*শ্রীমদ্ ভাগবতের অবধূত সংবাদ ২৭৯ ।*
*************************************
*🍀শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধের সপ্তম,অষ্টম ও নবম অধ্যায়ের মধ্যে এই অবধূত সংবাদ সন্নিবেশিত রয়েছেন।এই একাদশ স্কন্ধের মূল বিষয় হচ্ছে শ্রীগোবিন্দ এবং উদ্ধব সংবাদ অর্থ্যাৎ গোবিন্দ নিজ শ্রীমুখে সব তত্ত্বকথা উপদেশচ্ছলে বলেছেন তাঁর পরমপ্রিয় উদ্ধবকে। ভগবান তো কখনও নিজে তাঁর লীলাকথা বলতে পারেন না সেজন্য প্রসঙ্গের অবতারণাচ্ছলে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ যদুমহারাজকে শ্রীঅবধূতজী নামক একজন সন্ন্যাসী যা সব বলেছিলেন তা গোবিন্দ শ্রীমুখে তাঁর নিজজন উদ্ধবকে সব বলেছিলেন।এই অবধূতজীর আদি নাম "দত্তাত্রেয় ঋষি"।*
*🍀সাধারণতঃ চলতি কথায় আমরা জানি যে অবধূত নামক এক ঋষি বহুগুরু করেছিলেন।এই প্রসঙ্গটি স্বভাবতই দীক্ষিত মানুষের মনে দোলা দেয় যে এমন একজন প্রজ্ঞাবান ঋষি কি করে বা কেন বহুগুরু করেছিলেন।এ প্রশ্ন যদু মহারাজও অবধূতজীকে করেছিলেন এবং তদুত্তরে এই মহর্ষি বলেছিলেন যে মন্ত্রদাতা বা দীক্ষাদাতা গুরু তাঁর মাত্র একজনই কিন্তু তবুও তিনি এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের স্থাবর,জঙ্গম, জীবজন্তু কীট পতঙ্গের জীবনযাপন পদ্ধতির মধ্যে অনেক কিছু শিক্ষনীয় বিষয় অধিগত হয়ে তাঁদের গুরুপদে বরণ করেছিলেন এবং এই হিসাবে তিনি চব্বিশ জনকে গুরুপদে বরণ করেছিলেন, কারণ তাঁদের প্রত্যেকের নিকট হতেই তিনি অনেককিছু শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং সেজন্য তিনি নিজমুখে বলেছিলেন যে, "এই ভাবে বহু গুরুর কাছে শিক্ষা পেয়ে বৈরাগ্র লাভ করে,বিজ্ঞান আলোক বিশিষ্ট আত্মাতে অবস্থান করে তিনি মুক্ত এবং অহংকার শূন্য হৃদয়ে বিচরণ করেছেন "।এক্ষণে এই চব্বিশ জন গুরুর পরিচয় এবং কি শিক্ষা অবধূতজী লাভ করে নিজের জীবনে আচরণ করে গেছেন তার কিছু প্রসঙ্গ করে হবে।কারণ অনেকেই প্রবাদ বাক্যের মত অবধূত চব্বিশ জনকে গুরু করেছিলেন এই কথাটি জানেন সেজন্য আশাকরি এর সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গটি ভক্ত পাঠকগণের নিকট হৃদয়গ্রাহী হবে।*
*🙏অবধূতজীর প্রথম গুরু হচ্ছেন-- পৃথিবী।ধরিত্রীমাতার বক্ষে এই জীবজগৎ বিরাজিত।কত অত্যাচার কত যাতনা এই পৃথিবীকে যে সহ্য করতে হয় জীবজগতের আচরণের জন্য,তার কোন ঠিক ঠিকানা নাই কিন্তু তবুও ধরিত্রীমাতা সর্বংসহা হিসাবে সব নীরবে সহ্য করে যান। অবধূতজী বলছেন যে প্রকৃত যোগী বা সন্ন্যাসীকেও এইরকম পৃথিবীর মত ধৈর্য্যশীল হতে হবে।*
*🍀অবধূতজী আবার এই পৃথিবীকে দুইভাগে ভাগ করেছেন যথা বৃক্ষরূপ এবং পর্বতরূপ।বৃক্ষের গুণাবলী বিশ্লেষণ করে তিনি বলছেন যে বৃক্ষের জীবন দর্শন পর্য্যবেক্ষণ করলেই দেখা যায় যে পরমার্থে এবং জীবের মঙ্গলার্থে সে যেন নিজের সর্বস্ব চিরকাল দান করছে যথা=*
*(১)বৃক্ষ ফল দ্বারা পরের উপকার করে নিজে একটিও খায় না।*
*(২)শ্রান্ত(শ্রমযুক্ত) পথিককে সুশীতল ছায়া প্রদান করে নিজে সূর্য্যের চরম রৌদ্রতেজ সহ্য করে।*
*(৩)পল্লব মুকুলাদি দ্বারা নানা প্রকার দেব-সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে।*
*(৪)বৃদ্ধ বয়সে মানুষ করাত দিয়ে তার অঙ্গছেদন করে নানারকম আসবাব পত্র বানায়।*
*(৫)এমন কি শুকনো কাঠ দ্বারা জ্বালানী করে লোকে খাবার জিনিস তৈরী করে এবং বৃক্ষ নীরবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরেরজন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে।সেজন্য অবধূতজী বৃক্ষের নিকট হতে এই শিক্ষাই গ্রহণ করলেন যে প্রকৃত যোগীকে সবকিছুই পরেরজন্য বা পরের মঙ্গলের জন্য উৎসর্গ করতে হবে।*
*সেইরকম আবার পর্বতও নিজে কিছু ভোগ করে না সবকিছুই পরেরজন্য উৎসর্গ করে।পর্বত পৃথিবীকে ধারণ করে,প্রস্রবনের (জলপ্রবাহের) মাধ্যমে জলদান করে, পর্বতবক্ষে উৎপন্ন খনিজ দ্রব্যাদি সবই নিজে কিছুই ভোগ করে না এবং সবই যেন পরেরজন্য উৎসর্গীকৃত। সেরকম প্রকৃত সাধুকেও এইরকম আদর্শ মেনে চলতে হবে।*
*সেজন্য অবধূতজী তার প্রথম শিক্ষাগুরুর নিকট হতে তিনটি প্রধান জিনিস আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে পৃথিবীকে গুরুত্বে বরণ করেছিলেন এবং এই তিনটি সদ্ গুণ হচ্ছে--, পৃথিবীর ন্যায় ক্ষমা,বৃক্ষের ন্যায় সহনশীলতা ও পরেরজন্য জীবনদান এবং পর্বতের কাছ হতে পরাধীন বৃত্তি কারণ বৃক্ষের মত পর্বতকে স্থানান্তরিত করা যায় না।*
*(২) অবধূতজীর দ্বিতীয় শিক্ষাগুরু হচ্ছেন বায়ু যা আবার দুই অংশে বিভক্ত যথা=প্রাণবায়ু ও বাহ্যবায়ু। প্রাণবায়ুর কাছ হতে আমাদের এই শিক্ষাই গ্রহণ করতে হবে যেদিন অদৃষ্টে যে আহার মিলবে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।অর্থ্যাৎ যোগীব্যক্তিকে নানাধর্ম বিশিষ্ট বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করলেও বায়ুর মত নির্লিপ্ত বা অনাসক্ত থাকতে হবে।*
*সেজন্য অবধূতজী এই দুই কারণের জন্যই বায়ুকেও গুরুত্বে বরণ করেছিলেন।মূল কথাটি কি? মূল কথাটি হচ্ছে বায়ু যেরকম সর্বদাই বিরাজিত অথচ কারও সঙ্গে লিপ্ত হয় না,প্রকৃত যোগীকেও সেরকম নিঃসঙ্গতা পথে চলতে হবে এই প্রসঙ্গে সন্ন্যাসযোগে গীতা বলেছেন যে ----*
*🌷যোগী যুঞ্জীত সততম্ আত্মানং রহসি স্থিতঃ।*
*🌷একাকী যত চিতাত্মা নিরাশীঃ অপরিগ্রহঃ।।*
*🔷ভাবার্থ এই যে, "প্রকৃত যোগী একাকী নির্জন জায়গায় থেকে সংযতদেহ--সংযতচিত্ত-- আকাঙ্ক্ষাশূন্য ও পরিগ্রহশূন্য হয়ে চিত্তকে সবসময় সমাধি অভ্যাস করাবেন।*
*(৩) অবধূতজীর তৃতীয় শিক্ষাগুরু হচ্ছেন--"আকাশ"।*
*আকাশ=এটি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন যে আকাশ যেরকম দিগন্ত বিস্তৃত রহিয়াও কারও সঙ্গে লিপ্ত হয় না, তেমনি সাধনসিদ্ধ মুনিকেও সদাসর্বদা শ্রীহরি পাদপদ্ম ধ্যান ধারণায় নিজের জীবনকে চালনা করতে হবে।কারও সঙ্গে যেন লিপ্ত না হতে হয়।এই প্রসঙ্গটি আরও সহজবোধ্য হবে যদি আমরা গীতার রাজবিদ্যা রাজগুহ্য যোগের শ্লোকটি অনুশীলন করি, যেখানে শ্রীভগবান বলেছেন----*
*🌷যথা আকাশস্থিতো নিত্যং বায়ু সর্বত্রগো মহান্,*
*🌷তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানি ইতি উপধারয়।*
*🍀অর্থ্যাৎ ভাবার্থ হচ্ছে যে বায়ু আকাশে থাকলে যেমন উহা আকাশের সঙ্গে সংস্পৃষ্ট হয় না, সেইরকম সর্বভূত আমাতে থাকলেও আমার সঙ্গে উহাদের কোন বন্ধন হয় না।(অবধূতজীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় গুরু করণের সঙ্গে গীতার এই শ্লোক দুইটির বিশেষ সামঞ্জস্য আছে বলিয়া এখানে দেওয়া হল।*
*(৪)অবধূতের চতুর্থ শিক্ষাগুরু হচ্ছেন "জল"।*
*🍀ইহাকে বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন যে প্রকৃত সাধু বা যোগীকে জলধর্ম অবলম্বন করে চলতে হবে। কারণ জল মাত্রই স্বভাবত স্বচ্ছ(একেবারে পরিস্কার) এবং স্নিগ্ধ (কোমল) এবং মধুর।অর্থ্যাৎ তাঁর মতে জলের সঙ্গে মিত্রতা করতে হবে, তাহলে তাঁর ক্রিয়া জলের সমান হবে।জল মাত্রই স্নিগ্ধ এবং জলের এই স্নিগ্ধধর্ম মুনিগণকে গ্রহণ করতে হবে।জল যেরকম নিজের পিপাসা মেটায় না এবং শুধুমাত্র তৃষ্ণার্ত জীবজগতের পিপাসাকে নিবৃত্ত করে মুনিগণকেও তেমনি নিজে বিষয় ভোগ করা চলবে না।সেজন্য তিনি জলকে গুরুত্বে বরণ করেছিলেন। অবধূতজী আরও বলেছেন যে জলমাত্রেই স্বভাবতই স্বচ্ছ এবং জলের যে মালিন্য তা বহিরাগত,সেজন্য প্রকৃত সাধুকে এই মালিন্যকে ভজনের মাধ্যমে দূরীভূত করতে হবে।*
*(৫) অবধূতজীর পঞ্চম গুরু হচ্ছেন অগ্নি।*
*🍀এই প্রসঙ্গে অবধূতজী বলেছেন প্রকৃত যোগীকে অগ্নির ন্যায় তেজস্বী হতে হবে।এই তেজস্বীতা পরম সাত্ত্বিক যোগীর মুখমন্ডল দর্শনেই প্রতীয়মান বা বোধগম্য হয়, যেন মনে হয় দেহ হতে একটি জ্যোতি বাহির বা নির্গত হচ্ছে।তেমনি আবার অগ্নি সর্বপ্রকার গ্লানি বা অপবিত্র জিনিসকে দহন করলেও সদা পবিত্র--, সেইরকম প্রকৃত সাধুকেও এই জাতীয় পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে।অগ্নি যেমন কখনও সতেজ কখনও নিষ্প্রভ প্রকৃত মুনিকেও সেরকম প্রচ্ছন্ন অগ্নির মত সময় সময় ব্যবহারিক জগতে জড়বৎ আচরণ করতে হবে।অনেকটা জড়-জগতের মত। আবার প্রয়োজনে নিজস্ব ব্রহ্মচর্য্যরূপ তেজ অগ্নির মত বিকাশও করতে হবে।*
*(৬)অবধূতজীর ষষ্ঠ গুরু হচ্ছেন চন্দ্র।*
*🍀চন্দ্রকে গুরুপদে বরণ করবার কারণ এই যে আলোক মাত্রেই উজ্জ্বল এবং তাতে দাহিকা শক্তি বিদ্যমান। কিন্তু চন্দ্রালোকের বিশেষত্ব এই যে এটি তমসাচ্ছন্ন(অন্ধকারময়) ধরিত্রীকে আলোকিত করলেও সেই চন্দ্রালোক অতীব স্নিগ্ধ এবং উপভোগ্য।*
*সেজন্য অবধূতজী বলতে চাহেন যে প্রকৃত সাধুর স্বভাব হবে চাঁদের মত স্নিগ্ধ।জ্ঞানালোকে তাঁর চিত্ত উদ্ভাসিত হলেও যেন সদাসর্বদা স্নিগ্ধতা বজায় থাকে।এই গুণের জন্যই তিনি চন্দ্রকে গুরুত্বে বরণ করেছেন।*
*(৭)অবধূতজীর (দত্তাত্রেয় ঋষির) সপ্তম গুরু হচ্ছেন সূর্য্য।*
*🍀রবির কাছ থেকে তিনি এই শিক্ষাই পেয়েছেন যে সূর্য্য নিজের রশ্মিদ্বারা সর্বপ্রকার জলাশয়ের জলকে আকর্ষণ করলেও তিনি নিজেতা ভোগ করেন না, প্রয়োজনমত তিনি বারিধারার মাধ্যমে সেই জল পৃথিবীকে দান করেন জীবের মঙ্গলের জন্য।তিনি তো ইচ্ছে করলেই তা নিজের ভোগের জন্য রাখতে পারতেন কিন্তু তা করেননি। সেহেতু অবধূতজী প্রকৃত সাধুর চরিত্র বিশ্লেষণ করে বলেছেন যইন্দ্রিয় যদি বিষয় গ্রহণ করে এবং যদি তার ফলে এবং ভোগে আসক্ত হয় তাহলেই বন্ধনের সৃষ্টি।আর লাভালাভে চিত্ত যদি আসক্তিহীন হয় তাহলেই মুক্তি।সেইজন্য প্রকৃত সাধুকে বিষয় ভোগ করলেও আসক্ত হওয়া চলবে না।*
*(৮)অবধূতজীর অষ্টম গুরু হচ্ছেন কপোত-কপোতী।*
*🍀কোন এক বৃক্ষে এক কপোত কপোতী জীবন যাপন করত।কিছুদিন পরে কপোতী কতগুলি শাবক প্রসব করে।শাবকগুলি লালন পালনের জন্য কপোত কপোতী অসম্ভব কষ্ট স্বীকার করে তাদের জন্য আহার্য্য সংগ্রহ করত এবং সন্তানদের ধীরে ধীরে বেড়ে উঠার জন্য পিতা মাতার আর আনন্দ ধরে না,মায়ার শৃঙ্খলে তারা উভয়েই এমন আসক্ত হয়ে পড়িল যে তা বলার যোগ্য নয়।একদিন তারা যখন আহারের খোঁজে গিয়েছিল এক ব্যাধ শাবকগুলিকে জাল পেতে ধরে ফেলে এবং পিঞ্জরাবদ্ধ শাবকগণ ব্যাকুল ভাবে কাঁদতে থাকে।এমন সময় কপোত কপোতী তাদের নীড়ে বা বাসায় ফিরে এসে সন্তানদের এই দুর্দশা দেখে নিজেদের অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতে থাকে।সন্তান স্নেহের প্রাবল্যে করুণ ভাবে রোদন করতে করতে মাতা কপোতী সন্তানদের দুঃখে বিচলিত হয়ে সেই জালের কাছে উপস্থিত হওয়া মাত্র ব্যাধ তাকে ধরে ফেলে।তখন পিতা কপোত সকলের এই দুর্দশা দেখে মায়ামোহে পড়ে স্বেচ্ছায় নিজেকে সেই ব্যাধের জালে ধরা দিল, যার ফলে কপোত কপোতী তাদের সব সন্তান সন্ততি সহ মৃত্যুমুখে পতিত হল।(এটি দ্বারা অবধূতজী এই শিক্ষাই লাভ করলেন যে যদি কোন ব্যক্তি অত্যন্ত মায়াপ্রবণ হয়ে সংসারের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে তারা শেষে কপোত কপোতীর মত বিড়ম্বনা ভোগ করে।প্রকৃত সাধুকেও এই সমস্ত বিষয় হতে যথোচিত শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।*
*(৯)অবধূতজীর নবম গুরু হচ্ছেন "অজগর"।*
*🍀আমরা সকলেই জানি যে অতি বিশালাকায় অজগর সাপ খাদ্য অন্বেষণের জন্য ছুটাছুটি করতে পারে না, সে জঙ্গলের একটি জায়গায় পড়ে থাকে এবং কৃপাময় ভগবান তাকে এমন শক্তি দিয়েছেন যে নিঃশ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে সেই পরিধির মধ্যে কোন জীবজন্তু আসিলে সে তাদের টেনে নিয়ে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে।অর্থ্যাৎ পছন্দমত খাদ্য সংগ্রহের কোন প্রবৃত্তি তার মধ্যে নাই এবং যা পায় তাতেই সন্তুষ্ট।সেইরকম ভোগ্য এবং ভোজ্য বস্তুর জন্য প্রকৃত যোগী যেন কোন চেষ্টাই না করেন এবং যেন অজগর বৃত্তি অবলম্বন করেন।তিনি সাধন জগতে নিবিষ্ট থাকবেন এবং অযাচক বৃত্তি অবলম্বন করবেন কারণ ভগবান তাঁর ভক্তের "যোগক্ষেম" বহনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর একটি কথা -- আপনারা কখনও দেখেছেন বা শুনেছেন যে ভজনশীল কোন সাধু মহাত্মা অনাহারে বা খাদ্য অভাবে মারা গেছেন। কখনই না,কারণ তাহলে সেদিন শাস্ত্রবাক্য সব মিথ্যায় পর্য্যবসিত হবে।*
*যেদিন যা জুটে প্রকৃত যোগীকে মনে করতে হবে এটাই ভগবানের ইচ্ছা এবং সানন্দে তা গ্রহণ করতে হবে এবং অজগরের মত আচরণ করতে হবে।এটিই অবধূতজীর শিক্ষা অজগর সাপের কাছ হতে এবং চলতি কথায় একে "অজগর বৃত্তি" বলা হয়।*
*(১০)অবধূতজীর দশম গুরু হচ্ছেন সিন্ধু অর্থ্যাৎ মহাসমুদ্র।*
*🍀তিনি বলেছেন,যোগী বা মুনিগণকে সদা সর্বদা বাইরে প্রসন্নভাব এবং ভিতরে গম্ভীর ভাবে থাকতে হবে।কোন ব্যাপারেই যেন চিত্ত চঞ্চল না হয়।এই প্রসঙ্গে গীতার একটি শ্লোকই ইহার যথার্থ ভাবার্থ বহন করে,যথা----*
*🌷আপূর্য্যমানং অচল প্রতিষ্ঠং,*
*🌷সমুদ্রম্ আপঃ প্রবিশন্তি যদৃবৎ,*
*🌷তদবৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্ব্বে,*
*🌷স শান্তিম্ আপ্নতি ন কামকামী।*
*মহাসমুদ্র দর্শন করলেই বুঝা যায় যে সদাই জলরাশিতে পরিপূর্ণ।সেই স্বদাপূর্ণ সমুদ্রে অবিরত নদ নদী হতে জলরাশি প্রবেশ করছে কিন্তু তাতে সমুদ্রের কোন বিক্ষোভ উপস্থিত হয় না।সদা সর্বদাই যেন ধীর,শান্ত এবং প্রশান্ত।সেইরকম ঈশ্বরে যাঁদের মনপ্রাণ সমর্পিত,বিষয়গুলি তাঁদের ইন্দ্রিয় গোচর হলেও তাঁদের চিত্ত বিক্ষুদ্ধ হয় না।যে কথা গীতায় অন্যত্র বলা হয়েছে,যথা-----*
*🌷দুঃখেষু অনুদ্বিঘ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ,*
*🌷বীতরাগ ভয়ক্রোধঃ স্থীতধীঃ মুনিঃ উচ্যতে।*
*🍀অর্থ্যাৎ দুঃখে যিনি উদ্বেগশূন্য, সুখে স্পৃহাশূন্য বা বাসনাশূন্য,যার অনুরাগ,ভয় ক্রোধ সব নিবৃত্ত হয়েছে তাঁকেই স্থিতপ্রজ্ঞা মুনি বলা হয়।সেজন্য অবধূতজী সমুদ্রকে গুরুত্বে বরণ করে বলেছেন যে প্রকৃত যোগীকে বা মুনিকে মহাসমুদ্রের মত আচরণ করতে হবে।এইজন্যই মহাসমুদ্রকে গুরুরূপে বরণ করেছিলেন।*
#প্রেম#
সম্যঙ মসৃণিতস্বান্তো মমতাতিশয়াঙ্কিত।
ভাবঃ স এব সান্দ্রাত্ম বুধৈঃ প্রেমানিগদ্যতে।।
(ভক্তিরসামৃতসিন্ধু )
যাহা দ্বারা হৃদয় সম্যক্ রূপে নির্মল হয়, যাহা অত্যন্ত মমতাযুক্ত, যাহা অত্যন্ত ঘনীভূত, তাহাকেই
পন্ডিতগণ "প্রেম" বলিয়া থাকেন।
""কবিরাজ গোস্বামীপাদের প্রেমের সংজ্ঞা""
আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি বাঞ্জা ধরে প্রেম নাম।।
কামের তাৎপর্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল।
কৃষ্ণ সুখ তাৎপর্য্য প্রেম মহাবল।।
#প্রেম লক্ষণ#
অনেক বিপদে মন কিঞ্চিৎ না টলে।
প্রেমের লক্ষণ সেই সাধু শাস্ত্রে বলে।।
(শ্রীশ্রীভক্তমাল গ্রন্থ )
#স্নেহের লক্ষণ#
সেই প্রেম পরিপাকে হৃদয়ে তে রয়।
স্নেহ নাম ধরি সুখ অধিক বাঢ়য়।।
(শ্রীশ্রীভক্তিমাল গ্রন্থ )
#মান লক্ষণ#
স্নেহ পরিণামে তবে মান নাম হয়।
বক্রগতি শোভা হয় রস সুখময়।।
(ঐ)
#প্রণয় লক্ষণ#
মান পরিপাকেতে বিশ্বাস মিত্র বৃত্তি।
সখ্য দুই ভাঁতি হয় সুখের উন্নতি।।
প্রণয় বলিয়া তবে হয়তো আখ্যান।
প্রণয়ের পরিপাকে রাগের লক্ষণ।।
(ঐ)
# রাগ লক্ষণ#
বহু যে দুঃখেতে সুখ করিয়া মানয়।
ঈষৎ না টলে মন রাগ সেই হয়।।
(ঐ)
দর্শনে শ্রবণে রাগ দুইতো প্রকার।
সাক্ষাৎ দর্শন এক চিত্রপটে আর।।
(রসকল্পবল্লী গ্রন্থ )
#অনুরাগ লক্ষণ#
প্রিয় মুখ কমল যে যখন দেখয়ে।
নূতন নূতন বুদ্ধি প্রতিক্ষণে হয়ে।।
দেখিয়াও দেখি নাই মনে উপজয়ে।
তৃপ্তি নাহি হয় অনুরাগের বিষয়ে।।
(শ্রীশ্রীভক্তমাল গ্রন্থ )
শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণের আদি রস দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া রসকল্পবল্লীর গ্রন্থকার শ্লোক রচনা করেছেন -----------------------------------------------------
বিপ্রলব্ধ-সম্ভোগ দুই করিয়ে গণন।
উজ্জ্বল মধুর রসে দুই প্রয়োজন।।
এই বিপ্রলব্ধ তবে চতুর্বিধাখ্যান।
পূর্বরাগ প্রবাস, প্রেম-বৈচিত্র্য আর মান।।
# বিপ্রলব্ধ শ্রেণীবিভাগ সম্বন্ধে শ্রীশ্রী ভক্তমাল গ্রন্থে এই শ্লোক পাওয়া যায় --------------------------
পূর্বরাগ, মান, প্রেম-বৈচিত্র্য, প্রবাস।
চারি ভেদ হয় বিপ্রলব্ধের প্রকাশ।।
#পূর্বরাগ লক্ষণ#
সঙ্গমের পূর্বে যেই দেখিয়া শুনিয়া।
জনময়ে রাগ লোভ হৃদয়ে পশিয়া।।
সেই পূর্বরাগ তার বিষয় যে শুন।
দর্শন শ্রবণ বসু ভেদ কহি পুনঃ।।
(শ্রীশ্রী ভক্তমাল গ্রন্থ )
*** সঙ্গ নহে রাগ জন্মে কহি পূর্বরাগ।
( রসকল্পবল্লী গ্রন্থ )
# অষ্ট নায়িকা #
১, অভিসারিকা ২, বাসকসজ্জা ৩, উৎকন্ঠিতা
৪,বিপ্রলব্ধা ৫,খন্ডিতা ৬,কলহান্তরিতা ৭, স্বাধীন-
ভর্তৃকা ৮, প্রোষিত ভর্তৃকা।
(১) অভিসারিকার লক্ষণ----------------
"কান্তার্থিনী তু যা যাতি সঙ্কেতং ষাভিসারিকা"
অভিসারের আগে হয় দুইত ধরণ।
নায়ক গমন কিম্বা নায়িকা গমন।।
(রসকল্পবল্লী গ্রন্থ )
** এই অভিসারিকা নায়িকাও রসমঞ্জরী গ্রন্থে অষ্ট প্রকার নামে অভিহিতা।
(১) জ্যোৎস্না (২) তামলী (৩) বর্ষা (৪)দিবা (৫)
কুঞ্ঝটিকা (৬)তীর্থযাত্রা (৭) উন্মত্তা (৮)সঞ্চারা।
** প্রথম হতে ছয় প্রকার অভিসারিকায় লক্ষণ শব্দ দ্বারাই অনুভব হয়। উন্মত্তা ও সঞ্চারার লক্ষণ এই।( মুরলীক নাদ যব শুনই শ্রবণে।
উন্মত্ত হইয়া চলে নায়ক মিলনে।।)
( রসমঞ্জরী গ্রন্থ )
** সঞ্চারাভিসারিকার লক্ষণ---------------------
অনঙ্গ রসে মহাপীড়া আশঙ্কিত মন।
নিজ গৃহে স্থির নহে মন উচাটন।।
নিজো অঙ্গের বেশ করতে না পারে।
ভুজে নূপুর দেয় কঙ্কন পদে ধরে।।
অঞ্জন কপালে দেয় সিন্দুর অধরে।
উন্মত্ত হয় সেই মুরলীর স্বরে।।
(২) বাসকসজ্জা নায়িকার লক্ষণ
প্রিয়ের সহিত বিলাসের আশা করি।
গৃহ শয্যা মাল্য তাম্বুল স্নিগ্ধ বারি।।
চন্দনাদি নানা গন্ধ বসন ভূষণ।
সাজায় করিয়া সাধ প্রিয়ের কারণ।।
(শ্রীশ্রীভক্তমাল গ্রন্থ )
বাসকসজ্জা নায়িকা আবার অষ্ট প্রকার------
(১) মোহিনী (২)জাগর্তিকা(৩)রোদিতা(৪)মধ্যোক্তিকা
(৫)সুপ্তিকা(৬)প্রগলভা(৭)সুরসা ও (৮)উদ্দেশা)।
***মোহিনী নায়িকার লক্ষণ =
সজ্জা করি মোহিনী রহে সখীর সহিতে।
গোবিন্দকে করিবে মোহ অনুমান চিতে।।
***জাগর্তিকা নায়িকার লক্ষণ=
নিজে অঙ্গের ভূষা করি করে জাগরণ।
উঠি বসি দ্বারে যায় করে নিরীক্ষণ।।
*** রোদিতা নায়িকার লক্ষণ=
বিলাপ করিয়া ধনি করে রোদন।
অন্তরে হরষ হয় নায়ক মিলন।।
*** মধোক্তিকা নায়িকার লক্ষণ=
নিকুঞ্জ কানুন ধনি করে পরিষ্কার।
নিজে গুণ গরিমা কিছু করয়ে বিস্তার।।
নায়ক আইলে যে মতে করিবে মিলন।
মনে কত আশা করে কেলি সোঙরণ।।(স্মরণ)
***সুপ্তিকা নায়িকার লক্ষণ=
কুসুম শয়ানে সদা শয়নে উল্লাস।
সখী সঙ্গে করে সদা হাস পরিহাস।।
*** প্রভলভা নায়িকার লক্ষণ=
প্রগলভা একাকী রহে কুঞ্জেতে বসিয়া।
নায়ক আসিবে বলি উল্লসিত হিয়া।।
কিশলয় শেজ করে বকুল বিছাই।
দ্যুতিকে তর্জন করি সঘনে পাঠায়।।
*** সুরসার লক্ষণ ==========
নিজ মন্দিরেতে রহে নির্ভর হইয়া।
বস্ত্র আভরণ পনে শেজ বিছাইয়া।।
দূত পাঠাইয়া জানে নায়ক সম্বাদ।
বিলম্ব দেখিয়া কিছু করে অনুবাদ।।
উদ্দেশার লক্ষণ=====
নানা বেশ করি রহে সংকেতে যাইয়া।
নায়ক আসিবে মনে উলসিত হিয়া।।
নায়ক উদ্দেশ্যে নিজ সখীরে পাঠাই।
নানা উপচার করি মঙ্গল গায়।।
(৩) উৎকন্ঠিতা ---------
প্রিয় আগমন যবে শীঘ্র না করয়।
পথপানে চাহি রহে উৎকণ্ঠা হৃদয়।।
বিরহ তাপিত অতি করে বিলাপ।
নয়নে গলয় বারি কহয়ে প্রলাপ।।
সখীগণ আশ্বাস করে কত মত।
এখনই আসিবে প্রিয় স্থির কর চিত।।
(শ্রীশ্রীভক্তমাল গ্রন্থ )
উৎকণ্ঠিতা কান্ত পথ করে নিরীক্ষণ।
কতক্ষণ হইবেক মোর নায়ক মিলন।।
(রসমঞ্জরী গ্রন্থ )
* এই উৎকন্ঠিতা নায়িকা অষ্ট প্রকার যথা----
(১) উন্মত্তা(২) বিকলা (৩) স্তব্ধা (৪)চকিতা (৫)
অচেতনা (৬) সুখোৎকন্ঠা(৭)প্রগলভা ও (৮)নির্বন্ধা।
*** উন্মত্তা (পাগলিনী)------
*** বিকলা ------------
নায়ক না দেখি ধনী হয়তো বিকলা।
পথ পানে চাহি ধনী হইয়া চঞ্চলা।
*** স্তব্ধা -------
ক্ষণে ওঠে ক্ষণে বৈসে কাতর বদনী।
নায়ক বিলম্বে নখে লিখয়ে ধরনের।।
শয্যায় শয়ন ক্ষণে কামাতুরা হয়ে।
ক্ষণে ক্ষণে উঠে ধায় তমাল দেখিয়ে।।
*** চকিতা ==
ক্ষণেক বিরহ করে নানা অনুতাপ।
ক্ষণে ক্ষণে কহে ধনী বচন প্রলাপ।।
*** অচেতনা --- অচেতন অবস্থা প্রাপ্তা।
***সুখোৎকন্ঠিতা ====
পূরবে মুগধা যেন করয়ে বিলাস।
সেই কথা মনে গুণি করয়ে উল্লাস।।
***প্রগলভা =
শয্যা ত্যজিয়া রামা ক্ষণে বাহিরায়।
ক্ষণে মূরছিত তনু কান্দে উভরায়।।
ক্ষণে বাহিরায় ক্ষণে চলে আধ পথ।
দূতী সহ কলহ করয়ে অনুরত।।
*** নির্বন্ধা===
কেলি শয্যাতলে রহে রজনী বঞ্চিয়া।
সঙ্কেতে বসিয়া রহে নির্বন্ধ করিয়া।।
দৈব নির্বন্ধে কান্দ আসিতে না পায়।
সকল রজনী ধনী কান্দিয়া পোহায়।।
(৪) বিপ্রলব্ধা--------------------------
সখির আশ্বাসে ধনী স্থির করি মন।
প্রিয় আগমন পথ করে নিরীক্ষণ।।
বৃক্ষের যে পত্রে পত্রে শব্দ যদি হয়।
ঐ আইলো প্রিয় বলি উঠিয়া বৈঠয়।।
দ্যুতি পাঠাইয়া দিল প্রিয়ার কারণে।
ফিরিয়া আইসে দ্যুতী বজ্র হেন মানে।।
এইরূপ বিচ্ছেদ বিষয়ে নিশি যায়।
না আইলো যবে তবে মানবতী হয়।।
# এই বিপ্রলব্ধা আট প্রকার=====
1, নির্বন্ধা 2,প্রেমমত্তা 3, ক্লেশা 4,বিনীতা 5, নিন্দয়া 6, প্রখরা 7, দূত্যাদরী 8, চর্চিতা।
( নির্বন্ধার লক্ষণ দেওয়া হয়েছে )
** প্রেমমত্তা ------
নানা আভরণ পড়ি রহয়ে সঙ্কেতে।
জাগিয়া পোহায় নিশি কান্দিতে কান্দিতে।।
আপন যৌবন দেখি কান্দিয়া বিকল।
নিশি পরভাত হইল নহিল সফল।।
** ক্লেশার লক্ষণ---
নায়ক আইলো ঘরে জানিয়া নিশ্চয়।
সহচরী সঙ্গে সব দুঃখ কথা কয়।।
** বিনীতার লক্ষণ--
বিরহে বিনয় বাক্যে কহয়ে সখিরে।
ঝাঁপ দিবো আজি আমি যমুনার নীরে।।
** নিন্দয়ার লক্ষণ---
সখীমুখে শুনি আজি নায়ক না আইলো।
মিথ্যা সংকেত মানি রজনী পোহালো।।
হার মালা আভরণ ছিড়িয়া ফেলায়।
পুষ্প মালা আদি সব জলেতে ভাসায়।।
** প্রখরার লক্ষণ ----
জাগিয়া নয়নের জল নিরবধি ঝরে।
বিরহে বিলাপ করি কান্দে উচ্চৈঃস্বরে।।
** দূত্যাদরীর লক্ষণ---
নায়ক আসিবে স্বরে সংকেত জানিল।
কোকিলের ধ্বনি হেন শব্দ শুনিল।।
গুরুজন জাগি ঘরে উঠিল সত্বরে।
নায়ক বিমুখ হইয়া গেল নিজের ঘরে।।
*** চর্চিতার লক্ষণ মানে রাগান্বিতা।
(৫) খন্ডিতা -----
অন্য নায়িকা ভোগ করিয়া নায়ক।
আইসে অঙ্গতে নখ-চিহ্নাদি যাবক।।
দেখিয়া কোপিতা মনে র্ভৎসনাদি করি।
উপেক্ষা করয়ে যে খন্ডিতাবতী নারী।।
&খন্ডিতা নায়িকা অষ্টপ্রকার যথা -----
1,ধীরা 2, বিদগ্ধিকা 3, ক্রোধা 4, প্রগলভা 5, মধ্যা
6, মুগ্ধা 7, রোদিতা 8, প্রেমমত্তা।
(৬) কলহান্তরিতা
মান অন্তে প্রিয়ার বিচ্ছেদ সূচন।
অনুতাপ সেই কলহান্তরিতার লক্ষণ।।
&& এই কলহান্তরিতা নায়িকা আট প্রকার।
1, আগ্রহ 2, বিকলা 3, ধীরা 4, অধীরা 5, কোপনবতী 6, মন্থরা 7,সমাদরা 8,মুগ্ধা।
(৭) স্বাধীন ভর্তৃকা-------------------------------
নায়িকার অধীনমতে বেশাদি রচন।
নায়ক করয়ে স্বাধীন ভর্তৃকা লক্ষণ।।
আলুয়াইয়া কেশ করে বেণীর রচন।
কুচযুগে করে পত্রাবলীর লিখন।।
চিবুকে কস্তুরী বিন্দু নাসায় তিলক।
গলে মণিহার দেয় চরণে যাবক।।
চুম্ব আলিঙ্গন করে হিয়া আনন্দিত হিয়া।
আজ্ঞা করিতে থাকে কর পরশিয়া।।
** এই স্বাধীন-ভর্তৃকা নায়িকা অষ্টপ্রকার।
স্বাধীন ভর্তৃকা কথা শুন দিয়া মন।
কোপনা মানিনী মুগ্ধা মধ্যা বিচক্ষণ।।
উক্তকা উল্পাসা অনুকূলা অভিষেকা।
স্বাধীন ভর্তৃকা এই অষ্ট কৈল লেখা।।
1, কোপনা 2,মানিনী 3,মুগ্ধা 4,মধ্যা 5,উক্তকা
6, উল্পাসা 7, অনুকূলা ও 8,অভিষেকা।
(রসমঞ্জরী গ্রন্থ )
""প্রেম-বৈচিত্র্যর লক্ষণ""
দম্পতির পরম্পর প্রমোৎকর্ষ হয়।
অধিকীর্তিরত্যা সেই বিচারি না লয়।।
অঞ্চলে বান্ধিয়া রত্ন চাহি ফিরে ঘরে।
লোকেতে থাকিয়া হয় বিচ্ছেদ অন্তরে।।
""প্রবাস লক্ষণ""
সাধারণত প্রবাসকে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা যাইতে পারে। (১) দূর প্রবাস (২) নিকট প্রবাস।
** নায়ক প্রবাসে থাকলে নায়িকার বিরহ উপস্থিত
হয়, সেই বিরহিনী নায়িকাকে "প্রোষিতভর্তৃকা" বলা হয়।
প্রোষিতভর্তৃকা যার প্রিয় দূর দেশ।
বিরহিনী অঙ্গ মলিন নাহি বান্ধে কেশ।।
চিন্তিয়া আকুল দীন মন অঙ্গ হীন।
হায় হায় হুতাশ করয়ে রাতি দিন।।
** প্রোষিতভর্তৃকা নায়িকার বিরহকে তিন শ্রেণীতে
বিভক্ত করা যাইতে পারে। 1, ভাবী বিরহ 2, ভবন
বিরহ ও 3,ভূত বিরহ। (এই তিন প্রকার বিরহে দশপ্রকার অবস্থার উল্লেখ প্রাপ্ত হওয়া যায়।
(লালাসোদ্বেগ জাগার্য্যাস্তানবংজড়িমাএতু।
বৈয়গ্রংব্যাধিরুন্মাদো মোহোমৃত্যু-র্দশাদশ।।)
1, চিন্তা 2,জাগরণ 3,উদ্বেগ 4,ক্ষীণ 5,মলিন
6,প্রলাপ 7,ব্যাধি 8,উন্মাদ 9,মূর্ছা 10, মৃত্যু।
""সম্ভোগ লক্ষণ""
দরশন আলিঙ্গন চুম্বনাদি করি।
তাহে যে উপজে সুখ সম্ভোগ বিচারি।।
তাহাতে যে ভেদ দুই মুখ্য আর গৌণ।
মুখ্য চেতন আর গৌণ স্বপন।।
""মুখ্য সম্ভোগ""
মুখ্য পুনঃ চারিভেদ সংক্ষিপ্ত, সংকীর্ণ।
সম্পন্ন,সমৃদ্ধিমান চারি মুখ্য গণ্য।।
"" সংক্ষিপ্ত সম্ভোগ""
পূর্বরাগ পরে কৃষ্ণ সঙ্গে যে মিলন।
সংক্ষিপ্ত সম্ভোগ বলি তাহার গণন।।
""সংকীর্ণ সম্ভোগ""
মানের পশ্চাতে যে সম্ভোগ উপজয়।
সংকীর্ণ সম্ভোগ বলি গণন তাহায়।।
""সম্পন্ন সম্ভোগ""
প্রবাস হইতে প্রিয় আসিয়া সম্ভোগ।
সম্পন্ন যে সেই যাতে সর্ব উপভোগ।।
"" সমৃদ্ধমান সম্ভোগ""
পরবশ বাধা হইতে ছুটিয়া দর্শন।
দুর্লভ দর্শন সম্ভোগ বিচক্ষণ।।
রসময় সর্ব উপচয় তাহে হয়।
সম্ভোগসমৃদ্ধিমান করিয়া বহয়।।
""গৌণ সম্ভোগ""
স্বপনেতে নানারঙ্গ রসের সংযোগ।
তাহাতে যে সুখ সেই গৌণ সম্ভোগ।।
স্বপন দেখিয়া ধনী অতি প্রমোদিত।
সখীর সহিত কহে করিয়া বিদিত।।
# দূতী#
দূতী দুই প্রকার-- স্বয়ং দূতী ও আপ্ত দূতী।
অতি অনুরাগে লাজ ত্যজি প্রিয় সনে।
মিলিবারে চাহে স্বাভিযোগের কারণে।।
স্বয়ং দূতী সেই স্বয়ং দূতী পানা করি।
প্রিয়সনে মিলে গিয়া আপনি সুন্দরী।।
তাহাতে যে তিন ভেদ বাক্য কায় নয়ন।
বাক্যের অনেক ভেদ না যায় বর্ণন।।
## আঙ্গিক##
অঙ্গুলির ধ্বনি করি মুখে দেয় হাত।
অন্যমনে ভুল বাক্য কহে সখি সাথ।।
চরণের বৃদ্ধাঙ্গুলে ধরণী খোদয়।
কর্ণকন্ডুয়ণ করি স্তন দরশয়।।
সখির কন্ঠেতে ধরি করে আলিঙ্গন।
পুনর্বার ছাড়ি করে তাড়ন ভৎসন।।
চঞ্চল নয়ানে পুনঃ ইথি উথি চাহে।
স্তম্ভ প্রায় রহে অকারণ বাক্য কহে।।
অধর দংশন করে সখীর কর্ণেতে।
মিছামিছি কহে কথা ধরিয়া কন্ঠেতে।।
## চাক্ষুষ##
ঈষত নয়ানে হরি বদন ফিরায়।
হাসি হাসি চাহি পুনঃ নয়ন ঢুলায়।।
মুদিত নয়ান পুনঃ আধ আধ হেরি।
কটাক্ষ করয়ে বাম নয়ান পশারি।।
(জয় নিতাই, ভুল ভ্রান্তি মার্জনীয়)
*(১১)অবধূতজীর একাদশ গুরু হচ্ছেন পতঙ্গ।*
*🍀আমরা সকলেই জানি বা দেখি যে রাত্রিকালে পতঙ্গগুলি আগুনের আলোতে প্রলুব্ধ হয়ে তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং এইরকম স্পৃসা বা বাসনা দ্বারা বিনাশ পথে পতিত হয়।নিশ্চিৎ মরণ জেনেও এবং চোখের সামনে সকলে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে দেখেও পতঙ্গগুলি আগুনের আলোতে আকৃষ্ট হয়ে মৃত্যুকে বরণ করে।*
*🍀এই প্রসঙ্গটির অবতারণা করে অবধূতজী বলেছেন যে,সাংসারিক জগতে ইন্দ্রিয়ের চাহিদা যে সমাধান করতে পেরেছে তারই প্রকৃত বৈরাগ্য লাভ হয়েছে।চোখে কাপড় বেঁধে রূপ দেখব না বললেই বৈরাগ্য হয় না। অর্থ্যাৎ চোখে কাপড় বাঁধা, বৈরাগ্যের সাধনা নয়, প্রকৃত বহির্জগতের রূপ-রসাদিতে অরুচিই প্রকৃত বৈরাগ্য।এই প্রসঙ্গে একটি শাস্ত্রবাক্য (গরুড় পুরাণে) খুব শিক্ষণীয় যথা ঃ--*
*🌷পতঙ্গ মাতঙ্গ কুরঙ্গ ভৃঙ্গ মীনাঃ পঞ্চভিরেব পঞ্চ।*
*🌷একঃ প্রমাদী স কথং ন হন্যতে যঃ সেবতে পঞ্চভিরেব পঞ্চ।।*
*🌻অর্থ্যাৎ=পতঙ্গ,মাতঙ্গ (হস্তী), কুরঙ্গ (হরিণ),ভৃঙ্গ(ভ্রমর), মীন (মৎস্য বা মাছ) এরা প্রত্যকে বিনাশ প্রাপ্ত হয় কারণ তাদের প্রত্যেকের একটি করে ইন্দ্রিয় দুর্বল।সেই দুর্বল ইন্দ্রিয় পথে তাদের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। সেই তুলনায় মানুষ তো পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের অধিকারী এবং তারও এইটি ইন্দ্রিয়ের দুর্বলতায় সমস্ত প্রজ্ঞা বুদ্ধি বিনাশ প্রাপ্ত হয়।পতঙ্গের কাছ হতে এইরকম শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে অবধূতজী তাকে গুরুরূপে বরণ করেছিলেন।*
*(১২)অবধূতজীর দ্বাদশ গুরু হচ্ছেন মধুকর।*
*🍀এই মধুকরকে তিনি দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন, যথা--,ভ্রমর ও মৌমাছি। ভ্রমরের স্বভাব এই যে বিভিন্ন পুষ্প হতে একটু একটু করে মধু আহরণ করে, সেইরকম প্রকৃত যোগী বিভিন্ন শাস্ত্র হতে সারবস্তুটুকু গ্রহণ করবেন।অনেকটা মাধুকরী বৃত্তির মত, কারণ মাধুকরী বৃত্তির প্রধান নীতি হচ্ছে যে, সেইদিনের মত ভিক্ষান্ন সংগৃহীত হলে তিনি যেন আর ভিক্ষা না করেন অর্থ্যাৎ সঞ্চয় মনোবৃত্তিকে বিসর্জন দিতে হবে।সেইজন্য অবধূতজী ভ্রমরকে গুরুপদে বরণ করেছেন।*
*🍀তেমনি আবার তিনি মৌমাছির ন্যায় সঞ্চয়ী মনোবৃত্তিকে নিন্দনীয় বলে পরিত্যজ্য বলেছেন কারণ এই মৌমাছি এত কষ্ট করে মধু সংগ্রহ করে মৌচাকে সঞ্চয় করে, কিন্তু নিজে একটুও ভোগ করে না পরিশেষে মধুশিকারীদের হাতে সব বিনাশপ্রাপ্ত হয়। সেজন্য তিনি ভ্রমরের ন্যায় মাধুকরী বৃত্তিকে শ্রেয়জ্ঞান করেছেন এবং মৌমাছির আচরণের জন্যও তাকে গুরুপদে বরণ করেছেন।*
*🍀 লেখকের বক্তব্য--, মৌমাছির এই আচরণকে এইরকম দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে অন্য সিদ্ধান্তেও আসা যায় যে, মৌমাছি জীবজগতের কল্যাণের জন্য নিজে কত কষ্ট করে এই মধু সংগ্রহ করে অথচ নিজে ভোগ করে না।অর্থ্যাৎ পরেরজন্য জীবন দান।কারণ প্রস্ফুটিত ফুলের রেণুর কোষের মধ্যে মধু থাকলেও ফুলের কিন্তু সেই মধুদানের সামর্থ্য নাই।সে শুধু মধুর আধার হয়েই থাকে। পুষ্পের এই মধুর মহিমা বা মাহাত্ম্য জীব জগতে চিরকালই অবলুপ্ত থাকত যদি, না ভগবান মধুকরের সৃষ্টি করতেন।কারণ পুষ্প হতে মধু সংগ্রহের ক্ষমতা একমাত্র মধুকরেরই এবং যে মৌচাকে সে মধু সংগ্রহ করে রাখে তা হতে মধু আহরণ করে জীবজগৎ ফুলের মহিমা বা যশোগান করে।ইহা একটি তুলনামূলক চিন্তাধারা মাত্র, সুধী পাঠকগণ যেন এটি অন্য দৃষ্টি ভঙ্গিতে না দেখেন।*
*(১৩)অবধূতজীর এয়োদশ গুরু হচ্ছেন হস্তী।*
*এখানে স্পর্শ শক্তির কথা বলা হয়েছে। সাধারণতঃ বন্য হাতীকে ধরবার জন্য করিণী অর্থ্যাৎ স্ত্রী হস্তীকে ব্যবহার করা হয়।সুদক্ষ মাহুত করিণীর পিঠে আরোহণ করে জঙ্গলের মধ্যে হস্তী ধরতে ব্যাপৃত বা নিযুক্ত হয় এবং কৌশলে গর্ত্ত করে তার উপর লতাপাতাদি দ্বারা আবৃত করে স্ত্রী হস্তীকে সেখানে রাখে এবং তার সঙ্গমানসে পুরুষ হাতী আকৃষ্ট হয়ে সেই খাদে পড়ে যায় এবং ধরা পরে।সেহেতু উপমাচ্ছলে অবধূতজী বলেছেন যে,ইন্দ্রিয় চরিতার্থ লালসায় নর বা নারী যেন উভয়ে স্পর্শসুখে মোহিত না হয়। এমন কি প্রকৃতির দারু মূর্তি দর্শনও নিষিদ্ধ।এই প্রসঙ্গে ছোট হরিদাসকে উপলক্ষ্য করে শ্রীমন্মহাপ্রভু যা বলেছিলেন তা দ্বারা ইহা স্পষ্ট বুঝা যাবে।, যথা--*
*🌷প্রভু কহে বৈরাগী করে প্রকৃতি সম্ভাষণ।*
*🌷দেখিতে না পারি আমি তাহার বদন।।*
*🌷দুর্ব্বার ইন্দ্রিয় করে বিষয় গ্রহণ।*
*🌷দারবী প্রকৃতি হরে মহামুনির মন।।*
*🌷আমিতো সন্ন্যাসী আপনাকে বিরক্ত করি মানি।*
*🌷দর্শন দূরে রহুক প্রকৃতির নাম যদি শুনি।।*
*🌷তবহু বিকার পায় মোর তনু মন।*
*🌷প্রকৃতি দর্শনে স্থির হয় কোন জন?*
*🌻দর্শন হতেই স্পর্শের বাসনা জাগ্রত হয়,সেজন্য অবধূতজী স্পর্শ শক্তির কথা উল্লেখ করে হাতীকে গুরুপদে বরণ করেছেন।যার জন্য মহাপ্রভু কাষ্ঠের নির্মিত বা পাথর নির্মিত নারীর প্রতিমূর্তি দর্শনকেও প্রকৃত সাধুর পক্ষে নিষেধ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।*
🕯 🕯 🕯 🕯 🕯 🕯 🕯 🕯 🕯 🕯 🕯
*(১৪) অবধূতজীর চতুর্দশ গুরু হচ্ছেন মধুহা।*
*🍀এই প্রসঙ্গটি একবার পূর্বেই আলোচিত হয়েছে।এখানে মক্ষিকা বলতে তিনি যাকে উপলক্ষ্য করেছেন তাহল মধুহা অর্থ্যাৎ যে মধু আহরণ করে অর্থ্যাৎ মৌমাছি নয়। মৌমাছির অনেক কষ্ট স্বীকার করে মধু আহরণ করে মৌচাকে সংগ্রহ করলেও মধু আহরণ কারীরাই তা ভোগ করে -- সে নিজে কিছুই ভোগ করতে পারে না। এস্থলে প্রকৃত সাধুর চরিত্র বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন যে যথার্থ সাধুকে এই সঞ্চয়ী মনোভাবকে পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হবে কারণ তা না হলে দুঃখ পেতে হবে।প্রকৃত সাধুকে কায়মনোবাক্যে সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে গোবিন্দ ভজন করতে হবে এবং গৃহস্থীদের উচিত সঞ্চয়ের কিছু অংশ সাধু সন্ন্যাসীর সেবার জন্য ব্যয় বা দান করা। সেজন্য অবধূতজী বলেছেন, যে লোভী ব্যক্তি শুধু অতি কষ্টে অর্থ সঞ্চয় করে এবং দান বা ভোগ করে না, তার সঞ্চিত ধন অন্যে ভোগ করে,সেহেতু অবধূতজী ইহাদের গুরুপদে বরণ করেছিলেন।*
*অবধূতজীর পঞ্চদশ গুরু হচ্ছেন হরিণ।*
*এই প্রসঙ্গে একাদশ প্রশ্নে কুরঙ্গ অর্থ্যাৎ হরিণের চরিত্র বিশ্লেষণ আগেই করা হয়েছে অর্থ্যাৎ ব্যাধেরা হরিণের ডাককে নকল করে জঙ্গলে একপ্রকার শব্দ করে আর মুর্খ হরিণ মনে করে যে কাছেই হরিণের দল বিচরণ করছে,এই ভেবে তাদের সহিত মিলিত হবার বাসনায় সেই শব্দকে অনুসরণ করে পরিশেষে ব্যাধের জালে ধরা পড়ে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।*
*অর্থ্যাৎ প্রকৃত জিনিসকে না বুঝে যে অন্য জিনিসের প্রতি প্রলুব্ধ হয় তার চরম ক্ষতি হয়ে থাকে।কারণ শব্দের প্রতি আসক্তি হলে তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী, তার দৃষ্টান্ত হরিণ।হরিণকে গুরুপদে বরণ করায় সেই হরিণীপুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকেও গুরুপদে বরণ করতে হবে কারণ ঐ মৃগসুত স্ত্রীলোকের নৃত্য,গীত,বাদ্য প্রভৃতি ক্রীড়ায় বিমুগ্ধ হয়ে তাদের বশীভূত হয়ে পড়েছিলেন।সেজন্য রাজর্ষি ভরত তৃতীয় জন্ম অর্থ্যাৎ জড়ভরত জন্মে কারও সঙ্গে বাক্যালাপ করেননি। নিজে মূক বধির না হয়েও মূকের মত আচরণ করেছিলেন। কারণ বাক্যালাপের মাধ্যমেই শব্দ উচ্চারিত হয় এবং উচ্চারণভেদে প্রকারভেদে সেই শব্দ হতে নানা প্রকার সমস্যার সৃষ্টি হয় বলে এই কথাকে আসক্তির দ্বার বলা হয়। মহাজনগণ নিজেরা আচরণ করে জীবজগৎকে শিক্ষা দান করেন, অর্থ্যাৎ রাজর্ষি ভরতের মৃগজন্ম অঙ্গীকার, লোকশিক্ষার জন্য।জগৎকে শিক্ষা দিয়েছেন যে তোমরা যেন কেউ হরি ভজতে গিয়ে হরিণকে ভজনা কোরো না --, তাহলে আমার মত দুর্গতি হবে।এইরকম শিক্ষা পেয়ে অবধূতজী হরিণকে গুরুপদে বরণ করেছিলেন যদিও ইহা রূপক মাত্র।*
*🍀অবধূতজীর ষষ্ঠদশ গুরু হচ্ছেন মৎস্য।*
*🌻নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও অবোধ মৎস্য জিহ্বার লালসায় বড়শি বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুকে বরণ করে।এই জিহ্বার লালসা সম্বন্ধে মহাপ্রভুও সতর্ক বাণী আছে যেখানে তিনি বলেছেন যে প্রকৃত বৈষ্ণবকে জিহ্বার লালসা সম্পূর্ণরূপে বিসর্জন দিতে হবে কারণ যতদিন রসনাকে জয় করতে না পারা যায় ততদিন তাকে প্রকৃত সাধু বলা যাবে না, যথা----*
*🌷জিহ্বার লালসে যে বা ইতি উতি ধায়।*
*🌷শিশ্নোদর পরায়ণ কৃষ্ণ নাহি পায়।।*
*🍀এই জিহ্বার লালসার জন্য মীন অর্থ্যাৎ মৎস্য মৃত্যুমুখে পতিত হয় বলে অবধূতজী তাঁকে গুরুত্বে বরণ করেছেন।*
*"শিশ্নোদর পরায়ণ" এই কথাটির ব্যাকরণগত অর্থ হচ্ছে যে, ভোগাসক্ত-- ইন্দ্রিয়াসক্ত, কামুক বা পেটুক।ইহার মধ্যে দুইটি শব্দ আছে যথা শিশ্ন+উদর। শিশ্ন শব্দের অর্থ হচ্ছে পুরুষাঙ্গ লিঙ্গ।এবং উদর মানে পেট।এই উভয়ের পরায়ণ অর্থ্যাৎ যিনি আসক্ত তিনি কখনও শ্রীকৃষ্ণকে পাবেন না।*
*(১৭)অতঃপর অবধূতজীর সপ্তদশ গুরু হচ্ছেন "পিঙ্গলা"নামক এক পতিতারমণী।*
*🍀পিঙ্গলা নামক এক স্বৈরিণী নিজের দেহকে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে পুরুষকে আকৃষ্ট করবার জন্য যার দ্বারা সে তার দেহের বিনিময়ে অনেক অর্থ আয় করতে পারবে।দিনের পর দিন যায় কিন্তু কোন পুরুষই তার দিকে আকৃষ্ট হয় না এবং পিঙ্গলা সারাটি রাত্রি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে।এই ভাবে ক্রমাগত বিফল মনোরথ হয়ে তার মনে নিজের প্রতি ধিক্কার জন্মাইল এবং নিরাশার মাধ্যমে হৃদয়ে তীব্র বৈরাগ্যৈর আবির্ভাব হল।কারণ চিত্ত যদি দীন না হয় তাহলে তো দীননাথের কৃপা পাওয়া যায় না।সেজন্য টীকাকার বলেছেন--, এ একপ্রকার নির্ব্বেদ, অর্থ্যাৎ যখন সব বিষয়ে তার ত্যজ্য বুদ্ধি হয়েছে।ইহা দ্বারা এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে,বেশী আশা করলেই এ জীবনে দুঃখ পেতে হয় আর যদি নিরাশী হওয়া যায় তাহলেই পরম সুখ।*
*পিঙ্গলার এই চরিত্রটি হীরাবেশ্যার চরিত্রের সমকক্ষ কারণ এখানেও অর্থের লোভে এই সুন্দরীরমণী হরিদাস ঠাকুরের ন্যায় এক যতি (সন্ন্যাসী) সম্রাটকে ভ্রষ্ট করতে চেয়েছিল এবং পরে মহৎ কৃপায় যথাসর্বস্ব জলাঞ্জলী দিয়ে পরম বৈষ্ণবীতে পরিণত হয়েছিলেন।এই ঘটনাটি অনেক কাল পরের না হলে আমার মনে হয় অবধূতজী পিঙ্গলার ন্যায় হীরাপতিতাকেও গুরুত্বে বরণ করতেন।এই হীরাপতিতার নির্ব্বেদ প্রসঙ্গে বৈষ্ণব গ্রন্থে লিখেছেন যে--*
*🌷তবে সেই বেশ্যা গুরুর আজ্ঞা লইল।*
*🌷গৃহবিত্ত যেবা ছিল ব্রাহ্মণেরে দিল।।*
*🌷মাথামুন্ডি একবস্ত্রে রহিলা সেই ঘরে।*
*🌷রাত্রিদিনে তিনলক্ষ নাম গ্রহণ করে।।*
*🌷প্রসিদ্ধ কুলটা হইল পরম মহান্তী।*
*🌷বড় বড় বৈষ্ণব তাঁরে দর্শনার্থে যান্তি।।*
*🌻সেজন্য পিঙ্গলা চরিত্র উপলক্ষ্যে অবধূতজী বলেছেন যে সে জাগতিক সব জিনিসের প্রতি তৃষ্ণা বা ভোগ লালসা ত্যাগ করে পুরুষ সঙ্গম লালসা ত্যাগ করল।অর্থ্যাৎ যতদিন পিঙ্গলার প্রাকৃত পুরুষের প্রতি লালসা ছিল ততদিন চিত্তে সুখ ছিল না।সেজন্য জাগতিক এই জাতীয় আশা ত্যাগ করলে পরম সুখই লাভ হয়।সেইজন্য অবধূতজী বলেছেন যে নিরাশার মধ্যেই পরম সুখ এবং তিনি পিঙ্গলার ন্যায় একজন কুলটাকেও গুরুপদে বরণ করতে দ্বিধা করেননি।*
*(১৮)অবধূতজীর অষ্টাদশ গুরু হচ্ছেন কুরর বা ঈগল পক্ষী।*
*🍀কুরর পক্ষীর নিকট হতে অবধূতজী এই শিক্ষায় পেয়েছেন মানুষ বস্তুর প্রতি আসক্ততেই মনে দুঃখ পায়।কুরর পক্ষীর মুখে মাংসখন্ড দেখে অন্য বলশালী পক্ষী তার প্রতি ধাবমান হয়।কুরর পক্ষী তখন বুঝতে পারল যে সে তার সঙ্গে সংঘাতে জয়ী হতে পারবে না এবং তখনই সে তার মুখ থেকে সেই মাংসখন্ডটি ফেলে দিয়ে নিশ্চিত হয়।আমরাও সেইরকম আত্মভোগের জন্য বিষয় ভোগ লালসায় মুগ্ধ হয়ে অনবরত কালের ঠোক্কর খাই। অর্থ্যাৎ বিষয়ের প্রিয়তাই দুঃখের মূল কারণ।ত্যাগেই প্রকৃত শান্তি।সেহেতু অবধূতজী কুরর পক্ষীর নিকট এই শিক্ষা প্রাপ্ত হয়ে তাকে গুরুপদে বরণ করেছেন।*
*(১৯) অবধূতজীর উনবিংশ গুরু হচ্ছেন "বালক"।*
*🍀বালকের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এই যে তার চিত্ত স্বচ্ছ এবং নির্মল, জাগতিক কোন বস্তু তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।তাই কথায় বলে শিশুর মত সরল।বালক ক্ষুধায় কাঁদছে,মা তার মুখেএকটা কাঠের চুষিকাঠি ঢুকিয়ে দিলেন,সে পরমানন্দে তা চোষণ করতে লাগল।এটা যে খাদ্য নয় সে বিচার বুদ্ধি তার নেই। সম্পূর্ণরূপে মালিন্য বর্জিত হচ্ছে শিশুহৃদয়।কোন প্রকার মান অভিমান বোধ নেই--সাংসারিক কোন চিন্তা নেই, ধনী বা গরীব সে বোধ নেই,সদা প্রসন্ন ভাব। সেজন্য অবধূতজী বালকের এই চরিত্র অনুশীলন করে তাকে গুরুত্বে বরণ করে বালকের মত বিচার করতে চাহেন।*
*(২০)অবধূতজীর বিংশতম গুরু হচ্ছেন এক দরিদ্র কুমারী কন্যা।*
*🍀একদিন অবধূতজী ভ্রমণ করতে করতে এক সাধারণ গরীব গৃহস্থের অতিথি হন।ঘটনাক্রমে সেইদিনই আবার সেই কুমারীর বিবাহ সম্বন্ধ উপলক্ষ্যে পাত্রপক্ষের বাড়ী হতে তাকে দেখতে আসেন কিন্তু তখন তার পিতা-মাতা ঘরে ছিলেন না।*
*সংসারের এমন দুরবস্থা যে চাল পর্যন্ত ঘরে ছিল না,তখন কুমারীটি তাঁদের আপ্যায়নের জন্য গোপনে ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গার মনস্থ করলেন।বাসগৃহের খুব কাছেই সেই ঢেঁকিশাল সেজন্য ঢেঁকিতে পার দিবার সময় তার হাতের কাঁচের চুড়িগুলি হতে ঝনঝন করে শব্দ হতে লাগল।পার্শ্বের ঘরে বসেছিলেন ভাবী কুটুম্বগণ,এই শব্দ শুনে যদি তাদের সংসারের অভাব অনটনের বিষয় বুঝতে পারেন, সেজন্য সেই কুমারী কন্যা তার দুইহাতের সমস্ত চুড়িগুলি ভেঙ্গে ফেলিল মাত্র দুইগাছা করে দুইহাতে রাখল। কিন্তু তবুও এই দুইএর সংঘাতে একপ্রকার শব্দ হতে থাকায় সেই কুমারী কন্যা দুইহাত হতে একগাছি করে চুড়ি খুলে ফেলিল।প্রতি হাতে কেবল একটি করে চুড়ি রইল আর শব্দ হবার ভয় রইল রইল না।অবধূতজী বালিকার এই আচরণ লক্ষ্য করে এক অপূর্ব তত্ত্ব জীবজগতে প্রকাশ করলেন যা সাধু যোগীদের পক্ষে প্রযোজ্য। অর্থ্যাৎ মাত্র একগাছা করে চুড়ি থাকার ফলে পরিবেশ সম্পূর্ণ নিঃশব্দ হল।এর পেছনে মূল তত্ত্ব কথাটি হচ্ছে যে সাধু যোগীগণ পাঁচজনের সঙ্গে মিলে মিশে থাকলে সেখানে কলহ বিবাদ অবশ্যম্ভাবী যা মোটেই ভজনের পরিপন্থী নয়। সেজন্য সাধনপথে একাকী বিচরণ করতে হবে কুমারীর কঙ্কণের মত,কারণ একাকী থাকলে আর বিবাদ কলহের সম্ভাবনা নাই এবং নিশ্চিন্ত মনে সাধন ভজন করা যাবে।*
*🍀শ্রীমন্মহাপ্রভু যখন অজস্র লোকজন সঙ্গে নিয়ে রামকেলিতে এসে পরে বৃন্দাবন যাত্রার বাসনা করেন, তখন সনাতন গোস্বামীকে মহাপ্রভু জানান, তখন সনাতন গোস্বামী মহাপ্রভুকে সঙ্গোপনে ডেকে বলেছিলেন যে এইভাবে এত লোকজন নিয়ে কখনও বৃন্দাবনধামে যাওয়া উচিত হবে না কারণ ধাম বৃন্দাবন একাকী আস্বাদনের বস্তু,যার ফলে মহাপ্রভু সনাতনের এই উপদেশ অনুযায়ী কানাইয়ের নাটশালা অবধি এসে,প্রত্যাবর্তন করেন।সেজন্য অবধূতজী বলেছেন যে সাধনপথে একাকী বিচরণ এবং নিঃসঙ্গতাই কাম্য যা তিনি কুমারীর কঙ্কণ ভাঙ্গার মাধ্যমে শিক্ষা করে তাকে গুরুত্বে বরণ করেছিলেন।*
*(২১)অবধূতজীর একবিংশতম (২১) গুরু হচ্ছেন ইষুকার বা কামার, যে কামার ধারালো শর বা বাণ তৈরী করে।*
*🍀আমরা সকলেই জানি যে শাণিত কৃপাণ বা অস্ত্রের যে তীক্ষ্ণ ধার তা কিন্তু প্রকৃত লৌহ নয় এবং সুদক্ষ ইষুকার বা কর্মকার তাঁর কারিগরী বিদ্যার দ্বারা সেই লৌহকে গরম করে তার মধ্যে ইস্পাত বসিয়ে দিয়ে ধারাল ফলকটি তৈরী করেন এবং ইহা খুব সূক্ষ্ম কাজ, অত্যন্ত মনোঃসংযোগ সহকারে ইহাকে করতে হয়।কর্মকার শত কর্মব্যস্ত থাকলেও এই বিধ্বংসী ফলকটি তৈরী করবার সময় অত্যন্ত একাগ্র চিত্তে তা করেন কারণ সেই সময় চিত্ত চঞ্চল বা অন্যমনস্কতার প্রাবল্য দেখা দিলে সেই শরের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং কার্য্যকারীতা হবে না।*
*সেজন্য প্রকৃত শর-কার অভ্যাস দ্বারা নিজের চিত্তকে সংযত করে একাগ্র মনে সেই শরের ফলকটি তৈরী করেন যদিও তিনি সংসারের একজন কর্মব্যস্ত লোক।*
*সেহেতু অবধূতজী বলেছেন যে প্রকৃত যোগীকেও সমস্ত জিনিসকে উপেক্ষা করে একমাত্র গৌর-গোবিন্দ পাদপদ্মে নিজের চিত্তকে সমাহিত রাখতে হবে এবং শরকার তা করতে পারেন বলিয়া তিনি তাঁকে গুরুপদে বরণ করেছেন।*
*এই প্রসঙ্গে গীতার একটি শ্লোক এখানে দেওয়া হল যা এই প্রসঙ্গের ভাবধারার সঙ্গে জড়িত,যথা---*
*🌷অভ্যাস যোগযুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা।*
*🌷পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থ অনুচিন্তয়ন্।।*
*🌻অর্থ্যাৎ শ্রীকৃষ্ণ পার্থ অর্থ্যাৎ অর্জুনকে উপদেশচ্ছলে বলেছেন যে চিত্তকে অন্য বিষয়ে যেতে না দিয়ে পুনঃ পুনঃ অভ্যাস দ্বারা সেটিকে স্থির করে সেই দিব্য পরম পুরুষের ধ্যান করতে থাকলে সাধক সেই পরম পুরুষকেই প্রাপ্ত হন।ইষুকারের এই একাগ্রতা কিন্তু অভ্যাস সাপেক্ষ।*
◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆
*(২২)অবধূতজীর দ্বাবিংশতি গুরু হচ্ছেন সর্প।*
*সর্প তো খল ও ক্রুর কিন্তু যাঁর গুণ দেখা স্বভাব তিনি সব বস্তুর মধ্যেই গুণ দেখেন।সাপ সাধারণত লোকজনের ভয়ে একাকী বিচরণ করে এবং তার কোন নির্দিষ্ট বাসস্থান নাই, অনেকটা পরিব্রাজক সাধুগণের মত।সাপ কখনও খোলা জায়গায় থাকে না এবং গর্তের মধ্যে অতি গুপ্তস্থানে নিজেকে লুকিয়ে রাখে।এই প্রসঙ্গে অবধূতজী বলেছেন যে প্রকৃত সাধুকেও সাপের মত এইরকম নিঃসঙ্গ ভাবে থাকতে হবে।*
*🍀এই প্রসঙ্গে কিন্তু তত্ত্ব কথার প্রয়োজন।পূর্বে অবধূতজী কুমারীর কঙ্কণের ন্যায় নিঃসঙ্গতা কামনা করেছেন আবার তিনি কেন সর্পের এই নিঃসঙ্গতার জন্য তাকেও গুরুপদে বরণ করতে চাইছেন। ইহার উত্তরে বলা যায় যে, একটু গভীর ভাবে অনুশীলন করলে দেখা যায় কুমারীর বেলাতে "বহু যোগীর একত্রে বাস" নিষেধ প্রসঙ্গে নিঃসঙ্গতা কামনা করা হয়েছে। কিন্তু সাপের ক্ষেত্রে "সাধারণ জনসঙ্ঘ ত্যাগকে" উপলক্ষ্য করে সাপকে গুরুপদে বরণ করেছেন।সেজন্য অবধূতজী সাপের এই আচরণকে উপলক্ষ্য করে বলেছেন যে সর্প যেমন একাকী বিচরণ করে এবং তার কোন ঘরবাড়ী নেই কিন্তু তবুও অত্যন্ত সাবধানী ভাবে নির্জনে বাস করে, তার আচরণ এমনই যে তাকে লক্ষ্যই করা যায় না প্রকৃত মুনিকেও সেইরকম জনসঙ্ঘ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গুপ্তভাবে সাধন ভজন করতে হবে।*
*(২১)অবধূতজীর একুশতম গুরু হচ্ছেন "ইষুকার" অর্থ্যাৎ কর্মকার, যে কর্মকার ধারালো শর বা বাণ তৈরী করে।আমরা সকলেই জানি যে শাণিত কৃপাণ বা অস্ত্রের যে তীক্ষ্ণ ধার, তা কিন্তু প্রকৃত লৌহ নয়, সুদক্ষ ইষুকার বা কর্মকার তার কারিগরী বিদ্যার দ্বারা সেই লৌহকে গরম করে তার মধ্যে ইস্পাত বসিয়ে দিয়ে ধারাল ফলকটি তৈরী করে।এটি খুব সূক্ষ্ম কাজ এবং অতীব মনঃসংযোগ সহকারে এটিকে করতে হয়।কর্মকার শত কর্মব্যস্ত থাকলেও সেই বিধ্বংসী ফলকটি তৈরী করবার সময় অত্যন্ত একাগ্র চিত্তে তা করে থাকে, সেই সময় চিত্ত চঞ্চল বা অন্যমনস্কতার প্রাবল্য দেখা দিলে সেই শরের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং কার্য্যকারীতা হবে না।*
*সেজন্য প্রকৃত শরকার অভ্যাস দ্বারা নিজের চিত্তকে সংযত করে একাগ্র মনে সেই শরের ফলকটি তৈরী করেন যদিও তিনি সংসারের একজন কর্মব্যস্ত লোক।সেইকারণে অবধূতজী বলেছেন,যে প্রকৃত যোগীকেও সমস্ত বস্তুকে উপেক্ষা করে একমাত্র শ্রীগৌর-গোবিন্দ পাদপদ্মে নিজের চিত্তকে সমাহিত রাখতে হবে এবং কর্মকার তা করতে পারেন বলে তিনি তাঁকে গুরুপদে বরণ করেছেন।এই প্রসঙ্গে গীতার একটি শ্লোক এখানে দেওয়া হল যা এই প্রসঙ্গের ভাবধারার সহিত জড়িত,যথা-----*
*🌷অভ্যাস যোগযুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা।*
*🌷পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থ অনুচিন্তয়ন্।।*
*🌺অর্থ্যাৎ শ্রীকৃষ্ণ ভগবান পার্থ অর্থ্যাৎ অর্জুনকে উপদেশচ্ছলে বলেছেন যে, চিত্তকে অন্য বিষয়ে যেতে না দিয়ে পুনঃ পুনঃ অভ্যাস দ্বারা সেটিকে স্থির করে সেই দিব্য পরম পুরুষের ধ্যান করতে থাকলে সাধক সেই পরম পুরুষকেই প্রাপ্ত হন।ইষুকারের এই একাগ্রতা কিন্তু অভ্যাস সাপেক্ষ।*
*(২২)অবধূতজীর বাইশতম গুরু হচ্ছেন "সর্প"।*
*🍀সর্প তো খল ও ক্রুর কিন্তু যাঁর গুণ দেখা স্বভাব তিনি সব সময় সব জিনিসের মধ্যেই গুণ দেখেন।সর্প সাধারণত লোকজনের ভয়ে একাকী বিচরণ করে এবং তার কোন নির্দিষ্ট বাসস্থান নেই, অনেকটা পরিব্রাজক সাধুর মত।সাপ কখনও খোলা জায়গায় থাকে না এবং গর্তের মধ্যে অতি গুপ্তস্থানে নিজেকে লুকিয়ে রাখে।এই প্রসঙ্গে অবধূতজী বলেছেন যে, প্রকৃত সাধুকেও সাপের মত এইরকম নিঃসঙ্গ ভাবে থাকতে হবে।*
*এই প্রসঙ্গে কিছু তত্ত্ব কথার প্রয়োজন।পূর্বে অবধূতজী কুমারীর কঙ্কণের ন্যায় নিঃসঙ্গতা কামনা করেছেন আবার তিনি কেন সাপের এই নিঃসঙ্গতার জন্য তাকেও গুরুপদে বরণ করতে চাইছেন।এর উত্তরে বলা যায় যে, একটু গভীর ভাবে অনুশীলন করলে দেখা যায় কুমারীর বেলাতে বহু যোগীর একত্রে বাস নিষেধ প্রসঙ্গে নিঃসঙ্গতা কামনা করা হয়েছে। কিন্তু সাপের ক্ষেত্রে সাধারণ লোকজন ত্যাগকে উপলক্ষ্য করে সর্পকে গুরুপদে বরণ করেছেন।সেজন্য অবধূতজী সাপের এই আচরণকে উপলক্ষ্য করে বলেছেন যে,সর্প যেমন একাকী বিচরণ করে এবং তার কোন ঘরবাড়ি নেই কিন্তু তবুও অত্যন্ত সাবধানী ভাবে নির্জনে বাস করে এবং তার আচরণ এমনই যে তাকে লক্ষ্যই করা যায় না, প্রকৃত মুনিকেও সেইরকম লোকজন হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গুপ্তভাবে সাধনভজন করতে হবে।*