শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত👣চরণে👣অসংখ্যকোটি 🙇প্রণাম🙇 ক্লিক করুন 👇

শ্রী মৃন্ময় নন্দী কর্ত্তৃক সকল ভক্ত👣চরণে👣অসংখ্যকোটি 🙇প্রণাম🙇 ক্লিক করুন 👇

বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🔙 পূর্ব লীলা 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬১)💧বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য💧*
               *👥ভাবোল্লাস👥*
             •••••••••••••••••••••••••••
*আজু রজনী হাম, ভাগে পোহাইলুঁ,*
             *পেখলুঁ পিয়া মুখ চন্দা।*
*জীবন যৌবন, সফল করি মানলুঁ,*
           *দশ দিশ ভেল নিরদন্দা।।*
*🍀বিদ‍্যাপতির এই প্রসিদ্ধ পদটি ভাবোল্লাসের পদ বলে উল্লিখিত হয়। ভাবোল্লাস বলতে আমরা বুঝি যে,দীর্ঘ বিরহ যখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে,মন যখন আর কিছুতেই প্রবোধ মানতে চাইছে না, তখন শ্রীরাধিকা অন্তশ্চিত্তে (মনের ভেতরে) মিলন-সুখ অনুভব করে কৃতার্থ হচ্ছেন।দৈহিক মিলনের পরিবর্তে এখানে আত্মিক মিলনই বর্ণনীয়। বিদ‍্যাপতি সুকৌশলে তাই এই আত্মিক মিলন ঘটিয়েছেন। সখি!আমি আজ (গত) রজনী ভাগ‍্যে কাটালাম।কেন না,আমি স্বপ্নে আমার প্রিয়তমের চন্দ্রবদন দেখেছি।দেখে আমি জীবন যৌবন সফল বলে গণ‍্য করলাম। সমস্ত সংশয় কুহেলিকা (কুয়াসা বা অন্ধকারময়) দূর হল এবং দুঃখের ঘনঘটা কেটে গিয়ে দশদিক প্রসন্ন হল।*
*আজু মঝু গেহ, গেহ কলি মানলুঁ,*
      *আজু মঝু দেহ ভেল দেহা।*
*আজু বিহি মোহে,অনুকূল হোয়ল,*
           *টুটল সবহু সন্দেহা।।*
*🌹আজ স্বপ্নে প্রিয়তম এসেছেন,এজন‍্য আমি গৃহ--গৃহ বলে মানলাম--এতদিন এ গৃহ তাঁর বিরহে শ্মশান-সম হয়েছিল। আমার দেহ আজ দেহ বলে মনে করছি--এতদিন দেহের কোনও সার্থকতা ছিল না।*
*সোই কোকিল অব, লাখ ডাকউ,*
        *লাখ উদয় করু চন্দা।*
*পাঁচ বাণ অব, লাখ বাণ হোউ,*
         *মলয় পবন বহু মন্দা।।*
*🌻চন্ডীদাসের পদেও আছে=*
*🌷গগনে উদয় হউক চন্দ।*
*🌷মলয় পবন বহুক মন্দ।।*
*🌷কোকিল আসিয়া করুক গান।*
*🌷ভ্রমরা ধরুক তাহার তান।।*
*👥মিলনে এই সব প্রেমোদ্দীপক উপাদানের প্রয়োজন আছে।এখন মদনের পাঁচ বাণ লক্ষ বাণ হলেও ক্ষতি নাই।*
*🍀বিদ‍্যাপতি এই ভাবোল্লাসের স্রষ্টা বললে বেশী বলা হবে না।বিদ‍্যাপতির উপরি লিখিত পদটি এবং সুপ্রসিদ্ধ "হরি যব আওব গোকুলপুর। ঘরে ঘরে নগরে বাজব জয় তূর "।। অথবা "অঙ্গনে আওব যুব রসিয়া। পলটি চলব হম ঈষৎ হসিয়া।। অথবা "পিয়া যব আওব এ মঝু গেহে। মঙ্গল যতহুঁ করব নিজ দেহে"।।শ্রীরাধিকা মনে মনে এই যে মিলন-মহোৎসবের কল্পনা করে হর্ষোৎফুল্ল হয়ে উঠেছেন, কোথায়ও এর তুলনা আছে বলে আমি জানি না।বৈষ্ণব সাহিত‍্যেও এর তুলনা বেশী নেই। বিদ‍্যাপতি এর প্রবর্তক, এইজন‍্য মনে হয় যে,অন‍্য সকলের পদে বিদ‍্যাপতির মুদ্রাঙ্কই দেখতে পাই।বৈষ্ণব কবিদের মধ্যে দেখা যায় যে,এক এক জন কবি এক এক বিষয়ের রচনায় সিদ্ধ।যেমন চন্ডীদাস পূর্বরাগে,গোবিন্দ দাস অভিসারে,নরোত্তম দাস প্রার্থনায়, বিদ‍্যাপতি প্রার্থনার পদেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলা যায়। কিন্তু তাঁর ভাবোল্লাস পদগুলিতে এমনই একটি অজ্ঞাতপূর্ব বৈশিষ্ট্যের সাক্ষাৎ পাই যে,সমগ্র বৈষ্ণব সাহিত‍্যেও তা দুর্লভ।*
*☘সাহিত‍্যদর্পণে ভাবোল্লাসের কোনও প্রসঙ্গ নাই। উজ্জ্বলনীলমণিতেও দেখেছি বলে মনে হয় না। বিদ‍্যাপতি এই পদগুলিকে কোথায়ও ভাবোল্লাস আখ‍্যা দিয়েছেন কি না তাও জানি না।রাধামোহন ঠাকুরের পদামৃত সমুদ্রে ভাবোল্লাস কথাটির সঙ্গে বোধহয় প্রথম পরিচয় লাভ করা যায়। "ভাবোল্লাস" রসপর্য‍্যায়ে তিনি অনেকগুলো পদ দিয়েছেন।*
*🍁রাধামোহন ঠাকুর যে ভাবে এই পদগুলির অবতারণা করেছেন,তাতে মনে হয় যেন গায়কদের মধ্যে এই নামটি সুপরিচিত ছিল।কেন না, তিনি টীকায় বলেছেন, "অথ ভাবোল্লাস-গান-নির্ব্বাহকং তদ্ ভাবাক্রান্তং শ্রীমদ্ গৌরচন্দ্রং "আজহু শচীসুত " ইত্যাদিনা স্মরতি"। ভাবোল্লাস সম্বন্ধে টীকায় বেশী কিছু নির্দেশ তিনি দেননি।শুখু এই মাত্র বলেছেন, "ভাবোল্লাসোহয়ং ভাবি সমৃদ্ধিমদ্ রসস‍্যাঙ্গভূতত্বাৎ তদ্ রস এবেতি জ্ঞেয়ঃ"। অর্থ‍্যাৎ ভাবী ( ভবিষ্যৎ ) সমৃদ্ধিমান রসের অঙ্গ বলে এটি সেই রস বলেই বুঝতে হবে।সমৃদ্ধি বা সমৃদ্ধিমান সম্ভোগ রসশাস্ত্রের পারিভাষিক শব্দ। "দুর্লভালোকয়োযুনোঃ পারতন্ত্র‍্যাৎ বিযুক্তয়োঃ উজ্জ্বল-নীলমণির এই শ্লোকের ব‍্যাখ‍্যায় শ্রীজীব গোস্বামী তাঁর লোচনরোচনী টীকায় বলেন ; "ঋদ্ধি শব্দস্তাবৎ সম্পন্নতা-বাচকঃ, তত্র সমিত‍্যুপসর্গে আধিক‍্যং মতুপ্ প্রত‍্যয়স‍্য প্রশংসাতিশয়নিত‍্যযোগ প্রত‍্যায়নং তু ততোহপ‍্যধিকং দর্শয়তি"।তাহলে বুঝা যায় যে, সুচির বিরহের পরে যে মিলন হল, তাতে উপভোগ বা আনন্দাতিশয‍্য থাকায় তাকে সমৃদ্ধিমান সম্ভোগ বলে। শ্রীপাদ বিশ্বনাথ চক্রবর্তী তাঁর আনন্দচন্দ্রিকা টীকায় এই কথায় বলেছেন ; "সুদূর প্রবাসবসাৎ বিরহিণোর্যুনোর্নায়িকানায়কয়োঃ•••••• উপভোগ‍াস‍্যাতিরেক আধিক‍্যং স সমৃদ্ধিমান্ সম্ভোগ কীর্ত্ত‍্যতে "। এই সমৃদ্ধিমান সম্বোগ যদি শ্রীরাধামোহন ঠাকুরের "সমৃদ্ধিমদ্ররসঃ" হয়,তবে ভাবোল্লাসের অর্থ দাঁড়ায় যে সুদীর্ঘ বিরহের পর যে মিলন আনন্দ উপভোগের আতিশয‍্য তারই নাম ভাবোল্লাস।*
*🍀বৈষ্ণব সাহিত‍্যে ভাব অনেক জায়গায় প্রণয়ের নামান্তর মাত্র।অতএব ভাবোল্লাস অত‍্যধিক প্রণয়ের আনন্দ উচ্ছ্বাস। এই অর্থ গ্রহণ করলে বিরহের পর মিলনের সমস্ত পদকেই ভাবোল্লাস বলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু অনেকগুলো শ্রেষ্ঠপদে অন‍্যরকম ভাবও দেখা যায়।সেসব পদে কবি কল্পনায় আনন্দ উপভোগ করাচ্ছেন মিলনের পূর্বে।🌹প্রিয় আসবেন, এই স্বপ্ন দেখে শ্রীমতী রাইধনি অধীরা হয়েছেন। তাঁর আগমন-সম্বন্ধিনী আশায় উৎফুল্ল হয়ে উপভোগের ও অভ‍্যর্থনার নানা উপচার মনে মনে রচনা করছেন, অথবা নানা সুলক্ষণ দেখে প্রিয়তমের আগমন সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হয়ে তাঁর সম্বর্দ্ধনার জন্য আয়োজন করছেন। কাকের কর্কশ স্বরও আজ কানে মধু বর্ষণ করছে।কাকের যতই দোষ থাক, ভবিষ‍্যদ্বেত্তা বলে তার খ‍্যাতি আছে।তাই জ্ঞানদাস বলছেন=*
*আজু পরভাতে, কাক কলকলি,*
         *আহার বাটিয়া খায়।*
*বন্ধু আসিবার, নাম সুধাইতে,*
       *উড়িয়া বৈসয়ে তায়।।*
*🍁বিদ‍্যাপতি বলেছেন, কাক,তোমার চঞ্চু সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিব-- যদি বন্ধু আজ আসেন।*
*সোনে চঞ্চু বঁধএ, দেব মোঞে বাঅস,*
    *জঞো পিয়া আওত আজ রে।*
*🌳আরও কত সুলক্ষণ প্রিয়তমের আগমন সূচনা করছে=*
*বামভূজ আঁখি, সঘনে নাচিছে,*
          *হৃদয় উঠিছে সুখ।*
*প্রভাত স্বপন, প্রতীত বচন,*
       *দেখিব পিয়ার মুখ।।*
                                 *(বংশীদাস)*
*🍀হাতের বাসন খসে পড়ছে,দুইজনার মুখে যুগপৎ একই কথা, "বন্ধু আসিবার ঠিকন সুধাইতে" নাগিনী মাথা নাচাচ্ছে, এ সব শুভ লক্ষণ কি কখনও বৃথা হতে পারে?*
*🌷খঞ্জন কমলিনি সঙ্গ।*
*🌷পুলকে পুরয়ে সব অঙ্গ।।*
*🌷বাম নয়ন করু কম্প।*
*🌷সঘনে খসয়ে নিবি-বন্ধ।।জ্ঞানদাস।।*
*🍀খঞ্জনের নৃত্য করা বা দেখা অতীব শুভ লক্ষণ,যদি কমলে (পদ্মের উপরে) খঞ্জনের নৃত্য দর্শন করা যায়,তাহলে আরও শুভ হয়। এ সব লক্ষণ কখনও বিফল হবে না। মাধব নিজ গৃহে আসবে=*
*🌹চিকুর ফুরিছে,বসন খসিছে,*
           *পুলক যৌবন ভার।*
*🌹বাম অঙ্গ আঁখি,সঘনে নাচিছে,*
         *নাচিছে হিয়ার হার।।*
                          *(গোপাল দাস)*
*🍀এরকম ভাবে অনেক কবি ভাবোল্লাসের পদ রচনা করেছেন।একটি লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, এই রসের কোনও প্রসিদ্ধ পদ গোবিন্দ দাস রচনা করেননি। আকস্মিক ভাবোল্লাসে•••••••*
*উলসিত মঝু হিয়া,আজু আওব পিয়া,*
        *দৈবে কহল শুভবাণী।*
*শুভ-সূচক যত,প্রতি অঙ্গে বেকত,*
       *অতএ নিচয় করি মানি।।*
*🌻গোবিন্দ দাসের এই একটি মাত্র পদ আছে। কিন্তু এতেও কিন্তু রসটি সুপরিস্ফুট হয়নি।শ্রীমতী রাধারাণী শুভ-সূচক লক্ষণ প্রতি অঙ্গে পরিব‍্যক্ত দেখে সখীগণকে বলছেন ; তোমরা জায়গায় জায়গায় মঙ্গলকলস স্থাপন করে তার উপরে আম্র-পল্লব বা আমের-শাখা দাও। গ্রহগণককে ডেকে এনে নানা উপহার দাও। সোনার পাত্রে খৈ ভরে চোখের সামনে রাখ।সখীগণ! সুন্দর বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে উলুধ্বনি দাও, আমার প্রাণের প্রাণ হরি আজ নিজগৃহে আসিবেন।*
*🍁ভাবোল্লাসের পদে বিদ‍্যাপতির প্রতিভা কেউ খর্ব করতে পারেননি। কিন্তু এই বিষয়ে তাঁর শ্রেষ্ঠ পদগুলি বঙ্গদেশে ছাড়া অন‍্য কোথায়ও পাওয়া যায় না।মিথিলায় পাওয়া কয়েকটি পদে তার কিছু কিছু ভাব পাওয়া যায় বটে ; কিন্তু বিদ‍্যাপতির খ‍্যাতি রক্ষা করতে তা যথেষ্ট বলে মনে হয় না।প্রিয়তমের আগমন আশায় শ্রীমতী যে মনের কত সাধ ব‍্যক্ত করছেন,তার সংখ্যা নেই= বন্ধু যখন আমার আঙ্গিনায় আসবেন, তখন "পলটি চলব হাম ঈষৎ হসিয়া" একটি তুলির টানে বিরহিণীর আশা উৎফুল্ল হৃদয়ের ছবিটি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠে।প্রিয়তম যখন আমার আলিঙ্গন প্রার্থনা করবেন, তখন=*
*🌷মুখ মোঢ়ি বিহসি বোলব নহি তবহি।*
*🌹তবে তিনি আসিলে তাঁর সর্ব উপচারে অর্চনা করতে হবে।নগরের ঘরে ঘরে জয়-তূর্য‍্য(বাদ‍্য)বাজবে।আমি আর কি দিয়ে তাঁর অভ‍্যর্থনা করব?প্রাণবন্ধুর অভ‍্যর্থনার জন্য কারও কাছে তো প্রার্থনা করতে যেতে পারব না।লজ্জা করে না? আমি আমার নিজের দেহেই সমস্ত উপচার করব।আলপনা দিতে হয়, আমার গলার শুভ্র মোতির মালা আলিম্পন (আলপনা) হবে।মঙ্গল-কলস স্থাপন করতে হয়,আমার কুচযুগল মঙ্গল-কলস হবে। আমার অঙ্গগন্ধ ধূপ, আমার এই রূপশ্রী দীপ, এবং আমার সর্বাত্ম-নিবেদন নৈবেদ‍্য হবে। আর নয়নজলে প্রিয়তমের অভিষেক করব। নিদারুণ বিরহের মধ্যে যখন এই সুরটি বাজে,তখন তা মর্মে গিয়ে প্রবেশ না করে পারে না।বিশেষ করে যখন মনে পড়ে যে এই মরণাধিক বিরহের হয়ত কোনদিন অবসান নাই।*
😭😭😭😭😭😭🌹😭😭😭😭😭😭
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬২)🙏বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🙏*
            *🌹মুরলী-শিক্ষা🌹*
        🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹
*বংশীগানামৃত ধাম,লাবণ‍্যামৃত জন্মস্থান,*
    *যে না হেরে সো চাঁদ বদন।*
*সে নয়নে কিবা কাজ,পড়ু তার মাথে বাজ,*
    *জন্ম তার হৈল অকারণ।।*
 *সখি হে শুন মোর হতবিধি বল।*
*মোর বপু চিত্ত মন, সকল ইন্দ্রিয়গণ,*
     *কৃষ্ণ বিনা সকলই বিফল।।*
                    *(শ্রীচৈতন‍্যচরিতামৃত)*
*🍀শ্রীকৃষ্ণের মুখচন্দ্র মনে হলেই সবার আগে মনে পড়ে তাঁর বাঁশীর গান।মহাপ্রভু তাই আক্ষেপ করে বলেছেন,সেই মুরলীরঞ্জিত বদন যে নয়নে না দিখিল,তার নয়নে কি কাজ?সে নয়নে পড়ুক বাজ।সেই ভুবন মনোমোহন মুখটি সমস্ত লাবণ‍্যের আকরস্থল বা খনি।বিশ্বের যেখানে যা কিছু সুন্দর,সুশ্রী,সুষমামন্ডিত,তার মূল প্রস্রবণ যে ঐ চাঁদ মুখখানি।*
*🌷তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং,*
*🌷তস‍্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।*
*🌻তাই মহাপ্রভু শ্রীমতীর ভাবে বিভাবিত হয়ে খেদ করে বলেছেন যে,শ্রীকৃষ্ণের দর্শন বিনা তাঁর সমস্তই বিফল হল।শ্রীচৈতন‍্য আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীরাধিকার প্রেম আস্বাদন করবার জন্য।বস্তুতঃ বা প্রকৃতপক্ষে শ্রীরাধাকৃষ্ণলীলার দুইটি বস্তু অতুলনীয়।শ্রীকৃষ্ণের রূপের তুলনা নেই,আর শ্রীরাধিকার প্রেমের তুলনা নাই। বৈষ্ণব পদাবলীতে এই রূপ ও প্রেমের উৎকর্ষ অন‍্য সমস্ত বিষয়কে অতিক্রম করে আমাদের বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টি আকর্ষণ করে।রূপ নহিলে প্রেম স্ফূর্তি লাভ করে না।এখানে যত না রূপ,তত না প্রেম।*
*কিয়ে কমল দোলে রে নাটুয়া খঞ্জন পাখী।*
*ঘর সরবস্ব যৌবন দিয়ে শ‍্যামরূপ দেখি।।*
                            *(গোবিন্দ দাস)*
*☘এই রূপ দেখবার জন্য গৃহ, সর্বস্ব যৌবনে তিলাঞ্জলী দিতে হয়।নইলে তো এ রূপ দেখতে পাওয়া যায় না।দেখলেও প্রেমপিপাসা চরিতার্থ হয় না বা মেটে না।যিনি এমন করে রূপ দেখতেন,তাঁর প্রেম কেমন?এমন সর্বহারা প্রেম তো কল্পনা করা যায় না।তাই এই "প্রেমের মধুরিমা" কেমন তা দেখবার জন্য যেন রাধাকৃষ্ণ এক দেহ ধারণ করে "শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দররূপে" আবির্ভূত হয়েছিলেন। শ্রীবৃন্দাবনে ও নীলাচলে স্বরূপদামোদর গোস্বামী প্রমুখ পার্ষদবৃন্দ মহাপ্রভুকে এই অপূর্ব ভাব-সমন্বয়ের মধ্যে নিরীক্ষণ করেছিলেন।আমরা এই কথাগুলি শুনতে শুনত এত অভ‍্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এই সুন্দর কবিত্বপূর্ণ ভাবগম্ভীর কল্পনার গুরুত্ব বা মৌলিকত্ব সম্বন্ধে একবারও চিন্তা করি না। এরকমভাবে অবতার-কল্পনা ভারতীয় অবতারবাদসঙ্কুল ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসে আর কখনও হয়নি।এমন প্রাণস্পর্শীভাবে মানব-দেবতার চরিত্র-চিত্র আর কোথায়ও কোনও যুগে উদঘাটিত হয়নি।শ্রীচৈতন‍্য সাক্ষাৎ রূপ ও প্রেমের মূর্ত বিগ্রহ। একাধারে রূপ ও প্রেমের এরকম অবস্থান আর কোথায়ও কল্পিত হয়েছে বলে শুনি নাই। আমরা সচরাচর এটিই জানি রূপ যেখানে,প্রেম সেখানে নয় ; আবার প্রেম যেখানে রূপ সেখানে নয়।প্রেমের নির্মল দর্পণেই রূপ অম্লান-মধুরিমায় বিকশিত হয়।কাজেই রূপ ও প্রেম পরস্পরের সাহায্যকারী।রূপ হৃদয়ে জাগায় প্রেম, আর প্রেম রূপকে আস্বাদন করে সার্থক করে,ধন‍্য করে,সম্পূর্ণ করে।প্রেম আধার,রূপ আধেয়।উভয়েই পারস্পর্যেই সার্থকতা। কিন্তু বৈষ্ণব মহাজনদের চোখে কে যেন প্রেমের অলৌকিক কাজল পরিয়ে দিয়েছেন,তাঁরা দেখলেন রূপে রসে মাখামাখি হয়ে একজন এসেছেন ; তিনি আধারও বটে,আধেয়ও বটে। আবার ভগবানও বটে, ভক্তও বটে। আস্বাদ‍্যও বটে,আস্বাদিকাও বটে।অপূর্ব পরিকল্পনা!এর তুলনা নাই।*
*🌺প্রেমলম্পট ভগবান বৃষভানুনন্দিনীর প্রেমে মুগ্ধ হলেন।আর শ্রীমতী রাধারাণীর নয়ন-মনভুলে গেল তাঁর আরাধ‍্যের রূপে।শুধু কি রূপে?তাঁর প্রাণমনও উদভ্রান্ত হ'ল বাঁশীর রবে। "কদম্বের বন হইতে কি যে শব্দ আচম্বিতে" কানে প্রবেশ করল,তাতেই তো পাগল করেছে।নবমেঘের গর্জনের মত এ কি অপূর্ব ধ্বনি।বাঁশীর স্বরলহরী ভুবন ভাসিয়ে দিচ্ছে।এ অপূর্ব বাঁশী যার, তার চরণে নিজেকে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছা হয় কেন?মনে হয় এমন মধুর ধ্বনি কখনও শুনেন নাই,আবার মনে হয় এই মধুর ধ্বনি শুনে কেউ প্রাণ ধরে রাখতে পারে কি? এমন আকুল ডাকে কেউ কি তিলার্ধ ধৈর্য্য ধরতে পারে?এ যে তপ্ত ইক্ষু চর্বণের মত উষ্ণ অথচ মধুর ; মুখ জ্বলে যায়, অথচ ত‍্যাগ করবারও সাধ‍্য নাই। এ যেন অমৃত এবং গরল মিশিয়ে কে বাঁশী বাজাচ্ছেন! বাঁশীর গানের এই অপূর্ব কল্পনা একমাত্র বৈষ্ণব কবিতাই দেখতে পাওয়া যায়, যে গানে=*
*🌷যোগী যোগ ভুলে,মুনির ধ‍্যান টলে।*
*🌷ধায় কামিনী কাননে ত‍্যজি কুলে।।*
                              *(নৃসিংহ দেব)*
*🌹যে গানে বনের পশু পাখী মোহিত হয়,যে গানে জলের মকর মীন ভেসে উঠে,মৃত তরু মুঞ্জরে বা জীবিত হয়,যমুনা উজানে বহে, পাষাণ বা পাথর বিগলিত হয়, সে-ই কৃষ্ণের শ্রবণমঙ্গল বাঁশী। শ্রীরাধিকা বলেছেন=*
*🌷বাঁশী,তোর গানে স্থকিত রে, যমুনা নীর উছলই,*
      *মীন ভাসে মুখ চাহই রে।*
*🌷তোর গানে পাষাণ রে*
            *দরবিত,মৃত তরু মুঞ্জরে,*
                 *কাননে পশুপাখী ধাবই রে।।*
*❤এ কি বাঁশী?এ কি সঙ্গীত!যে বাঁশীতে এমন পাগল করে,সে বাঁশী খেয়াতি ছিল,তিনিই নিশ্চয় এই বাংলা পদের রচয়িতা বিদ‍্যাপতি।*
*এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, বিদ‍্যাপতির পদাবলীর মধ্যে শেখর রায় শেখর রচিত অনেক পদ স্থান পেয়েছে।(নরেন্দ্র গুপ্তের সংস্করণ) নগেন্দ্র বাবু বলেন যে বিদ‍্যাপতির উপাধি ছিল কবি শেখর। সুতরাং শেখর ভণিতা যুক্ত পদগুলিকে বিদ‍্যাপতির পদ বলে তিনি ধরে নিয়েছেন। কিন্তু শেখর বা শেখর রায় নামে একজন কবি শ্রীচৈতন‍্যের পরে আবির্ভূত হয়েছিলেন।তাঁর দন্ডাত্মিকা পদাবলীতে শেখর ভণিতার অনেক পদ উদ্ধৃত হয়েছে।এই পদগুলিতে শ্রীচৈতন‍্যের প্রভাব ও তাঁর প্রচারিত প্রেম-ভজনের বৈশিষ্ট্য বতর্মান।কাজেই সেগুলি ব্রজবুলির পদ হলেও বিদ‍্যাপতির কখনও হতে পারে না। চম্পতি নামে আর একজন বৈষ্ণব কবির পদ বিদ‍্যাপতির বলে দাবী করা হচ্ছে।চম্পতি নাকি বিদ‍্যাপতির আর এক নাম ছিল।(নগেন্দ্র গুপ্ত)।দুই একটি পদে চম্পতি বিদ‍্যাপতি এই যুগ্ম নামও দেখা যায়।চম্পতির ব্রজবুলি পদগুলি অতি সুন্দর।সেগুলিকে বিদ‍্যাপতির পদের অন্তর্ভুক্ত করে নিবার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু রাধামোহন ঠাকুর পদামৃত সমুদ্রের টীকায় স্পষ্ট লিখেছেন যে,চম্পতি একজন গৌর ভক্ত, ও প্রতাপরুদ্র নরপতির পরম ভাগবত মহাপাত্র ছিলেন। অনুমান হয় যে তায় চম্পতি,বিদ‍্যাপতি উপাধি লাভ করেছিলেন।*
*🌻বিদ‍্যাপতি কি বৈষ্ণব ছিলেন?*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*নগেন্দ্রবাবু বলেন যে,বিদ‍্যাপতি পরম শৈব ছিলেন, বৈষ্ণব ছিলেন না।মিথিলার সর্বত্র তাঁর রচিত শিব ও গৌরীর গান শুনতে পাওয়া যায়,লোকমুখে রাধা-কৃষ্ণের গীত খুব অল্প। এর উত্তরে বলা যেতে পারে যে,গ্রীয়ার্সন কর্তৃক মিথিলা হতে যে ৮২টি বিদ‍্যাপতির পদ সংগৃহীত হয়েছিল,তার মধ্যে ৭৬টি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক ; একথা নগেন্দ্র বাবুও স্বীকার করেছেন।এছাড়াও এ পর্যন্ত বিদ‍্যাপতির যে সব পদ সংগৃহীত হয়েছে,তার মধ্যে হরগৌরী সম্বন্ধীয় পদ ৫০টির বেশী না,অথচ রাধাকৃষ্ণ পদের সংখ্যা এক হাজারের কম না। এটিই কি বিদ‍্যাপতির বৈষ্ণবধর্ম-প্রীতির ফল না?বিদ‍্যাপতি তরুণ বয়সে কবিত্বের জন্য যে বিসপী গ্রাম দান স্বরূপ পেয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে নবজয়দেব উপাধি পেয়েছিলেন, তা কি হরগৌরী পদাবলীর জন্য। বিদ‍্যাপতি জয়দেবকে অনুসরণ করে পদাবলী রচনা করেছিলেন এবং তাঁর চিত্ত সেই রসে ভরপূর ছিল এ সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নাই। তবে এটিও ঠিক যে ঐ সময়ে শৈবও বৈষ্ণব ধর্মের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না।বিদ‍্যাপতির পদ হতেও তা বুঝা যায় =*
*🌷ভণই বিদ‍্যাপতি বিপরীত বাণী*
*🌷ও নারায়ণ ও শূলপাণি।।*
*🌹আপাততঃ বিপরীত শুনালেও এটি নিশ্চয়, যিনি নারায়ণ তিনি শূলপাণি। হর ও হরির মধ্যে কোনও ভেদ নাই। সুতরাং এটি কোনও ক্রমেই বলা চলে না যে বিদ‍্যাপতি বৈষ্ণব ছিলেন না।বিদ‍্যাপতির প্রার্থনার পদগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে এই ভ্রম বিদূরিত হতে দেরী হবে না।*
*🌷মাধব,বহুত মিনতি করু তোয়*।
*🌷দেই তুলসি তিল, এ দেহ সমর্পিল,*
       *দয়া জনু ছোড়বি মোয়।।*
*🌷হে হরি বন্দো তুয়া পদ-নায়।*
*🌷তুয়াপদ পরিহরি, পাপ পয়োনিধি,*
       *পার হোয়ব কওন উপায়।।*
*🙏এরকম আকুতি ভরা প্রার্থনা ও দৈন‍্য খুবই কম কবির পদেই পাওয়া যায়।*
*🌻এ সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা বিদ‍্যাপতি ঠাকুরের পদাবলীর ভূমিকায় দ্রষ্টব‍্য (দ্বিতীয় সংস্করণ, মুখবন্ধ পৃষ্ঠা ১০)*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙌🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬৩)🌹বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🌹*
        *❤বিদ‍্যাপতির প্রেম❤*
    ❤❤❤❤❤❤❤❤❤
*🍀সাধারণতঃ চন্ডীদাসকেই আমরা প্রেমের কবি বলে জানি।প্রেমের এমন পূজারী বুঝি আর হয়নি!বিদ‍্যাপতিকে আমরা রূপের কবি বলেই জানি।চন্ডীদাসের প্রেম আধ‍্যাত্মিক,বিদ‍্যাপতির প্রেম রূপজ, এমনই ভাবে আমরা এই দুই প্রেমিক কবির মধ্যে তুলনায় সমালোচনা করে থাকি। চন্ডীদাসে প্রেম সম্বন্ধে বেশী কিছু বলবার প্রয়োজন নাই,কারণ প্রেমের তিনি ছিলেন প্রধান সাধক, পিরীতির চারণ কবি।প্রেমের মহিমা তাঁর মত আর কোনও কবিই প্রচার করতে পারেননি।*
*আঁখির নিমিষে, যদি নাহি হেরি,*
        *তবে সে পরাণে মরি।*
*চন্ডীদাস কহে, পরশ-রতন,*
        *গলায় গাঁথিয়া পরি।।*
*❤প্রেম অমূল‍্য নিধি--পরশমণি, মণিমাণিক‍্য হতেও অমূল‍্য।প্রেমাস্পদকে চোখের আড় করতে ইচ্ছা হয় না, পাছে হারিয়ে যায়।তাকে পরশমণির মত হার গেঁথে গলায় পরতে সাধ হয়।মিলনেও শঙ্কা যায় না। তাই=*
*🌷দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।*
*🌷তিল আধ না দেখিলে যায় যে মরিয়া।।*
*🍁এ প্রেমের তুলনা নাই। কবি নিজেই বলছেন=*
*জল বিনু মীন জনু কবহুঁ না জীয়ে।*
*মানুষে এমন প্রেম কোথা না শুনিয়ে।।*
*🌺সত‍্যই মানুষে এমন প্রেম কি হয়?শ্রীপাদ কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী যেন ইঁনারই প্রতিধ্বনি করে বলেছেন=*
*অকৈতব কৃষ্ণ প্রেম,যেন জাম্বুনদ হেম,*
     *হেন প্রেমা নৃলোকে না হয়।*
*যদি তার হয় যোগ,না হয় তার বিয়োগ,*
    *বিয়োগ হৈলে কেহ না জীয়য়।।*
*🍀ভাগ‍্যগুণে যদি এই প্রেম হয়,তাহলে বিচ্ছেদে প্রাণ বাঁচে না। বিদ‍্যাপতিও বলেছেন=*
*🌷এ সখি অপুরুব রীতি।*
*🌷কহাহুঁ ন দেখিঅ অইসনি পিরীতি।।*
*🌳হে সখি!এ এক অপূর্ব ব‍্যাপার, কোথাও এমন পিরীতি দেখিনি। বিদ‍্যাপতির রাধিকা বলছেন প্রিয়তম গাঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ থেকেও চমকিয়ে উঠেন।আমি একটু পাশ ফিরলেই অমনি মান করেছি আশঙ্কায় ব‍্যস্ত-সমস্ত হয়ে উঠেন।*
*🌷ঘুমক আলসে জদি পলটি হোউ পাস।*
*🌷মান ভয়ে মাধব উঠয়ে তরাস*।।
*☘বিদ‍্যাপতি প্রেমে যে উপমা দিয়েছেন,তাহাও প্রেমকে উর্ধ্বস্তরে স্থাপন করেছে।প্রেম অতল স্পর্শ রহস‍্য, অথচ মধুরিমায় অফুরন্ত নির্ঝর।কবিরা নানাভাবে যেমন এর মাধুর্য‍্য বিকশিত করে তুলতে চেয়েছেন,তেমনি এটির রহস‍্য উপমা উৎপ্রেক্ষার দ্বারা বুঝতে চেষ্টা করেছেন।যে প্রেম ইন্দ্রিয়জ সুখের সমতল হতে উর্ধ্বে উঠতে পারে না,তাকে বৈষ্ণবগণ "কাম" বলে বর্ণনা করেছেন।কাম ও প্রেমের মধ্যে যে প্রভেদ তা কবিরাজ গোস্বামী তাঁর প্রসিদ্ধ পয়ারে ব‍্যক্ত করেছেন=*
*🌷আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম।*
*🌷কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-বাঞ্জা ধরে প্রেম নাম।।*
*🌺এই সংজ্ঞা সর্ববাদিসম্মত হোক বা না হোক, এটি স্বীকার করতেই হবে যে,প্রেমের বিভিন্ন স্তরভেদ বৈষ্ণব কবিগণ যেমন বুঝাতে চেয়েছেন এমন আর কোথাও দেখা যায় না।*
*🌻কবিরাজ গোস্বামী যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তার মূল অনুসন্ধানে আমরা আমাদের জাতীয় কবি চন্ডীদাস বিদ‍্যাপতির কাব‍্যে উপনীত হই।চন্ডীদাস যা তাঁর সরল তরল ভাষার তুলিকায় ধরতে পারেননি,তাও উপমার দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন=*
*🌷ভানু কমল বলি সেও হেন নহে*।
*🌷হিমে কমল মরে ভানু সুখে রহে।।*
*🌷চাতক জলদ কহি সে নহে তুলনা।*
*🌷সময় নহিলে সে না দেয় এক কণা।।*
*🌷কুসুমে মধুপ কহি সে নহে তুল*।
*🌷না আইসে ভ্রমর আপনি না যায় ফুল।।*
*❤প্রেমের দুরবগাহ (জটিল) রহস‍্য এখানে আরও জটিল হয়ে উঠেছে,যাতে উপমাও তার নাগাল পেল না।*
*🍁বিদ‍্যাপতি চাতক ও জলদের উপমায় সুন্দর মাধুর্য‍্য পরিবেশন করেছেন=*
*🌷সহজে চাতক,না ছাড়য় বরত,*
           *না বৈসে নদি তীরে।*
*🌷নব জলধর, বরিখন বিনু,*
          *না পিয়ে তাহারি নীরে।।*
*🌺চাতক নবীন জলদের জল ছাড়া অন‍্য জল পান করে না,তার ব্রত ত‍্যাগ করে না।পিপাসায় নদী তীরে গিয়ে বাস করে না। যদি দৈবাৎ (কখনও) তৃষ্ণায় কন্ঠ শুকিয়ে যায়, তবে হয়ত একটু জল পান করতে পারে, কিন্তু চেয়ে থাকে সেই মেঘের পানে।সেইরকম তোমার প্রেমাস্পদ অতি দুঃখে তোমার নাম স্মরণ করে শতধারে অশ্রু বিসর্জন করেন।*
*যদি দৈব বশে, অধিক পিয়াস,*
         *পিয়ব হেরয়ে থোর।*
*তবহুঁ তোহার, নাম সুমরি,*
       *গলয় শতগুণ লোর।।*
❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬৪) বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য*
           *বিদ‍্যাপতির প্রেম*
           ^^^^^^^^^^^^^^^^^^
*❤প্রেম যে শুধু ক্ষুধিত প্রাণের বুভুক্ষা (ভোজন করবার ইচ্ছা) মাত্র নয়, এটি যে জীবনের ব্রত,অচল, অপ্রকম্প(স্থির) তাইই বিদ‍্যাপতি সুন্দর উপমার দ্বারা বুঝিয়েছেন।উপমা-টি প্রসিদ্ধ, কিন্তু এতে যে ভাবের পরিবেশ আছে,তাইই বিদ‍্যাপতির কাব‍্যের বিশিষ্টতা সম্পাদন করেছে।*
*☘বিদ‍্যাপতির আরও একটি প্রচলিত উপমার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেছেন।প্রেমের রহস্যটি উপমানের রহস‍্যে যে গাম্ভীর্য লাভ করেছে,তার তুলনা নাই।◆সখী বলছেন, যে প্রেমের উপমার জন্য সারা বিশ্ব খুঁজলাম, কিন্তু ক্ষীর ও নীরের সম্বন্ধের মত একটিও তুলনা খুঁজে পেলাম না বা দেখলাম না।*
*🌷খোঁজল সকল মহীতল গেহ।*
*🌷খীর নীর সম না হেরল নেহ।।*
*❤প্রেমের এমন উপমাস্থল আর নেই। কারণ যদি কেউ ক্ষীর আগুনেরমুখে স্থাপন করে এবং কাঠি দিয়ে নেড়ে জল "মারে" তাহলে (জলের সঙ্গে দুধের বিয়োগ ঘটলে) ক্ষীর উথলিয়ে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ-ত‍্যাগ করতে চাহে।*
*🌷যব কোই বেরি অনল মুখ আনি।*
*🌷খীর দন্ড দেই নিরসত পানি।।*
*🌷তবহুঁ খীর উমড়ি পড় তাপে।*
*🌷বিরহ বিয়োগ আগ দেই ঝাঁপে।।*
*❤বলুন তো? এমন প্রেম কোথায় আছে?দুগ্ধ যখন উথলিয়ে আগুনে পড়ে,তখন যদি কেউ একটু জল সেই দুধে দেয়,অমনি বিরহবিয়োগ দূরে যায় এবং ক্ষীর শান্ত ভাব ধারণ করে।*
*🌷যব কোই পানি আনি তহি দেল।*
*🌷বিরহ বিয়োগ তবহি দূরে গেল।।*
*🌷ভনই বিদ‍্যপতি এহেন সুনেহ।*
*🌷রাধা মাধব ঐসন নেহ।।*
*❤রাধামাধবের প্রেমের এমন উপমা চন্ডীদাসও দিতে পারেননি।বিরহের পরে মিলনেরও যে চিত্র বিদ‍্যাপতি এঁকেছেন,তা অন‍্য কোনও কবির কাব‍্যে পাই না।*
*🌷রাধা বদন নিরখি রহু কান।*
*🌷ভাবে ভরল অঙ্গ ধরল ধিয়ান।।*
*🌹শ্রীকৃষ্ণ অনিমিষে প্রিয়তমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।অষ্ট সাত্ত্বিক ভাবে (রোমাঞ্চ,স্বেদ,অশ্রু ইত্যাদি ) তাঁর অঙ্গ পূর্ণ হল, তিনি ধ‍্যানে আত্মহারা হলেন।যাকে পাবার জন্য প্রাণে অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, তাকে দেখে বক্ষে ধারণ করবার কথা কৃষ্ণ ভুলে গেলেন। তখন রাইধনি কিন্তু তাঁর মনের কথা বুঝলেন,অমনি বাহু প্রসারিত করে তাঁকে বক্ষে টেনে নিলেন।*
*🌷রাহী বুঝল তনু মরমক বোল।*
*🌷বাহু পসারি কাহ্নু কর কোর।।*
*🌺কীর্তনানন্দের এই পদটিতে বিদ‍্যাপতির ভণিতা নাই। কিন্তু পদটি যে বিদ‍্যাপতির সে সম্বন্ধে সন্দেহ করবার কারণ নাই। আর একটি ভণিতাযুক্ত পদে এটি অপেক্ষাও গভীরতর ভাব রয়েছে।বিরহের পর মিলনে দুজনেই চিত্রপুতুলীর মত স্থির হয়ে রইলেন,সম্ভাবণ(কোন চিন্তা) নাই,আলিঙ্গন নাই--,এ প্রেমের ধারা কেমন কে বলতে পারে!*
*🌷চিত পুতলি জনু রহু দুহু দেহ।*
*🌷ন জানিয় প্রেম কেহন অছু নেহ।।*
*❤এ প্রেমের গতি বুঝা ভার,কাছে থেকেও কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না।*
*🌷এ সখি দেখ দুহুক বিচার।*
*🌷ঠামহি কোই লখই নাহি পার।।*
*🌹শ্রীমতী সখীকে জিজ্ঞাসা করছেন,সখি! আমার শ‍্যাম কোথায়?যাঁর প্রেমে পাগল হয়ে আমার বনে আসিলাম, তিনি কোথায়? আমি যে সমস্ত বৃন্দাবনময় শ‍্যাম দেখছি--, সব কানন ভরে যে শ‍্যারূপ,তাঁর কাছে আমি কেমন করে যাব?তিনি কি আমার সুখদুঃখের কথা বুঝবেন?*
*🌷ধনি কহ কাননময় দেখিয় শ‍্যাম।*
*🌷সে কিয়ে গুনব মঝু পরিণাম।।*
*🌹শ্রীকৃষ্ণের অবস্থাও সেইরকম। তিনি রাইধনিকে দেখেও দেখছেন না।প্রতি তরুতলে শ্রীরাধিকার সেই অপরূপ মূর্তি দেখছেন--,আর যেদিকে নয়ন ফিরাচ্ছেন সে দিকেই রাইরূপ দেখে চমকিয়ে চমকিয়ে উঠছেন=*
*🌷চউকি চউকি দেখি নাগর কান।*
*🌷প্রতি তরুতল দেখ রাই সমান।।*
*❤যে প্রেমে বিশ্বময় প্রেমাস্পদকে নিরীক্ষণ করে বা দেখেন, তা যে ইন্দ্রিয়-গ্রামের অনেক উর্দ্ধে,একথা বলে বুঝাবার বোধহয় প্রয়োজন নাই।*
*🌷স্থাবর জঙ্গম দেখে না দেখে তার মূর্তি।*
*যাঁহা যাঁহা নেত্র পড়ে তাহা কৃষ্ণ স্ফূর্তি।।*
*🍀ইহা পাঠ করবার সময় বিদ‍্যাপতির "কাননময় দেখিয় শ‍্যাম" মনে পড়বেই।*
❤🌹🌻❤🌹🌻❤🌹🌻❤🌹🌻❤
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬৫)🌻বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🌻*
      *👣বিদ‍্যাপতির অভিসার👣*
       ▪▪▪▪▪▪▪▪▪
*🍀পদাবলী সাহিত‍্যে বহু অভিসারের পদ আছে।অলঙ্কার শাস্ত্রে নায়িকা-প্রকরণে যে অষ্ট প্রকার নায়িকার কথা আছে,অভিসারিকা তাদের মধ্যে অন‍্যতমা। শ্রীবিশ্বনাথ বলেন=*
*🌷অভিসারয়তে কান্তং যা মন্মথ-বশংবদা।*
*🌷স্বয়ং বাভিসরত‍্যেষা ধীরৈরুক্তাভিসারিকা।।*
                            *(সাহিত‍্য দর্পণ)*
*🍀অর্থ‍্যাৎ অভিসারিকা দুই প্রকার=যে নায়িকা মন্মথবশীভূতা হয়ে কান্তকে নিজের কাছে আনয়ন করে এবং যে নায়িকা নিজেই কান্তের কাছে গমন করে।শ্রীপাদ রূপ গোস্বামীও ঐ দুই প্রকার অভিসারিকার কথায় বলেছেন=*
*🌷যাভিসারয়তে কান্তং স্বয়ং বাভিসরত‍্যপি।*
                    *(উজ্জ্বল নীলমণি)*
*🍁কিন্তু পদাবলীতে দ্বিতীয় প্রকার অভিসারিকার বর্ণনাই বেশীর ভাগে পাওয়া যায়।অমরকোষেও এই প্রকার অভিসারিকার কথায় বলা হয়েছে =*
*🌷কান্তার্থিনী তু যা যাতি সংকেতং সাহভিসারিকা।*
*☘সংস্কৃত কাব‍্যে স্বয়ং অভিসারিণীর উদাহরণটি উপভোগ‍্য ঃ--*
*🌷উৎক্ষিপ্তং করকঙ্কণদ্বয়মিদং বদ্ধা দৃঢ়ং মেখলা,*
*🌷যত্নেন প্রতিপাদিতা মুখরয়োমঞ্জীরয়োর্মূকতা।*
*🌷আরব্ধে রভসান্ময়া প্রিয়সখি! ক্রীড়াভিসারোৎসবে,*
*🌷চন্ডলস্তিমিরাবগুন্ঠনপটক্ষেপং বিধত্তে বিধুঃ।।*
                            *(সাহিত‍্য দর্পণ)*
*🌻মত মুরলী সঙ্কেতে আহ্বান করে অন‍্য রমণীর সহিত নিশি যাপন করিলে,অতএব আর এমন পিরীতিতে কাজ নাই।*
*🌷ধিক রহু মাধব তোহারি সোহাগ।*
*🌷ধিক রহু যো ধনি তোহে অনুরাগ।।*
*🌷চলহ কপট শঠ না কর বেয়াজ।*
*🌷কৈতব বচনে অবহু কিয়ে কাজ।।*
                       *(বলরাম দাস)*
*🍀যাঁরা আধ‍্যাত্মিক ভাবের সন্ধানী,তাঁরা ভক্ত ভগবানের মধ্যে এই মান-অভিমানের পালা দেখতে পান।ভক্ত ভগবানকে অনন‍্যশরণ হয়ে ভজনা করেন। কিন্তু ভগবান তো একের একান্ত বশীভূত হতে পারেন না।কাব‍্যের ভাষায়,রসের ভাষায় তাই ভগবানকে বহুবল্লভ বলা হয়।*
*🍁বৈষ্ণব কবিতায় কাব‍্যরসই মূলত আস্বাদ‍্য, আধ‍্যাত্মিকভাব তার অনুগামী।আধ‍্যাত্মিক অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দিলে কাব‍্যরসের অনুপম মাধুর্য‍্য হারিয়ে ফেলবার সম্ভাবনা আছে। আহার করবার সময় যেমন আস্বাদনের দিকেই বেশী মনোযোগ থাকে,মধুর অম্ল প্রভৃতি বিচিত্র রসের পরিবেশনে যেমন আহার্য‍্য রুচিকর হয়ে উঠে এবং ক্ষুধার নিবৃত্তি তার অবশ‍্যম্ভাবী ফল, বৈষ্ণব কবিতা সম্বন্ধেও আমার বোধ হয় কবিদের সেরকম অভিসন্ধি দেখা যায়।আস্বাদনের জন্যই রসপারিপাট‍্য, সেই জন্যই এই গীতি-কবিতা ভক্ত-অভক্ত সকলের পক্ষে চিরন্তন আস্বাদ‍্য হয়ে রয়েছে। যাইহোক,এই খন্ডিতা-রস বৈষ্ণব কবিগণ কিভাবে আস্বাদন করেছেন, তাইই আলোচনা করা যাক। বিদ‍্যাপতির খন্ডিতার অনেকগুলো পদ আছে,যথেচ্ছভাবে দুই একটি উদ্ধৃত করছি।*
*🌷সহস রমণী সোঁ ভরল তোহর হিয়,*
            *করু তনি পরসি ন ত‍্যাগে।*
*🌷সকল গোকুল জনি সে পুনমতি ধনি,*
            *কি কহব তহ্নিক ভাগে।।*
*🌷পদ-জাবক হৃদয় ভিন অছ,*
             *অরু করজ খত তাহে।*
*🌷জাহি যুবতি সঙ্গে রয়নি গমৌলহ,*
             *ততহি পলটি বরু জাহে।।*
                            *(তালপত্রের পুঁথি)*
*🍀তোমার হৃদয় সহস্র রমণী দ্বারা পূর্ণ। (কিন্তু) তার স্পর্শ ত‍্যাগ করিও না।গোকুলে সব নারীর অপেক্ষা সেই রমণী পুণ‍্যবতী,তার ভাগ‍্যের কথা কি বলব? পদের অলক্তকরাগ এবং হৃদয়ে নখরেখার দ্বারা সে কর্জখত লেখিয়ে নিয়েছে।যে রমণীর সঙ্গে রজনী কাটালে বরং তার কাছেই ফিরে যাও।তোমার-----*
*🌷প্রতি অঙ্গে রতি চিন বেকত হোয়।*
*🌷করতলে চাঁদ ধপাবয় কোয়।।*
                           *(কীর্তনানন্দ গ্রন্থ )*
*🌹চন্ডীদাসের অনবদ‍্য পদ=*
*🌷ভাল হইল আরে বন্ধু আইলা সকালে।*
*🌷প্রভাতে দেখিলাম মুখ দিন যাবে ভালে।।*
*🌺কোনও কোনও বিষয়ে এই পদটির তুলনা বৈষ্ণব সাহিত‍্যে নাই। শ্রীকৃষ্ণ প্রভাতে সঙ্কেত-কুঞ্জে এসেছেন, তাঁর নয়ন অর্ধ নিমীলিত নিশি জাগরণের ফলে,নিশি জাগার ফলে তাঁর চোখ আধ ঘুম ভাব দেখাচ্ছে।বক্ষে যাবকলেখা (আলতারদাগ) ও খর নখর-ক্ষত। এ অবস্থায় নায়িকার অত‍্যন্ত ক্রোধ হওয়াই স্বাভাবিক কিন্তু বাইরে ক্রোধ প্রকাশ হলে, চোখের জলে দৈন‍্য প্রকাশ পেলে,পরাভবের গ্লানি স্বীকার করতে হয়। কাজেই তিনি বক্রোক্তির সাহায্যে মনোভাব গোপন করতে চেষ্টা করছেন।এরকম নায়িকাকে "ধীরা মধ‍্যা" খন্ডিতা বলে।সাপরাধ নায়ককে হেসে হেসে তীব্র শ্লেষোক্তির দ্বারা যে নায়িকা কষ্টদান করে তাকে ধীরামধ‍্যা বলে।যে নায়িকা ঐরকম অবস্থায় কেঁদে কেটে নায়কের সন্তাপ উৎপাদন করে,তাকেও বলে ধীরামধ‍্যা, আর যে নায়িকা কটুক্তির দ্বারা নায়কের মনস্তাত (মনোদুঃখ)দেয় তাকে মধ‍্যা অধীরা বলে। বক্রোক্তির অর্থ=*
*অন‍্যন‍্যান‍্যর্থকং বাক‍্যমন‍্যথা যোজয়েদ্ যদি।*
*অন‍্যঃ শ্লেষেণ কাক্কা বা সা বক্রোক্তিস্ততো দ্বিধা।।*
*🌻🌻আগামী পর্বে ব‍্যাখ‍্যা।*
🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦜🦚🦚🦚🦚🦚🦚
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬৬)⚪বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য⚪*
           *বিদ‍্যাপতির অভিসার*
                    *খন্ডিতা*
          ☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
*🍀যিনি কথা বলছেন,তাঁর কথা যদি বাহ‍্যতঃ এক অর্থ বহন করে আর অন‍্য অর্থ বক্তার অভিপ্রেত হয়, তাহলে তাকে বক্রোক্তি অলঙ্কার বলে।*
*🌺শ্লেষপূর্ণ কথার দ্বারা বা বিকৃত স্বরের দ্বারা এই ব‍্যঙ্গ গূঢ় অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে।বেণীসংহারে ভীমকে দুঃশাসনের রক্তপান করতে দেখে যখন অশ্বত্থামা কর্ণকে বিদ্রূপ করে বলেছেন=*
*অঙ্গরাজ! সেনাপতে!দ্রোণোপহাসিন্,*
*রক্ষ সাম্প্রতম্ ভীমাদ্ দুঃশাসনম্।*
*🍁তখন তার প্রত‍্যেকটি কথা শাণিত ছুরিকার মত শ্রোতার অন্তরে প্রবেশ করে। অভিনয়ের স্থলে স্বরের ঈষৎ বিকৃতির দ্বারা এই উক্তিকে আরও কঠোর করে তোলা হয়। পূর্বে যে পদটির উল্লেখ করেছি, "ভাল হৈল আরে বন্ধু", এর নিষ্ঠুর শ্লেষ (বিকৃতি স্বর) সহজেই কষ্টদায়ক, কীর্তন গায়ক স্বরের কিঞ্চিৎ বৈচিত্র্য সাধন করে একে অপূর্ব করে তুলেন।সঙ্গীতে স্বরভঙ্গীর দ্বারা বিদ্রূপকে যে এমন ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়,তা না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন।প্রকৃতপক্ষে কোনও সঙ্গীতেই বিদ্রূপের এরকম অভিব‍্যক্তি দেখা যায় না।এইজন‍্য গীতটির বৈশিষ্ট্য অদ্ভুত!কবি আগাগোড়া এই অলঙ্কার ঠিক রেখেছেন।পদটি সুপরিচিত হলেও এখানে উদ্ধৃত করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।*
*🌷বন্ধু তোমার বলিহারি যাই।*
*🌷ফিরিয়া দাঁড়াও তোমার চাঁদ মুখ চাই।।*
*🌹তোমাকে শতমুখে প্রশংসা করি, কারণ তোমার যে অপূর্ব "শ্রী" হয়েছে, তা দেখবার যোগ্য।(এই কথা শুনে যখন নায়ক মুখ লুকাচ্ছেন তখন বললেন) তুমি একবার আমার দিকে মুখ করে ফিরে দাঁড়াও, তোমার অনিন্দ‍্যসুন্দর (নূতন শোভায়) মুখটি একবার ভাল করে দেখি।*
*🌷আই আই পড়েছে রূপে কাজরের শোভা।*
*🌷ভালে সে সিন্দুর তোমার মুনির মনোলোভা।।*
*🌲আহা! কি অপরূপ শোভাই না হয়েছে! সখী!(আই আই) তোরা একবার দেখে যা। একেবারে কাজলে সিন্দুরে মাখামাখি।কালোরূপে কি সুন্দর মানিয়েছে।*
*🌷খরনখ দশন অঙ্গ জর জর।*
*🌷ভালে সে কঙ্কণ দাগ হিয়ার উপর।।*
*🌷নীল পাটের শাড়ি কোঁচার বলনি।*
*🌷রমণী-রমণ হৈয়া বঞ্চিলা রজনী।।*
*☘চিরদিন তো তোমার পীতধুতি পরাই অভ‍্যাস,আজ একি সুন্দর সাজ! রমণীর নীলশাড়ী পরে এসেছ?তাতে আবার কোঁচা দুলাচ্ছ!*
*🌷সুরঙ্গ যাবক রঙ্গ উরে ভাল সাজে।*
*🌷এখন কহ মনের কথা আইলা কিবা কাজে।।*
*🔴তোমার বক্ষে সুলোহিত আলতার রেখা সুন্দর মানিয়েছে।এমন করে কে তোমাকে সাজাল বল দেখি?সেই রসিকা রমণী রতিরণে তোমাকে পরাভব করে বোধ হয় পদাঘাত করেছে, অথবা প্রেমে বশীভূত হয়ে তার আলতা-রঞ্জিত পদযুগল তুমি নিজে বক্ষে ধারণ করেছ!এখন বল, তোমার জন্য আমি কি করতে পারি? আমি তোমার এই নব প্রেমোৎসবে সব কিছু করতে সতত তৈরী আছি।*
*🌷চারি পানে চাহে নাগর আঁচরে মুখ মোছে।*
*🌷চন্ডীদাসের লাজ ধুইলে না ঘুচে।।*
*🔷পদটি পীতাম্বর দাসের "রসমঞ্জরীতে" গোপালদাসের ভণিতায় আছে।গোপালদাস বা রামগোপাল দাস পীতাম্বর দাসের পিতা।পিতার সম্বন্ধে পুত্র সঠিক সংবাদ না দিয়ে পারেন না, এই মনে করে অনেক গবেষক এই পদটি চন্ডীদাসের বলে স্বীকার করতে চান না। কিন্তু সব দিক দিয়ে বিবেচনা করে দেখলে এই উৎকৃষ্ট পদটি চন্ডীদাসের বলেই মনে হয়। (খন্ডিতার মধ্যে চন্ডীদাস-রচিত বহু পদ পাওয়া যায় )। একই ভাবের সুন্দর সুন্দর পদ খন্ডিতার মধ্যে চন্ডীদাস ও গোবিন্দ দাসের,এটি না মেনে উপায় নাই।গোপালদাসের একটি মাত্র পদ খন্ডিতায় আছে।*
*ছল করি বাণী,কতয়ে পরলাপসি,*
       *তোহারি বচন পরমাণ।*
*চারি পহর রাতি,জাগিয়া পোহাইলুঁ,*
       *আয়লি রাতি বিহান।।*
*🌻এই পদটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর রচনা, এটি বুঝতে দেরি হয় না। রাধামোহনের পদামৃত সমুদ্রে এবং বৈষ্ণবদাস পদ কল্পতরুতে চন্ডীদাসের ভণিতাই দিয়েছেন।*
*🍀চতুরের শিরোমণি নাগর মহা ফাঁপরে পড়ে চারিদিকে দেখছেন। কিন্তু ধৃষ্ট নায়ক সহজে হটিবার পাত্র নন।তিনি প্রবঞ্চনার জাল বুনে বললেন=*
*🌷না কর না কর ধনি এত অপমান।*
*🌷তরুণী হইয়া কেনে একে দেখ আন।।*
*🌷বংশী-পরশি আমি শপতি করিয়ে।*
*🌷তোমা বিনে দিবানিশি কিছু না জানিয়ে।।*
*🌷ফাগু বিন্দু দেখিয়া সিন্দুর বিন্দু কহ।*
*🌷কন্টক কঙ্কণ-দাগ মিছাই ভাবহ।।*
*🌷এত কহি বিনোদ নাগর চলিতে চায় ঘর।*
*🌷চন্ডীদাস কহে রাই কাঁপে থর থর।।*
*🌹তুমি তরুণী,তোমার চোখের দৃষ্টি এত খারাপ হল কি করে?এক দেখতে অন‍্য দেখছ।সিন্দুর কোথায় দেখলে, ও তো ফাগের বা আবিরের বিন্দু। (তোমার জন্য সারানিশি জেগে বনে বনে ঘুরে বেড়িয়েছি)তারই জন্য বক্ষে কন্টকের বা কাঁটার ক্ষত হয়েছে।কঙ্কণের দাগ বলে তাহাই ভুল করেছ। "ধৃষ্ট নাগর" অর্থে যে মিথ‍্যা কথায় দক্ষ। আজ শ্রীমতীর মন রাখবার জন্য কৃষ্ণ মিথ‍্যার উপর মিথ‍্যা কথা অসঙ্কুচিত ভাবে বলেই যাচ্ছেন। অথচ তিনি তাঁকে বুঝাচ্ছেন=*
*🌷মিথ‍্যা কথায় যত পাপ জানহ আপনি।*
*🌷জানিয়া না মানে যেই সেই সে পাপিনী।।*
                        *(চন্ডীদাস)*
❤❤❤❤❤❤🌹❤❤❤❤❤❤
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬৭)🌻বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🌻*
*উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বৈষ্ণব প্রভাব*
▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪
*🍁অনেকের ধারণা যে বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব বঙ্গদেশেই নিবদ্ধ।সে ধারণার হেতু বোধ হয় এই যে,শ্রীকৃষ্ণচৈতন‍্য ও নিত‍্যানন্দ প্রভু বঙ্গদেশে অবতীর্ণ হয়ে বৈষ্ণবধর্মের প্লাবনে এ দেশ ভাসিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গদেশের বাইরেও যে এ ধর্মের প্রভাব ছিল,তা ইতিহাস হতে জানতে পারা যায়।শ্রীমন্মহাপ্রভুর পূর্বে দক্ষিণভারতে শ্রীরামানুজ আচার্য‍্য আবির্ভূত হয়েছিলেন।তারও পূর্বে দক্ষিণদেশে অনেক সাধুসন্ত বৈষ্ণবধর্মের উপদেশ দিয়েছিলেন।তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ গোপীভজনও অনুমোদন করেছিলেন। শ্রীমন্মধ্বাচার্য‍্যও দক্ষিণদেশে প্রাদুর্ভূত হয়েছিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ যখন দক্ষিণদেশে গমন করেছিলেন,তখন তিনি বৈষ্ণবধর্মের দুইটি উৎকৃষ্ট বা উত্তম পুঁথি সংগ্রহ করে এনেছিলেন।একটি ব্রহ্মসংহিতা, অপরটি ভক্তচূড়ামণি বিল্বমঙ্গল ঠাকুরের শ্রীকৃষ্ণকর্ণামৃত।মহাপ্রভু নীলাচলে যে সব গ্রন্থ সবসময় আস্বাদন করতেন,তার মধ্যে কর্ণামৃত অন‍্যতম।দক্ষিণদেশের কবি,ভক্ত ও দার্শনিক একবাক‍্যে বলা যায় রায় রামানন্দের সহিত মহাপ্রভু সাধ‍্য-সাধনতত্ত্ব আলোচনা করেছিলেন।সেরকম আলোচনা,সেরকম ইষ্টগোষ্ঠী কোন ধর্মের ইতিহাসে বড় বেশী দেখতে পাওয়া যায় না।রামরায় বলেছেন=*
*🌷ইহা আমি কিছুই না জানি।*
*🌷যে তুমি কহাও সেই কহি আমি বাণী।।*
*🌷তোমার শিক্ষায় পড়ি যেন শুক পাঠ।*
*🌷সাক্ষাৎ ঈশ্বর তুমি কে বুঝে তোমার নাট।।*
                    *(শ্রীচৈতন‍্যচরিতামৃত)*
*🍀উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে শ্রীরাম-সীতার লীলাই সমধিক প্রচলিত বলে আমাদের ধারণা।রামসীতার লীলা মহাপ্রভুর সময়ে দাক্ষিণাত‍্য দেশেও যে প্রচলিত ছিল, তা বেশ বুঝা যায়।মহাপ্রভু শুধু যে রামসীতার মন্দির দেখেছিলেন তা নয়,তিনি দাক্ষিণাত‍্য ভ্রমণের অনেক সময় সীতা ও রামের চরিত্র আলোচনা করে কাটাতেন।উত্তর-পশ্চিমে রামলীলার প্রবল প্রচার হল তুলসীদাস হতে।তুলসীদাস আকবরের সময়ে প্রাদুর্ভূত হয়েছিলেন।তাঁর রাম-চরিতমানস আজও কোটি কোটি লোকের আধ‍্যাত্মিক ক্ষুধা মিটিয়ে থাকে।তাঁর দোহা ও চোপাই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হিন্দুর কন্ঠে কন্ঠে বিরাজ করে।*
*🌳উত্তর-পশ্চিম ভারতে শ্রীকৃষ্ণলীলার প্রসারও কম নয়।মহাপ্রভুর সমকালে শ্রীবল্লভাচার্য‍্য মথুরামন্ডলে বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করেন।তাঁর জন্ম সন ১০৭১ খৃষ্টাব্দ অর্থ‍্যাৎ বল্লভাচার্য‍্য মহাপ্রভু অপেক্ষা সাত কি আট বৎসরের বড় ছিলেন।তাঁরও পূর্বে রামানন্দ প্রভৃতি সাধুগণ বৈষ্ণবধর্মের সারকথা পশ্চিমাঞ্চলের নরনারীগণকে শুনিয়ে গিয়েছেন। রামানন্দ রামানুজাচার্য‍্যের শিষ্য সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন।ভক্তপ্রবর কবীর (কাশীর জোলা), বৈষ্ণবাগ্রগণ‍্য রুইদাস (চর্মকার বা মুচি) রামানন্দের শিষ্য বলে কথিত হন।নিম্বার্ক নামক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা নিম্বার্ক বা নিম্বাদিত‍্যও বঙ্গের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।*
*🍁ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে,তুলসীদাসের কিছু পূর্বে সূরদাস শ্রীকৃষ্ণলীলা নিয়ে হিন্দীতে অসংখ্য পদ রচনা করেছিলেন।সূরদাসকে বৈষ্ণবমহাজনদের মধ্যে গণনা করা হয় এবং তাঁর কৃত পদাবলী বৈষ্ণবপদসংগ্রহের মধ্যে স্থান লাভ করেছে।সূরদাস গোকুলে বসে যে সময় তাঁর সূরসাগর রচনা করছিলেন,প্রায় সেই সময়েই শ্রীপাদ রূপ-সনাতন প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণবাচার্য‍্য ও কবিগণ বৃন্দাবনে বসে তাঁদের অমর কাব‍্য ও গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য‍্যের বিষয় এই যে,ইঁনারা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কিনা,তা জানা যায় না।শ্রীমদ্ বল্লভাচার্য‍্য সম্বন্ধে ভক্তমালে উল্লিখিত হয়েছে যে,তাঁর সঙ্গে মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং তিনি (বল্লভ) শ্রীধরস্বামীর টীকার (শ্রীমদ্ভাগবতের) নিন্দা করলে মহাপ্রভু কানে হাত দিয়ে বলেছিলেন=*
*🌷কহের স্বামীর প্রতি যেই দোষ দেয়।*
*🌷ভ্রষ্টা করিয়া তাহে বেদেতে কহয়।।ভক্তমাল।।*
*🍁এই বল্লভাচার্য‍্য নিজেই ভাগবতের একখানি টীকা করেছিলেন।বল্লভাচার্য‍্য যে সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন, তার নাম "বল্লভাচারী"।বল্লভাচার্য‍্যের এক পুত্র ছিলেন,তাঁর নাম বিঠঠলনাথ।বল্লভাচার্য‍্যের ন‍্যায় তিনিও শিষ্য গ্রহণ করেছিলেন।বল্লভাচার্য‍্যের চারজন শিষ্য ছিলেন,বিঠ্ ঠলনাথেরও শিষ্য ছিলেন চারজন।এই আট শিষ‍্য অষ্টছাপ নামে প্রতিষ্ঠিত হন। অষ্টছাপের মধ্যে একজন ছিলেন,তাঁর নাম "নন্দদাস"।নন্দদাস বিঠ্ ঠলনাথের শিষ্য।নন্দদাস এই নামটি তাঁর গুরুদত্ত নাম কিনা বলা যায় না।নাম শুনলেই মনে হয় যে,হয় তিনি কোনও নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন,অথবা গুরু হতে এই নাম লাভ করেছিলেন।*
*নন্দদাস শুধু অষ্টছাপের একজন ছিলেন না,তিনি বিখ‍্যাত কবি হয়েছিলেন। বাংলার কবি গোবিন্দদাস যেমন শ্রীনিবাস আচার্য‍্যের কাছে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষালাভ করে অদ্ভুত কবিত্ব শক্তি লাভ করেন ও শ্রীরাধাকৃষ্ণের লীলা গানে অদ্বিতীয় হয়ে উঠেছিলেন, নন্দদাসজিও সেইরকম শ্রীগুরু কৃপায় অপূর্ব প্রতিভাশালী কবি হয়ে উঠেছিলেন।তাঁর কবিতা এত মধুর যে,মনে হয় যেন শ্রীরাধাকৃষ্ণের প্রেমামৃতে তিনি তাঁর লেখনী ডুবিয়ে লিখেছিলেন।তাঁর কবিতায় শ্রীজয়দেবের ঝঙ্কার পাওয়া যায়।আশ্চর্য‍্যের বিষয় এই যে,শ্রীজয়দেবের কবিতা যেমন পদ্মাবতীর প্রেমে ফুটে উঠেছিল, চন্ডীদাস যেমন রামীর কৃপায় কৃষ্ণপ্রেম অনুভব করতে পেরেছিলেন, বিদাপতির কবিতা যেমন লছমী দেবীর কৃপা ছাড়া স্ফূর্তিপ্রাপ্ত হত না,নন্দদাসের সম্বন্ধেও সেইরকম কিম্বদন্তী আছে।বিঠ্ ঠলনাথের এক শিষ‍্যা ছিলেন,তাঁরই আদেশে নাকি নন্দদাসজির প্রাণে শ্রীরাধাকৃষ্ণপ্রেমের সঞ্চার হয়েছিল। নন্দদাসজীর "রাস পঞ্চাধ‍্যায়" শুধু ভাগবতের অনুবাদ নয়।তিনি নিজে লীলারসে ডুবে ঐ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।শ্রীজয়দেব গীতগোবিন্দে বসন্তরাসের বর্ণনা দিয়েছেন। হরিবংশেও রাসের বর্ণনা আছে। কিন্তু নন্দদাসজী ইঁনাদের গ্রন্থ হতে আখ‍্যানভাগ নিলেও নিজের প্রতিভাগুণে তাকে সুন্দর কাব‍্যে পরিণত করেছেন।হিন্দী সাহিত‍্যে নন্দদাসের রাসপঞ্চাধ‍্যায় ও ভম্বর-গীতার (ভ্রমর গীতা)সুখ‍্যাতি ধরে না।সূরদাসও ভ্রমর-গীতায় অপূর্ব মাধুর্য‍্যের সঞ্চার করেছিলেন।*
*রাজপুতানায় মীরাবাই গিরিধরলালের প্রেমে আত্মহারা হয়েছিলেন।মীরা চিতোরের রাণা ভোজরাজের পত্নী ছিলেন।মীরার অপূর্ব প্রেমসঙ্গীতে রাজপুতানা একদিন মেতে উঠেছিল।পরে ঔরঙ্গজেবের অত‍্যাচারে যখন গৌড়ীয় বৈষ্ণবেরা বৃন্দাবন ছাড়তে বাধ‍্য হলেন,তখন রাজপুতানা তাঁদের আশ্রয় স্থান হয়েছিল।শ্রীমদনমোহন প্রসঙ্গে জানতে পারা যায় যে,মূলতান ও পাঞ্জাব এক সময়ে মদনমোহন ও সনাতন গোস্বামীর স্মৃতির সমাদর করত।পাঞ্জাবের অন্তর্গত কাংড়া উপত‍্যকায় এখনও অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ খৃষ্টাব্দের বৈষ্ণব চিত্র পাওয়া যায়।লাহোর চিত্রশালায় রাধাকৃষ্ণের "স্বাধীনভর্ত্তৃকার" যে ছবিটি রক্ষিত আছে,তা প্রকৃতপক্ষে আতি সুন্দর।🌹শ্রীপদামৃত মাধুরী'র তৃতীয় খন্ডে প্রসিদ্ধ শিল্প-সমালোচক অর্ধেন্দ্রকুমার গাঙ্গুলী মহাশয়ের সৌজন্যে ছবিটি মুদ্রিত হয়েছে।*
🪔🪔🪔🪔🪔🪔🙏🪔🪔🪔🪔🪔🪔
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬৮)🙏বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🙏*
*উত্তর-বঙ্গে বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব প্রভাব*
▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪
*⭐রাজশাহীর আদিবাসী আমি না হলেও এর সঙ্গে আমার অন্তরের যে নিবিড় যোগ আছে,সেই কথাটি আপনাদের কাছে আগে বলিনি। আমার এই শেষোন্মুখ কর্মজীবনের সূত্রপাত হয়েছিল রাজশাহীতে।রাজশাহী কলেজের অধ‍্যাপক পদ লাভ করে প্রথম যখন আসি,তখন প্রমত্তা পদ্মার সেই বর্ষাকালের ঢল ঢল রূপ আমাকে মুগ্ধ মূক করেছিল।আমি সেদিন সারাদিন অভুক্ত ছিলাম, কিন্তু তাতে আমার কোনও কষ্ট বোধ হয়নি। তখন আমি বালক বললেও অন‍্যায় হবে না। সেদিন পদ্মা আমাকে যে চঞ্চলতার দীক্ষা দিয়েছিল,জীবনে তা ভুলতে পারিনি।তারপরে এসেছিলাম বঙ্গীয় সাহিত‍্য সম্মেলনের অধিবেশনে, সেও আজ বহুদিন হ'লো।আপনাদের "বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির" যখন ভিত্তি স্থাপিত হয় তখন আমি উপস্থিত ছিলাম সে উৎসবে।লর্ড কারমাইকেল যে সৌধের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন,আজ তা সারা বাংলার গৌরবস্থল হয়েছে। সুতরাং আপনাদের আভিজাত‍্যপূর্ণ ইতিহাসের সঙ্গে কোনও রূপে জড়িত হতে পারা যে-কোনও ব‍্যক্তির পক্ষে সৌভাগ্যের কথা।*
*আমার দুঃখ এই যে,প্রথম জীবনে যেসব বন্ধু পেয়েছিলাম,তাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ নেই। ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার,সুকবি রজনীকান্ত,সুলেখক মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ এঁরা রাজশাহীর লোক, কিন্তু সমগ্র বাংলার দুলাল।এঁদের বন্ধুত্ব লাভ করবার সুযোগ আমার হয়েছিল।তাই স্মরণ ক'রে রাজশাহী জেলার এই উৎসব-বাসরে আমার শ্রদ্ধার স্রক-চন্দন তাঁদের উদ্দেশ্যে অর্পণ করি। ব্রজসুন্দর সান‍্যাল ছিলেন তার সম্পাদক, আমার প্রবন্ধ সে কাগজে বেড়িয়েছে। এখন এ অঞ্চলে কোনও কাগজ আছে কিনা জানি না।যদি থাকে,তবে আমার সহানুভূতি তার সঙ্গে অবশ‍্যই থাকবে।যদি কাগজ না থাকে,তাহলে আপনাদের মারফতে আমি এই আবেদন জানাতে চাই,পাঠাগারের সঙ্গে একটি সাময়িকপত্র থাকলে সোনায় সোহাগা হয়।তার কারণ যেখানেই জ্ঞান, সেখানেই প্রকাশ। সত্ত্বগুণের ধর্মই এই যে,সে প্রকাশশীল।যাঁরা পাঠাগারকে সত‍্যিকার বস্তু বলে মনে করেন,যাঁরা তার সমস্ত সার্থকতা দিতে চান,তাঁরা প্রকাশের পথ খুঁজবেনই ; কারণ পাঠাগারের সার্থকতা প্রচারে। পাঠাগারের (লাইব্রেরীর)বিস্তৃতিও অনেকটা প্রচারের উপর নির্ভর করছে। তা নইলে ঘরের গৃহিণীরা চাকর পাঠিয়ে মধ‍্যাহ্ন-বিনোদনের জন্য কতগুলি পাঠ‍্য অপাঠ‍্য নভেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন।আপনাদের এখানে উপস্থিত পরিস্থিতি ঠিক এই রকম কিনা জানিনা। কিন্তু বহু পাঠাগারের সঙ্গে আমি পরিচিত,যেখানে অবস্থা এর চেয়ে বেশী ভাল নয়।*
*আমাদের অতীত ইতিহাস এমন নৈরাশ‍্যজনক ছিল না। এই বরেন্দ্র ভূমি একদিন যশঃসৌরভে ভারতবর্ষের আকাশ বাতাস মুগ্ধ করে রেখেছিল। সেদিনকার ইতিহাস যদি আমরা ভুলে যাই,তাহলে অকৃজ্ঞতার চরম হবে।অতীত ইতিহাসের সোপানরাজি(উর্ধে উঠার সিঁড়ির পথ) কোনও জাতির সভ‍্যতাকে উন্নত হ'তে উন্নততর রাজ‍্যে পৌঁছে দেয়, একথা ভুললে চলবে না। আজ যেখানে আমরা সম্মিলিত হয়ে,এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে' গৌরব বোধ করছি (নওগা) একদিন তারই অনতিদূরে নানা বিদেশ হ'তে জ্ঞান-মন্দিরের তীর্থযাত্রীরা হাজার হাজার সংখ্যাই সমাগত হয়েছিল। তারও পূর্বে হিউয়েন সাঙ এখানে এসে এক উন্নতশালী জনপদের বিবরণ লিখেছিলেন। জৈন ধর্মেরও নিদর্শন এখানে আবিস্কৃত হয়েছে।ব্রাহ্মণ‍্যধর্মের প্রভাবও বহু পূর্ব হতে বতর্মান ছিল, পন্ডিতেরা এই অনুমান করেন।শিবশক্তির যে যুগনগ্ধ মূর্তি পাওয়া গেছে, তার থেকে বৌদ্ধ ও হিন্দুর মধ্যে ঘনিষ্ঠ আদান প্রদানের পরিচয় পাওয়া যায়। হেবজ্র এবং প্রজ্ঞাপারমিতার যুগল মূর্তি (তিব্বতীয় ভাষায় যবষুম) বোধ হয় পরে শিবশক্তি রূপে হিন্দুদের দেবগোষ্ঠীতে প্রবেশ করেছিল। হিন্দু বৌদ্ধ জৈনের মিলনক্ষেত্র এই সুন্দর দেশ কি ভাবে সভ‍্যতা, ঐশ্বর্য‍্য ও শৌর্য‍বীর্য‍্যের মহান আদর্শ গড়ে উঠেছিল, তা ভাবলে সম্ভ্রমে ও ভক্তিতে আমাদের মাথা অবনত হয়ে আসে স্বভাবতই।যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না,তাই ঘটেছিল এই উত্তর বঙ্গে।আমরা ভাবি যে সভ‍্যতা ও জ্ঞানে আমরা অতীত যুগকে বহু পেছনে ফেলেছি। কিন্তু এ যে কত বড় ভুল,তা একটু প্রণিধান (মনোযোগ)করলেই বুঝতে পারা যায়। ইলেকট্রিক পাখা,টেলিফোন, বেতার,মোটর প্রভৃতি বতর্মান যুগের আবিস্কার আমাদের নিত‍্য নতুন চমক লাগিয়ে দিচ্ছে সত‍্য ; কিন্তু সেই অতীত গৌরবময় যুগের তুলনায়, আমাদের এই ধার-করা উন্নতি যে কতখানি ম্লান তা আমরা ভেবে দিখিনি। সে সুবর্ণ যুগের তুলনায় এখনকার যুগকে জোর গিলটি যুগ বলা চলে, তার বেশী নয়।*
*🌻সেই অতীত যুগের কথা আজ স্মরণ করি।পালরাজগণের সময় উত্তর বঙ্গ যে উন্নতি করেছিল,তা আজ কল্পনার বস্তু।পালরাজগণের গৌরবময় যুগে বঙ্গের এই উত্তরপ্রদেশের ইতিহাস ভারতের ইতিহাস বললেও বেশী বলা হয় না।সে সময়ে বঙ্গে যেসব রাজ‍্য ছিল,তারা কোথায় গেল?সেই দলভুক্তি,কোটাটবী,বালবলভী, রাজশাহী জেলার কৌশাম্বী প্রভৃতি আজ কোথায়?সেই প্রসিদ্ধ বিহারগুলিই বা কোথায়? ওদন্তপুর, বিক্রমশীল, জগদ্দল প্রভৃতি বিহারগুলি একাধারে ধর্ম ও বিদ‍্যাশিক্ষার প্রসিদ্ধ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।এই পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার সেই গৌরবময় যুগের স্মৃতি মাটিরতলে লুকিয়ে রেখেছে যুগ যুগান্ত ধরে। এই রাজশাহী জেলাতেই দিব্বোকের বিজয়বাহিনী দ্বিতীয় মহীপালের দর্প চূর্ণ করে, যে জয়স্তম্ভ স্থাপন করেছিল,আজও তা বতর্মান আছে শুনেছি।রামপাল অতিকষ্টে আবার এইদেশে শান্তি স্থাপন করেছিলেন। "শেক শুভোদয়ায়" রামপাল সম্বন্ধে যে গল্প আছে, তা রোমের ন‍্যায়-বিচারের খ‍্যাতিকেও ম্লান করে।তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র যক্ষপালকে অপরাধের জন্য প্রাণদন্ড দিয়েছিলেন এবং সেই শোকে নিজেও নদীগর্ভে আত্মবিসর্জন দিলেন।"তারনাথের" ইতিহাস থেকেও আমরা পাই যে রামপালের এক পুত্র ছিল তার নাম যক্ষ।এ সব কীর্তি কাহিনী আমরা ভুলে গেছি। শুধু রাজরাজাদের কীর্তি গাথা নয়, সংস্কৃতির দিক দিয়েও উত্তরবঙ্গ বহুদূর অগ্রসর হয়েছিল। স্মরণাতীত কাল হতে রাঢ়দেশ অপেক্ষাও উত্তর বঙ্গের গৌরব ছিল বেশী। গুপ্ত সম্রাটদের সময় থেকে আরম্ভ করে উত্তর বঙ্গের একটি অব‍্যাহত ইতিহাস দেখতে পাওয়া যায়।সেজন‍্যই এখানে অতীতের এত নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে যে বঙ্গের অন‍্য কোন জায়গায় সেরকম নয়।বৌদ্ধধর্মের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে এটি কোন সম্প্রদায় বা শ্রেণী-বিশেষের মধ্যে নিবদ্ধ ছিল না। "শ্রমণ" বা ভিক্ষুরা আপামর সাধারণের মধ্যে শান্তির বাণী প্রচার করতেন। আমরা শুধু জানি যে,বৌদ্ধেরা তাঁদের ধর্ম প্রচার করতে দেশ বিদেশে অভিযান করেছিলেন। কিন্তু দেশের মধ্যেও অহিংসা, সন্তোষ ও শান্তির বাণী তাঁরা যে কি অদম‍্য উৎসাহে প্রচার করেছিলেন,তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।অশোকের শিলালিপি,স্তম্ভলিপি এসব চিরপরিচিত উপায় তো ছিলই।সারা দেশময় সঙ্ঘারাম,বিহার,মহাবিহার প্রভৃতি স্থাপন করে,তাঁরা লোক-শিক্ষার বিরাট আয়োজন করেছিলেন।লোকশিক্ষার এরকম বিপুল ব‍্যবস্থা আর কোনও প্রাচীন জাতির ইতিহাসে দেখা যায় না।হিউয়েসাঙ্গের বিবরণ থেকে বুঝা যায় যে তিনি বিংশিতিটি বিহার এই উত্তর বঙ্গেই দেখেছিলেন।শুধু তাই নয়, অন্তঃপুরচারিকাদের নিকট সদ্ধর্মের অর্থ‍্যাৎ বৌদ্ধধর্মের মর্ম বুঝাবার জন্য ভিক্ষুণীগণেরও সংখ্যা কম ছিল না। বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা সমগ্র জগতের ধর্মে ইতিহাসে যে এক অতি উন্নততর স্তরের সূচনা করেছিল একথা বোধকরি সকলেই জানেন। জীবন যাত্রার যে নীতি তাঁরা শিখিয়েছিলেন তা আজও পুরোনো হয় নি বা অন‍্য নীতির দ্বারা পরাভূত হয়নি।এই অত‍্যদ্ভূত উন্নতি কিভাবে সম্ভব হয়েছিল,তার ইতিহাস আমরা বিশেষ কিছু জানি না।তবে অনুমান হয় যে পাহাড়পুর,তাম্রলিপি,নালন্দা প্রভৃতি জায়গায় যেসব বিহার ছিল,তাকে কেন্দ্র করে এক একটি প্রদেশের সভ‍্যতা বিস্তার লাভ করেছিল।প্রত‍্যেক বিহারে ত‍্যাগশীল,সুপন্ডিত, বহুদর্শী প্রবীণ শ্রমণগণ বাস করতেন।*
🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌻🌹🌹🌹🌹🌹🌹
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬৯)🔴বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🔴*
*উত্তর-বঙ্গে বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব প্রভাব*
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
*🌺তাঁদের কাছে দেশ-বিদেশ থেকে ছাত্রেরা সমাগত হতো জ্ঞানলাভ করবার জন্য। এইভাবে বিক্রমশীল, তক্ষশীলা,নালন্দা প্রভৃতির খ‍্যাতি বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।ভারতবর্ষের ইতিহাসে তেমন আর কখনও হয়নি।পন্ডিতেরা অধ‍্যয়ন ও অধ‍্যাপনা করতেন।ছাত্রেরা শিক্ষা করতেন।উভয়ের পুঁথি লিখিত হ'ত শত সহস্র সংখ্যায়।পুঁথি না হলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন,সাধারণ বিদ‍্যালয়ও চলে না। নালন্দায় দশহাজার ছাত্র অধ‍্যয়ন করতো, এইকথা হিউয়েন সাঙ বলেছেন--, তাদের জন্য অন্তত দুইশ কি আড়াইশ অধ‍্যাপক থাকতেন।তাঁদের প্রত‍্যেকের জন্য গ্রন্থের প্রয়োজন মিটাতে হলে কত পুঁথি থাকা আবশ্যক, ভেবে দেখুন।নালন্দায় নয়তলা বাড়িতে গ্রন্থাগার ছিল। অন‍্যান‍্য বিহারেও এরকম পুস্তকাগার নিশ্চয়ই ছিল, কারণ আগেই বলেছি বিহারগুলি ছিল প্রধানতঃ শিক্ষার কেন্দ্র।তখন মুদ্রাযন্ত্র ছিল না,কাজেই পুঁথি নকল করবার হাজার হাজার লোকের পরিশ্রম আবশ্যক হত।এইসব লোক ভূমি,গ্রাম এবং বিত্ত পারিশ্রমিক স্বরূপ প্রাপ্ত হত।অষ্টম শতাব্দী হতে আরম্ভ করে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তিব্বতের পন্ডিতেরা দলে দে এদেশে আসতেন, ভারতের বিশেষ করে উত্তর ভারতের পুঁথি তিব্বতীয় ভাষায় নকল করত।এই ভাবেই অতীতকালে আমাদের সংস্কৃতির সৌধ বিরচিত হয়েছিল,যার গঠনে উত্তর বঙ্গ কম সহায়তা করেনি।সে সংস্কৃতি করকম ছিল?আজ আর শত চেষ্টাতেও তার একটি ছবি আমরা চোখের সামনে আনতে পারি না।ভারতবর্ষ থেকে, বাংলাদেশ থেকে বৌদ্ধধর্মের নিদর্শন চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়েছে। এর কারণই বা কি? কেউ কেউ মনে করেন মুসলমানেরা বৌদ্ধধর্মের কীর্তিকলাপ নিশ্চিহ্ন করে মুছে দিয়েছে। কিন্তু সেটা সত‍্য কথা নয়। কারণ মুসলমানদের কাছে বৌদ্ধও যা, হিন্দুও তা-ই। মুসলমান আক্রমণে দেশের সংস্কৃতির স্রোত অনেকটা বাধা পেয়েছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু হিন্দুধর্মের মন্দির,আশ্রম, গুহাগুলি এখনও তো মেখলার মত আমাদের জন্মভূমির অঙ্গ বেষ্টন করে বিরাজ করছে। এই কারণেই হিমালয় হতে কন‍্যাকুমারীকা পর্যন্ত সমগ্রদেশ এখনও হিন্দুদের স্থান বা হিন্দুস্থান বলে, দেশ বিদেশে পরিচিত হবার দাবী রাখে।তাহলে মুসলমানদের দৌরাত্ম্য বৌদ্ধধর্মের বিলোপের কারণ হতে পারে না।*
*🍁কেউ কেউ বলেন শঙ্করাচার্য‍্যের সময় হতে হিন্দুধর্মের যে অভ‍্যুদয় হয়েছিল,তারই ফলে বৌদ্ধধর্মের পতন হয়েছে। কিন্তু তা-ই বা কেমন করে, বিশ্বাস করা যায়?হিন্দুধর্মের এখন যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি, তা বৌদ্ধধর্মের অনেকখানি আত্মসাৎ করে নিয়েছে। বৌদ্ধধর্মের আদর্শ= নির্বাণ, হিন্দুদের= মোক্ষ বা মুক্তি। বৌদ্ধদের জন্মান্তর ও কর্মফলবাদের সঙ্গে হিন্দুর অধ‍্যাত্মবিদ‍্যার একটুও প্রভেদ নাই। বৌদ্ধদের শূন‍্য এবং হিন্দুদর্শনের নির্গুণ ব্রহ্মে তফাৎ কি বড় বেশী? এইভাবে হিন্দু এবং বৌদ্ধমতের যে সমন্বয় আমরা দেখতে পাই,তাতে এক ধর্মের দ্বারা অন‍্য ধর্মের উচ্ছেদ-সাধন সম্ভব কতখানি তাহাও বিবেচ‍্য।পালরাজগণ সকলেই বৌদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তাঁরা হিন্দুমতের প্রতি বিরূপ ছিলেন না।যতদূর জানা যায় তাতে পালরাজারা ব্রাহ্মণগণকে সমাদর করতেন,ভূমিদান করতেন এবং নিশ্চয়ই তাঁদের উপাসনাদিতে বাধা দিতেন না। আমার বোধহয়, বৈষ্ণবধর্মের অভ‍্যুত্থান বৌদ্ধসংস্কৃতির বিশেষ অন্তরায়রূপে দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশে ঐ ধর্মের যে প্রবল বন‍্যা একদিন বয়েছিল, তার শক্তি সম্বন্ধে আমাদের অনেকেরই হয়ত সুস্পষ্ট ধারণা নেই। আমার মনে হয় যে,বহুদিন এরকম শক্তিশালী প্রভাব জনসাধারণের মধ্যে অনুভূত হয়নি। তার ফলে হয়েছে এই যে,বঙ্গদেশে বহুলোক এখনও বৈষ্ণব, এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতিও নানা ছদ্মবেশে বৈষ্ণবমতের সঙ্গে মিশে আত্মগোপন করে রয়েছে। হিন্দুর অধ‍্যাত্মবিদ‍্যার সঙ্গে বৌদ্ধমতের যতটা মিল আছে, বৈষ্ণবদের সঙ্গে ততটা নয়। কিন্তু একটি বিষয়ে বৌদ্ধদের অনুকরণ করেছিলেন বৈষ্ণবেরা, সেটি হচ্ছে বৈষ্ণবদের জাতিভেদের প্রতি অনাস্থা।জাতিভেদ বৈষ্ণব প্রভাবে কতটা খর্ব হয়েছিল,তা এখন বুঝতে পারা কঠিন হবে। কারণ পরে ব্রাহ্মণ‍্যধর্মের সঙ্গে বৈষ্ণবধর্মের যে সমন্বয় ঘটলো,তাতে জাতিভেদ আবার মাথা তুলতে সমর্থ হয়েছিল। ব্রাহ্মণেরা এই বিষয়ে চৈতন‍্য-প্রবর্তিত ধর্মের উপর গোড়া থেকেই খুব চটা ছিলেন। এখন দাঁড়িয়েছে এই যে,বৈষ্ণবতত্ত্ব কতটা হিন্দু সমাজে চললেও জাতিভেদ পুরোমাত্রায় মেনে নেওয়া হচ্ছে।সে "চন্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি-পরায়ণঃ" আর নেই।মহাপ্রভু যা শিখিয়ে গিয়েছিলেন=*
*🌷যে-ই ভজে সে-ই বড় অভক্ত হীন ছার।*
*🌷কৃষ্ণ ভজনে নাহি জাতিকুলাদি বিচার।।*
*🌻সে শিক্ষা আমরা ক্রমে বিস্মৃত হয়েছি। অবশ‍্য সেজন‍্য আমাদের যে দুর্গতি,তার জন্য এখনই আমাদের প্রায়শ্চিত্ত শুরু হয়েছে ভীষণভাবে।বাংলার তথা ভারতবর্ষের প্রধান রাষ্ট্রীয় সমস‍্যা এখন হিন্দু মুসলমান নিয়ে নয়,এখন সে সমস‍্যা Scheduled caste বা অনুন্নত জাতি নিয়ে।যাদের আমরা আঙ্গিনার বাহির করে দিয়েছি,তারাই অন‍্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগ দিয়ে হিন্দুদের স্বাধীনতা-লাভের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দেখে মনে হয় যে, বৌদ্ধদের শিক্ষা,বৈষ্ণবদের শিক্ষা ত‍্যাগ করে আমরা ভাল করিনি। আর কোনও দেশের সংস্কৃতির ইতিহাসে এই জটিলতা নেই। আমাদের নিজ কর্মফল অভিসম্পাতরূপে আমাদের ভাগ‍্যকে বিড়ম্বিত করছে।*
❤💧❤💧❤💧❤💧❤💧❤💧❤
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৭০)🦚বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🦚*
*উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব প্রভাব*
🌷🌷🌷🌷🌷🌷🌷🌷🌷🌷
*🌻সে যাই হোক, এই জেলাতেই বৈষ্ণবদের যে অভ‍্যুদয় হয় ষোড়শ শতাব্দীতে,শ্রীচৈত‍ন‍্যের পরে এত বড় বিপ্লব আর ঘটেনি।খেতুরির রাজপুত্র বুদ্ধেরই মত গৃহত‍্যাগ করে,যে আদর্শ এই জেলাতেই (রাজশাহী) দেখিয়েছেন,তা গৌতম বুদ্ধের সংসার ত‍্যাগেরই মত মর্মস্পর্শী ও আধ‍্যাত্মিক প্রভাবশালী।দিকে দিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়ল, নরোত্তমদাসের এই ত‍্যাগের আদর্শে বৈষ্ণবধর্ম মহীয়ান্ হয়ে উঠলো।দেশব‍্যাপী যে আন্দোলন হলো,তাঁর কাছে সমস্ত বাধাবিঘ্ন ভেসে গেল।শূন‍্যবাদের রিক্ত সিংহাসনে বসলেন শ্রীরাধাকৃষ্ণের যুগল মূরতি।শালগ্রাম শিলা নয়, একেবারে রূপেরসে ভরপুর সচ্চিদানন্দঘন বিগ্রহ।শালগ্রাম অনেকটা শূন‍্যের প্রতীক। কিন্তু তাঁর স্থলে আসলেন অখিলরসামৃত মূর্তি,নন্দনন্দন শ্রীকৃষ্ণ।বৌদ্ধদের দুরূহ অষ্টমার্গিক সাধনের স্থলে এলো আপামর সাধারণের জন্য নাম-সংকীর্তন।শুকনো কঠোর বিধি-নিষেধের জায়গায় এলো প্রেম,অহিংসার জায়গায় করুণা।অহিংসা একটি অভাবাত্মক ধর্ম--,হিংসার অভাব এই মাত্র। কিন্তু করুণা হৃদয়ের একটি সহজাত শ্রেষ্ঠ বৃত্তি।এইভাবে সারাদেশ বৈষ্ণবধর্মের আহ্বানে সাড়া দিয়ে উঠেছিল। আগের যেসব সংস্কৃতির ভগ্নাবশেষ তখনও বতর্মান ছিল,সেগুলি অল্পে অল্পে ধরণীপৃষ্ঠ হতে বিদায় গ্রহণ করতে লাগল।*
*বৌদ্ধধর্মের প্রভাব এইরূপে যখন খর্ব হতে আরম্ভ করেছিল,তখন বৈষ্ণবরাও ভগবান বুদ্ধের জন্য একটু জায়গা করে,তাঁকে দশাবতারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে চেষ্টা করেছিলেন ; তারই পরিচয় আমরা শ্রীজয়দেবে পাই।শ্রীজয়দেব বাংলার কবি ; তাঁর সময়ে বৌদ্ধ প্রভাব জীবন্ত ভাবে বাংলাদেশে বতর্মান ছিল।*
*নরোত্তমদাস ঠাকুরের প্রভাব কীর্তনের অনুকূল পবনে দূর দূরান্তরে প্রবাহিত হতে লাগল। আমার মনে হয় কূলপ্লাবিনী পদ্মার প্লাবনের মত এই ধর্মের ঢেউ লেগেই পুরাতন ভাবধারার শেষ সৌধগুলি ভেঙ্গে পড়তে লাগল। নরোত্তমদাস গরাণহাটী কীর্তনের প্রবর্তক,শ্রীনিবাস আচার্য‍্য মনোহরসাহী কীর্তনের জনক বলে বিখ‍্যাত। এঁদের উভয়ের সম্মিলন ঘটেছিল এই জেলাতেই। একজন উত্তর বঙ্গের, আর একজন রাঢ়ের। এই হতে উত্তর বঙ্গ আর রাঢ় এক স্বর্ণ সূত্রে গ্রথিত হলো।এমনটি আগে হয়েছিল বলে জানা যায় না। শ্রীচৈতন‍্যের সময়ে এবং তাঁর অব‍্যবহিত পরবর্তী কালে নদীয়া শান্তিপুর দিয়ে রাঢ় অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্মের ঢেউ বয়েছিল।শ্রীহট্ট অঞ্চলেও এর কতকটা প্রভাব পৌঁছেছিল। কিন্তু উত্তর বঙ্গে যে বৈষ্ণব ভাব-প্রবাহ এমন প্রবলভাবে ধাক্কা দিতে পারলো, তার কারণ আমার বোধহয় উত্তরবঙ্গের পুরাতন সংস্কৃতি।উত্তরবঙ্গ আগে থেকেই যেন এর জন্য তৈরী ছিল। পুন্ড্রবর্দ্ধন ও সোমপুর বিহারকে কেন্দ্র করে যে সভ‍্যতা যুগযুগান্ত ধরে পুরাতন অট্টালিকায় বট গাছের মত অসংখ্য শিকড় বিস্তার করে সমাজকে আচ্ছন্ন করেছিল, তারই ফলে একদিন হঠাৎ জাগরণ এসেছিল।সে জাগরণের দিকে সারা বাংলাদেশ নির্ণিমেষ নেত্রে তাকিয়ে রইল। ঠাকুর নরোত্তমদাস যা করেছিলেন,তার তাৎপর্য‍্য বুঝতে হলে সমস্ত বৈষ্ণব ধর্মমতের ইতিহাস আলোচনা করতে হয়।তিনি একদিকে যেমন কীর্তনের পদ্ধতি বেঁধে দিলেন,তেমনি বৈষ্ণব মতবাদের ভিত্তিও সুদৃঢ় করে দিলেন।তাঁর "শ্রীশ্রীপ্রেমভক্তিচন্দ্রিকা" "হাটপত্তন" "প্রার্থনা" "চমৎকারচন্দ্রিকা" প্রভৃতি গ্রন্থ বৈষ্ণব সমাজের যে কি অসামান্য উপকার করেছে,তা বলে শেষ করা যায় না।নরোত্তমদাস ঠাকুরের অবদান বরেন্দ্রীপুন্ড্র বর্দ্ধনের গরিমময় ইতিহাসের উপযুক্ত বলে আমরা মনে করতে পারি।তাঁর "প্রার্থনা" পদগুলি জগতের সাহিত্যে তুলনাবিহীন এবং তাঁর প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা নামক গ্রন্থটিকে বৈষ্ণবগণ বলেন "লক্ষ গ্রন্থের টীকা"।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🪔🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🔜 ক্রমাগত 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 অষ্টম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo8.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

    📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝
    ꧁👇📖 সূচীপত্র ✍️ শ্রী জয়দেব দাঁ 📖👇



✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧


✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

   ✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️ 
নিবাস- বাঁশবাড়ী, কীর্তন মন্দিরের পাশে, পোঃ- বাঁশবাড়ী, থানা- ইংরেজ বাজার, জেলা- মালদহ, পশ্চিমবঙ্গ, পিন কোড- ৭৩২১০১।

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

  *••••┉❀꧁👇🏠Home Page🏠👇꧂❀┅••••* 


✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

    *••••━❀꧁👇 📖 সূচীপত্র 📖 👇꧂❀┅••••* 



✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

     *••••━❀꧁👇📚 PDF গ্রন্থ 📚👇꧂❀┅••••* 


✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
    *••••┉━❀꧁ 🙏 রাধে রাধে 🙏 ꧂❀━┅••••* 
                   শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ
              হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রীরাধেগোবিন্দ।।
  *••••┉━❀꧁ 🙏 জয় জগন্নাথ 🙏 ꧂❀━┅••••*
              হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
              হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥
  *••••┉━❀꧁ 🙏 জয় রাধাকান্ত 🙏 ꧂ ❀━┅••••*
   🌷❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🌷
   🏵️❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🏵️
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧







বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🔙 পূর্ব লীলা 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 রায় রামানন্দ🌷 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫১) 🙏বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🙏*
           *🙏রায় রামানন্দ🙏*
           ***********************
*🍁জগন্নাথ-বল্লভে রাধা পরকীয়া নায়িকা=*
*🌷দয়িতা দয়িতস্তস‍্যা বালেয়ং কুলপালিকা।*
*🌷অকান্ডে কিমসৌ মুগ্ধে ধত্তামাচারবিপ্লবং।।*
                 *(জঃ বঃ নাঃ ২য় অঙ্ক)*
*🌻শ্রীরূপ গোস্বামীর নাটকেও তাইই। বিদগ্ধমাধবে মুখরা শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন, চঞ্চল!"অভিমন‍্যোঃ সহধর্মিণী পত্নী তব বন্দনীয়া"।শ্রীরাধা অভিমন‍্যুর (আয়ানের) পত্নী অতএব তোমার নমস‍্যা।*
*🌹এই পরকীয়াতত্ত্ব সম্বন্ধে উভয়ের ঐক‍মত‍্য কি আকস্মিক?অথবা রামানন্দের প্রভাবের ফল? জগন্নাথ- বল্লভে ললিতা বিশাখা নেই, রাধার সখীর নাম মদনিকা ও শশীমুখী।মদনিকা এবং পৌণমাসী উভয়েই বয়োজ‍্যেষ্ঠা এবং লীলার প্রধান প্রযোজনকর্ত্রী।জগন্নাথবল্লভের বিদূষক রতিকন্দল,শ্রীরূপ গোস্বামীর নাটকে মধুমঙ্গলে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু গানের দিক দিয়ে জগন্নাথবল্লভ যথেষ্ট জনপ্রিয়তার দাবী করতে পারে!জগন্নাথবল্লভ পঞ্চাঙ্ক নাটক যথা=পূর্বরাগ,ভাবপরীক্ষা, ভাবপ্রকাশ, রাধাভিসার ও রাধাসঙ্গম। প্রথম অঙ্কে চারটি করে ১২টি,চতুর্থ অঙ্কে পাঁচঠি এবং পঞ্চম অঙ্কে চারটি গান আছে।এর মধ্যে অনেকগুলো গান পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হয়েছে এবং কীর্তনের আসরেও অদ‍্যাপি শুনতে পাওয়া যায়।যথা="কেলিবিপিনং প্রবিশতি রাধা",রাধা মধুর বিহারা (অভিসার); "গোপকুমার সমাজমিমং সখি পৃচ্ছ কদানুগতোহহং (রূপানুরাগ) ইত্যাদি।*
*🍁এই গানের অনেকগুলিই শ্রীজয়দেবের অনুকরণে রচিত। জয়দেবের প্রভাব কোন বৈষ্ণব কবিই অতিক্রম করতে পারেননি।জগন্নাথ বল্লভের মত ছোট নাটকটিতে বিংশত‍্যধিক (কুড়িটির বেশী) গানের সমাবেশ দেখলে জয়দেবের কথায় বেশী করে মনে পড়ে।তবে শ্রীজয়দেব যেমন শৃঙ্গার রসের মধ‍্য দিয়েই শ্রীকৃষ্ণলীলা আস্বাদন করেছেন, রামানন্দ সেরকম করেননি।পঞ্চম অঙ্কে (রাধাসঙ্গম)মাত্র শ্রীরাধাকৃষ্ণের বিহার মদনিকার দ্বারা বর্ণিত হয়েছে, তাও বেশ গাম্ভীর্য‍্যপূর্ণ। আগেই বলেছি, রামানন্দের ভাষায় শ্রীজয়দেবের শব্দ-অলঙ্কারের প্রভাব সুস্পষ্ট। দৃষ্টান্তস্বরূপ=*
*🌻মঞ্জুতর গুঞ্জদলি কুঞ্জমতি ভীষণং।*
*🌻মন্দ মরুদন্তরগ গন্ধ কৃত দূষণং।।*
*🌹অথবা, রাধিকে পরিহর মাধবে রাগময়ে ইত্যাদি পদ নেয়া যেতে পারে। আবার চন্ডীদাসের প্রভাব রামরায়ের কাব‍্যে না থাকবারই কথা। কারণ চন্ডীদাস বাঙ্গালী কবি।তথাপি তাঁর রাধাপ্রেমের আকুতি দেখলে চন্ডীদাসের কথা মনে স্মরণ হয়। বিশেষ যখন তিনি বলেছেন=*
*🌻তন্মন‍্যে বিরহে নবৈব বিধুরা কান্তস‍্য যোগে যথা।*
*🌹চন্ডীদাসের অমর চিত্র "দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া" অবশ্যই মনে পড়বে।বিদ‍্যাপতির প্রভাবও রায় রামানন্দের উপর লক্ষ্য করা যায়।তাঁর প্রেমবিলাসবিবর্তের পদটি=*
*🌷পহিলহি রাগ নয়ন ভঙ্গ ভেল।*
*🌹নিশ্চয়ই বিদ‍্যাপতির অনুকরণে লিখিত।রামরায় গানে যে অত‍্যন্ত সুপন্ডিত ছিলেন,এ সম্বন্ধে সংশয় নাই।তাঁর অনেকগুলির জনপ্রিয়তার এটিও একটি হেতু।আর একজন বিখ‍্যাত কবি সেইজন‍্যই তাঁর সংস্কৃত গানগুলিকে বাংলা রূপ দিতে অনুপ্ররিত হয়েছিলেন।জগন্নাথবল্লভের শ্লোক ও সঙ্গীত অবলম্বন করে শ্রীলোচনদাস চল্লিশটি পদ রচনা করেছিলেন।পদগুলি অতি সুললিত এবং জায়গায় জায়গায় কাব‍্য-সৌন্দর্য‍্যে মূল কবিকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।লোচনদাসের পদেও ব্রজবুলি ভাষার যথেচ্ছ ব‍্যবহার লক্ষ্য করবার বিষয়।তাঁর চল্লিশটি পদের মধ্যে তেরটি ব্রজবুলি ভাষায়।*
*🍀রামানন্দের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব তাঁর সংলাপে,যেখানে তিনি মহাপ্রভুর প্রশ্নের উত্তরে সাধ‍্যের স্থাপন করেছেন।অদ‍্যাপি এই সাধ‍্যসাধনতত্ত্ব বৈষ্ণবসমাজে ভক্তিধর্মের দৃঢ় ভিত্তি বলে গণ‍্য হয়।বস্তুতঃ এই প্রসিদ্ধ সাধ‍্য সাধনতত্ত্ব-বিচারের মত প্রেমধর্ম-ব‍্যাখ‍্যা আর কোথাও দেখা যায় না। রামানন্দ ছিলেন "রাধাকৃষ্ণ প্রেমরসের জ্ঞানের সীমা"।কাজেই তাঁর এই তত্ত্বব‍্যাখ‍্যা বৈষ্ণবধর্মের নির্যাস বলে আদৃত হয়েছে।*
*🍁এই সুপরিচিত সাধ‍্য-বিচারের মধ্যে মাত্র দুইটি বিষয়ের প্রতি আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করোএ চাই।প্রথমতঃ কান্তা-ভাবের ভজন এই প্রথম স্পষ্টভাবে অঙ্গীকৃত হল। ভগবান যে প্রিয়তম, একথা বৃহদারণ‍্যক এবং নারায়ণীর উপনিষদে উক্ত হয়েছে। ব্রজের গোপীরা যে শ্রীকৃষ্ণকে প্রাণকান্তারূপে ভজনা করেছিলেন, এটিও শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত ভক্তিধর্মের যে ব‍্যাখ‍্যা প্রচলিত ছিল তাতে মধুর বা উজ্জ্বল রসের জায়গা স্বীকৃত হয়নি। সেইজন‍্যই শ্রীচৈতন‍্যদেব যে ভক্তি-সাধনা প্রবর্তিত করলেন তাকে "অনর্পিতচরীং চিরাৎ" বলা হয়েছে।(যা পূর্বে কোনযুগে বা কোনকালে এইভাবে প্রেভক্তি প্রদান করেননি)। তিনি মধুর রস-সমন্বিত ভক্তির প্রবর্তক,এটি যদি স্বীকার করা যায়,তবে তার প্রেরণা এই দাক্ষিণাত‍্য দেশ হতে এসেছিল এটি না মেনে উপায় নাই। (◆অধুনালুপ্ত "উদয়ন" পত্রিকায় (কার্ত্তিক ১৩৪১) বাংলার প্রেমধর্ম শীর্ষক প্রবন্ধে আমি এর বিস্তৃত ব‍্যাখ‍্যা দিয়েছিলাম। রায় বাহাদুর রমাপ্রসাদ চন্দ উদয়নে (পৌষ ১৩৪১) তার প্রতিবাদ করেন,আমার প্রত‍্যুক্তি (বসুমতি বৈশাখ ১৩৪২) দ্রষ্টব‍্য)।*
*☘দ্বিতীয়তঃ এই তত্ত্বের বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে রামানন্দ রায় স্বরচিত একটি পদ গান করেন=*
*🌷পহিলহি রাগ নয়নভঙ্গ ভেল।*
*🌷অনুদিন বাঢ়ল অবধি না গেল।।*
*🌷না সো রমণ না হাম রমণী।*
*🌷দুহুঁ মন মনোভব পেষল জানি।। ইত্যাদি।।*
*🌹এই পদটির ব‍্যাখ‍্যার অনেক কথা এবং জনৈক সুধী সমালোচক ভ্রমে পতিত হয়েছেন।অর্থ‍্যাৎ ভুল পথে চালিত হয়েছেন।তাঁরা মনে করেন যে, "না সো রমণ" ইত্যাদির দ্বারা বিপরীত বিহারের ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু বস্তুতঃ তা নয়।রায় রামানন্দ এখানে কান্তা-প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করে এমন এক অনির্বচনীয় অবস্থার আভাস দিচ্ছেন,যেখানে কান্ত ও কান্তা,নায়ক ও নায়িকা, ভক্ত ও ভগবান একাত্মা হয়ে যান ; কোনও রূপ ভেদ থাকে না, এটিই কান্তা প্রেমের চরম পরিণতি।(◆প্রেমবিলাস-বিবর্তের ব‍্যাখ‍্যা সম্বন্ধে ভারতবর্ষে (আষাঢ় ১৩৪৪) আমি যে আলোচনা করেছিলাম এবং শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত রাধাগোবিন্দ নাথ যে প্রত‍্যুত্তর (ভাদ্র ১৩৪৪) দিয়েছিলেন তা দ্রষ্টব‍্য)।*
*🌹বৈষ্ণবদের এই প্রেমবিলাসবিবর্ত এক অপূর্ব বস্তু।রামরায় যেরকম ভয়ে ভয়ে এটি ব‍্যাখ‍্যা করেছেন,তাতে মনে হয় যে,প্রেমের এই অভেদতত্ত্ব অত‍্যন্ত নিগূঢ় এবং রহস‍্যমন্ডিত মর্মকথা। কান্তা-প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করে বক্তা মনে করলেন যে,এ প্রসঙ্গেই এটিই চরম হল। কিন্তু =*
*🌷প্রভু কহে এহ হয় আগে কহ আর।*
*🌷রায় কহে আর বুদ্ধিগতি নাহিক আমার।।*
*🌷যেবা প্রেম-বিলাস-বিবর্ত এক হয়।*
*🌷তাহা শুনি তোমার সুখ হয় কি না হয়।।*
*🌻সন্দেহ-দোলায়িত রায় রামানন্দ এরই ব‍্যাখ‍্যাস্বরূপ নিজকৃত এক পদ গাইলেন; "পহিলহি রাগ নয়নভঙ্গ ভেল"।এই গান শুনে মহাপ্রভুর প্রশ্ন নিরস্ত হয়ে গেল।তিনি উদ‍্যত-ফণ অজগরের মত দুলতে লাগলেন এবং পরিশেষে=(প্রেমে প্রভু স্বহস্তে তার মুখ আচ্ছাদিল)। "প্রেমবিলাসবিবর্ত অর্থে এখানে এমন একটি অবস্থার ইঙ্গিত করা হচ্ছে তত্ত্ব হিসাবে যার উপরে আর নাই।"বিবর্ত্ত" অর্থে ভ্রম, অর্থ‍্যাৎ যেমন শুক্তিতে মুক্তাভ্রম, রজ্জুতে সর্পভ্রম।প্রেমের জগতে ভেদ--ভ্রম,অভেদই--সত‍্য অর্থ‍্যাৎ প্রেমবিলাসে যে দ্বৈতত্ত্ব দেখতে পাওয়া যায়,তা প্রাথমিক প্রেমের পরাকাষ্ঠা হয় তখন,যখন প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের আর কোনও ভেদ থাকে না।*
*পিরীতি লাগিয়া, আপনা ভুলিয়া,*
        *পরেতে মিশিতে পারে।*
*পরকে আপন, করিতে পারিলে,*
       *পিরীতি মিলয়ে তারে।।*
*দুই ঘুচাইয়া, এক অঙ্গ হও,*
       *থাকিলে পিরীতি আশ।*
*পিরীতি সাধন, বড়ই কঠিন,*
       *কহে দ্বিজ চন্ডীদাস।।*
*🌹এই অভেদতত্ত্বই প্রকটিত হয়েছে "রসরাজ-মহাভাবে'র একত্বে। "রসরাজ মহাভাব" দুই একরূপ। (চৈঃচঃ) এই রসরাজ মহাভাবের জীবন্ত বিগ্রহ 🙏রায় রামানন্দের সম্মুখে বিরাজমান। অর্থ‍্যাৎ রামানন্দ সর্বশেষে যখন রাধাকৃষ্ণতত্ত্ব হতে গৌরাঙ্গতত্ত্বে এসে পড়লেন, তখন মহাপ্রভু স্বহস্তে তাঁর মুখ আচ্ছাদন করলেন। এই====*
*🌷ব‍্যাধিকরণতরা বানন্দবৈবশ‍্যতো বা,*
*🌷প্রভুরথ করপদ্মেনাস‍্যমস‍্যাপ‍্যধত্ত।*
       *(চৈতন‍্যচন্দ্রোদয়নাটকং, ৭ম অঙ্ক)*
*🌻কবিকর্ণপুর বিপ্রের মুখ দিয়ে সার্বভৌমের প্রশ্নের উত্তরে এইকথা বলিয়েছিলেন কিন্তু এই তত্ত্ব অতি নিগূঢ়। এখানে কবিকর্ণপুর এটিকে চাপা দিয়েছেন মাত্র।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🌷🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫২) বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য*
                  *পদাবলী*
            *বাদল---অভিসার*
         ☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
*⚪বর্ষার ঘনায়মান মেঘপুঞ্জ দেখলে প্রণয়ীর চিত্ত আকুল হয়।বাদল মেঘ সেইজন‍্য প্রেমের কাব‍্যে অমর হয়ে আছে। প্রিয়াবিরহ-কাতর যক্ষের কাছে ধূমজ‍্যোতিঃ-সলিল-মরুৎ- সন্নিপাতমাত্র মূর্তিমান হয়ে উঠেছিল এবং প্রেমের যোগ্য দূতরূপে বৃত (কর্মে বরণ করা ) হয়েছিল। ঘটকর্পরও মেঘকে দূত করে প্রোষিত ভর্তার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছিলেন।পরমভক্ত শ্রীজয়দেব তাঁর অমর কাব‍্য আরম্ভ করেছিলেন মেঘেরই পুণ‍্য নাম নিয়ে। "মেঘৈর্মেদুরমম্বরং" স্মরণ করলে আজও নীল যমুনার কুলে তমাল বনরাজি-শ‍্যামলিত মেঘমেদুর সন্ধ‍্যার একটি সুন্দর চিত্রপট চোখের সামনে ভেসে উঠে।*
*☘আর তেমন মেঘ করে না কি?তেমন করে গুর-গুর দেয়া ডাকে না কি? কই, এখন আর তেমন করে পরাণবন্ধুয়া আঙ্গিনার কোণে প্রণয়িনীর জন্য বৃষ্টির ধারার মধ্যে দাঁড়িয়ে তো প্রতিক্ষা করেন না!*
*🌷এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা,*
                *কেমনে আইলে বাটে।*
*🌷আঙ্গিনার কোণে বন্ধুয়া তিতিছে,*
                 *দেখিয়া পরাণ ফাটে।।*
*🌺ঘরে গুরুজন,আমি যে তাঁদের দৃষ্টি এড়িয়ে বাহির হতে পারলাম না!তিনি আমার জন্য আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে ভিজে সারা হলেন।কত কষ্ট তাঁকে দিলাম,তাই ভেবে আকুল হচ্ছি।*
*🌷ঘরে গুরুজন ননদী দারুণ,*
                     *বিলম্বে বাহির হৈলুঁ।*
*🌷আহা মরি মরি সঙ্কেত করিয়া,*
                     *কত না যন্ত্রণা দিলুঁ।।*
*🌺আমি সঙ্কেত করে তাঁকে এনে এত কষ্ট দিলাম! কিন্তু তিনি তো সে অসহ দুঃখকে দুঃখ মনে করেন না। আমার জন্য বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনি সুখী!আহা!এমন প্রেম আর হয় না।*
*🌷আপনার দুখ সুখ করি মানে,*
                     *আমার দুখের দুখী।*
*🌷চন্ডীদাস কয় বন্ধুর পিরীতি,*
                    *শুনিয়া জগত সুখী।।*
*🌺এই প্রীতি নিয়েই বৈষ্ণবের কাব‍্য। সামান্য নায়ক-নায়িকার নিতান্ত সাধারণ প্রেম উপলক্ষ্য করে কখনও শ্রেষ্ঠ কাব‍্য রচিত হতে পারে না।শ্রীরাধাকৃষ্ণের এ পিরীতির কথা শুনে "জগৎ সুখী"। এমন আর হয় না।মুরারি গুপ্ত চন্ডীদাসেরই প্রতিধ্বনি করে বলেছিলেন=*
*খাইতে শুইতে রৈতে,আন নাহি লয় চিতে,*
         *বন্ধু বিনা আন নাহি ভায়।*
*মুরারি গুপুতে কহে,পিরীতি এমতি হৈলে,*
         *তার গুণ তিন লোকে গায়।।*
*🌹প্রেমাস্পদ আহারে-বিহারে, শয়নে-স্বপনে, নিদ্রা-জাগরণে যার চিত্তকে নিঃশেষে অধিকার করেছেন,তার প্রেমের কথা শুনতে শুনাতে,বলতে বলাতে প্রাণ গলে মধুময় হয়ে যায়। এই তো প্রেম। এঁরই নাম শ্রীরাধা।যুগে যুগে মানুষ এই প্রেমের ধ‍্যান করেছেন,এই পিরীতের স্বপ্ন দেখেছে,ইঁনারই নাম শ্রীরাধা।*
*গগনে অব ঘন, মেহ দারুণ,*
        *সঘনে দামিনী ঝলকই।*
*কুলিশ পাতন, শবদ ঝন ঝন,*
        *পবন খরতর বলগই।।*
*🍀এমন দুর্দিনে আমার প্রাণকান্ত সঙ্কেতকুঞ্জে গিয়েছেন।আমি কি ঘরে বসে আরাম করতে পারি?আমাকে না গেলেই নই।ঐ শুনছ না, থেকে থেকে বাঁশী বাজছে? আজ ঐ বাঁশী শুনে বোধ হচ্ছে--,নায়কের মনেও মাঝে মাঝে সন্দেহের দোলা লাগছে--, সুকুমারী বালিকা এই দুরন্ত বর্ষায় এত দূর পথ অতিক্রম করে কেমন করে আসবে?*
*🌷পাঁতর মা ভেল আঁতর বারি।*
*🌷কৈছে পঙারব সো সুকুমারী।।*
                         *(গোবিন্দদাস)*
*প্রান্তর আজ বর্ষার জলে অন্তর (সুদূর) হয়ে পড়েছে।এই জলপ্লাবন অতিক্রম করে সে সুকুমারী আসতে পারবে কি?*
*🌺সখিরা শ্রীমতীকে নিষেধ করছেন, এমন দুর্যোগে যেও না।শেষে কি প্রেমের জন্য প্রাণ হারাবে? ঘরের বাইরে দুয়ার রুদ্ধ হয়েছে।পথ পিছল,চলা শঙ্কাজনক।ঐ দেখ,দূর হতে বর্ষা ঝেঁপে আসছে।দুরন্ত বর্ষায় কি তোমার সূক্ষ্ম নীল শাড়ীতে জল মানবে? অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে যাবে বলে একটি নীলশাড়ী পরেছ দেখছি!*
*🌷মন্দির বাহির কঠিন কপাট।*
*🌷চলইতে শঙ্কিল পঙ্কিল বাট।।*
*🌷তহিঁ অতি দূরতর বাদল দোল*।
*🌷বারি কি বারই নীল নিচোল।।*
*🍁আর সে তো এখানে নয়। মানসগঙ্গার অপর পারে, যেখানে তোমার প্রাণবল্লভ আছেন,সেখানে এমন দারুণ বর্ষায় কি যাওয়া যায়*?
*সুন্দরি কৈছে করবি অভিসার।*
*হরি রহ মানস সুরধূনী পার।।*☆
*☆রায় বাহাদুর ডাক্তার দীনেশচন্দ্র সেন ইহার আধ‍্যাত্মিক ব‍্যাখ‍্যা দিয়েছেন।হরি মনোরাজ‍্যের অপর পারে বাস করেন, ইত্যাদি (বৃহৎবঙ্গ)। "মানসগঙ্গা"নামে বৃন্দাবনে যে একটি সরোবর আছে,তা বোধ হয় তাঁর স্মরণ ছিল না। বৈষ্ণবপদাবলীর আধ‍্যাত্মিক ব‍্যাখ‍্যা অবশ‍্য সর্বত্র করা যায়। কিন্তু তাতে কাব‍্যরস একেবারে উড়ে যায়।*
*🌻শুধু তাইই নহে ; বর্ষার গতিক চেয়ে দেখ। বিদ‍্যুৎ চমকাচ্ছে, মনে হয় যেন দশদিকে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।চেয়ে দেখতেই চোখের মণি ঠিকরিয়ে বা ঝলসিয়ে যায়।ঐ শোন ঘন ঘন অশনিপাত।শুনলেই প্রাণ কেঁপে উঠে! এই দুর্যোগে অভিসারে যাবে?*
*🌷দশ দিশ দামিনী দহন বিথার।*
*🌷হেরইতে উচকই লোচন তার।।*
*🌷ঘন ঘন ঝন ঝন বজর নিপাত*।
*🌷শুনইতে শ্রবণে মরমে মরি যাত।।*
*কিন্তু হলে কি হবে? অনুরাগের গতিই বিচিত্র। সখীরা বুঝালে কি অনুরাগিনী ফিরবে? কেউ যদি ধনুতে শর বা তীর যোজনা করে,তবে আকর্ণ সন্ধান করলেও সে বাণ ধনুত‍্যাগ করতে পারে, না-ও করতে পারে। কিন্তু যে বাণ ধনুত‍্যাগ করেছে, সে বাণকে আর কি শত চেষ্টা করেও ফেরানো যায়*?
*🌷গোবিন্দদাস কহ ইথে কি বিচার।*
*🌷ছুটল বাণ কিয়ে যতনে নিবার।।*
*🌹মহাভাবস্বরূপিণী কৃষ্ণানুরাগিনী শ্রীমতী রাধাঠাকুরাণী সখীদের কথায় তাঁর অভিসার-সঙ্কল্প ত‍্যাগ করলেন না। তিনি বলিলেন=*
*কুলবতী কঠিন কপাট উদঘাটলুঁ,*
             *তাহে কি কাঠ কি বাধা।*
*কুল মরিয়াদ সিন্ধু সঙ্গে পঙারলু,*
            *তাহে কি তটিনী অগাধা।।*
*🌻কুলবতী সতী তার দুস্ত‍্যজ কুলধর্ম ত‍্যাগ করতে পারিল, আর কাঠের কবাট তার গমনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে?কুলমর্য‍্যাদারূপ সিন্ধু আমি হেলায় গোস্পদের মত পার হলাম,আর ক্ষুদ্র তটিনী (মানসগঙ্গা) আমার কাছে দুস্থর হবে?সখী!তোমরা আমার মন পরীক্ষা করছ মাত্র ; তোমরা তো আমাকে ভালভাবেই জানো,আর আমাকে পরীক্ষা করিও না।প্রিয়তম কি যে আকুল হৃদয়ে আমার পথ চেয়ে আছেন,তা ভেবে আমার প্রাণ কেঁদে উঠছে।*
   *🌷সখি হে মঝু পরীখন কর দূর।*
*কৈছে হৃদয় করি,পন্থ হেরত হরি,*
     *সোঙরি সোঙরি মন ঝুর।।*
*🌻সখী! আমার জন্য তোমরা ভাবিও না।কোটি কুসুম-শরেযার হৃদয় জর্জরিত,বর্ষায় তার কি করবে? যার হৃদয় বিরহ-দহনে অহর্নিশি পুড়ে ছাই হচ্ছে,বজ্রপাত তার পক্ষে কি এতই কষ্টদায়ক?যাঁর পদে আমার মন-প্রাণ,তিল-তুলসী দিয়ে সমর্পণ করেছি,তাঁর কাছ হতে দেহের কথা আর কি ভাবিব?*
*কোটি কুসুমশর, বরিখয়ে যছুপর,*
      *তাহে কি জলদজল লাগি।*
*প্রেম দহন দহ, যাক হৃদয়ে সহ,*
      *তাহে কি বজরক আগি।।*
*যছু পদতলে হাম,জীবন সোঁপলু,*
      *তাহে কি তনু অনুরোধ।*
*গোবিন্দ দাস, কহই ধনি অভিসর,*
        *সহচরী পাওল বোধ।।*
*👣তুমি অভিসার কর। আর কিছু বলতে হবে না ; এবারে সখীগণ বুঝতে পেরেছেন।সখীগণ আর বাধা দিবার চেষ্টা করলেন না।শ্রীমতী তখন নূপুর খুলে রাস্তায় বাহির হলেন।নূপুরের ধ্বনিতে প্রতিবেশী জাগবে। আর প্রাণকান্তের জন্য অভিসারে মঞ্জীরের বা নূপুরের প্রয়োজন কি?শুধু গতি-বাধা জন্মাবে বৈ তো নয়। যা কিছু বাধা জন্মাতে পারে, বিলম্ব ঘটাতে পারে,অনুরাগবতী সে সমস্ত একে একে পরিত‍্যাগ করলেন। প্রথমে লীলাকমল ফেলে দিলেন।পরে মাথার মোতির মালা খুলে ফেললেন। তারপরে গলার মণিময় হার ছুঁড়ে ফেললেন।"দূর কর সোতিনী মোতিম হার"। কেবল নীল শাড়ীটি অঙ্গে রইল, অলঙ্কারের ভার হতে মুক্ত হয়ে সুন্দরী অভিসারে চলিলেন।*
*🌷রস ধাধর্সে চলু পদ দুই চারি।*
*🌷লীলাকমল তেজল বরনারী।।*
*🌷পরিহরি মৌলিক মালতি মাল।*
*🌷তেজল মণিময় গীমক হার।।*
  ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆
*🌷বেশ-শেষ রহু নীলিম বাস।*
*🌷মিললি নিকুঞ্জে কহ গোবিন্দদাস।।*
*🌹কিন্তু পথে নানা বিঘ্ন ঘটিল। "তরল জলধর বরিখে ঝর ঝর" অমনি বিদ‍্যুৎ চমকালো। অভিসারিনী মনে করলেন, কেউ পথের ধারে স্ফটিকস্তম্ভ রোপণ করেছে।পিছল পথ,পরতে পরতে স্ফটিকস্তম্ভ বিদ‍্যুদ্দামবিদ্ধ বিপুল জলধারা ধরতে গেলেন।উদ‍্যত-ফণ সাপের মাথার মণি দেখে মনে করলেন বুঝি কেউ দীপ জ্বেলেছে,তাঁর অভিসারে বাধা দিবার জন্য।অমনি বামহাতে সেই দীপ আবরণ করলেন। কিন্তু তখনি বুঝলেন এ তো দীপ নয়, এ যে ভীষণ সর্পের মাথার মণি!তখনই সমস্ত শরীর কেঁপে উঠিল।বুঝি সাপের ছোঁবলে আজ প্রাণ যায়! প্রাণ যায় যাক এতে দুঃখ নেই, কিন্তু বঁধূর সঙ্গে দেখা হল না, এ বড় দুঃখ কেমন করে সইব?*
*হেরি দামিনী, ফটিক তরু জানি,*
       *চমকি ধরু নীরধার রে।।*
*দেখি ফণি মণি, দীপ জ্বলু জানি,*
       *বাম কর দেয় ঝাঁপি রে।*
*জানি যুবতী, এহি ফণি পতি,*
      *সঘনে তনু উঠে কাঁপি রে।।*
*🌻কিন্তু বন্ধু তো নিশ্চিন্ত নাই আমার জন্য। এই চিন্তা করতে করতে পথে চলেছেন শ্রীমতী। অপরদিকে শ্রীকৃষ্ণ মনে মনে বলছেন, আমার প্রিয়তমা যেভাবেই হোক কেন সে আমার সঙ্গে দেখা করবেই, এতই মনের জোর শ্রীকৃষ্ণের।রাধারাণী পথ চলতে চলতেই পথেই অর্ধপথে প্রাণবঁধূর সঙ্গে মিলন হল। মিলন যে হবে সেকথা একেবারেই জানা, গোবিন্দ দাস ভাবছেন যে,যখন পথ মধ্যেই সাক্ষাৎ হয়ে গেল,আর কষ্ট দিবার প্রয়োজন কি? দুষ্ট মন্মথ এইভাবে প্রেম পরীক্ষা করে। (বৈষ্ণব পদাবলী, ৬১৪ পৃষ্ঠা, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ‍্যায়)।*
*🌷গুণি-গুণি আকুল চলল মুরারি।*
*🌷মীলল আধ পন্থে বরনারী।।*
*🌷গোবিন্দদাস কহই পুন ধন্দ।*
*🌷প্রেম পরীখত মনমথ মন্দ।।*
*🙏এখানেই "বাদল অভিসার" রইল।*
👣👣👣👣👣👣🙏👣👣👣👣👣👣
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫৩)🙌বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🙌*
            *🍒ঝুলন--লীলা🍒*
         🌳🌳🌳🌳🌳🌳🌳🌳
*🌻হিন্দুদের পূজাপার্বণ সম্বন্ধে আলোচনা করলে দেখা যায় যে, কৃষিকার্য‍্যের সঙ্গে তাদের কিছু-না-কিছু যোগ আছে। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ,কাজেই আমাদের আমোদ-প্রমোদ পূজাপার্বণ কৃষিকর্মের প্রতি লক্ষ্য রেখে অনুষ্ঠিত হয়।রাবণবধের জন্য শ্রীরামচন্দ্রকে অকালবোধন করতে হয়েছিল ; সেই কারণে আমাদের প্রধান উৎসব দূর্গাপূজা শরতেই সম্পন্ন হয়।রাবণবধের প্রয়োজনীয়তা থাক বা না থাক,ঐ সময়ে কৃষীজীবিগণের প্রচুর অবসর। সেইজন‍্য উৎসবের দেশব‍্যাপী আয়োজন।দূর্গাপূজার নাম সেইজন‍্য দূর্গোৎসব। অন‍্য কোনও পূজার এরকম আনন্দবহ নামকরণ হয়নি। দূর্গোসবের পরে পরপর লক্ষ্মীপূজা,শ‍্যামাপূজা,কার্তিকপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা,নবান্ন প্রভৃতি। বৈষ্ণবগণ তাঁদের উৎসবের পরিকল্পনায় আর একটু অগ্রসর হয়েছেন বলে বোধ হয়। প্রকৃতিকে তাঁরা ধর্মকর্মের সঙ্গে গেঁথে নিয়েছেন।এটিই স্বাভাবিক, কারণ বৈষ্ণবগণ ধর্মের প্রয়োজনে কাব‍্য ও অলঙ্কারশাস্ত্রকে জুড়ে দিয়েছেন।যাঁদের দেবতা অখিলরসামৃতমূর্তি, ভজন যাঁদের "রম‍্যা কাচিৎ উপাসনা" সাধ‍্য যাঁদের প্রেম,তাঁদের সৌন্দর্য্যবোধ কিছু প্রবল থাকবে, এইই তো আশা করা যায়। বৈষ্ণবদের তিনটি প্রধান উৎসব তিন চন্দ্রমা-শালিনী পূর্ণিমা রজনীতে অনুষ্ঠিত হয়।প্রাবৃট (বর্ষাকাল) পূর্ণিমায় ঝুলন, শারদীয়া পূর্ণিমায় রাস, ফাল্গুনী পূর্ণিমায় হোলি। ভগবানের এই তিনটি লীলায় মনোমুগ্ধকর।প্রত‍্যেকটিতেই আনন্দের হিল্লোল বহে যায়। সৌন্দর্য্য আনন্দের একটি অপরিহার্য‍্য উপাদান। সৌন্দর্য্যকে বাধা দিলে আনন্দের অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ভক্ত ভগবানকে দেখেন প্রকৃতির অফুরন্ত সৌন্দর্য্যের মধ্যে। যে সৌন্দর্য্য ইন্দ্রিয়াতীত,অতীন্দ্রিয়,নয়নমনের অগোচর,তাতে ব্রহ্মবিদ পরমহংসগণ তৃপ্ত হন।শ্রীকৃষ্ণের লীলা-কথা হৃৎকর্ণ-রসায়ন,আপামর সাধারণ সকলের পক্ষেই মধুর।স্বভাবশোভাও সকলের উপভোগ‍্য,সকলেরই অধিগম‍্য বা শিক্ষণীয়।কাজেই এই স্বভাবশোভার মধ্যে ভগবানকে পেলেও পাওয়া যেতে পারে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য যদি ভগবদ্ ভক্তির উদ্দীপনা জোগাতে না পারে, তবে আর কিসে পারবে?আকাশে যখন রামধনু আঁকে,তখন মনে পড়ে সেই মোহনচূড়া।উপাস‍্য তখন নবমেঘের অন্তরালে রূপায়িত হয়ে উঠেন সেই ইন্দ্রধনুর অপরূপ রঙের বাহারে।*
*🌷আকাশ চাহিতে কিবা,*
             *ইন্দ্রের ধনুকখানি,*
                  *নবমেঘে করিয়াছে শোভা।*
                           *(জ্ঞানদাস)*
*🍀যমুনার কালো জলে চাঁদের আলো পড়ে চিকমিক করছে। অমনি ভক্তের মনে পড়ে গেল,কৃষ্ণের কালো অঙ্গে সোনার অলঙ্কারের কথা।*
*🌷আভরণ বরণ কিরণে অঙ্গ ঢর ঢর,*
 *কালিন্দী জলে যৈছে চান্দকি চলনা।*
                     *(নয়নানন্দ)*
*🔷নীল আকাশে মেঘ করেছে, তাতে বিদ‍্যুৎ খেলছে। গোধূলি বেলায় ঝাঁকে ঝাঁকে বকের সারি সেই আকাশের বুকে মালা দুলিয়েছে (অস্তম্ভতোরণস্রজাং=কালিদাস)। এমন সময় পূর্বাকাশে পূর্ণচন্দ্র দেখা দিলেন।এ চিত্র কেমন লাগে? এই সৌন্দর্য্য স্মরণ করিয়ে দেয় না কি সেই ভগবানকেই, যাঁর নীলকান্তোপম অঙ্গে পীতবসন ঝলমল করছে,যাঁর সুপ্রসর বক্ষে মালতীর মালা দুলছে,যাঁর ললাটে চন্দনবিন্দু শোভা পাচ্ছে?*
*উজোর হার উর,পীত বসন ধর,*
        *ভাল হি চন্দন বিন্দু।*
*মিলিত বলাকিনী,তড়িত জড়িত ঘন,*
       *উপরে উজোরল ইন্দু।।*
                   *(ঘনশ‍্যাম দাস)*
*🌺কেউ কেউ বলেন,বাংলা কবিতায় স্বভাব-শোভার বর্ণনা নাই। কিন্তু বৈষ্ণব কবিতা পড়লে সে ধারণা বেশীক্ষণ টিকবে পারে না।ঝুলন লীলায় বর্ষার শোভা যেভাবে বর্ণিত হয়েছে,তাতে সৌন্দর্য্য অনুভূতির যে কোনও ত্রুটি আছে এমন বোধ হয় না।বর্ষার বর্ণনা বর্ষাভিসারেও আছে, স্বপ্নদর্শনেও আছে। বর্ষাভিসারে শ্রীমতী অভিসারে যাচ্ছেন প্রকৃতির দারুণ বিপ্লবের মধ্যে।*
*🌷দশদিশ দামিনী দহন বিথার।*
*🌷হেরইতে উচকই লোচন তার।।*
*🌷ঘন ঘন ঝন ঝন বজর নিপাত*।
*🌷শুনইতে শ্রবণে মরমে মরি যাত।।*
                           *(গোবিন্দদাস)*
*🍁সখিরা অনেক নিষেধ করল, কিন্তু অভিসার ব‍্যাহত হল না। শ্রীমতী চলিলেন=*
*🌷তরল জলধর বরিখে ঝর ঝর*।
*🌷গগনে গরজে ঘন ঘোর।।* *(কবিশেখর)*
*🌹শ্রীমতী প্রাণবন্ধুকে স্বপ্নে দেখলেন সে এক বর্ষার রজনীতে। "স্বর্গে মর্ত‍্যে স্বপনের গুপ্ত আনাগোনা" বর্ষার নিভৃত নিশীথেই সবচেয়ে বেশী বোধ হয়। মনে পড়ে,ইংরেজ কবি স্বপ্নের নিভৃত নিকেতন নির্মাণ করেছেন বর্ষার বারিধারার মাঝখানে ; নিঝুম রাত, টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, দূরে কুকুর ডাকছে একঘেয়ে রবে,প্রতিধ্বনি মিলাচ্ছে দূর আকাশের কোলে।☆Spenser : Faery Quene, Canto 1. এই তো স্বপ্নের বিলাসভূমি। শ্রীরাধিকাও স্বপ্ন দেখছেন এক শ্রাবণ রজনীতে। গুর্ গুর্ মেঘ ডাকছে, মন্দ মন্দ বৃষ্টিপাত হচ্ছে,রাত্রি ঝাঁ ঝাঁ করছে ; ঝিল্লীর রবে নিস্তব্ধতা নিবিড় হয়ে উঠছে।দূরে পর্বতের উপর ময়ূরের কেকাধ্বনি শোনা যাচ্ছে,ভেকের দল বর্ষার উৎসবে মেতে উঠেছে।*
*রজনী শাঙন ঘন,ঘন দেয়া গরজন,*
        *রিমিঝিমি শবদে বরিষে।*
☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆
*শিখরে শিখন্ড রোল,মত্ত দাদুরী বোল,*
       *কোকিল কুহরে কুতূহলে।*
*ঝিঁ ঝাঁ ঝিনিকি বাজে, ডাহুকী সে গরজে,*
       *স্বপন দেখিলুঁ হেনকালে।।*
                              *(জ্ঞানদাস)*
🦚🦚🦚🪷🪷🪷🌷🌷🌷🌸🌸🌸🪔
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫৪)🌹বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🌹*
         *🍒ঝুলন---লীলা🍒🍒*
       🌲🌲🌲🌲🌲🌲🌲🌲🌲
*🌳বৈষ্ণব কবিগণ শাঙন বা শ্রাবণ ঘন বিভাবরীর(যে সূর্য‍্যকে আবরণ করে,বা রাত্রির) মোহে মুগ্ধ।কি মিলনে,কি বিরহে কবিমাত্রেরই মনে পড়ে বর্ষার মেঘমেদুর আকাশ ; যমুনার কুল,বনভূমি, তমালছায়ায় শ‍্যামায়মান, রাত্রির সমাগত,মেঘে মেঘে গগন ছেয়ে গিয়েছে, আহা কি চমৎকার পরিবেশ!শ্রীরাধামাধবের নিভৃত কেলি-বিলাসের এমন সুন্দর উদ্দীপনময়ী প্রাকৃতিক অবস্থা আর হতে পারে না।শ্রীজয়দেবের বহুপূর্বে কালিদাস নির্বাসিত যক্ষকে এমনই এক বাদল ঘন সন্ধ‍্যায় বিরহের অশ্রুতে প্লাবিত করেছিলেন। আষাঢ়ের প্রথম দিনে মেঘাড়ম্বর দেখে বিরহী যক্ষ ব‍্যাকুল,বিচলিত,বিভ্রান্ত হয়েছিল। এমন প্রত‍্যাসন্ন (আকাঙ্খাযুক্ত) শ্রাবণের বাদল দিনে প্রণয়িণী যার কন্ঠলগ্না,সে ভাগ‍্যবানের হৃদয়ও কাতর হয়ে উঠে, সুদূর প্রোষিত (প্রবাসী)কান্তের তো কথায় নাই!এই আষাঢ়ের প্রথম দিনে মেঘবর্ষার বর্ণনা দেখে আমার মনে হয় কবিকুলতিলক বাংলা দেশের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ নহিলে পয়লা আষাঢ়ের স্নিগ্ধ মাধুরী আর কোথায়ও এমনভাবে অনুভব করা যেত কি?যাইহোক, কালিদাস তাঁর মেঘদূতে মিলন ও বিরহের উদ্দীপক রূপে বর্ষাকে প্রেমের দেউলে চির-প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। বিদ‍্যাপতিও এই বর্ষার ছবি এমন করে এঁকেছেন যে জগতে তার তুলনা মালা কঠিন।*
*গগনে অব ঘন- মেহ দারুণ,*
       *সঘন দামিনি ঝলকই।*
*কুলিশ পাতন, শবদ ঝন ঝন,*
       *পবন খরতর বলগই।।*
*☘বিরহ-বর্ণনায় এই বর্ষার সমাবেশ আরও সুন্দর হয়েছে। শ্রীমতী রাইধনি আজ একাকিনী নিতান্ত নিঃসঙ্গভাবে কাটাচ্ছেন। "দোসর জন নাহি সঙ্গ "। এমন সময়ে বর্ষা নামিল। "বরিষা পরবেশ,পিয়া গেও দুর দেশ, রিপু ভেল মত্ত অনঙ্গ"। প্রিয়সঙ্গ লালসা প্রবল হ'ল।*
     *সজনি আজু শমন-দিন হোয়।*
*নব নব জলধর, চৌদিকে ঝাঁপল,*
    *হেরি জিউ নিকসয়ে মোয়।।*
*❤প্রাণ বাহির হয়ে যাচ্ছে।প্রিয় যে নেই এমন বর্ষার নিশিতে, এ দুঃখের কি আর অবধি আছে?*
  *সখী হে হামার দুখের নাহি ওর।*
*এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর,*
             *শূন‍্য মন্দির মোর।।*
*⚪এই "শূন‍্য মন্দির" কথাটির মধ্যে যেন জগতের হাহাকার পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে।*
*ঝম্পি ঘন গর, জন্তি সন্ততি,*
     *ভুবন ভরি বরি খন্তিয়া।*
*কান্ত পাহুন, কাম দারুণ,*
       *সঘনে খরশর হন্তিয়া।।*
*🏞চারিদিকে মেঘ ঝেঁপেছে ও মুহুর্মুহু গর্জন করছে।ভুবন ভরে বর্ষণ নেমেছে। আমার প্রাণকান্ত প্রবাসে বা অনেকদূরে রয়েছে আর দারুণ অনঙ্গ আমার প্রতি খরতর শর বর্ষণ করছে।( স্মরণ রাখা ভাল যে,ব্রজেরলীলা নিষ্কামলীলা, অপ্রাকৃতিকলীলা, আমরা প্রাকৃতিক, বুঝতে যেন ভুল না হয়,আমরা মাতৃ শোণিত ও পিতৃ শুক্র দ্বারা জন্ম হয়েছে, আমরা কোনদিনই কামদেবের সামনে দাঁড়াতে পারব না, কিন্তু ব্রজের গোপিনীগণ কামদেবকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন, মনে রাখতে হবে)। [ঐ বারিধারা আমাকে কন্দর্পশরে জর্জরিত করছে]।*
*কুলিশ কত শত, পাত মুদিত,*
         *ময়ূর নাচত মাতিয়া।*
*মত্ত দাদুরী, ডাকে ডাহুকী,*
         *ফাটি যাওত ছাতিয়া।।*
*তিমির দিগভরি, ঘোর যামিনী,*
      *অথির বিজুরিক পাঁতিয়া।*
*বিদ‍্যাপতি কহ, কৈসে গোঙায়বি,*
       *হরি বিনে দিন রাতিয়া।।*
*🌹এমন সুন্দর বোধ আর কোনও দেশের কবিতায় নেই।এরকম শব্দচিত্র কোনও ভাষায় কখনও অঙ্কিত হয়নি। "হরি বিনে" এই দীর্ঘ দিন-রাত্রি কেমন করে অতিবাহিত করব? বিল্বমঙ্গল ঠাকুর আর একদিন এমনই কাতর কন্ঠে বলেছিলেন=*
*🌷অমূন‍্যধন‍্যানি দিনান্তরাণি হরে ত্বদলোকনমন্তরেণ।*
*🌷অনাথবন্ধো করুণৈকসিন্ধো হা হন্ত হা হন্ত কথং নয়ামি।।*
*🙏হে হরি!তোমার অদর্শনে এই অধন‍্য দিনগুলি কিভাবে কাটাব? হায়!হায়!হে অনাথের বন্ধু!করুণার সাগর!বলে দাও বিরহের এই দীর্ঘ দিনগুলি কেমন করে যাপন করব?*
*যাক্ আর বিরহের কথা আর বলব না। ঝুলনলীলার মধ‍্য দিয়ে বৈষ্ণব কবিগণ যে মিলনের সুর গেয়েছেন, তারই এক আধটি তান যদি ধরতে পারি,সেই চেষ্টা করব।যমুনার কুলে, বটবৃক্ষের ডালে নবীন লতা দিয়ে সুন্দর একটি হিন্দোলা টাঙ্গানো হয়েছে। তাতে নানারকম বর্ষার কুসুম দিয়ে মনোহর সজ্জা করা হয়েছে।ভ্রমরকুল ঝাঁকে ঝাঁকে সেই পুষ্পপুঞ্জে পড়ছে,উড়ছে,গুন গুন গান করছে। শুক,পিক,পাপিয়া সেই হিন্দোলা ঘিরে ঘিরে উড়ে বেড়াচ্ছে ও কলধ্বনি করছে=*
*🌷হিন্দোলা রচিত কুসুমপুঞ্জ,*
*🌷অলিকুল তাহে বিহরে গুঞ্জ,*
*🌷সারি শুক পিক বেঢ়ল কুঞ্জ,*
*🌷ঘেরি ঘেরি ঘেরি বোল রি।*
*⚪আজ পূর্ণিমা রজনী, "চাঁদ উজোর রাতিয়া"।মাঝে মাঝে মেঘ এসে সে স্নিগ্ধ জোছনাকে মৃদুতর, স্নিগ্ধতর করে দিচ্ছে--, "গগন হি মগন স-ঘন রজনীকর আনন্দে করত নেহারি"। শুধু যে মেঘের দল আকাশের নীল সরোবরে সাঁতার দিচ্ছে আর তার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদ উঁকি দিচ্ছেন,তা নহে।অল্প অল্ট বৃষ্টিও হচ্ছে=*
*🏞বুন্দ সুন্দর নেনি নেনি।*
*🍁এই "নেনি নেনি" বৃষ্টির বালাই যাই! প্রাচীন সাহিত‍্যে কোথাও এই খন্ড খন্ড করা ইলশে গুড়ির বর্ণনা দেখতে পাই না। কিন্তু ঝুলনলীলার পক্ষে এমনই এক বর্ষার রাত্রি চাই,ঝড়ঝঞ্ঝা দুর্যোগ চাই না।*
*বারিদ গরজি, গরজি সব ঘেরল,*
           *বুন্দ বুন্দ করু পাত।*
*কহ শিবরাম, মলয়াচল দুহুঁ পর,*
       *মৃদু মৃদু করতহি বাত।।*
*❤ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির সঙ্গে মলয় বাতাস বহিছে।ময়ূর কেকারব করছে, চকোর-চাতক-শুক-পিক মধুর গান করছে,অলি-ঝঙ্কারেকানন ভরেছে। নদীর কূলে ব‍্যাঙ ডাকছে,আর সেই ধ্বনির সঙ্গে ধ্বনি মিশিয়ে গগনে গুর্ গুর্ দেয়া ডাকছে।*
*বদত মোর, চকোর চাতক,*
       *কীর কোইল অলিগণি।*
*রটত দরদা-, তোয়ে দাদুরী,*
        *অম্বুদাম্বরে গরজনি।।*
                            *(শিবরাম)*
*"পরম সুঘড় শিরোমণি" অখিল কলাগুরু শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র এমনই দিনে ঝুলনায় বসেছেন।সখীগণ ব্রীড়াসঙ্কুচিতা রাধাকেও তুলে দিলেন। তখন সেই লতার ডুরি ধরে সখীরা দোলা দিতে লাগলেন। এটিই "নওল-নওলী" রাধাকৃষ্ণের ঝুলন।*
*🌷কিয়ে অপরূপ ঝুলন কেলি,*
      *শ‍্যাম হৃদয়ে হৃদয় মেলি,*
                      *রাধা রহু লাগি।*
                            *(উদ্ধবদাস)*
*🌹শ্রীমতী ঝুলনার ঝোঁকে যত চমকাতে লাগলেন, নায়কশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ তত তাঁকে আলিঙ্গন পাশে আবদ্ধ করলেন।*
*🌺ঝুলনা-ঝমকে চমকে রাই,*
*🌺বিহসি মাধব ধরল তাই,*
*🌺আনন্দে অবশ পরশ পাই,*
           *🌺চাপি করত কোলে রি।*
                          *(কৃষ্ণদাস)*
*🌹কিছুক্ষণ পরে তিনি দোলনার দুলুনিতে অভ‍্যস্ত হলেন। কিন্তু সখীরা যখনই কৌতুকে "অতিহুঁ বেগে" দোলা দোলাচ্ছেন, তখনই রাইধনি উৎকণ্ঠিত হয়ে সখীগণকে অনুনয় করছেন, তোমরা একটু ধীরে ধীরে ঝুলাও,পাছে আমার প্রাণবন্ধু পড়ে যান।*
*🌷ঝুলায়ত সখীগণ করতালি দিয়া।*
*🌷সুবদনী কহে পাছে গিরয়ে বন্ধুয়া।।*
                         *(জগন্নাথদাস)*
*🙏বৈষ্ণব কবিগণ বর্ষার ছন্দে ঝুলন-গীতি রচনা করে পরম উপভোগের সামগ্রী করে তুলেছেন। কিন্তু লীলার মাধুর্য‍্য সকলের প্রাণে সমান আনন্দ দান করে না।শ্রীরাধামাধব কোন এক অতীত যুগে বর্ষার ঘনায়মান সন্ধ‍্যায় ঝুলনায় ঝুলেছিলেন,শুধু এইটুকুমাত্র স্মরণ করে তাঁরা ভগবল্লীলারসে অবগাহন করতে পারেননি।তাঁদের সন্ধানী চিত্ত তত্ত্বের দিক ধাবিত হয়।লীলা যে নিত‍্য বস্তু তা তাঁরা বুঝতে পারেন না।তাঁরা লীলার ফুলপাতা সরিয়ে ফলের খোঁজ করেন।তাঁদের তৃপ্তিবিধানের জন্য লীলার মধ্যে তত্ত্ব অন্বেষণ করতে হয়।*
*☘শ্রীকৃষ্ণের মুখ‍্যলীলা তিনটি।একটি রাসলীলা।এতে তত্ত্ব হিসাবে আছে বিশ্বের অফুরন্ত আনন্দের উৎসব।রাস অর্থই প্রকৃষ্ট রস।রস এব রাসঃ।রাসের আর এক অর্থ অবশ‍্য চক্রাকারে নৃত্য।চক্রধারীর রাসমন্ডলী বা রাসচক্র আনন্দের সীমাহীন পৌনঃপুনিকতা (যা পুন পুন উৎপন্ন হয় ),অনন্ত বিস্তৃত পুলকোচ্ছাস। বিশ্বের যেখানে যা কিছু সু,যা কিছু মধুর,যা কিছু আনন্দের সব তাঁরই বিকাশ। "আনন্দাদ্ধিবখল্বিয়ানি ভূতানি জায়ন্তে"।*
*🍀তাঁর আর একটি লীলা হোলি। হোলিলীলার তত্ত্ব তার বাইরের লাল রঙেই ঘোষিত হয়েছে।হোলি বা দোল ফাগের উৎসব।যার হৃদয় অনুরাগে অরুণ হয় না,ফাল্গুনের অধীর পুলক যার প্রাণে অনুরাগের ফাগ মাখিয়ে দেয় না,তার পক্ষে হোলি উৎসব ব‍্যর্থ।বিজয়া দশমী যেমন শাক্তদের পক্ষে এক পরম মৈত্রীর মালন মহোৎসব, হোলিও তেমনই বৈষ্ণবদের এক সার্বজনীন মহা মিলনক্ষেত্র। প্রীতির পিচকারি যখন লাখে লাখে ছুটে,তখন গালাগালিও কটু না হয়ে উপভোগের সামগ্রী হয়। "স্তুতি নিন্দা সকলই মধুর"। ঝুলনলীলা অপেক্ষাকৃত আধুনিক হলেও প্রাচীনকাল হতে এর ইঙ্গিত রয়েছে। ভগবানের আন্দোলন লীলা সমস্ত ছন্দ,সমস্ত গতি,সমস্ত জীবপ্রবাহের উত্থান-পতনের প্রতীক।বিশ্বে যে ছন্দ অনন্ত মাধুর্য‍্যে অনুরণিত হয়ে উঠেছে,তারই আভাস ঝুলনে পাওয়া যায়।ছন্দ নহিলে বিশ্ব যে এক মুহূর্ত‍্য চলে না।সমস্ত বিশ্বব্রহ্মান্ড ছন্দে চলছে,যদি সে ছন্দের ব‍্যতিক্রম কখনও ঘটে,তবে দিনরাত্রির ক্রমভঙ্গ হবে,সূর্য‍্য,চন্দ্র,গ্রহ,নক্ষত্র পরস্পর পরস্পরের পথ রোধ করে চুরমার হবে।সমস্ত বিশ্বে সঙ্গীতের,কাব‍্যের প্রধান সম্পদ,সুষমা,গৌরব তার বিচিত্র ছন্দ।সঙ্গীত,কাব‍্য না হলেও মানুষ বাঁচতে পারে, কিন্তু প্রাণের স্পন্দন পর্যন্ত সবই যে ছন্দ।সে ছন্দচ‍্যুতি যখন ঘটে,তখন প্রাণ নিষ্কৃতি লাভ করে মরণে,গতি মূর্ছিত হয় পাষাণের চিরস্তব্ধ স্থাবরতায়।নীহারিকাপুঞ্জ হতে আরম্ভ করে জগতের কীট পতঙ্গ অণু-পরমাণু পর্যন্ত সবই ছন্দে সুরে সৌন্দর্য‍্যে বাঁধা।তারই সূত্রডুরি ধরে আনন্দময়কে আমরা দোলায় ঝুলনে।*
🙏🌸🌷🦚🪷🙏🪔🌸🌷🦚🪷🦚🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫৫) 🌹বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🌹*
          *🌹🌹রাসলীলা🌹🌹*
          🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹
*🌹শ্রীকৃষ্ণের যত লীলা আছে,তার মধ্যে রাসলীলা সর্বোৎকৃষ্ট, তা সকল কীর্তনীয়াগণের জানা।তার কারণ এই নয় যে আমাদের লৌকিক দৃষ্টিতে রাসলীলাটি বেশী উপভোগ‍্য।কারণ এই যে,আনন্দময়ের বিকাশ এই লীলাটিতে পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হয়েছে।এটি "সর্বলীলা উৎসব মুকুটমণি"।*
*পরব্রহ্মকে লাভ করবার যে বিবিধ পন্থা আছে ইহা সর্বজনবিদিত।কেউ মনে করেন যাগযজ্ঞের দ্বারা ভগবানকে লাভ করা যায় ; কেউ মনে করেন, তিনি তত্ত্বজ্ঞান লভ‍্য। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে,তিনি পরম আস্বাদ‍্য।তাঁর চিন্তনে,মননে,ধ‍্যানে হৃদয়ের আনন্দ উথলিয়ে উঠে।যাঁরা যাগযজ্ঞের দ্বারা ভগবানকে লাভ করতে বা পরম পদ পেতে ইচ্ছে করেন,তাঁরা বলেন, "অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে স্বর্গ লাভ হয় "।যাঁরা বিজ্ঞানবাদী,তাঁদের মতে সত‍্যং জ্ঞানং অনন্তং ব্রহ্ম।ইঁনারা নির্বিশেষ,নির্বিকল্প, ত্রিগুণাতীত ব্রহ্ম স্বরূপ চিন্তা করে এক অখন্ড জ্ঞানময় রাজ‍্য লাভ করেন ; সেখানে সকল ভেদ দূরীভূত হয়ে গিয়ে কৈবল‍্য প্রাপ্তি ঘটে।ব্রহ্মভূত এই আত্মা দুঃখ শোকের অতীত,তার সমস্ত বাসনা আকাঙ্ক্ষা ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে। "ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্ম ন শোচতি ন কাঙ্খতি"।*
*🍀কিন্তু একদিন ঋষি বলে উঠলেন যে ব্রহ্ম শুধু জ্ঞানময় নহেন ; তাঁকে জানলে যে সব সংশয়ের অবসান হয়, সব বন্ধনের মোচন হয়, শুধু তাইই নয় ; তিনি আনন্দ স্বরূপ। "রসো বৈ সঃ"। তাঁকে জানলে আনন্দে হৃদয় ভরে যায়।তাঁকে পাবার জন্য, ধরবার জন্য হৃদয়ে লোভ জন্মে। সাহিত‍্যদর্পণকারের মতে রস অর্থে যা আস্বাদন করা যায়। কিন্তু আমাদের আস্বাদ‍্য কি? স্থূলভাবে দেখতে গেলে আস্বাদ‍্য--,কটু,তিক্ত,কষায়,লবণ,অম্ল ও মধুর।এর সাধন আমাদের জিহ্বা।সেইজন‍্য তার নাম রসনা।সমস্ত জন্তুরই রসনা আছে। কাজেই এর আস্বাদন অত‍্যন্ত স্থূল।এই প্রাথমিক স্তরের উপরে উঠবার যোগ‍্যতা কেবল মানুষেরই আছে।সেজন‍্য মানুষের পক্ষে অন‍্য একটি বিরাট রাজ‍্যের দ্বার খুলে গিয়েছে।তার নাম আধ‍্যাত্মিক রাজ‍্য। এ রাজ‍্যে অন‍্য কোনও জীবের প্রবেশ অধিকার নাই।এই আধ‍্যাত্মিক রাজ‍্যের বাহ‍্যপ্রকাশ সাহিত‍্য।সাহিত‍্যে আস্বাদনের উপকরণ বহু।অলঙ্কার শাস্ত্র এবং মনোবিজ্ঞান সেগুলিকে শ্রেণীবদ্ধ করে বলেছেন রস নয়প্রকার=শৃঙ্গার বা আদি,বীর,রৌদ্র, করুণ,হাস‍্য,ভয়ানক,বীভৎস,অদ্ভুদ ও শান্ত।কারও মতে বাৎসল‍্য রসও গণনীয়।এই সব রসের মূলতত্ত্ব খোঁজ করলে দেখা যায় যে,এর মধ্যে একটি সামগ্রী অন্তর্নিহিত আছে যা সমস্ত সাহিত‍্যসৃষ্টি ও কল্পনার বিলাসকে আস্বাদ‍্য করে তুলে।তার নাম আনন্দ। সত‍্যং জ্ঞানং আনন্দং ব্রহ্ম।যে আনন্দ হতে সমস্ত ভূতনিবহ জন্মলাভ করে,যে আনন্দ লাভ করে তারা আহ্লাদিত হয়,আবার যে আনন্দে তারা বিলীন হয়,সেই আনন্দই তো ব্রহ্ম।এই আনন্দ না হলে প্রাণীকুল বাঁচে না। মানুষের আত্মা আনন্দের সন্ধানেই ব‍্যাপৃত। পরব্রহ্মকে যখন আনন্দময়,মাধুর্য‍্যময়,পরম আস্বাদ‍্য বলে জানা গেল তখনই তো তিনি রূপে রসে মূর্তিমান হয়ে উঠলেন। ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ। তিনি মূর্তিধারী পরম মনোহর, সুন্দর রূপশ্রী-সমন্বিত পুরুষ।সুন্দর বলেই তিনি কৃষ্ণ।কারণ তাঁর আকর্ষণী শক্তিতে বিশ্ব বিমুগ্ধ।তাহলেই বুঝলাম যে,একদিকে ভগবান তাঁর অনন্ত সৌন্দর্য্য মাধুর্য‍্য বিস্তার করে দাঁড়িয়েছেন,অন‍্যদিকে সমস্ত বিশ্বের চিত্ত লোলুপ হয়ে তাঁর দিকে অনন্তকাল হতে ধাবিত হচ্ছে। এটিই রাসের মর্মকথা বলে বোধ হয়।*
*🌹এই তত্ত্বের স্ফুরণ লীলায়।তত্ত্ব আর লীলা আপাত দৃষ্টিতে পৃথক বলে মনে হয়। কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখলে বুঝা যায় যে,এই দুইয়ের মধ্যে অপূর্ব সামঞ্জস্য বিদ‍্যমান রয়েছে।তত্ত্ব না জানলে লীলা শুষ্ক ইতিহাসের উপাদান হয়ে পড়ে।আবার লীলায় প্রবেশ না করলে তত্ত্ব নীরস তর্কে পর্যবসিত হবার আশঙ্কা থাকে।ভগবদগীতা ভক্তিতত্ত্বের সমুদ্র ; মহাভারত লীলার খনি। এই তত্ত্ব ও লীলার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে বৈষ্ণবগণ তাঁদের ধর্মমত স্থাপন করেছেন।এ দুইয়ের মধ্যে যে বিরোধ আছে,তা তাঁরা কখনও স্বীকার করেন না। আমাদের অবস্থা অন‍্যরকম।আমরা যখন বৈদান্তিকের দৃষ্টি নিয়ে শ্রীকৃষ্ণলীলা বুঝতে যাই, তখন লীলার অসঙ্গতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি। আর যখন ঐতিহাসিকের দৃষ্টি নিয়ে লীলার আলোচনা করতে যাই,তখন খৃষ্টান ধর্মযাজকের মতো লীলার কামায়নপরতা (Eroticism) প্রমাণ করতে রত হই।◆(বঙ্কিমচন্দ্র বলেন, রাসলীলা গোপীগণের ঈশ্বরোপসনা। একদিকে অনন্ত সুন্দরের সৌন্দর্য্য বিকাশ আর একদিকে অনন্ত সুন্দরের উপাসনা••••••••••••*
*◆যাকে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় একজায়গায় বলেছেন-----, It is eroticism run wild--রাসলীলা ৬৫ পৃষ্ঠা।)*
*🌻মনে রাখতে হবে,কৃষ্ণলীলাকে বিষয়বস্তু করে আমাদের দেশে নানা পুরাণ,কাব‍্য ও সঙ্গীত রচিত হয়েছে।*
*বিশেষ করে পুরাণগুলিতে ধর্ম ও কাব‍্যের সংমিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়।রস না হলে কাব‍্য হয় না।রসের মধ্যে আদিরস শ্রেষ্ঠ--,আদ‍্য এব পরোরসঃ।সেইজন‍্য শ্রীজয়দেবের গীতগোবিন্দ আমাদের দেশে সর্বত্র ধর্মগ্রন্থে।সম্মান লাভ করতে পেরেছেন। শ্রীজয়দেব শুধু শ্রীকৃষ্ণলীলা বর্ণন করতে বসেন নাই, তিনি চেয়েছেন শৃঙ্গাররসের আদর্শরূপে শ্রীকৃষ্ণকে চিত্রিত করতে।তাঁর কাব‍্যে শ্রীকৃষ্ণ মূর্তিমান শৃঙ্গাররস, শৃঙ্গাররসের অধিদেবতা। শৃঙ্গার রস কাকে বলে তা অলঙ্কারশাস্ত্রে ব‍্যাখ‍্যা করেছেন।সেই অলঙ্কারশাস্ত্রসম্মত রসকে প্রাকৃত নায়ক নায়িকার রভসকেলির মধ‍্য দিয়ে না ফুটিয়ে জয়দেব গোস্বামী রাধাকৃষ্ণের লীলায় প্রকাশ করেছেন।আমাদের বিংশ শতাব্দীর নৈতিক কান্ডজ্ঞান তাতে পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হয়।আমরা ভাবি যে,যিনি এমন সুন্দর দশাবতার স্তোত্র গ্রথিত করেছেন,যিনি প্রতি সঙ্গীতের শেষে শ্রীকৃষ্ণকে একান্ত ভক্তির সহিত প্রণাম করেছেন,তাঁর হস্তে ভগবানের লীলা এমন কামকলায় পরিণত হল কেমন করে?*
*☘এ শুধু আমাদের দেশে নয়, ইউরোপেও ভগবানের সম্বন্ধে নানা বিরুদ্ধ কল্পনা কল্পিত হয়ে মানুষের মনকে উদভ্রান্ত করে দিয়েছে।একজন প্রসিদ্ধ দার্শনিক অন‍্য এক দার্শনিকের ব্রহ্মের সম্বন্ধে বলেছেন যে,"অনন্ত" এমনই একটি বিরাট ড্রেন যাতে সব রকমের বিরোধের স্রোত একত্র বহে চলছে।☆His Infinite is a grand sewer in which all contradictions flow together--- Hegel on Spinoza's Doctrine of Substance.☆*
*ভগবান এক অথচ বহু,তিনি অসীম অথচ সসীম, তিনি অরূপ অথচ পরম রূপবান, তিনি পরম দয়াল আবার কঠিন করাল, তিনি সমস্ত ধর্মের আদর্শ প্রতিষ্ঠাতা সংস্থাপয়িতা, আবার সমস্ত নীতির উচ্ছেদকর্তা! তিনি শুদ্ধ বুদ্ধ অপাপবিদ্ধ, অথচ তিনি ঘরে ঘরে মাখন চুরি করেছেন, স্তনপালচ্ছলে নারীবধ করেছেন, তপস‍্যার জন্য শূদ্রের শিরশ্ছেদ করেছেন, অসংখ্য নরনারী নিয়ে কেলি করেছেন। সুতরাং ইতিহাস বা চরিত্রনীতির দিক দিয়ে ভগবানের লীলা বুঝতে পারা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে এইসব বিরোধী ধর্ম ভগবানে আরোপিত হলেও, আমাদের ধর্মবুদ্ধির স্রোত কখনও রুদ্ধ হয়নি, কখনও বাধা প্রাপ্ত হয়নি।তার কারণ তর্কে তাঁকে না পেলেও আমরা তাঁকে পেয়েছি যোগে,পেয়েছি ধ‍্যানে,পেয়েছি বিশ্বাসে। এখানে একটি কথা বলা আবশ্যক মনে করি।বৈষ্ণবগণ অধিকারবাদ মানেন।তাঁদের মতে সকলের সকল বিষয়ে অধিকার নাই।যাঁদের যে রসে অধিকার সেই রসের অনুশীলন নিয়েই তাঁরা থাকবেন, অন‍্য রসের কথায় তাঁদের প্রয়োজন নেই। প্রথমতঃ অন্তরঙ্গ বহিরঙ্গ ভেদে অধিকারী দুই প্রকার।রাসলীলা প্রভৃতি অন্তরঙ্গ ভক্তেরই আস্বাদ‍্য ; এতে বহিরঙ্গের প্রবেশ অধিকার নেই। বৈষ্ণবদের মধ্যেও এমন অনেক ভক্ত আছেন যাঁরা শৃঙ্গার বা মধুর রসের গান শুনেন না।রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা শুনলে তাঁরা ত‍ৎক্ষণাৎ সে জায়গা ত‍্যাগ করেন।তাঁরা সখ‍্য,বাৎসল‍্য প্রভৃতি রসের অধিকারী। আবার দেখেছি অনেকে মধুর রস বা প্রেমলীলার আস্বাদনে বিভোর হয়ে পড়েন,কারও কারও সম্বিৎ থাকে না।এর মধ্যেও আবার অধিকার ভেদ আছে। বিপ্রলম্ভের যে চার প্রকার রস বিভাগ আছে যথা পূর্বরাগ,মান, প্রেমবৈচিত্ত‍্য ও প্রবাস,তার মধ্যে প্রবাস বা বিরহ কেউ কেউ শুনতে চান না।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫৬) 🙏বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য*
           *🌻🌻রাসলীলা🌻🌻*
       🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻
*🌹রাসলীলা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে যদি কেবল রিরংসা (রমণেচ্ছা) নিয়ে ভগবচ্চরিত্রে দোষারোপ করতে রত হওয়া যায়, তাহলেই সমস্ত কর্তব‍্যের অবসান হয় না।কৃষ্ণলীলার মধ্যে রাসলীলাই সব নহে, অন‍্যান‍্য অনেক লীলা আছে। "রাস" চৌষট্টি রসের মধ্যে একটি বটে। এছাড়াও সখ‍্য, বাৎসল‍্য প্রভৃতি রসেরও বহু লীলা রয়েছে।সে সবই যে কামায়ন প্রচুর এমন নয়।তার পর যে বিরহে বৃন্দাবন লীলার অবসান,তাতেও কি কামায়নের প্রাচুর্য‍্য আছে? যে বিরহে কাব‍্য-লক্ষ্মী অশ্রুবিসর্জন করে কুল পাননি, যে বিরহে কবিগণ বেদনার গীত রচনা করে ধন‍্য হয়েছেন, সে বিরহেও কি কামের বৈজয়ন্তী উড়েছে? যদি তা না হয়,তবে রাসলীলাকে পৃথক করে দেখা উচিত না ; পরন্তু সমস্ত লীলার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হবে। ☆হীরেন্দ্রনাথ দত্ত বেদান্তরত্ন প্রণীত "রাসলীলা" দ্রষ্টব‍্য।*
*🍀শ্রীকৃষ্ণ পরমরূপবান পুরুষ ; তাঁকে দৈখলে সাধ হয় সমস্ত ইন্দ্রিয় যদি নয়নে পরিণত হ'ত!এইরকম দেখে কি হয়?রমণীরা কামমোহিত হয়। দলে দলে তাঁর শ্রীচরণে আত্মদান করেন।*
*কহে দ্বিজ চন্ডীদাসে,কুলবতী কুল নাশে,*
      *আপনার যৌবন যাচায়।*
*🍁স্ত্রীলোকের সাররত্ন যে যৌবন,তাও ডালি (উপঢৌকন) দিতে ইচ্ছা করে।এটিই রূপের প্রভাব।রূপ যদি অন‍্যের হৃদয়ে প্রতিবিম্বিত হয়ে লালসা না জন্মায়,তবে সে রূপ রূপই না। এই রূপ দেখে বা রূপের কথা শুনে যে অনুরাগ হয়,তাহাই পূর্বরাগ। রূপ দেখে রতি জন্মে। রতি গাঢ় হলে ধরে প্রেম নাম। মিলনই তার পরিণাম।এটি আধ‍্যাত্মিক মিলন মাত্র নয়, এটি সর্বাত্মা,সর্বেন্দ্রিয়,সর্বাঙ্গের মিলন আকাঙ্ক্ষা করে।সেই জন্য একটি অনবদ‍্য কাব‍্য সম্ভব হয়েছে।*
*🌷রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।*
*🌷প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।*
*🌻তাঁর প্রতি অঙ্গে যেন অনঙ্গের তরঙ্গ খেলছে। সুতরাং অবাধ অফুরন্ত চিরন্তন মিলন ব‍্যতীত এ প্রেম চরিতার্থতা লাভ করে না। তাই মিলনের জন‍্য দৈহিক আত্মিক সর্ববিধ লালসা। কোথায়ও এতটুকু উহ‍্য (অপ্রকটিত )নাই, অভাব নাই বা ফাঁক নাই।এ যে আত্মহারা,পাগল করা,সর্বস্থপণ প্রেম।এখানে দেহের মনের প্রাণের আত্মার সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। কাজেই দেহ পশ্চাতে ফেলে মন ছুটিল আগে, যখন বাঁশী বাজিল, তখন=*
*🌹শুনত গোপী প্রেম রোপি,*
              *মনহিঁ মনহিঁ আপনা সোঁপি,*
              *তাঁহি চলত যাঁহি বোলত,*
                  *মুরলীক কল-লোলনী*।
                        *(গোবিন্দদাস)*
*যেখানে দূরে বাঁশী বাজছে সেখানে গিয়ে কৃষ্ণ দর্শনে তো বিলম্ব ঘটবে। তাই ব্রজগোপীগণ মনে মনে আত্মসমর্পণ করতে করতে ছুটলেন। এখানে অর্থ এত স্পষ্ট যে আধ‍্যাত্মিক ব‍্যাখ‍্যা করতে গেলে কাব‍্যরস সব মাটি হয়ে যাবে কিন্তু ইঙ্গিতের অভাব নাই! হাজার হাজার ব্রজগোপিনী ছুটলেন বাঁশীরবের সন্ধানে। কিন্তু কেউ কাউকেও দেখতে পেলেন না। বলা বাহুল‍্য সাধন পথের পথিক অনেক। কিন্তু সকলেই আপন মনে পথ চলেন।কেউ কাউকে দেখতে পান না।*
*🌷তত হি বেলি সখিনী মেলি,*
*🌷কেহু কাহুক পথ না হেরি।*
*🍀কাব‍্য রসটুকু বজায় থাকল অথচ অব‍্যর্থ ইঙ্গিতও রইল।শরতের পূর্ণচন্দ্র শোভা পাচ্ছে,রাশি রিশি মল্লিকা ফুল ফুটেছে, যমুনার কালো জলে চন্দ্র কিরণের রজত ঢেউ খেলছে, ফুলে ফুলে অগণিত ভ্রমর গুঞ্জন করছে,ময়ূর ময়ূরী পুচ্ছ প্রসারিত করে নৃত্য করছে।এমনই সময় ব্রজগোপীদের ভ্রমাভিসার। কৃষ্ণ যমুনার কুলে নীপমূলে ললিত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে বাঁশী বাজাচ্ছেন। গোপীকুল থমকিয়ে দাঁড়িয়ে সে রূপ দেখিল,সে বাঁশী শুনল,তারা মাধুর্য‍্যের ঝর্ণাধারা প্রাণ ভরে পান করে পাগল হ'ল।শ্রীকৃষ্ণ তাদেরকে অনেক নীতি কথা বলে নিবৃত্ত হতে বললেন।তোমাদের পতিরা গৃহে রয়েছেন,তাঁদের সঙ্গ ত‍্যাগ করে অসময়ে তোমরা বনে আসিলে কেন?এমন অধর্ম করতে নাই ইত্যাদি।ব্রজগোপীরা যে উত্তর দিলেন,তার সারার্থ উপনিষদে পাওয়া যায় ; "পতিঃ পতীনাং তুমি যে পতিরও পতি,জগৎপতি "।পুত্র-কন‍্যা সংসার কি ছার! তুমি যে প্রেয়ো পুত্রাৎ প্রেয়ো বিত্তাৎ,প্রেয়োহন‍্যস্মাৎ। কিন্তু আমরা এখানে তত্ত্বের গহনে প্রবেশ করতে চাই না। আমরা এই শারদীয় রাসের কাব‍্য আস্বাদন করতে পারলেই যথেষ্ট মনে করি। ভাগবত,হরিবংশ,ব্রহ্মপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ (প্রচলিত) এখানে কাব‍্য কথায় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। শ্রীজয়দেব গোস্বামী এই শরৎকালীন রাস পরিত‍্যাগ করে বসন্ত-বন বর্ণন আরম্ভ করে বসন্ত রাসের প্রবন্ধ করেছেন।ভাগবত এবং গীতগোবিন্দ উভয়েরই ইচ্ছা বোধহয় এই যে,অনবদ‍্য নৈসর্গিক শোভার মধ্যে এই সুন্দর কাব‍্য প্রসঙ্গের অবতারণা করবেন।উভয়েই শৃঙ্গার রসের আতিশয‍্য বর্ণনা করেছেন। এটি কাব‍্যের দিক দিয়ে অনিবার্য‍্য। কারণ রূপানুরাগ, অভিসার ও মিলনের পরে এই রাসেই আনন্দলীলার পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে।কাব‍্যের দিক দিয়ে এর সার্থকতা দুইটি। প্রথম=প্রেমিক প্রেমিকার প্রণয়ের উৎকর্ষ বুঝাতে হলে ভিন্ন গত‍্যন্তর নাই।রাসে শ্রীকৃষ্ণ গোপাঙ্গনাগণের মধ্যে শ্রীরাধাকে নিয়ে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। কেননা=*
*🌷অনেনারাধিতো নূনং ভগবান্ হরিরীশ্বরঃ।*
*🌹শ্রীগীতগোবিন্দে বসন্তঋতুতে যখন শ্রীকৃষ্ণ অন‍্যান‍্য গোপীদের সঙ্গে ক্রীড়া করছিলেন, তিনিই শ্রীরাধার রূপ হৃদয়ে নিয়ে অন‍্য ব্রজসুন্দরীগণের সঙ্গ ত‍্যাগ করলেন।এতে রাধার প্রতি প্রেমাতিশয‍্য সূচিত হল।*
*🌷রাধামাধায় হৃদয়ে তত‍্যাজ ব্রজসুন্দরীঃ।*
*🌻কেনই বা না করবেন? শ্রীকৃষ্ণকে অন‍্য রমণীর সঙ্গে বিহার করতে দেখেও শ্রীরাধা তাঁর পূর্ব প্রীতি স্মরণ করে আনন্দলাভ করলেন।*
*🌷রাসে হরিমিহ বিহিতবিলাসম্।*
*🌷স্মরতি মনোমম কৃতপরিহাসম্।।*
*🍀শরৎকালীন রাসে তিনি আমার সঙ্গে যে সব লীলাবিলাস প্রকাশ করেছিলেন, আমার সঙ্গে যে হাস‍্য পরিহাস করেছিলেন, তাইই স্মরণ করে আমি তাঁরই মিলন কামনা করছি।*
*☘আগেই বলেছি যে,লীলার সঙ্গে তত্ত্বের সামঞ্জস্য বিধান এই সব কবির এক অনন‍্যসাধারণ নৈপূণ‍্য।বহুবল্লভ যিনি,তাঁকে পেতে হলে একান্ত আনুগত‍্যের প্রয়োজন।কবি কৌশলে তাইই দেখিয়ে তাঁর বসন্তসময়বনবর্ণনা সমন্বিত রাসলীলাকে পরম উপভোগ‍্য করে তুললেন।ভাগবতে রাসের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধানও এই সমন্বয়ের উদাহরণ।প্রেম পরম রমণীয় সামগ্রী বটে। কিন্তু অভিমান থাকলে প্রেম সর্বাঙ্গসুন্দর হয় না।সেই জন‍্যই রাসের অন্তর্ধান।গোপীগণ কৃষ্ণের সঙ্গে রমণ করে সৌভাগ্যগর্বে স্ফীত হয়ে উঠলেন। তাই তিনি =*
*🌷প্রশমায় প্রসাদায় তত্রৈবান্তরধীয়ত।*
*👌তাদেরকে কৃপা করবার জন‍্যই অন্তর্ধান করলেন। আবার শ্রীরাধাকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণ যখন বনান্তরালে গেলেন পুষ্প তুলে, কেশ বেঁধে এবং অন‍্যান‍্য বিলাস রচনা করে যখন আনন্দে বিচরণ করছিলেন, তখন রাধার মনে গর্ব হল যে আমিই সর্বাপেক্ষা প্রেয়সী। তিনি বললেন আমি আর চলতে পারছি না, আমাকে কাঁধে করে যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিয়ে চল। নয় মাং যত্র তে মনঃ। ইহা বলাতে কৃষ্ণপ্রেমগরবিণী রাধার কি খুব বেশী অপরাধ হল? মনে তো হয় না। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান বিধান করে কবি এখানে যে বিরহরসের অবতারণা করলেন,তা পরম উপভোগ‍্য হয়েছে।তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে কবি তুলির দুই-এক টানে যে চিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন,তাতে রাসের নিরবচ্ছিন্ন অনাবিল আনন্দ যেন শতগুণে বেড়ে গেছে।তত্ত্বের দিক দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ পরমপুরুষ,শ্রীরাধা ভক্ত, মূর্তিমান মহাভাব।কাব‍্যের দিক দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বহুবল্লভ নায়ক,শ্রীরাধিকা প্রেমিকা। শ্রীকৃষ্ণ রসিকেন্দ্রচূড়ামণি, শ্রীরাধা রসিকাশিরোমণি। নব নব সৌন্দর্য্য মাধুর্য‍্যের মধ‍্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণলীলা যেন অবারিত স্রোতে বহে গিয়েছে। কবিত্বের দিক ছেড়ে দিয়ে কেবল তত্ত্বের দিক দিয়েও রাসলীলা আস্বাদন করা যেতে পারে। বিশ্বের মধ্যে যা কিছু সুন্দর যা কিছু উপভোগ‍্য, তা তো ভগবানেরই বিভূতি। যেখানে একটু আলো,একটু গীতিগন্ধ, যেখানে একটু সৌন্দর্য্য সেখানেই আনন্দময় ভগবানের কিরণ-সম্পাত। তাই বিশ্ব আলোকে পুলকে মেতে উঠেছে, তাই এত হাসি,এত গান,এত কলরব। এদের কারও তো স্বাধীন সত্তা নাই।সমস্তই ভগবানের আনন্দময় বিকাশের কণা।*
*🌷তমেব ভান্তং অনুভাতি সর্বং তস‍্য ভাসা সর্বমেব বিভাতি।*
*🔥সূর্য‍্য চন্দ্র তাঁকে আলোকিত করে না।চন্দ্রের কৌমূদীতে পৃথিবী আলোকিত।সে চন্দ্র আবার সূর্য‍্যের কিরণে উদভাসিত। কিন্তু সূর্য‍্যচন্দ্র যাঁর কিরণে উদভাসিত, তিনিই ব্রহ্ম। এই যে বিশ্বে বর্ণের খেলা,সূর্য‍্য অস্ত গেলে বর্ণ থাকে কোথায়? এই যে বিশ্বে এত আনন্দ,এত হাসি, এটি ভগবানেরই লীলা খেলা।রাসলীলা তারই কাব‍্য,তারই ইতিহাস।*
*বৈষ্ণবগণ রাধাগোবিন্দের প্রেমের আদর্শকে উচ্চতম কোঠায় স্থাপন করতে চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই। শ্রীরূপ গোস্বামী বসন্ত রাসের বর্ণনায় কি সুন্দর ভাবে এই প্রেমের মহিমা ব‍্যক্ত করেছেন।বসন্তরাসে গোপীরা দলবদ্ধ হয়ে শ্রীকৃষ্ণ অন্বেষণে ছুটেছেন, শ্রীকৃষ্ণ বেগতিক দেখে কুঞ্জের অভ‍্যন্তরে গিয়ে আত্মগোপন করলেন। তিনি চতুর্ভূজ নারায়ণ মূর্তি ধরে বসিলেন।তখন গোপীগণ তাঁকে দেখে প্রণাম করিল এবং বলল, ঠাকুর আমাদের কৃষ্ণ কোথায়?তার সন্ধান বলে দিয়ে আমাদের দুঃখ দূর কর।*
*🌷নমো নারায়ণ দেব করহ প্রসাদ।*
*🌷কৃষ্ণসঙ্গ দেহ মোরে খন্ডাহ বিষাদ।।*
*🙏তুমি নারায়ণ তোমাকে প্রণাম করি। কিন্তু আমরা তোমাকে চাই না, বল, বল, আমাদের কৃষ্ণ কোথায়? কৃষ্ণ চুপ করে থাকলেন।পরে শ্রীরাধা যখন আসিলেন, তখন আর তাঁর ছদ্মবেশ রইল না,তাঁর অতিরিক্ত দুটি হাত মিলিয়ে গেল।*
*🌷সা শক‍্যা প্রভবিষ্ণুনাপি হরিণ*
*🌷নাসীচ্চতুর্বাহুতা। --- উঃ নীলমণি।*
*🌹লীলার দিক দিয়ে এর অর্থ হল প্রেমের এই লুকোচুরি খেলায় কৃষ্ণ হলেন পরাভূত। আর তত্ত্বের দিক দিয়ে এর অর্থ হল এই যে,প্রেমের কাছে ঐশ্বর্য‍্য (ঈশ্বরত্ব) টিকতে পারে না।চতুর্বাহুত্ব ঐশ্বর্য‍্যের লক্ষণ।দ্বিভূজ মুরলীধর কৃষ্ণ প্রেমের অধিদেবতা।এখানে কি কামায়নতার প্রাচুর্য? "উত্তুঙ্গ অনঙ্গতরঙ্গে'র" মধ‍্য দিয়ে যে সত‍্যটি বৈষ্ণবগণ বলতে চেয়েছেন,তা কি ঐ তরঙ্গকে অতিক্রম করতে পারেনি? আর একটা কথা বলে এ প্রবন্ধ শেষ করব।ভাগবতে,ব্রহ্মবৈবর্তে বা গীতগোবিন্দে যে আদিরসের প্রবাহ দেখতে পাওয়া যায় শ্রীচৈতন‍্য পরবর্তী বৈষ্ণব সাহিত‍্যে তা অনেক সংযত হয়েছে।সেখানে রিরংসার কথা বড় একটা নাই, আছে প্রেম,আছে নৃত‍্যগীত আমোদ আহ্লাদ।*
*🌷বাজত তাল রবাব পখোয়াজ,*
                *নাচত যুগল কিশোর।*
*🌷অঙ্গ হেলাহেলি নয়ন ঢুলাঢুলি,*
              *দুহুঁ মুখ দুহুঁ হেরি ভোর।।*
*🙌রাস অর্থে এই নৃত্য। রাস অর্থে যেমন রসের প্রগাঢ়তা বুঝায়,তেমনি আর এক অর্থে মন্ডলাকারে নৃত্য বুঝায়।ব্রজ গোপীরা বাঁশীর স্বরে আত্মহারা হয়ে যমুনাতীরে নীপকুঞ্জে মিলিলেন।কৃষ্ণ তাঁদের আকুলতা দেখে রাসমন্ডলী রচনা করলেন।রাস বা হল্লীশ অর্থে মন্ডলী বন্ধন করে নৃত্য --, কৃষ্ণ, মধ‍্যস্থলে, ব্রজ গোপীরা তাঁকে ঘিরে চক্রাকারে আবর্তিত হতে লাগিল। এই নৃত্যকে সম্পূর্ণরূপে সার্থক করবার জন্য যোগেশ্বর কৃষ্ণ নিজেকে বহুতে পরিণত করলেন এবং প্রত‍্যেক গোপীর পার্শ্বে দাঁড়ালেন। এইভাবে কবির কাব‍্যে এক অপূর্ব চিত্র উদঘাটিত হল।*
*🌷তত্রাতিশুশুভে তাভি র্ভগবান দেবকীসুতঃ।*
*🌷মধ‍্যে মণীনাং হৈমানাং মহামরকতো যথা।।* 
*🌻একটি স্বর্ণময় মণি তার পাশেই একটি মরকত, একটি মেঘখন্ড তার পাশেই একটি বিদ‍্যুৎ, একটি চাঁদ তার পাশেই আঁধার, চমৎকার চিত্র এই কাব‍্যের রস আস্বাদন করতে করতে অপূর্ব অপার্থিব আনন্দে মন ভরে যায়।ধর্মতত্ত্বও মনে পড়ে না,নীতিকথাও ভাল লাগে না ভুলিয়ে দেয় এই রাসলীলা কি ; কামক্রীড়া না প্রেমোৎসব?*
*🌹🌹এখানেই রইল, জয় শ্রীরাধেশ‍্যাম🙏*
🦚🦚🦚🦚🦚🦚🌷🦚🦚🦚🦚🦚🦚
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫৭)🌕বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🌕*
          *👬হোলি উৎসব👬*
          🔴🔵🔴🔵🔴🔵🔴
*🔷হোলি শব্দ হোলাকা বা হোলিকা শব্দ হতে এসেছে।হোলাকা একটি উৎসবের নাম!ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন উত্তর-পশ্চিমে যে বহ্ন‍্যুৎসব হয়,তার নাম হোলাকা।বঙ্গদেশে এই উৎসব পূর্ণিমার পূর্বদিন অনুষ্ঠিত হয়।এই অনুষ্ঠানে একটি পর্ণকুটীর নির্মাণ করে তাতে, অথবা খড়ের একটি পুতুল গড়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।কোন কোনও জায়গায় একে চাঁচর বা মেড়া পোড়ান বলে। এরকম করবার তাৎপর্য‍্য কি,তা বলা যায় না।দীপাবলীতে বা দীপালীতে প্রদীপ দানের ব‍্যবস্থা বা কোন কোনও জায়গায় আকাশ প্রদীপের ব‍্যবস্থার একটা সঙ্গত কারণ পাওয়া যায়। অর্থ‍্যাৎ ঐ সময়ে কীট-পতঙ্গের অত‍্যন্ত প্রাদুর্ভাব হয়,দীপালীতে সেই কীটপতঙ্গ ভীষণ উপদ্রব করে বলে সেই অগ্নিতে তারা নাশপ্রাপ্ত হয়।হোলির সময়ে বহ্ন‍্যুৎসবের যে কি কারণ থাকতে পারে,তা কিন্তু সঠিক বুঝা যায় না।হয়ত এমন হতে পারে যে,ফাল্গুনে ফসল উঠে গেলে তৃণগুল্ম জঞ্জাল ও বৃক্ষের গলিত পত্র অনেক জমা হয়,সেগুলিকে পোড়াবার একটি যৌথ ব‍্যবস্থা এই বহ্ন‍্যুৎসব। কিন্তু এটি অপেক্ষাও স্বাভাবিক কারণ মনে হয় এই যে,প্রায় প্রাচীন কাল হতে সর্বজাতির মধ্যে উৎসব বিশেষে আগুন নিয়ে খেলবার রীতি দেখা যায়।এমন হতে পারে যে,হিন্দুদের মধ্যেও সেই সার্বজনীন রীতির প্রমাণ এই বহ্ন‍্যুৎসব।মহরমের সময় মুসলমানদের আগুন নিয়ে যে খেলা করে,তাও এই প্রথারই অনুবর্তন। কিন্তু হোলাকা বা হোলিকা শব্দ হতে কি করে অগ্নির উৎসব আসতে পারে,তা বুঝতে পারা যায় না। একটি প্রবাদ আছে যে,হোলিকা নামে এক রাক্ষসী ছিল।সে যমুনা পারে বাস করত ও ছেলে ধরে উদর পূরণ করত।শ্রীকৃষ্ণ সেই রাক্ষসীকে বধ করে যমুনাপুলিনে বালুরাশি তার রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছিলেন।হোলির আবির খেলা তারই স্মৃতি বহন করছে। অন‍্য একটি কিংবদন্তী বলে যে,হোলিকা রাক্ষসীকে বধ করা হয়নি।গালাগালি দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভূত-প্রেত ছাড়াবার সময় নানা অশ্লীল গালি দিবার প্রথা আছে।আদিমকাল হতে এরকম একটি ধারণা চলে আসছে যে,ভূত-প্রেত,রাক্ষসী,দানবী অশ্লীল গালাগালি সহ‍্য করতে না পেরে সে জায়গা ত‍্যাগ করে।এটি সতে হলে ভূত-প্রেতের রুচি শিষ্টতর বলতে হবে।হোলিতে এখনও অশ্রাব‍্য গালিবর্ষণের রীতি দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু তা হিন্দুস্থানীদের কোনও কোনও শাখার মধ্যে নিবদ্ধ। বৈষ্ণব পদাবলীতে হোরি বা হোলি প্রসঙ্গে গালাগালির উল্লেখ আছে ঃ---*
*ব্রজবনিতা যত, রিঝি ঋঝায়ত,*
          *রহগারি মৃদু ভাষ।*
*🍀গোপালচম্পূতে শ্রীজীব গোস্বামীও এই কথা বলেছেন--,*
*🌷সকেলিগালিরীতিময়গীতিকোলাহলৈঃ! পূর্বচম্পূ।*
*🍁পুরাণে এই উৎসবের কোনও ইতিহাস পাওয়া যায় না।ভাগবতে এর উল্লেখ নেই।শ্রীজয়দেব গোস্বামী বসন্তরাসের বর্ণনা করেছেন সত‍্য, কিন্তু হোলির কোনও প্রসঙ্গ গীতগোবিন্দে নেই।চন্ডীদাসের হোলির পদ দেখতে পাওয়া যায় না। বিদ‍্যাপতিতেও দেখেছি বলে মনে হয় না। আমার বোধহয়, উত্তর-পশ্চিম হতে এই উৎসব আমাদের দেশে এসেছে।হোলি বা হোরি নামটি হিন্দির মত, ফগুয়া বা ফাগ হিন্দী শব্দ। সংস্কৃত শব্দ ফল্গু আছে এবং হোলির উৎসবকে ফল্গু উৎসব বলে।রঘুনন্দন শ্রীচৈতন‍্যদেবের সমসাময়িক। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে,ষোড়শ শতাব্দীতে হোলি উৎসবের প্রচলন বঙ্গদেশে ছিল।শ্রীপাদ সনাতন গোস্বামীর পদেও আছে=*
*ভদ্রালম্বিত, শৈব‍্যোদীরিত,*
         *রক্ত-রজোভরধারী।* 
*পশ‍্য সনাতন-, মূর্তিরিয়ং ঘন,*
         *বৃন্দাবন-রুচিকারী।।*
*🌻ভদ্রা সহকৃত শৈব‍্যা কর্তৃক উৎক্ষিপ্ত রক্তবর্ণ ফল্গুচূর্ণধারী শ্রীকৃষ্ণকে দেখ।ইনি নিত‍্য শাশ্বত-মূর্তি-বিশিষ্ট ও বৃন্দাবনের প্রতি অত‍্যন্ত অনুরাগশীল!এই কবিতা হতে বুঝা যায় যে,সে সময়ে বৃন্দাবনে ফাগ খেলিবার প্রথা সুবিদিত ছিল। শ্রীজীব গোস্বামী গোপালচম্পূর পূর্বচম্পূতে লিখেছেন=*
*অপি বাত! জনতাসু হোরিকায়াং,*
*হরিমভিসস্রুরহো! ব্রজস‍্য নার্য‍্যঃ!*
*🍀ব্রজরমণীগণ শ্রীহরিকে হোলির উৎসবে (রঙ্গগোলালে) অভিষিক্ত করেছিলেন।*
*🌺শ্রীচৈতন‍্যের সমকালীন প্রসিদ্ধ পদকর্তা ও গায়ক বাসুদেব ঘোষের একটি পদে পাওয়া যায় =*
*🌷দেখ দেখ ঋতুরাজ বসন্ত সময়।*
*🌷সহচর সঙ্গে বিহরে গোরা রায়।।*
*🌷ফাগু খেলে গোরাচাঁদ নদীয়া নগরে।*
*🌷যুবতীর চিত হরে নয়নের শরে।।*
*🌷সহচর মেলি ফাগু দেয় গোরা গায়।*
*🌷কুঙ্কুম পিচকা লেই পিছে পিছে ধায়।।*
*🌹বাসুদেব ঘোষের অন‍্য একটি পদে আছে =*
*🌷আজুরে কনকাচলে নীলাচলে গোরা।*
*🌷গোবিন্দের সঙ্গে ফাগু রঙ্গে ভেল ভোরা।।*
*🌻এখানে নীলাচলে হেমগিরি সদৃশ শ্রীগৌরাঙ্গ শ্রীজগন্নাথের সঙ্গে ফাগ খেলছেন, এটিই বর্ণিত হয়েছে। সাধারণতঃ গৌরচন্দ্রিকায় সুরধূনী তীরই হোলির ক্রীড়াক্ষেত্র। কিন্তু বাসুদেব ঘোষের উপরি উক্ত পদে এবং গোবিন্দ দাসের আর একটি পদে শ্রীগৌরাঙ্গের হোলিলীলা নীলাচলে বর্ণিত হয়েছে।পদ দুইটির সাদৃশ‍্য দেখে মনে হয় যে,গোবিন্দ দাসের পদ অল্টবিস্তর পরিবর্তন করে কেউ বাসুদেব ঘোষের নাম দিয়েছেন মনে হয়। হোলির যে সব গৌরচন্দ্রিকায় নরহরি নাম আছে,সেগুলি নরহরি চক্রবর্তীর রচিত বলেই মনে হয়।*
*🍀যাইহোক,শ্রীচৈতন‍্যের সময়ে যে,হোলিলীলার প্রচলন ছিল, সে সম্বন্ধে সন্দেহ নাই।এই সময়ে বা এর অদূরবর্তী প্রাক্কালে হোলিলীলা বৈষ্ণব কাব‍্যসাহিত‍্যে ও বাঙ্গালীর সমাজে প্রবেশ লাভ করেছিল বলেই বোধহয়।*
🔴🔵🌕⚪🔴🔵🌕⚪🔴🔵🌕⚪🔴
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫৮)🔴বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🔴*
             *🌺হোলি লীলা🌺*
          🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺
*🌻বহু পূর্বে বসন্ত-পঞ্চমীতে মদন-মহুৎসব অনুষ্ঠিত হত। "রত্নাবলীতে" এই মদন-মহোৎসবের বর্ণনা আছে।এই উৎসবে স্ত্রী-পুরুষ মিলে পটবাসক বা পিঠালি কুঙ্কুমচন্দনে সুবাসিত করে পরস্পরের প্রতি নিক্ষেপ করত।শৃঙ্গ ভরে জল নিয়ে যুবক-যুবতীরা পরস্পরকে অভিসিঞ্চিত করিত।শৃঙ্গ শব্দের সঙ্গে ইংরেজি Syringe শব্দের ভাষাগত সাদৃশ‍্য দেখে মনে হয়,খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে আমাদের দেশে পিচকারীর ব‍্যবহার ছিল। প্রসঙ্গতঃ বলা যেতে পারে যে, পিচকারীর কোনও সাধু প্রতিশব্দ আমরা এ পর্যন্ত আবিস্কার করতে পারিনি।এই অর্থে শৃঙ্গ শব্দের প্রচলন নাই বললেও চলে।পিচকারী সম্ভবতঃ হিন্দী হতে এসেছে। আমরা বাংলা সাহিত‍্যে সেটিকে স্থান দিয়েছি অথবা কিছু পরিবর্তন করে নিয়েছি, যথা--,পিচকিরি,পিচকা, পেচকা ইত্যাদি। এই পিচকারী,পটবাস বা আবির,কুঙ্কুমচন্দন,জল-নিক্ষেপ প্রভৃতি সমস্তই মদন-মহোৎসবই পরে বসন্তলীলা বা হোলিলীলায় পরিণতি লাভ করেছে।*
*🍁মদন-মহোৎসবে অশ্লীলতার নামগন্ধ ছিল না।এখন "মদন" বলতেই আমরা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ি। সেই জন্য মদন-মহোৎসবকে মনে করি বুঝি Bacchanalian revelry জাতীয় কিছু হবে। কিন্তু আমাদের দেশে মদন চিরদিনই প্রেমের দেবতা। এ মদন অন্ট নয়, পরন্তু পরম রূপবান্। রূপ ও প্রেমের সম্বন্ধ অতি নিবিড়। মদনের সখা বসন্ত এবং সেইজন‍্য বসন্তের আগমনের সঙ্গে মদনের বিজয়যাত্রা আরম্ভ হয়।বসন্তকালই মদনোৎসবের সময়।এখানে একটু লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে,আমাদের দেবতারা চরিত্র বিষয়ে সব সময়ে সাবধান না হলেও মদনের সম্বন্ধে সাধারণতঃ কোনও অপবাদ দেওয়া হয় না।যাইহোক, বসন্তোৎসবে আমরা মদনের পরিবর্তে মদনমোহনকে সিংহাসনে স্থাপন করেছি।মদনমোহন শুধু প্রেমের দেবতা নহেন,তিনি সমস্ত বিশ্বের অধিদেবতা। তিনি একদিকে মন্মথেরও মন্মথ, "সাক্ষান্মথমন্মথ", অন‍্যদিকে "অনাদিরাদিগোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্"।কাজেই বসন্তোৎসব আর্য‍্যাবর্তের প্রায় সর্বত্রই অনুষ্ঠিত হয়।হোলির উৎসব,বহ্ন‍্যুৎসব, ফল্গুৎসব সমস্ত এই বসন্তোৎসবের অঙ্গীভূত হয়েছে। হোলি,বাসন্তী পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগের সঙ্গে পূজা পার্বণ অনুষ্ঠান জুড়ে দেওয়ায়,এটি অনেকটা বাধ‍্যতামূলক হয়েছে।ইউরোপে স্বভাবশোভার বোধ জনসাধারণের মধ্যে অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে ছিল না বললেই চলে।ফরাসি দার্শনিক ও সাম‍্যবাদী "রুসোর" রচনা পাঠ করে লোক স্বভাব-শোভা সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠে। কিন্তু আমাদের দেশের লোক স্মরণাতীত কাল হতে পূজা-অর্চনা-ব্রত-উৎসবের মধ‍্য দিয়ে নিসর্গ-দেবীর পদে অঞ্জলী দিয়ে আসছে।বসন্তকালের নির্মল প্রফুল্ল রাকা রজনীতে (পূর্ণিমা রজনীতে) হোলির ব‍্যবস্থা, শরৎকালের নির্মল মেঘমুক্ত আকাশে যখন পূর্ণচন্দ্রের আবির্ভাব হয়,তখন ঘুমাবে কে?সে দিন কোজাগর লক্ষ্মীপূজো, সে রাত্রিতে ঘুমাতে নেই।ঘুমালে যে অমন রাত্রিটি বিফল হয়ে যায়।হেমন্তকালের স্নিগ্ধ জোছনা নিশীথে রাসলীলা,বর্ষার মেঘের ফাঁকে ফাঁকে পূর্ণচন্দ্রের ক্ষণে ক্ষণে আবির্ভাব, ঝুলনের দোলায় বড় সুন্দর মানায়।গ্রীষ্মের রজনীতে পূর্ণচন্দ্রের উদয়ে জগৎ জুড়ায়,বনে বনে ফুল ফোটে,সুবাস ছড়ায়।সে সময়ে শ্রীকৃষ্ণের ফুলদোল।কুহু রজনীর ঘন অন্ধকারেরও একটি গম্ভীর,ভীতিজনক সৌন্দর্য্য আছে, সে দিনও ফাঁক যাইনি।করালিনী কালীর পূজার জন্য ঐরকম কুহু যামিনীই প্রশস্ত।*
*🌹ভগবানের লীলা বিচিত্র রহস‍্যময়। তিনি কি লীলা করেন, তা ভক্ত ছাড়া অন‍্য কেউ বলতে পারেন না।*
*🌷অনুগ্রহায় ভক্তানাং মানুষং দেহমাশ্রিতঃ।*
*🌷ক্রিয়তে তাদৃশী ক্রীড়া যাঃ শ্রত্বা তৎপরোভবেৎ।।*
*🌻ভগবান মানুষের রূপ পরিগ্রহ করে মানুষী লীলা করেন।যাঁরা মনে করেন যে, ভগবান মানুষের মত লীলা কখনও করতে পারেন না, তিনি অনন্ত,অসীম,অশব্দ,অস্পর্শ,অরূপ ; তাঁদেরকে কিছু বলবার নাই।তাঁদের পক্ষে লীলামাত্রই অলীক।লীলাবাদের প্রতিকূল ব‍্যক্তির সংখ্যা অল্প নয়। যুক্তির দ্বারা লীলাবাদ প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা বিড়ম্বনা। লীলাবাদ রহস‍্যবাদের সঙ্গে জড়িত।এই Mysticism বিভিন্ন অনুপাতে সব ধর্মের মধ্যেই আছে। রূপক Symbolism ছাড়াও ধর্ম হয় না। সুতরাং কেবল ন‍্যূনাধিকের ব‍্যাপার-- all a difference of degree. মানবাত্মার সঙ্গে প্রেময়ের সম্বন্ধ বুঝতে বুঝাতে ভক্তগণ প্রাণান্ত চেষ্টা করে গিয়াছেন। কিন্তু ভাগবতের কথাটির মত মূল‍্যবান কথা খুব কমই শোনা যায়। "ক্রিয়তে তাদৃশী ক্রীড়াঃ যাঃ শ্রুত্বা তৎপরোভবেৎ"। তিনি সেই সব লীলা করেন, যা শুনলে মন তাঁর দিকে ধাবিত হয়। ভগবানের জীবনচরিত কেউ লিখে নাই, তাঁর জীবনের কোনও সন তারিখযুক্ত প্রামাণিক ইতিহাস রচিত হয়নি, কোনও শিলালিপিতে বা তাম্রশাসনে তাঁর কার্যকলাপ উৎকীর্ণ হয়নি। ভগবান এক অনন্ত মাধুর্য‍্যপূর্ণ চিন্তামণিধামের অধীশ্বর।সে চিন্তামণিধামের নাম বৃন্দাবন--, পরম পবিত্র রমণীয় উপবন।সে রাজ‍্য,সে জগৎ আমাদের ধূলিমলিন কলুষকলঙ্কিত সংসারের মত নয়।*
*🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫৯)🔶বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🔶*
            *🔷হোলি লীলা🔷*
         ❤❤❤❤❤❤❤❤
*🌹সে চিন্তামণিধাম কেবল চিন্তার দ্বারা,ধ‍্যানের দ্বারা যোগের দ্বারা লভ‍্য।*
*🌷পরম পুরুষোত্তম স্বয়ং ভগবান।*
*🌷কৃষ্ণ যাঁহা ধনী সেই বৃন্দাবনধাম।।*
*🌷চিন্তামণিময় ভূমি চিন্তামণি-ভবন।*
*🌷চিন্তামণিগণ দাসী চরণ ভূষণ*।।
*🌷কল্টবৃক্ষলতা যাঁহা সাহজিক বন।*
*🌷পুষ্পফল বিনে কেহ না মাগে অন‍্য ধন।।*
*🌷অনন্ত কামধেনু যাঁহা চরে বনে বনে।*
*🌷দুগ্ধ মাত্র দেন কেহ না মাগে অন‍্য ধনে।।*
*🌷সহজ লোকের কথা যাহা দিব‍্যগীত।*
*🌷সহজ গমন করে নৃত্য প্রতীত*।।
*🌷সর্বত্র জল যাঁহা অমৃতসমান।*
*🌷চিদানন্দ জ‍্যোতি স্বাদ‍্য যাঁহা মূর্তিমান।।*
*🍁শ্রীকৃষ্ণ যেখানে বাস করেন,সে-ই চিন্তামণিধাম--সে-ই বৃন্দাবন ; যেখানে ভূমি,গৃহ সমস্ত চিন্তামিময়। চিন্তামণি নামক বহুমূল‍্য রত্ন সেখানে দাসীগণের চরণভূষণ।সেখানে প্রতিবৃক্ষ,প্রতি ধেনু কামধেনু।সেখানে কেউ ফল ফুল দুগ্ধ ছাড়া অন‍্য ধনের কামনা করে না। সেখানে সহজ গমনই নৃত‍্য, সহজ বচনই দিব‍্য সঙ্গীত। সেখানে জল অমৃত এবং যে চিদানন্দজ‍্যোতি যোগীগণের ধ‍্যানেরও অতীত,তাইই পরম আস্বাদ‍্য মূর্তি পরিগ্রহ করে বিরাজ করছেন।*
*🌺এ হেন বৃন্দাবন ভগবানের প্রেমলীলা স্থল হলেও হতে পারে। সেই চিন্তামনিধাম বৃন্দাবন,সেই যমুনার কুল,সেই মালতী,যূথী,জাতির গন্ধভরা বসন্ত-সমীরণ। এখানে ভগবানের বিহার কল্পনা করা যেতেও পারে। এখানেই "অপরূপ দুহুঁ জন অতনু-বিলাস"।ইঁনাদের বিলাসে দেহের সন্ধান মাত্র নাই,তাই অতনু-বিলাস।উভয়ের তনু শুধুই প্রেমে গড়া।প্রেমের আকৃতি এই যে, পুরাতনকে নূতন করে সৃষ্টি করে,অথবা প্রেমের চোখে সবই নূতন,তাই চির বসন্তে=*
*🌷বিহরে শ‍্যাম নবীন কাম,*
*🌷নবীন বৃন্দাবিপিন ধাম,*
*🌷সঙ্গে নবীন নাগরীগণ,*
               *নবঋতুপতি রাতিয়া।*
*🌷নবীন গান নবীন তান,*
*🌷নবীন নবীন ধরই মান,*
*🌷নৌতুন গতি নৃত্যতি অতি,*
            *নবিন নবিন ভাতিয়া।।*
*🌻আজ সবই নূতন বোধ হচ্ছে।এমনই নবীন বসন্তে,নবীন বৃন্দাবনে, নবীন সহচরীগণকে নিয়ে নবীনকিশোর হোলি খেলা পাতিলেন। সমবয়ঃ সখাগণের সঙ্গে হোলি খেলতে খেলতে ব্রজ-যুবরাজ চলেছেন।পৌর্ণমাসী সব ব্রজললনাগণকে সাবধান করে দিলেন =*
*🌷আজ কোই কুলবতী নাহি বাহিরাব।*
*🌷যমুনা সিনানে কোই নাহি যাব।।*
*🌷বিপতি পড়ল আজু যুবতি সমাজ।*
*🌷সখাগণ সঙ্গে খেলই যুবরাজ*।।
*🌹হোলি খেলার ধূম পড়ে গিয়েছে।পথগুলি ব্রজ-বালকরা ঘিরে ফেলেছে, কারও পালাবার যো নাই। পিচকারী নিয়ে সকলে এমন ভাবে রঙ্গগোলাল ফেলছে, যেন মাথার উপর দারুণ বর্ষণ হচ্ছে, তাই পদকর্তা বলছেন=*
*🌷কহ গোবর্দ্ধন রহ গৃহমাহ।*
*🌷কোই জনি মন্দির ছোড়ি বাহিরাহ।।*
*🌺শ্রীমতীরাইধনি ঘরে বসে ভাবছেন, আহা! এমন আনন্দের দিনে বাইরে যেতে পারব না?*
*🌷ইহ দিনে কৈছে রহিতে কহ ঘর মাহা।*
*🌷সো সুখে হোই নৈরাশ।।*
*🌻আমরা সব সখী মিলে হোলি খেলা দেখতে যাবই। এতে লজ্জা করলে চলবে না।শ্রীমতী রাধিকা গুরুজনের নিকট হতে অনুমতি নিয়ে বাহির হয়ে পড়লেন। কিন্তু এক বিপদ হ'ল--,শুনতে পেলেন পদ্মাসখী সঙ্গে করে আসছেন,তাঁরা প্রাণনাথের সঙ্গে হোলি খেলবেন।এতক্ষণ বুঝি তাঁদের মিলন হয়ে গেল।*
*🌷বংশীবট তট মীলন ভেল বুঝি,*
               *ফাগু যন্ত্র করি হাত।*
     *🌷সজনি ইহ দারুণ পরমাদ।*
*🌷ঐছন ভাতি রচন করি চল সখি,*
          *যাই করিয়ে সব বাদ।।*
*🌹চল,আমরা তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ করি। তার পরে•••••••••••*
*🌷সভে মিলি ফাগু তিমির করি বেঢ়ব,*
                 *লখই না পারই কোই।।*
*🌷ঐছনে কানু লেই সভে আওব,*
                 *তুরিতহিঁ নিধুবন পাশ।*
*🌷গোবর্দ্ধন কহ আনন্দে খেলহ,*
                     *পদ্মা পাউ নৈরাশ।।*
*🍁আমরা সকলে মিলে এমন করে আবিরে অন্ধকার করে দিব যে, কেউই কিছু দেখতে পাবে না।তখন আমরা কৌশল করে সত্বর কৃষ্ণকে নিধুবনের কাছে আনিব। পদ্মা নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে।*
*🌷ফাগুরাজে সকল করল আঁধিয়ার।*
*🌷নারি-পুরুষ কোই লখই না পার।।*
*🌷ঐছনে কানুক মাঝহি ঘেরি।*
*🌷আনলুঁ নিধুবনে সো নাহি হেরি।।*
🔴⚪🌕🔵🔶🔷🔷🔶🔴⚪🌕🔵🙌
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৬০)🌳বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য🌲*
      *🔷🔶হোলি লীলা 🔶🔷*
   ▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪
*🌻ঐসময় হোলিতে দুই দলে আবির কুঙ্কুমের যুদ্ধ চলত।লাখে লাখে পিচকারী ছুটত।শ‍্যাম-অঙ্গ লালে লাল হয়ে যেত।শ্রীরাধিকার দলের সেনাপতি হতেন প্রধানা সখিরা-- ললিতা বিশাখা। শ্রীকৃষ্ণের দলের সেনাপতি হতেন বটু অর্থ‍্যাৎ মধুমঙ্গল ও সুবল। সাধারণতঃ গোপীরা জয়লাভ করতেন ও মধুমঙ্গলকে যাচ্ছে-তাই করে ছাড়ত।সম্ভবত তাঁকে এমন করে আবির ও রঙ মাখাতেন চেনা বড়ই দায় হত।হোলীলীলার খন্ড কাব‍্যে মধুমঙ্গল বিদূষক। ললিতমাধব,জন্নাথবল্লভ প্রভৃতি নাটকেও মধুমঙ্গলই বিদূষকের ভূমিকা গ্রহণ করেন।তিনি কিছু লোভী ব‍্যক্তি, প্রেমের আবেদন অপেক্ষা ক্ষুধার তাড়নাই তাঁর পক্ষে বেশী আগ্রহের বিষয়।ব্রজ-গোপীরা তাঁকে নিয়ে হাস‍্য-পরিহাস করতে ভালবাসেন। মধুমঙ্গল সুতরাং এই রমণীব‍্যূহের কাছে পরাজয় সম্ভাবনা মাত্রেই সেখান থেকে পালিয়ে যাবার রাস্তা খুঁজতেন।গোপীরাও তাঁকে ধরে নানারকম লাঞ্জিত ও বিড়ম্বিত করতে দ্বিধা বোধ করেন না।যাইহোক=*
*🌷মধুমঙ্গল সহ সুবলা পলাওল,*
                  *বল্লভী দাস জয় গায়।*
*🍀কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের অবস্থা তখন সঙ্কটজনক। কর বা হাত হতে মুরলী মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে ; শিখিপুচ্ছচূড়া আউলিয়ে পড়েছে।দুই হাতে তিনি চোখ রগড়াতে ব‍্যস্ত ; ততক্ষণে লক্ষ লক্ষ পিচকারী তাঁকে রঙ্গগোলালে স্নান করাচ্ছে। কিন্তু একজন তাঁর দুরবস্থা দেখে ছল ছল নয়নে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন।সখীদের আনন্দে শ্রীরাধা সম্পূর্ণ যোগ দিতে পারছেন না। কখনও =*
*🌷চুয়া চন্দন গোরী দেয় শ‍্যামের গায়।*
*🌺কখনও বা বসনাঞ্চল দিয়ে তাঁর নয়ন বয়ন(বদন) মুছিয়ে দিচ্ছেন।*
*🌷শ‍্যামেরে বিভোর দেখি রসবতী রাই।*
*🌷অরুণ বসন দিয়া ওমুখ মুছাই।।*
*☘কিন্তু জয়ের আশা তখনও মেটেনি। তাই বলছেন=*
*🌷এস বঁধূ আরবার খেলাই হে ফাগুয়া।*
*যদি বল একা আমি,বহু সঙ্গের সঙ্গী তুমি,*
       *সযুথে বিশাখা হউক তুয়া।।*
*🌻বিশাখা তার দল সহ তোমার পক্ষে যাক। তোমার পিচকারী না থাকে,বলো কত চাই? আমি তোমায় দিব।রঙ না থাকে,তাওও দিব। তোমার কৃপায় আমাদের রঙের (অর্থ‍্যাৎ অনুরাগের) অভাব নাই। ফাগের রঙে গগন পবন লাল হয়ে গেল। যমুনার জল,নীলোৎপল, কোকিল, ময়ূর,বৃক্ষলতা সব লাল হল।*
*🌷ফাগু খেলাইতে ফাগু উঠিল গগনে!*
*🌷বৃন্দাবনের তরুলতা রাতুল বরণে।।*
*🌷রাঙ্গা ময়ূর নাচে গাছে রাঙ্গা কোকিল গায়।*
*🌷রাঙ্গা ফুলে রাঙ্গা ভ্রমর রাঙ্গা মধু খায়।।*
*🌹এই যে সব লালে লাল হল, এ রঙ কি শুধু বাইরে রইল?প্রাণে কি সে অরুণিমার পরশ লাগল না?বৈষ্ণব কবি প্রাণের ঠাকুরকে শুধু ফাগ মাখিয়েই তৃপ্ত হতে পারেননি। তাই তিনি বলছেন, উভয় মনে মনে লাল হচ্ছেন=*
*🌷নিরখত বয়ন, নয়ন পিচকারী,*
      *প্রেম গোলাল মনহি মন লাগ।*
*🍀প্রেমিক যুগল উভয়ে উভয়ের মুখের দিকে যে সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন,সে দৃষ্টি ঐ পিচকারীর ধারারই মত অব‍্যর্থ।সহজেই অরুণ দৃষ্টির অনুরাগ ভরা চাহনিতে মুহুর্মুহু উভয়ে লাল হয়ে উঠছেন। এদিকে=*
*🌷অরুণ তরুণ তরু অরুণহি ধরণী।*
*🌷স্থল জলচর সবে ভেল এক বরণী।।*
*🌷অরুণহি নীরে অরুণ অরবিন্দ*।
*🌷অরুণ হৃদয় ভেল দাস গোবিন্দ।।*
*🌹অন‍্যদিকে রাধাগোবিন্দের মনের মধ্যে প্রেমের হোলি খেলা চলছে=*
*🌷ফাগু রঙ্গ তহিঁ নব অনুরাগ।*
*🔵সে হোলি-খেলায় নব অনুরাগ হ'ল ফাগ, নয়নের দৃষ্টি হল পিচকারী ধারা।তনু মন দুই যুক্ত করে শৃঙ্গ বা পিচকারী হল=*
*🌻খেলত তনু মন জোরি ভোরি দুহুঁ।*
*🍀পিচকারীতে একটি নল ও একটি দন্ড বা Piston লাগে।এ ক্ষেত্রে দেহ হল নল, মন হল দন্ড।গুলাল বা গোলাল তৈরী করতে আতর গোলাপের প্রয়োজন হয় ; এ প্রেমের খেলায় "দুহুঁ অঙ্গ পরিমল চূয়া-চন্দন" হল।এইভাবে হোলিখেলা প্রেমে এবং প্রেমের লীলা হোলিখেলায় পরিণত হয়ে বৃন্দাবনে আনন্দের ফোয়ারা ছুটল।বৃন্দাবন যখন আবিরে লাল,অর্থ‍্যাৎ ফাগ বৃষ্টিতে অন্ধকার,তখন এই হোলি খেলতে খেলতে =*
*🌷বন্ধুয়া আমার হিয়ার মাঝারে,*
                    *কেহ না দেখিতে পায়।*
*🌳আমরাও কিশোর-কিশোরীকে হৃদয়ের মধ্যে অনুরাগে অভিসিঞ্চিত করে আজ সেই চিন্তামণিধামের হোলিলীলা স্মরণ করি🙏।*
*🙌 জয় জয় শ্রীরাধা শ‍্যামের জয়, জয় সকল সখা-সখীর জয়।*
❤❤❤❤❤❤🌻❤❤❤❤❤❤
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

🔜 ক্রমাগত 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত‍্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 সপ্তম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo7.html

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

    📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝
    ꧁👇📖 সূচীপত্র ✍️ শ্রী জয়দেব দাঁ 📖👇



✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧


✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

   ✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️ 
নিবাস- বাঁশবাড়ী, কীর্তন মন্দিরের পাশে, পোঃ- বাঁশবাড়ী, থানা- ইংরেজ বাজার, জেলা- মালদহ, পশ্চিমবঙ্গ, পিন কোড- ৭৩২১০১।

✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

  *••••┉❀꧁👇🏠Home Page🏠👇꧂❀┅••••* 


✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

    *••••━❀꧁👇 📖 সূচীপত্র 📖 👇꧂❀┅••••* 



✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧

     *••••━❀꧁👇📚 PDF গ্রন্থ 📚👇꧂❀┅••••* 


✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
    *••••┉━❀꧁ 🙏 রাধে রাধে 🙏 ꧂❀━┅••••* 
                   শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ
              হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রীরাধেগোবিন্দ।।
  *••••┉━❀꧁ 🙏 জয় জগন্নাথ 🙏 ꧂❀━┅••••*
              হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
              হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥
  *••••┉━❀꧁ 🙏 জয় রাধাকান্ত 🙏 ꧂ ❀━┅••••*
   🌷❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🌷
   🏵️❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🏵️
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧







adds