোমতী মনে করলেন--- কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে দ্রুতবেগে গেলে যদি কৃষ্ণের কোন স্থানে আঘাত লাগে বাছা আমার ভীষণ কষ্ট পাবে। এইজন্য তিনি গমনকালে কৃষ্ণকে কোল হতে নামিয়ে মাটিতে বসিয়ে রাখলেন। (🌻যে ভগবানকে পাবার জন্য কত শত মুনি ঋষি হাজার হাজার বৎসর তপস্যা করেও শ্রীচরণ দর্শন পাননা, সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে মা যশোমতী উনানে দুধ পড়ে যাবে বলে মাটিতে বসিয়ে চলে গেলেন, ধন্য-ধন্য মা তুমি, তোমার চরণে শত শতকোটি দন্ডবৎ প্রণাম)।*
*🍀কৃষ্ণজননী যশোদা, সামান্য দুগ্ধ রক্ষা করবার জন্য, সচ্চিদানন্দ-ঘন-বিগ্রহকেও কোল হতে নামিয়ে রেখে চলে গেলেন দেখে মনে হয়, প্রেমবান্ ভক্তের প্রেম-ব্যবহার একমাত্র প্রেমবান্ ভক্তেরই বুদ্ধিগম্য।যাঁর ব্রহ্মস্বরূপে আত্মস্বরূপ লয় করবার জন্য জ্ঞানীগণ বহুক্লেশসাধ্য জ্ঞানসাধনায় আত্মনিয়োগ করে সর্বত্যাগী হয়ে যান ; যাঁর পরমাত্মস্বরূপ সাক্ষাৎ করবার জন্য অষ্টাঙ্গযোগীগণ যম নিয়মাদি তীব্র সাধনায় দীর্ঘকাল অতিবাহিত করে নির্বিকল্প সমাধিক্ষেত্রে যেতে সচেষ্ট হন ; যাঁর ভগবৎ স্বরূপের কৃপাকটাক্ষ-কণিকা লাভের জন্য "অজ", "ভব", "শেষ" "সনকাদি" পর্য্যন্ত সর্বদা লালায়িত--যশোদা সেই নরাকৃতি পরব্রহ্মকে কোলে পেয়েও তাঁকে পরিত্যাগ করে দুগ্ধরক্ষার জন্য এত ব্যস্ত হলেন কেন,তা তিনিই জানেন। কত শত শত জ্ঞানী যোগী ও ভক্তগণ যাঁকে পাবার জন্য সর্বত্যাগ করেন, মা যশোদা সামান্য দুগ্ধ রক্ষার জন্য তাঁকে ত্যাগ করতেও কুন্ঠিত হলেন না।দুগ্ধ কি সচ্চিদানন্দ-ঘন-বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ হতেও মা যশোদার কাছে উপাদেয় বস্তু বলে মনে হয়?*
*🌻মা যশোদার এই বিচিত্র ব্যবহারের সমালোচনায় প্রবৃত্ত হলে মনে হয় যে--- জ্ঞানী,যোগী প্রভৃতির সঙ্গে ভগবানের যেরকম সম্বন্ধ,প্রেমবান্ ভক্তগণের সহিত তাঁর সেরকম সম্বন্ধ নয়। অজ্ঞানাচ্ছন্ন জীব,যখন মায়ামোহের পদাঘাতে জর্জরিত হয়ে অজ্ঞানকেই সংসার দুঃখের মূল কারণ বলে ধারণা করতে পারে, তখনই সংসারমুক্তির জন্য জ্ঞানসাধনে রত হয় এবং সিদ্ধিদশায় ব্রহ্মস্বরূপ সাক্ষাৎকার লাভ করে কৃতার্থ হয়। সুতরাং সংসারদুঃখ হতে মুক্তিলাভও জ্ঞানিগণের শ্রীভগবানের ব্রহ্মস্বরূপের সঙ্গে সম্বন্ধের হেতু।চিত্তের চাঞ্চল্য বশতঃ নানারকম বিষয়াভিনিবেশ বৈষয়িক সুখে দুঃখে মুহ্যমান হয়ে যখন চিত্তের চাঞ্চল্য এই সংসারদুঃখের হেতু বলে নিশ্চিত হয়, তখন যম নিয়মাদি অষ্টাঙ্গযোগ সাধনায় চিত্তের একাগ্রতা সম্পাদন করে যোগীগণ পরমাত্মার সাক্ষাৎকার লাভ করে কৃতার্থ হতে চেষ্টা করেন। সুতরাং চিত্তচাঞ্চল্যজনিত সংসারদুঃখ হতে মুক্তিলাভ করাই যোগীগণের পরমাত্মার সঙ্গে সম্বন্ধের হেতু। স্বর্গাদি ভোগবাসনার তাড়নায় অস্থির হয়ে কর্মীগণ কর্মযোগানুষ্ঠানে কর্মফলদাতা ভগবানের প্রীতবিধান করেন এবং তাঁর দেওয়া কর্মফল লাভ করে তাঁরই ভোগে মত্ত হয়ে যান। সুতরাং স্বর্গাদি ভোগবাসনায় কর্মীগণের ভগবানের সহিত সম্বন্ধের হেতু। কিন্তু প্রেমবান ভক্তের ভগবানের সহিত যে সম্বন্ধ, তাতে সংসারমুক্তি কিম্বা স্বর্গাদি ভোগবাসনার সম্বন্ধেগন্ধলেশমাত্রও থাকে না,তাঁরা সবরকম কামনা কিম্বা আত্মস্বার্থচিন্তায় জলাঞ্জলি দিয়ে কেবলমাত্র ভগবানের সেবা করবার জন্যই ভগবানের সঙ্গে সম্বন্ধ করে থাকেন।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু তথ্য ও তত্ত্ব কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--১৬*
*🍀শ্রীভগবান তাঁদের পুরুষার্থ নহেন,শ্রীভগবানের সেবাই তাঁদের পরম পুরুষার্থ। সেইজন্য তাঁরা ভগবানের সেবার জন্য ভগবানকে পর্য্যন্ত ত্যাগ করতেও কুন্ঠিত হন না। যাতে ভগবানের সেবা সম্পাদন হয়,তাঁরা কায়মনোবাক্যে তারই অনুষ্ঠান করে থাকেন। ভগবানকে ত্যাগ করলে যদি ভগবানের সেবা হয়, তাহলে তাতেও তাঁরা কুন্ঠিত হন না, জ্ঞানী,যোগী কিংবা কর্মিগণের ব্রহ্ম,পরমাত্মা কিংবা কর্মফলদাতা ভগবানকে ত্যাগ করলে,স্বার্থ সিদ্ধি হয় না,সেইজন্য তারা সর্বত্যাগ করে ব্রহ্ম,পরমাত্মা কিম্বা কর্মফলদাতার সঙ্গে সম্বন্ধ করবার জন্যই লালায়িত হন। কিন্তু প্রেমবান ভক্তগণের ভগবানের সহিত যোগ ও বিয়োগ উভয় প্রকারেই ভগবানের সেবা সিদ্ধি হতে পারে।সেইজন্য তাঁরা সেবার প্রয়োজন অনুরূপ কখনও মিলনে, কখনও বা বিরহে ভগবানের সঙ্গে সম্বন্ধ রেখে তাঁর সেবা সম্পাদন করে তারই প্রীতিবিধান করে থাকেন। জ্ঞানী যোগীগণ ব্রহ্ম ও পরমাত্ম সাক্ষাৎকারে আত্মস্বরূপ হারিয়ে ফেলেন ; সুতরাং তাদের আর তখন পৃথী অস্তিত্ব থাকে না, কাজেই তারা আত্মসত্ত্বাশূন্য ঐক্যলাভে ব্রহ্মস্বরূপ হয়েই অবস্থান করেন। কিন্তু প্রেমবান ভক্ত, ভগবানের সেবায় আত্মহারা হলেও তাদের আত্মস্বরূপ লোপ হয় না। কাজেই তারা সেই পরমানন্দ ঘনবিগ্রহকে নিয়ে যতই আত্মবিস্মৃতি হন না কেন, সেবার সময় উপস্থিত হলে তৎক্ষণাৎ তাদের আত্মস্মৃতি ফিরে আসে এবং তারা যথাযোগ্য সেবায় আত্মনিয়োগ করে ভগবানের প্রীতি সম্পাদন করবার জন্য লালায়িত হন।*
*🌻কৃষ্ণজননী যশোদা,কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে তাকে স্তনদান এবং তার স্তনদানের আনন্দে হাসিভরা মুখ নিরীক্ষণ ও অঙ্গে হাত বুলাতে বুলাতে অপ্রাকৃত পরমানন্দে বিভোর হয়েছিলেন, কিন্তু তার যখন সেবার সময় উপস্থিত হল, তখন তার সেই বিভোর ভারে অবসান হয়ে গেল, তিনি তৎক্ষণাৎ তৎকালীন সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন। প্রেমফান ভক্ত কখনও সেবা ভুলে আত্মহারা হন না, তারা সেবারসে মত্ত হয়ে সেবায়ই আত্মহারা হন। মা যশোদা যে কৃষ্ণকে ছেড়ে উনানের দুধ রক্ষা করবার জন্য চলে গেলেন, তাহাও কৃষ্ণের সেবা ছাড়া অন্য কিছুই নয়।এই দুধ, মা যশোদা কৃষ্ণকে খাওয়াবেন বলেই উনানে গরম করতে রেখেছিলেন। আগুনের তাপে উথলিয়ে উঠলে পড়ে যাবে, কৃষ্ণের খাওয়া হবে না, এইজন্য তিনি কৃষ্ণকে পরিত্যাগ করেও দুধ রক্ষা করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।যাইহোক,প্রেমাধীন শ্রীকৃষ্ণেরও বাৎসল্যপ্রেমময়ী যশোদার স্তন-ক্ষরিত বাৎসল্য পীযূষধারায় বাধা পড়ায় যে কি দুঃখ হয়েছিল,তাহাও আমরা যখন ক্ষুধাতুর হয়ে ভোজন করতে আরম্ভ করি, তখন যদি হঠাৎ ভোজনে বাধা পড়ে, কিম্বা কোনও কাম্যবস্তু পেয়ে তা ভোগ করতে আরম্ভ করলে হঠাৎ যদি অতৃপ্ত অবস্থায় তাতে বাধা পড়ে, তাহলে আমাদের যে দুঃখ হয়, তা মনে করলে মা যশোদার স্তনপানে হঠাৎ বাধা পড়ায় কৃষ্ণের কি রকম মানসিক অবস্থা হয়েছিল, তারও কিছু ইঙ্গিত পেতে পারি।*
*🍀বাৎসল্য-প্রেমবতী জননীগণের পুত্র অপেক্ষাও পুত্রের খাদ্যবস্তুতেও বেশী আগ্রহ দেখা যায়। পুত্রের খাদ্যবস্তুই পুত্রকে লালনপালন করার শ্রেষ্ঠ উপকরণ, কিন্তু অবোধ শিশুপুত্র তা বোঝে না,সে সর্বদা জননীর কোলেই থাকতে ভালোবাসে ; কিন্তু জননী কেবলমাত্র পুত্রকে কোলে করেই বসে থাকেন না, তিনি পুত্রকে কাঁদিয়েও,তার খাদ্য তৈরী এবং রক্ষা করে থাকেন। "তদ্ভক্ষ্যপেয়াদিযু কাপ্যপেক্ষতা, যয়া পুনঃ সোহপি সমেত্যুপেক্ষতাং। প্রেম্নো বিচিত্রা পরিপাট্যুদীরিতা,ব্যোধ্যা তথা প্রেমবতীভিরেব ষা"।। (সারার্থদর্শিনী)----কৃষ্ণের ভক্ষ্যপেয়াদি বস্তুতে মা যশোদার এমনই কিছু অপেক্ষা আছে,যার জন্য তিনি কৃষ্ণকেও উপেক্ষা করতে কুন্ঠিত হন না। মা যশোদার এই পরমাদ্ভুত ব্যবহার বাৎসল্য-প্রেমেরই বিচিত্র পরিপাটি বিশেষ। ইহা কেবল বাৎসল্য প্রেমবতী জননীগনেরই বুদ্ধিগম্য হতে পারে, তদ্ভিন্ন অন্য কেউ এই বিচিত্র ব্যবহারের কোন তত্ত্বই বুঝতে সক্ষম হবেন না।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--১৭*
*🌻যাইহোক, গোপালের মাতৃদুগ্ধ পান করে অতৃপ্ত হবার ফলে তিনি ক্রোধান্বিত হলেন এবং সামনে মা যশোদার রাখা দধিভান্ড দেখে তা ভাঙ্গবার জন্য মনে মনে ভাবলেন। কি দিয়ে ভাঙ্গবেন? হঠাৎ দেখলেন শিলাপুত্র (নোড়া), সেই নোড়া দিয়ে দধিভান্ডের গায়ে আঘাত করতে লাগলেন, আঘাত করতে করতে সেই ভান্ডে ছোট ছিদ্র হয়ে গেল এবং সেই ছিদ্রপথে প্রবলবেগে দধিধারা বাহির হয়ে যশোদানন্দনের চরণদ্বয়সিক্ত করে ভূমি প্লাবিত করল। এইভাবে দধিভান্ড ভেঙ্গে গোপাল আরও ভীত হয়ে পড়লেন, তিনি মনে ভাবলেন, "আজ আর মায়ের হাতে রক্ষা নাই"। তখন তাড়াতাড়ি নিকটবর্তী নবনীভান্ড হতে নবনী নিয়ে তিনি নিভৃত ঘরের ভিতরে পলায়ন করলেন এবং সেখানে গিয়ে সেই সদ্যোজাত নবনী ভোজন করতে লাগলেন।যশোদা এসে দেখেন দধিভান্ড ভাঙ্গা, নবনীভান্ড শূন্য,দধি-ধারায় গৃহাঙ্গন প্লাবিত এবং সেই গোপালও নেই। গোপাল মনে মনে ভীষণ ভয় পেলেন, মা যদি এখন আমায় দেখেন তাহলে আমাকে তিরস্কার করবে বলে সে ভীত হয়ে অন্য স্থানে পলায়ন করলেন। দধিভান্ড ভাঙ্গার পর গোপালের মনে ক্রোধের পরিবর্তে ভয়ের সঞ্চার হল। এবং নিজেকে আত্মগোপন করবার জন্য ব্যগ্র হয়ে পড়লেন।তখন নিঃশব্দে পদসঞ্চারে কিছুদূর এগিয়ে দেখলেন-- নবনীত গৃহের দ্বার অর্গলমুক্ত বা খোলা অবস্থায় আছে ; তিনি তখন সেই গৃহে প্রবেশ করে সামনের দরজার কবাট লাগিয়ে দিয়ে পেছনের দরজা খুলে দিলেন। সেই গৃহে প্রচুর নবনীভান্ড সংরক্ষিত আছে, কিন্তু সমস্ত ভান্ডই শিকায় ঝুলান আছে বলে গোপাল তার একটিও স্পর্শ করতে পারলেন না। তখন তিনি গৃহকোণ হতে একটি উদূখল অতি কষ্টে ঘরের মধ্যস্থলে সরিয়ে এনে তা রাখলেন এবং তার উপরে উঠে বসলেন ; তখন আর গোপালের---শিকায় ঝুলান নবনীভান্ড গ্রহণ করতে কিছুমাত্র অসুবিধা হল না। তিনি শিকা হতে নবনীভান্ড নামিয়ে তা হতে নবনী নিয়ে পরমানন্দে ভোজন করতে লাগলেন এবং মা যশোদার আসছেন কিনা বারে বারে দরজার দিকে চঞ্চল নয়নে দেখতে লাগলেন।*
*🍀গোপাল নবনীগৃহে প্রবেশ করে পেছনের দরজা খুললেই তাঁর কমনীয় বাল্যমূর্তি দেখে পরমানন্দে মত্ত হয়ে নিকটবর্তী বৃক্ষশাখা হতে দলে দলে বানর এসে দরজার বাইরে প্রাচীর বেষ্টিত নিভৃত অঙ্গনে বসে অনিমিষনয়নে গোপালের বাল্যখেলামাধুরী দেখতে লাগল। যেন মনে হল গোপালের সঙ্গে তাদের কতকালের পুরাতন পরিচয় এবং কতকাল পরে আবার দেখা হল ; তারা যেন কতদিনের হারানিধি ফিরে পেয়েছে,তাই তারা আনন্দে মত্ত হয়ে গোপালের সামনে এসে বসিল।গোপালও তাদেরকে দেখে পরমানন্দবিজড়িত মৃদুমন্দ মধুর রবে বললেন--- তোমরা এসেছ,এই নাও,পেট ভরে নবনী খাও।এই বলে তিনি শিকা হতে নবনীভান্ড নিয়ে কিছু ভোজন করে অবশিষ্ট নবনীপূর্ণ ভান্ড নিয়ে বানরগণকে দিতে লাগলেন।এইভাবে তিনি কত কত নবনীভান্ড যে বানরগণকে দিলেন তার আর পরিমাণ নাই।বানরগণকে এইভাবে আদর করে পরমাগ্রহে নবনী খাওয়ান দেখে মনে হয়,যেন ত্রেতাযুগের ঋণশোধ হচ্ছে।সে লীলায় তিনি বানরগণকে মনোসুখে হাতে করে কিছুই খাওয়াতে পারেন নাই,তাই বুঝি এবার মনের সাধ মিটিয়ে খাওয়াচ্ছেন।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--১৮*
*🌻সত্যই বাৎসল্যপ্রেমময়ী মা যশোদা, তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন, আমার সেই চঞ্চল ছেলে বাল্যচপল্য বশত দধিভান্ডভেঙ্গে ফেলেছে এবং তার দুগ্ধপানে ক্ষুধার নিবৃত্তি না হওয়ায় সে নবনীভান্ড হতে নবনী নিয়ে ভোজন করেছে, কিন্তু আমি তাকে তিরস্কার করব মনে করে সে ভয়ে পালিয়ে গেছে। এখনও সূর্য্যোদয় হয় নাই, সুতরাং ঘরের মধ্যে এখনও অন্ধকার আছে ; আমার ভয়ে লুকাতে গিয়ে তাড়াতাড়ি ও অসাবধানতা বশত সেই অবোধ বালকের নবনী অপেক্ষাও সুকোমল অঙ্গে আঘাত লাগে নাই তো ? অন্ধকার ঘরে লুকাতে গিয়ে যদি কোনপ্রকারে ভয় পায়, তাহলেও তো তার কোন প্রকার ব্যাধি হতে পারে। কিন্তু তাকে কোথায় খোঁজ করব? রাজভবনের অসংখ্য ঘরের মধ্যে সে কোন ঘরে প্রবেশ করে যে আত্মগোপন করেছে, তা কে আমাকে বলে দিবে ? তাকে ডাকলে কি সে উত্তর দিবে ? হায়, আমি কেমন করে তার খোঁজ পাব? মা যশোদা এইভাবে কৃষ্ণের খোঁজের জন্য ব্যাকুল হলে কৃষ্ণের দধিসিক্ত ছোট ছোট চরণচিহ্নগুলি হঠাৎ তাঁর নয়নগোচর হল।চরণচিহ্ন দেখে মা বুঝতে পারলেন যে, এই চিহ্নের ধার ধরে গেলে কৃষ্ণের সন্ধান পাওয়া যাবে। অতঃপর দেখলেন কৃষ্ণ নবনীঘরে প্রবেশ করেছে।মা যশোদা মনে করলেন,সর্বনাশ হয়েছে ! এই ঘরে শ্রীনারায়ণসেবা, অতিথিসেবা এবং ইন্দ্রযাগের জন্য নবনী রাখা রয়েছে। আমার ছেলে যদি উচ্ছিষ্ট হাতে স্পর্শ করে, তাহলে তো বড়ই অনর্থ ঘটবে। মা যশোদা নিঃশব্দে কবাট খুলে দেখলেন তিনি যা ভেবেছেন,তাইই হয়েছে।কৃষ্ণ উদূখলের উপর দাঁড়িয়ে শিকা হতে নবনী ভান্ড নিয়ে তা হতে কিঞ্চিৎ ভোজন করে অবশিষ্ট বানরগণকে দিচ্ছে তারা পরমানন্দে তা ভোজন করছে। এই ব্যাপার দেখে মা যশোদার কিঞ্চিৎ ক্রোধসঞ্চার হল, তিনি মনে মনে ভাবলেন, আমার পুত্র দিন দিন অতি অশান্তপ্রকৃতি হয়ে উঠছে ; সুতরাং ইহাকে এখন হতেই শাসন করা কর্তব্য। প্রতিবাসিনী গোপীগণ অনেক দিন আমাকে বলেছে যে, আমার পুত্র তাদের ঘরে ঢুকে নবনী চুরি করে খায় এবং বানরগণকে খাওয়ায়, কিন্তু তাদের কথায় আমার বিশ্বাস হত না, মনে করতাম, তারা পরিহাস করছে ; কিন্তু আমি স্বচক্ষেই তো তাইই দেখছি, সুতরাং এখন আর অবিশ্বাসের কিছুই নাই।এই কথা মনে করে মা যশোদা সেই ঘরেরই দরজার পার্শ্বে একটি মণিময়ী সোনার যষ্টি বা লাঠি রাখা ছিল,সেটি হাতে নিলেন। (এই যষ্টি নিয়ে কৃষ্ণই খেলা করেন এবং তিনিই খেলতে খেলতে এই স্থানে ইহা ফেলে গিয়েছিল)।মা হাতে লাঠি নিয়ে কাপড়ের আঁচলে গোপন করলেন এবং ধীরে ধীরে উদূখলের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণের পেছনদিকে এসে তাকে ধরবেন মনে করে শনৈঃ শনৈঃ বা ধীরে ধীরে বা আস্তে আস্তে এগোতে লাগলেন।মা যশোদাকে দেখেই ভয়ে ভীত হয়ে ঘরের মধ্যে থাকা বানরগণ পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল।তা দেখে গোপাল চমকে উঠে পেছনে মাকে দেখলেন, মায়ের হাতে লাঠি দেখে ভয়ে অধীর হয়ে পড়লেন এবং কালবিলম্ব না করে উদূখল হতে নেমে দ্রুতপদে পলায়ন করলেন।তাতে মা যশোদা গর্জন করে উঠলেন--- ওরে দুষ্ট ছেলে ! তুই কি আমার হাত থেকে রক্ষা পাবি ? যেখানে যাবি,সেখান হতেই জোরকরে তোকে ধরে আজ তোর এই অশান্ত ভাবের যথাযথ শাস্তি দিব। এই বলে বাৎসল্যপ্রেমবতী মা যশোদা "অখিলব্রহ্মান্ডপতি" শ্রীকৃষ্ণের পেছন পেছন ধাবিত হলেন।*
*🌹নিত্যসিদ্ধ বাৎসল্যপ্রেমপয়োনিধি মা যশোদা, তাঁর অপার বাৎসল্যপ্রেমবলে সর্বকারণ-কারণ শ্রীভগবানের সহিত যে সমস্ত ব্যবহার করে থাকেন, তা ব্রহ্মাদিরও অগম্য। তিনি সর্বাধার ভগবানকে কোলে ধারণ করেন,সকলের স্তবনীয় ভগবানকে ভর্ৎসনা করেন, সর্বলোকপালক ভগবানকে লালনপালন করেন,সর্বারাধ্য ভগবানকে নিজগর্ভজাত বালক বুদ্ধিতে অতি হীন জ্ঞান করেন ; তাঁর প্রেম এবং প্রেমোচিত ব্যবহার কেবলমাত্র তাঁরই পক্ষে সম্ভবপর ! জ্ঞানীগণ বহুজন্ম ব্যাপী তীব্রসাধনা করেও যে ভগবানের সর্বব্যাপিচিৎ-সত্তার অনুসন্ধান পান না, যোগীগণ বহুজন্মব্যাপী যোগসাধনাতেও যাঁর সর্বজীবহৃদয়স্থ অন্তর্য্যামী-সত্তার সাক্ষাৎকার লাভ করতে পারেন না, আর মা যশোদা তাঁরই লীলাবিগ্রহ নিয়ে কত খেলাই না খেলছেন ! শ্রীভগবান ব্রহ্ম ও পরমাত্মারূপে নিশ্চলভাবেই অবস্থান করেন, তবুও তাঁকে কেউ ধরতে পারেন না ; কিন্তু যশোদার বাৎসল্যপ্রেমে গড়া সচ্চিদানন্দঘনবিগ্রহ কখনও নিশ্চলভাবে অবস্থান করেন না, তিনি নিত্য নব নব লীলার তরঙ্গে সর্বদাই চঞ্চল, তথাপি তাঁর বাৎসল্যপ্রেমবতী যশোদার হাত এড়াবার সাধ্য নেই। তিনি যদি লীলাবেশে লুকায়িত হন মা যশোদা তাঁকে খুঁজে বাহির করেন ; তিনি যদি পলায়ন করেন, মা যশোদা তাঁকে ধরবার জন্য পেছনে ধাবিত হন। ধন্য তাঁর বাৎসল্যপ্রেমের অসমোর্দ্ধ মহিমা।*
*ক্রমাগত* *ভাগবতীয় ব্যাখ্যা*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*🙏জয় শ্রীরাধা-দামোদর, দামবন্ধন লীলার কিছু কথন।*
*পর্ব-সংখ্যা--১৯*
*🌻মায়ের হাতে ধরা পড়বার ভয়ে যশোদানন্দন দ্রুতবেগে নন্দালয়ের অন্তঃপুরাঙ্গনে ধাবিত হলে যশোদাও তাঁকে ধরবার জন্য পেছন পেছন ধাবিত হলেন ও বারে বারে বলতে লাগলেন,--- ওরে দুষ্ট ছেলে! আজ আমার হাতে তোর নিস্তার নেই, তুই যেখানে যাবি, আমি সেখানে গিয়েই তোকে ধরে আনব এবং তোর কৃত কর্মের উচিত শাস্তি দিব।যশোদানন্দন তাঁর ক্রোধাবিষ্টা জননীর ভয়ে ভীত হয়ে দ্রুতবেগে দৌড়ে পালাচ্ছেন, মা বয়স্কা তাঁর সঙ্গে কি তিনি দৌড়াতে পারেন, তবুও পেছন পেছন ধাবিত হয়ে তাঁকে ধরি ধরি করেও ধরতে পারেন না। চঞ্চল কৃষ্ণের পেছনে ধাবিত হওয়ার ফলে মা যশোদার কেশপাশ আলুলায়িত হয়ে তা হতে পেছনদিকে কুসুম বর্ষণ হতে লাগল।ইহাতে মনে হয় যেন, কৃষ্ণের পেছনে ধাবিতা যশোদার চরণপূজনের অভিলাষে তাঁর মাথার কেশপাশ কুসুমাঞ্জলি প্রদান করছে। যাইহোক, কিছুতেই কৃষ্ণকে ধরতে পারছেন না। মায়ের ক্রোধাবস্থা দেখে কৃষ্ণ এবার রাজসভা প্রাঙ্গণের দিকে অগ্রসর হলেন,তাঁর মনের ভাব এই যে, তিনি রাজসভায় গিয়ে উপস্থিত হলে তাঁর জননী সেখানে যেতে পারবেন না, তিনিও তাঁর কোপ হতে রক্ষা পাবেন ; কিন্তু সেদিন নন্দ প্রভৃতি সমস্ত গোপগণ ইন্দ্র যাগ অনুষ্ঠানের জন্য গোবর্দ্ধনে গিয়েছেন বলে রাজসভা যে জনশূন্য, তা গোপালের জানা নেই।*
*🌻তিনি গিয়ে দেখলেন, রাজসভা জনশূন্য এবং জননীও খুব কাছে প্রায়, এতে কৃষ্ণ একেবারে ভয়ে অধীর হয়ে উঠলেন এবং রাজসভা হতে রাজপথের দিকে অগ্রসর হলেন।যশোদাও তাঁকে ধরবার জন্য পেছন পেছন ছুটে চলেছেন, অমনি তাঁর দৃষ্টি কৃষ্ণের চরণতলে পড়িল ; তিনি দেখলেন, নবনী অপেক্ষাও কোমল কৃষ্ণের চরণতল ব্রজের কঠিন মৃত্তিকাস্পর্শে বড়ই ব্যথিত হয়েছে ; বাৎসল্যপ্রেমবতী যশোদা আর স্থির থাকতে পারলেন না,তাঁর বাৎসল্য প্রেমবিভাবিত হৃদয় একেবারে ব্যাকুল হয়ে পড়িল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, হায় ! হায় ! আমি তো ভাল কাজ করি নাই, আমি পশ্চাৎ ধাবিত হয়েছি বলে আমার ভয়ে আমার কোটি প্রাণপ্রতিম কৃষ্ণ বেগে পলায়ন করছে এবং ব্রজের কঠিন মাটি স্পর্শে তার কোমল চরণ ব্যথিত হচ্ছে।হায়! হায়! আমি কেন এমন কাজ করলাম, কেন এমন কুবুদ্ধির উদয় হল, আমার জন্যই আমার নয়নমণির, প্রাণের প্রাণ নীলমণি ভীত, পলায়িত এবং চরণে ব্যথিত হয়েছে। হায়! আমি কেন এমন অন্যায় কাজ করলাম! কৃষ্ণের চরণে বেদনা লেগেছে এই আশঙ্কায় যেমন যশোদার হৃদয় এইভাবে ব্যথিত হল, অমনি দেখতে দেখতে কৃষ্ণের গতি ধীর হয়ে গেল। যশোদা তখন তাড়াতাড়ি এসে বাম হাতে কৃষ্ণের ডান হাত ধরে নিলেন।*
*যশোদা যতক্ষণ কৃষ্ণকে ধরবার জন্য আত্মশক্তিতে নির্ভর করে তাঁর পেছন পেছন ধাবিত হচ্ছিলেন, ততক্ষণ কৃষ্ণ তাঁর অধরাই ছিলেন, কিন্তু যেমন কৃষ্ণের চরণে ব্যথা লেগেছে বলে তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠিল, তখন আর কৃষ্ণ তাঁর অধরা রইল না, তৎক্ষণাৎ তিনি ধরা পড়ে গেলেন। কৃষ্ণের জন্য প্রাণ না কাঁদলে কেউ কোন দিনই যে কৃষ্ণকে ধরতে পারেন না,তা এই পরমমধুর লীলার ইঙ্গিতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়।*
*ক্রমাগত*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧