✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*••••┉❀꧁👇🏠Home Page🏠👇꧂❀┅••••*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*••••━❀꧁👇 📖 সূচীপত্র 📖 👇꧂❀┅••••*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*••••━❀꧁👇📚 PDF গ্রন্থ 📚👇꧂❀┅••••*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*•❀꧁ 📖সূচীপত্র 🙏 শ্রী জয়দেব দাঁ 📖 ꧂❀•*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
🚩পূর্ব লীলা 👉
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০১)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*লেখক=ভক্তপ্রাণ শ্রী শশীভূষণ বসু, আশ্বিন মাসে (১৩২১সনে) প্রকাশিত।*
*🌻শ্রীগৌরাঙ্গর সমসাময়িক দেশের অবস্থা।*
▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪
*🍀গৌরহরি যখন দ্বাদশ বৎসরের,তখন পাঠানবংশীয় হোসেন শাহ গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে,রাজ্যশাসন করতে আরম্ভ করেন।হিন্দু রাজত্ব লুপ্ত প্রায়।ভারত তখন যবন অধিকারে অধিকৃত।হিন্দু রাজারা তখন মুসলমান রাজাদেরকে কর বা শুল্ক দান করতেন,সেজন্য তাঁদের স্বাধীনতা একেবারে নষ্ট হত না,তাঁরা অনেক জায়গায় নিজেদের ইচ্ছানুসারে রাজ্য শাসন করতে পারতেন।তখন মুসলমান রাজাদের অধীনে,কাজীরা রাজপ্রতিনিধিরূপে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বাস করতেন।তখন বঙ্গের নবাব হোসেন শাহ।সেই সময় নবদ্বীপে চাঁদ কাজী নামে একজন রাজপ্রতিনিধি বাস করতেন।হোসেন শাহর চরিত্রের মাধুর্য্য গুণে, হিন্দু মুসলমান সকলেরই শ্রদ্ধা ও প্রীতি লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু কাজীরা সময়ে সময়ে বিষ্ণুভক্ত বৈষ্ণবদের অত্যাচার করতে ভুল করতেন না,চাঁদ কাজীও নবদ্বীপের বৈষ্ণবদের বাড়িতে গমন করে কীর্তনের সময় তাঁদের খোল করতাল কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলতেন, এবং যাতে তাঁরা আর হরিনাম কীর্তন না করেন,সেইজন্য নানারকমের তাঁদের ভয় দেখাতেন।হোসেন শাহর গুণে এসকল অত্যাচার হতে তাঁরা মুক্তি লাভ করে মুক্তভাবে ঘরের বাইরে কীর্তনের অধিকারী হয়েছিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গের সময় যখন বঙ্গদেশ যবন করে (হাতে) কবলিত তখন উড়িষ্যায় স্বাধীনতার সূর্য্য একবারে অস্তমিত হয়নি,তখনও উড়িষ্যার রাজাদের সঙ্গে মুসলমানদের সংগ্রাম চলছে।তখন উৎকলের সীমা অতিক্রম করলেই,যবন অধিকৃত রাজ্যে পদার্পণ করতে হত। গৌরহরি যখন উৎকল রাজ্যে কিছুকাল অবস্থান করার পর শিষ্যবৃন্দ সহ বৃন্দাবনধামে যাত্রা করেন,তখন উড়িষ্যাধিপতি রাজা প্রতাপরুদ্র তাঁদেরকে নৌকা করে কয়েকজন বলিষ্ঠ অস্ত্রধারী লোক সহচরগণ দিয়ে কোন নিরাপদ জায়গা পর্যন্ত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন।*
*🌹আইন কানুন সম্বন্ধে এই দেখা যায়,এখনকার মতো সে সময়ে ফৌজদারি,দেওয়ানি প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বিচার-পদ্ধতির ব্যবস্থা ছিল না।নবাব বা রাজাই সর্বেসর্বা।তিনিই নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনা অনুসারে সকল প্রকার অভিযোগেরই বিচার করতেন।তাঁর বিচারই চূড়ান্ত মীমাংসা বলে গৃহীত হত।*
*🌺সমাজসংস্কার বিষয়ে তখন অপেক্ষা এখন অনেক পরিবর্তন ঘটেছে,পরিচ্ছদাদি সম্বন্ধে দেখা যায়,এখনকার মতো প্যান্টালুন কোট সার্ট তখন প্রচলন হয়নি।লোকের পরিধেয় বস্ত্র জানুর উপরেই অবস্থিতি করত। বৃষ্টি ও রৌদ্র হতে রক্ষা পাবার জন্য লোকে গোলপাতার ছাতা ব্যবহার করত।এখনও অনেক পল্লীতে তা দেখা যায়।স্ত্রীলোকের এখনকার মতো সেমিজ জ্যাকেট প্রভৃতি ব্যবহার না করলেও ভদ্র গৃহের মহিলারা পরিধেয় কাপড়ের উপর গায়ে ওড়না ব্যবহার করতেন, তখন সেটিকে "দোগজা" বলা হত। অলংকার আদি বিষয়ে তখন নারীরা শাঁখা প্রভৃতি ও রূপার গহনা ব্যবহার বেশী করতেন,অবস্থাপন্ন লোকের রমণীরা স্বর্ণ-অলঙ্কারে অঙ্গ সুশোভিত করতেন। কিন্তু এখনকার মতো স্বর্ণালঙ্কার যে তখন প্রচলিত ছিল,তা বোধ হয় না।এখনও অনেক পল্লীতে নারীরা হাতে গলায় ও পায়ে রজত- নির্মিত অলঙ্কারই ব্যবহার করে থাকেন।*
*🙏অদ্বৈতাচার্য্যের পত্নী সীতাদেবী যখন ডুলি (ছোট পালকি)করে শিশু নিমাইকে দেখতে যান তখন তিনি কিরকম বস্ত্রালঙ্কার ব্যবহার করেছিলেন, চৈতন্যচরিতামৃতে তার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়।*
*অদ্বৈত আচার্য্য ভার্য্যা,জগৎ বন্দিতা আর্য্যা,*
*নাম তাঁর সীতা ঠাকুরাণী।*
*আচার্য্যের আজ্ঞা পাঞা,চলে উপহার লঞা,*
*দেখিতে বালক শিরোমণি।।*
*সুবর্ণের কড়ি বাউলি,রজত পত্র পাশুলী,*
*সুবর্ণের অঙ্গদ কঙ্কণ।*
*দু বাহুতে দিব্য শঙ্খ,রজতের মল বঙ্ক,*
*স্বর্ণ মুদ্রা নানা হারগণ।।*
*ব্যাঘ্যনখ হেম জড়ি,কটি পট্টে সূত্র ডোরি,*
*হস্ত পদের যত আভরণ।*
*চিত্র বর্ণ পট্ট শাড়ী,ভুনি দোগজা পট্টপাড়ি,*
*স্বর্ণ রৌপ্য মুদ্রা বহুধন।।*
*দূর্বা,ধান্য,গোরোচন,হরিদ্রা,কুঙ্কুম, চন্দন,*
*মঙ্গল দ্রব্য পাত্র ভরিঞা।*
*বস্ত্র গুপ্ত দোলা চড়ি,সঙ্গে লঞা দাসী চেড়ী,*
*বস্ত্রালঙ্কারে পেটরা ভরিয়া।।*
*ভক্ষ্য ভোজ্য উপহার,সঙ্গে লৈল বহুভার,*
*শচীগৃহে হইল উপনীত।।*
*🌹পাঞা=পেয়ে বা পাইয়া।লঞা=লইয়া বা লয়ে বা নিয়ে। কড়ি বাউলি=কানের গহনা বিশেষ। পাশুলি=পাঁইজোড় বা পায়ের গহনা বিশেষ।অঙ্গদ=বাজু।কঙ্কণ=হাতের গহনা।মলবঙ্ক=বাঁকা মল। ব্যাঘ্রনখ হেম জড়ি =সোনা দিয়ে বাঁধান বাঘের নখ সুতা দিতে গেঁথে কোমরপাটার মতো কোমরে পরান হত। ভুনি দোগজা পট্টপাড়ী=রেশমের পাড় লাগানো চাদর। গোরোচন=গোরুর মাথার শুকনো পিত্ত। ভরিঞা=ভরিয়া বা ভরে।বস্ত্র গুপ্ত দোলা=কাপড় চোপড়ে ভরা বড় পেটরা।*
*🌻খাবার বিষয়ে যে বিশেষ পরিবর্তন ঘটেছে,তাও বোধ হয় না।তখনও বঙ্গের লোকেরা ডাল,মোচার ঘন্ট,সুক্ত,পায়েস পিষ্টকাদি যেমন ভোজন করতেন,এখনও আমাদের ঘরে আমাদের ভোজনের জন্য,এইসব দ্রব্যই সেইরকমই তৈরী হয়ে থাকে।তবে সে সময় এখনকার মতো পোলাও, কালিয়া,খাজা,গজা মিহিদানা পৃভৃতির কোন প্রচলন ছিল না।থাকলে বৈষ্ণব গ্রন্থে তার উল্লেখ দেখতে পেতাম।তখনকার সঙ্গে এখনকার শিক্ষা সম্বন্ধে আলোচনা করলে,দেখা যায়,তখন অসংখ্য লোকের মধ্যে মাতৃভাষার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় ঘটিবার কোন ব্যবস্থা ছিল বলে, বোধহয় না।অধিকাংশ লোকেই নিরক্ষর ছিল।উচ্চবংশের অল্প সংখ্যক লোকেরা নিজেদের ছেলেদের পার্শী শিক্ষা দিবার জন্য মৌলবীদের পাঠশালায় পাঠিয়ে দিতেন।যে সব ব্রাহ্মণ পৌরহিত্যের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন,তাঁরা দেবদেবীর পূজার মন্ত্রগুলি কন্ঠস্থ করে,যজমানদের বাড়িতে গিয়ে নিত্য নৈমিত্তিক দেব সেবার কাজ সম্পূর্ণ করে বেড়াতেন।এঁদের মধ্যে অল্পলোকেই সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করতেন।চতুষ্পাঠীর ছাত্রেরা অবশ্য অধ্যাপকগণের কাছে সংস্কৃত সাহিত্য ও দর্শনাদিতে ব্যুৎপত্তি লাভ করতে সমর্থ হতেন, কিন্তু তাঁদের সংখ্যা সমস্ত বঙ্গদেশের মধ্যে অতি অল্পই দেখা গিয়েছিল।যখন পুরুষদের মধ্যে অজ্ঞানতার এতই প্রাদুর্ভাব,তখন বঙ্গ মহিলারা যে অজ্ঞানতার ঘোর অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন ছিলেন,সেই বিষয়ে কোন আলোচনা বোধ হয় নিষ্প্রোজন।চার বা সাড়েচার শত বৎসরের মধ্যে এই শিক্ষা সম্বন্ধে কি ঘোর পরিবর্তনই সংঘটিত হয়েছে।যে শিক্ষাতে নরনারী জ্ঞানচক্ষু লাভ করে, মনুষ্যত্বের উচ্চ আদর্শ ধরতে সমর্থ হয় ; সেই শিক্ষা বিস্তারের জন্য আজ কত দেশ-সংস্কারক দাঁড়িয়েছেন।তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের গুণে সব শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষার জ্যোতি প্রবেশ করছে।দেশের সাধারণ ও ভদ্র লোকদের জন্যও নানা জায়গায় বিদ্যামন্দির সব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।সেকালের সঙ্গে যে একালের শিক্ষা বিষয়ে যে ঘোর যুগান্তর উপস্থিত হয়েছে তা সর্ববাদি সম্মত বলে স্বীকার করতেই হবে।তবে নারীজাতির স্বাধীনতা সম্বন্ধে এই দেখা যায় যে,মুসলমানদের শাসনকাল অবধি আর্য্যনারীদের অবগুন্ঠনবতী (মাথায় ঘোমটা দিয়ে) হয়ে বাড়ীর ভেতরেই বাস করতে হয়েছে।শ্রীগৌরাঙ্গের সময়েও সেইরকম পর্দানশিন হয়েই তারা বাস করতেন।তবে শিক্ষার প্রসার যতই বেড়েছে, মনে হয় ভক্তি ততই দূরে সরে যাচ্ছে।*
*🌹এই কথাগুলি গ্রন্থকারের*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০২)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ-চরিত🙏*
*শ্রীগৌরাঙ্গর সমসাময়িক দেশের অবস্থা।*
▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪
*🔷তখন বাংলা ভাষার অতি শৈশব অবস্থা।লোকে মাতৃভাষায় কথা বলত বটে, কিন্তু বহু সংখ্যক লোক চিঠি পত্র লিখতে পারত না।সেই সময় চন্ডীদাস,বিদ্যাপতি প্রভৃতি কয়েকজন, গৌর আবির্ভাবের আগেই তাঁদের সুললিত কবিতা দ্বারা, বঙ্গবাসীর চিত্তকে আকৃষ্ট করতেন, কিন্তু শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাবের পর শ্রীপাদ কৃষ্ণদাস কবিরাজ, শ্রীপাদ বৃন্দাবন দাস ঠাকুর প্রভৃতি বৈষ্ণব কবিগণ প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষার পুষ্টিসাধন করে গিয়েছেন।গৌরসুন্দরের আবির্ভাবের সময় হতেই আমাদের মাতৃভাষা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্য অনেক বিষয়ে তখন আমাদের প্রিয় বঙ্গভূমি পিছিয়ে থাকলেও মানব জীবনের যে প্রধান সৌন্দর্য্য, সরলতা, অমায়িকতা,বিনয়,সৌজন্য প্রভৃতি গুণ সব তাঁদের মধ্যে যথেষ্ট ভাবেই বিরাজ করত।অতিথি সেবা,তখন গৃহস্থের একটি পারিবারিক শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলেই মনে করত।গৃহস্বামী বা গৃহিণীর আহারের আগে দুপুরবেলা কেউ উপস্থিত হলে,তাঁর ফলমূলাদি আহার করে,নিজেদের ক্ষুধার অন্ন তাঁদেরকে দান করে তৃপ্তি লাভ করতেন। বর্তমানে নানান কারণে এখন আমাদের আর এ দৃশ্য দেখবার উপায় নাই ; তবে অনেক ছোট ছোট পল্লীতে এ দৃশ্য একেবারে বিরল বলে মনে হয় না। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাগণ অতিথি সেবা এখনও পরমধর্ম বলে তার অনুষ্ঠানে বিরত থাকেন না।*
*🍀এখন ধর্ম সম্বন্ধে সামান্য আলোচনা করা যাক। গৌতম বুদ্ধের তিরোভাবের পর হতেই পুরাণকর্তাদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও কল্পনা প্রভাবে ভারতে দেবদেবীর পূজা প্রবর্তিত হয়, এবং এই পৌরাণিক মূর্তি পূজা হতেই ধীরে ধীরে পঞ্চোপাসক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সূর্য্য উপাসকরা সৌর,গণপতির উপাসকরা গাণপত্য,শিবের উপাসকরা শৈব,বিষ্ণুর উপাসকরা বৈষ্ণব ও শক্তির উপাসকরা শাক্ত নামেই অভিহিত হয়ে থাকেন।প্রায় চারশ বছর আগে বঙ্গদেশে শাক্ত ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়েরই প্রভাব প্রবল হয়ে উঠে।আবার তারমধ্যে শাক্তেরা প্রবলতর হয়ে শত শতলোককে নিজেদের সম্প্রদায়ভুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ভারতের বৈদিক আর্য্যঋষিরা প্রকৃতির চারিদিকে সেই আদ্যাশক্তিকে দর্শন করে,তাঁরই পূজায় রত হয়েছিলেন। কিন্তু এই সব শক্তিমন্ত্রের সাধকেরা,তন্ত্র শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে সাধনায় রত হতেন।এই তন্ত্র শাস্ত্রগুলি যে ঠিক কোন সময়ে,কার দ্বারা রচিত হয়েছিল, তা নির্দেশ করা খুবই কঠিন।এই শক্তি উপাসকেরা দুই ভাগে বিভক্ত। পশ্বাচারী ও বীরাচারী বা বামাচারী।যাঁরা দেবদেবীর পূজা হোম বলিদান করিয়েই ক্ষান্ত হতেন, তাঁরা বীরাচারী বা বামাচারী বলে কথিত।কেউ কেউ বলেন,তন্ত্রোক্ত পঞ্চমকারের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে।থাকতে পারে, কিন্তু এই শেষোক্ত বামাচারী তান্ত্রিক সাধকেরা জীবনে তার পরিচয় দান করতে সমর্থ হননি।চারশ বৎসর আগে চারিদিকে তন্ত্রোক্ত সাধনার প্রভাবই প্রবল হয়ে উঠেছিল। পঞ্চমকার সাধনার দৃষ্টান্তে বঙ্গদেশে কদাচারের স্রোত প্রবাহিত হয়েছিল, অপক্ষপাতী নীতিবান ব্যক্তিরা তা অবশ্যই স্বীকার করবেন।*
*🔴একদিকে যেমন শাক্তেরা লোকদের নিজেদের সম্প্রদায়ভুক্ত করতে লাগলেন,অন্যদিকে বিষ্ণু উপাসকেরাও ভক্তি-ধর্ম বিস্তারের জন্য তেমনি চেষ্টা করতে লাগলেন।দাক্ষিণাত্যে রামানুজ, বিষ্ণুস্বামী, মধ্বাচার্য্য ও নিম্বাদিত্য চারজন ভক্তিধর্ম বিস্তারের জন্য আপন আপন সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত করেন।সকলেরই উদ্দেশ্য সরস ভক্তিভাব দেশ মধ্যে বিতরণ করা। এই বৈষ্ণবার্য্যেরা যে তৎকালীন তন্ত্রোক্ত সাধন প্রণালীর গতিরোধ করবার জন্য ব্যস্ত হয়েছিলেন,তা নয়,তাঁদেরকে বৌদ্ধ ও শঙ্করাচার্য্যের অদ্বৈত মতের বিরুদ্ধেও ঘোরতর সংগ্রাম করতে হয়েছিল।ক্রমে তাঁদের জীবন ভক্তি ধর্মের মত দেশ দেশান্তরে প্রচারিত হয়ে পড়ল।দেশও সে প্রভাব গ্রহণে বঞ্চিত রইল না।মধ্বাচার্য্য মঠের পরম ভক্ত মাধবেন্দ্রপুরী বঙ্গদেশে শান্তিপুরে আগমন করে গুণানুরাগী ধর্মনিষ্ঠ অদ্বৈতাচার্য্যকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেন।অদ্বৈতকে ভক্তি-মন্ত্রে দীক্ষি দিয়ে, মাধবেন্দ্রপুরী শক্তিমন্ত্রে উপাসিত শুকনো বঙ্গভূমিতে যেন প্রেমের বন্যা বহিবার দরজা খুলে দিলেন।*
*👹তখন লোকের ভূত,প্রেত,ডাইনিতে খুব বিশ্বাস ছিল ; কোন নারী মূর্ছারোগে আক্রান্ত হলে অনেক সময় সেটি অপদেবতার কাজ বলেই লোকে মনে করত; এবং অপদেবতার হাত থেকে তাকে উদ্ধার করবার জন্য, সে নারীর প্রতি যথেষ্ট অত্যাচার করা হ'ত।ওঝারাই ভূত ছাড়াবার জন্য নিমন্ত্রিত হতেন। লোকে সাপের ভয়ে বিষহরির পূজো দিত ; এবং কবির লড়াই ও মঙ্গলচন্ডীর গান শুনে খুবই আনন্দ অনুভব করত।*
*🔶অনেক পরিবারে সত্যনারায়ণের কথা হ'ত।লোকে অতি নিষ্ঠার সঙ্গে তা শুনতেন।কথা বিরাম হলে ময়দা,ও গুড় মিশ্রিত সিন্নি তৈরী হত।শ্রোতারা তা ভক্তির সঙ্গে সেবা করতেন। তখন ব্রাহ্মণ্যধর্মের বড়ই প্রবল প্রতাপ ছিল।লোকে ব্রাহ্মণদেরকে দেবতার মত জ্ঞান করত।ব্রাহ্মণাও নিচুশ্রেণী লোকের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সঙ্কুচিত হতেন না।ব্রাহ্মণদের সঙ্গে কোন নিচুশ্রেণীর লোকের কোন বিষয়ে মনান্তর বা বিবাদ উপস্থিত হলে ব্রাহ্মণেরা রাগে অধীর হয়ে উঠতেন, এবং পৈতা হাতে নিয়ে বিরোধীকে অভিসম্পাৎ করতেন।অজ্ঞ লোকেরা তা অব্যর্থ মনে করে ভয়ে অভিভূত হয়ে পড়ত।তখন ব্রাহ্মণেরাই সমাজের সর্বে-সর্বা ছিলেন।সমাজের ধর্ম নিয়ম পরিচালনের ভার তাঁদেরই উপরে ছিল।কেউ কোন প্রচলিত ধর্ম ও সামাজিক নিয়ম উল্লঙ্ঘন করলে তার শাসনের ব্যবস্থা তাঁরাই করতেন। আবার প্রায়শ্চিত্তের বিধি তাঁরাই বিধান করতেন। তখনকার প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা মনে করলে শরীর যেন শিহরিয়ে উঠে।সুবুদ্ধি রায় যখন গৌড়ের অধীশ্বর ছিলেন,তখন হোসেন শাহ তাঁর অধীনে কাজ করত। তার কোন অপরাধের জন্য রাজা সুবুদ্ধি রায় হোসেনের পিঠে বেত্রাঘাত করেন।কালের অপূর্ব গতি!পরে হোসেন শাহ গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করলেন।গৌড়েশ্বর তখন পত্নীর কথায় প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবার জন্য সুবুদ্ধি রায়ের মুখে যবনের জল ঢেলে দেয়, তাতে সুবুদ্ধি রায়ের জাতচ্যুত হলে,ব্রাহ্মণেরা এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তাঁর মুখে গরম ঘি পানের ব্যবস্থা করেন।সুবুদ্ধি রায় এইরকম ব্যবস্থা জীবন-সঙ্কট মনে করে বারাণসীধামে গমন করে বাস করতে থাকেন।যখন গৌরহরি বৃন্দাবনধামে গমন করেন তখন সুবুদ্ধি রায় তাঁর কাছে এসে তাঁর অপরাধ এবং তারজন্য ব্রাহ্মণদের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থার কথা বলে তিনি গৌরহরির শরণাপন্ন হন।প্রেমাবতার গৌরহরি,ব্রাহ্মণদের ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, তুমি বৃন্দাবনে গিয়ে সর্বদা কৃষ্ণনাম করো,তোমার অপরাধ বিদূরিত হবে।গৌরহরির কথা শুনে সুবুদ্ধি রায় যেন নবজীবন লাভ করলেন।গৌরবাক্য শিরোধার্য্য করে তিনি তাঁর নির্দেশ অনুসারে জীবন অতিবাহিত করতে লাগলেন। তখন জাতিভেদের কঠিন বন্ধনে লোকে আবদ্ধ ছিল।নমঃশূদ্রদের ছোঁয়া লাগলে লোকে স্নান করা আবশ্যক মনে করত।বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে অন্নগ্রহণ করা দূরে থাকুক, সমবর্ণের লোকের মধ্যেও জায়গা বিশেষে পরস্পরের স্পৃষ্ট বা ছোঁয়া অন্ন গ্রহণ করতেও সঙ্কুচিত হতেন। দেশের এই দুর্গতির অবস্থায় একজন আদর্শ জ্ঞানী, ভক্ত ও প্রেমিক পুরুষের আবির্ভাবের প্রয়োজন হয়েছিল।বিধাতার অপূর্ব বিধান অনুসারে সে সময় এক মহাপুরুষ নবদ্বীপ নগরে আবির্ভূত হয়েছিলেন।ইনিই আমার শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০৩)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*🏞নবদ্বীপ🏞*
∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆
*🍀নবদ্বীপ শ্রীগৌরাঙ্গের জন্মভূমি ও তাঁর লীলার প্রথম ক্ষেত্র।নবদ্বীপ বঙ্গ-ইতিহাসে চিরদিনই পরিকীর্তিত হয়েছে।বিশেষ করে শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাবের জন্য এই স্থানের মাহাত্ম্য ও গৌরব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। "নবদ্বীপ" নাম উচ্চারণেই অনেক ধর্মপ্রাণ বঙ্গবাসীর হৃদয়ে শ্রীগৌরাঙ্গদেবের ভক্তিলীলার মনোহর ছবি উদিত হয়ে তাদের প্রাণকে ভক্তিরসে আপ্লুত করে তুলে। বর্তমান নবদ্বীপের প্রায় তিন ক্রোশ দূরে ভাগীরথীর পূর্ব পারে একটি সুদীর্ঘ দীঘি ছিল।লোকে তাকে "বল্লাল দীঘি" বলত।এইরকম প্রবাদ আছে যে,রাজা লক্ষ্মণ সেন যখন এই স্থানের রাজা ছিলেন,তখন তিনি তাঁর পূর্ব পুরুষ সুবিখ্যাত বল্লালসেনের নামে এই স্থান উৎসর্গীকৃত করেন।সেই হতেই ঐ দীঘিটি বল্লান দীঘি নাম ধারণ করে।এই দীঘির পূর্ব পার্শ্বে লোকের বসতি ছিল, এবং সেটির উত্তরদিকে ক্ষুদ্র পর্বতের মতো ইট ও পাথরের একটি স্তুপ ছিল। বল্লাল দীঘির মতো লোকে এই স্তুপটিকেও বল্লাল স্তূপ নামে অভিহিত করেছিল।ক্রমে ভাগীরথীর স্রোত পশ্চিমদিকে প্রবাহিত হওয়াতে অধিবাসীরা আরও অগ্রসর হতে লাগল।সেনবংশীয়দের নবদ্বীপ ধীরে ধীরে গঙ্গা-সলিলে নিমগ্ন হয়ে,নিজের অস্তিত্ব বিলোপ করে ফেলল।সে সময় মায়াপুর,আতোপুর,গঙ্গানপুর, সিমুলিয়া প্রভৃতি ছোট ছোট পল্লীর সমাবেশে একটি সমৃদ্ধশালী নগর গঠিত হয়ে উঠে।এই নবগঠিত নবদ্বীপেই শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাব ঘটে।বঙ্গদেশের মধ্যে নবদ্বীপ সংস্কৃতচর্চা,বিশেষতঃ ন্যায়শাস্ত্রের জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।নবদ্বীপের এই শেষোক্ত বিষয়ের প্রসিদ্ধি লাভের জন্য মিথালাকেই প্রধান কারণ বলতে হয়।বিদ্যার্থিগণ, ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করবার জন্য মিথিলায় গমন করতেন। তাঁদের পাঠ সমাপ্ত হলে,তাঁরা ন্যায়ের কোন গ্রন্থ সঙ্গে করে নবদ্বীপে আনতে পারতেন না,কারণ মিথিলায় কাউকেও ন্যায়ের গ্রন্থ দেওয়া হত না।নবদ্বীপ পাছে ন্যায়শাস্ত্রে মিথিলার সমকক্ষ হয়ে উঠে,এই আশঙ্কায় চতুষ্পাঠীর অধ্যাপকেরা এই আদেশ প্রচার করেছিলেন।যখন মিথিলা ন্যায়শাস্ত্রে এইরকম শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল,তখন নবদ্বীপেও কয়েকটি চতুষ্পাঠীতে সংস্কৃত শাস্ত্রের আলোচনা হত। কিন্তু নবদ্বীপ ন্যায়শাস্ত্রে মিথিলার অনেক পেছনে পড়ে ছিল।এই অবস্থা দেখে বাসুদেব সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য নামে জনৈক উৎসাহী ও মেধাবী যুবক পুরুষ,এক সুন্দর উপায় নির্দ্ধারণ করলেন। তিনি এই সংকল্প করলেন যে,মিথালায় গমন করে,ন্যায়শাস্ত্র কন্ঠস্থ করে, স্বদেশে ফিরবেন।এই সুদৃঢ় সঙ্কল্প হৃদয়ে ধারণ করে তিনি ন্যায় অধ্যায়নের জন্য মিথালায় গমন করেন।সার্বভৌম এমন মনোনিবেশ সহকারে সেটি পাঠ করতে লাগলেন যে,ন্যায়শাস্ত্রের প্রত্যেক ছত্র ও পদ সব তাঁর স্মৃতিপটে অঙ্কিত হয়ে গেল।তিনি দেখলেন,সুবৃহৎ ন্যায়শাস্ত্র তাঁর কন্ঠস্থ হয়ে গেছে।সাধনিয় সিদ্ধ হয়ে, বাসুদেব ভট্টাচার্য্য নবদ্বীপে ফিরে এলেন।বঙ্গদেশের শিক্ষার ইতিহাসে সে এক চির-স্মরণীয় দিন!তাঁর অদ্ভুত স্মৃতিশক্তির বিষয় চারিদিকে প্রচারিত হয়ে পড়ল।বাসুদেব সার্বভৌম একটি টোল খুলে ন্যায়শাস্ত্র শিক্ষা দিতে আরম্ভ করলেন।ন্যায়শাস্ত্রের চর্চা দিন দিন বাড়তে লাগল।মানুষ যখন কিঞ্চিৎ পরিমাণে জ্ঞানের আস্বাদন করে,তখন তার চিত্ত সংসারের ঐশ্বর্য্য,ও মান মর্য্যাদা অপেক্ষা তারই অনুশীলনে অনেকবেশী তৃপ্তি লাভ করে থাকে।নবদ্বীপবাসীরা সেই আনন্দের অধিকারী হবার জন্য যত্ন করতে লাগলেন।টোলের ছাত্রেরা যখন পরস্পর পথে চলতেন,তখন তাঁরা আর কোন দিকে বিশেষ দৃষ্টি না করে,তর্কের মীমাংসায় রত হতেন, দিনেরবেলা ছাত্ররা জাহ্নবীর জলে স্নান করতে গিয়ে, গাত্রমার্জনের দিকে বেশী দৃষ্টি না রেখে,চিত্তের উৎকর্ষ সাধনের দিকেই বেশীরভাগ মনোনিবেশ করতেন।তাঁরা ন্যায়শাস্ত্রের কোন এক প্রশ্ন উত্থাপন করে,সেইবিষয়েই বাদানুবাদে রত হতেন।স্রোতস্বিনী (গঙ্গার) বক্ষে দাঁড়িয়ে,এইভাবে বেশীরভাগ সময় তাঁরা যাপন করতেন।সময় সময়ে বাত বিতন্ডা এত ঘোরতর হয়ে দাঁড়াত যে, পরস্পরের মধ্যে কেবল কথা কাটাকাটির বিচারে তার পরিসমাপ্তি হত না হাতাহাতি পর্য্যন্তও হয়ে যেত।সত্য নির্ণয়ই ন্যায়শাস্ত্রের মুখ্য উদ্দেশ্য।সেই সত্য নির্ণয়ের জন্য ছাত্রেরা ব্যস্ত হয়ে উঠিতেন।নবদ্বীপ সংস্কৃত চর্চা ও ন্যায়শাস্ত্রের প্রধানতম ক্ষেত্র বলে, বঙ্গদেশের চারিদিকে নাম ছড়িয়ে পড়ল।নবদ্বীপ হিন্দুরাজত্বের শেষ লীলাভূমি।যবন সেনাপতি বক্তিয়ার খিলজির আগমনবার্তা ঘোষিত হলে,যেদিন লক্ষ্মণ সেন তার সৈন্যসামন্তের সঙ্গে যুদ্ধ করতে অপারক মনে করে,কাপুরুষের মতো নিজ দেশ ছেড়ে গোপনে নৌকায় চড়ে পলায়ন করেন,সেই দিন হতেই বঙ্গদেশের অধঃপতন সূচিত হয়েছে।নবদ্বীপের গৌরব বিলুপ্ত হয়েছে!বিধাতার বিধানে যেন নবদ্বীপ ভাগীরথীর স্রোতে আপনার অঙ্গ ভাসিয়ে দিয়ে সে কলঙ্ক মোচন করতে যত্ন করেছেন।ভীরু স্বভাব লক্ষ্মণ সেনের নবদ্বীপ নগর চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু নবদ্বীপ শ্রীগৌরাঙ্গের জন্মভূমি বলে চিরদিনই নিজের অক্ষয় কীর্তি রক্ষা করবে। ভক্তি ও ভগবৎপ্রেমের লীলাভূমি বলে, নবদ্বীপ সব সময়ই ভারতের ধর্ম ইতিবৃত্তে স্বর্ণাক্ষরে নিজের নাম অঙ্কিত করে রাখবে।*
*⭐প্রায় পঞ্চদশ শতাব্দীতে এক যোগী পুরুষ এই জায়গায় আগমন করেন।তাঁর সাধনা ও সাধুতার গুণে অনেক লোক তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শন করত।এইরকম কথিত আছে যে,এই সাধু পুরুষ নবদ্বীপে এক দেবীমূর্তি স্থাপন করেন।ইঁহার নাম "পোড়ামা"।শ্রীচৈতন্যের সময় নবদ্বীপবাসী নর-নারীগণ সব সময়ে ও সকল শুভানুষ্ঠানে এই পোড়ামার কাছে গমন করে,পূজোর উপহার প্রদান করত ও তাঁর আশীর্বাদ ভিক্ষা করত।*
*🙏বৈষ্ণব গ্রন্থকারেরা নবদ্বীপের ভূয়সী প্রশংসা করে,নিজেদের লেখনিকে চরিতার্থ করতে প্রয়াস পেয়েছেন।তাঁদের বর্ণিত বিষয় পাঠ করলে, নবদ্বীপ সম্বন্ধে এই প্রতীয়মান বা বোধগম্য হয় যে,মহাত্ম্যা ভক্ত-চূড়ামণি শ্রীগৌরাঙ্গের সময়ে নবদ্বীপ বিদ্যাচর্চায়,বাণিজ্যে, সম্পদে ও ধর্মে বিশেষ উন্নতি লাভ করেছিল। এখানে শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর কৃত শ্রীচৈতন্যভাগবত হতে কিছু অংশ উদ্ধৃত হল।*
*🌷নানা স্থানে অবতীর্ণ হইলা ভক্তগণ।*
*🌷নবদ্বীপে আসি সভার হইল মিলন।।*
*🌷নবদ্বীপে হইব প্রভুর অবতার।*
*🌷অতএব নবদ্বীপে মিলন সভার।।*
*🌷নবদ্বীপ হেন গ্রাম ত্রিভুবনে নাঞি।*
*🌷যহিঁ অবতীর্ণ হইলা চৈতন্য গোসাঞি।।*
*🌷অবতরিবেন প্রভু জানিয়া বিধাতা।*
*🌷সকল সম্পূর্ণ করি থুইলেন তথা।।*
*🌷নবদ্বীপ-সম্পত্তি কে বর্ণিবারে পারে।*
*🌷একো গঙ্গাঘাটে লক্ষ লোক স্নান করে।।*
*🌷ত্রিবিধ বৈসে এক জাতি লক্ষ লক্ষ।*
*🌷সরস্বতী-দৃষ্টিপাতে সভেমহা দক্ষ।।*
*🌷সভে মহা অধ্যাপক করি গর্ব ধরে।*
*🌷বালকেও ভট্টাচার্য্য সনে কক্ষা করে।।*
*🌷নানা দেশ হইতে লোক নবদ্বীপে যায়।*
*🌷নবদ্বীপে পঢ়ি লোক বিদ্যারস পায়।।*
*🌷অতএব পঢ়ুয়ার নাহি সমুচ্চয়।*
*🌷লক্ষ কোটি অধ্যাপক নাহিক নির্ণয়।।*
*🌷রমা দৃষ্টি পাতে সর্বলোক সুখে বসে।*
*🌷ব্যর্থ কাল যায় মাত্র ব্যবহার-রসে।।*
*🌹যহিঁ=যে স্থানে বা যে জায়গায়। ত্রিবিধ-বৈসে=বিবিধ বয়সে, বা নানান বয়সে।সরস্বতী দৃষ্টিপাতে=সরস্বতীর কৃপায়। কক্ষা=প্রতিযোগিতা।*
*🌻নিজেদের মতাবলম্বীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ধর্ম প্রসঙ্গ করতেন।অদ্বৈতাচার্য্য,শ্রীবাস পন্ডিত, শুক্লাম্বর ব্রহ্মচারী কয়েকজন পরম ভক্তেরনাম এখানে উল্লেখযোগ্য।অদ্বৈতাচার্য্য দেশের দুর্গতি দেখে,ব্যথিত হৃদয়ে কোন ভক্তাবতারের আবির্ভাবের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতেন।তাঁর সে ঐকান্তিক প্রার্থনা বিফলে যায় নাই ; শ্রীগৌর নবদ্বীপে অবতীর্ণ হয়ে, তাঁর মনোবাঞ্জা পূর্ণ করেছিলেন।*
*🙌জয় জয় প্রেমাবতার শ্রীগৌরের জয়🙌*
✧══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০৪)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*⭐বংশ-পরিচয় ও জন্মের পূর্বাভাস⭐*
**************************************
*💧শ্রীহট্টের অন্তর্গত ঢাকা দক্ষিণগ্রামে কোন সম্ভ্রান্ত বৈদিক ব্রাহ্মণকুলে উপেন্দ্র মিশ্র নামে জনৈক ব্রাহ্মণ বাস করিতেন।তাঁর সাত পুত্র ছিলেন।তন্মধ্যে শ্রীজগন্নাথ মিশ্র তৃতীয়।বাল্যজীবনেই জগন্নাথের ধীরতা,সৌজন্য,বিনয় ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল।উপনয়ন সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে, জগন্নাথ জ্ঞানানুশীলনের জন্য,স্বদেশ পরিত্যাগ করে নবদ্বীপে আগমন করেন।সে সময় যে সকল পন্ডিতের গুণগ্রামে নবদ্বীপে সে সময় যে সকল পন্ডিতের গুণে নবদ্বীপ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, তারমধ্যে মহেশ্বর বিশারদ অন্যতম।শ্রীজগন্নাথ তাঁর চতুষ্পাঠীতে প্রবিষ্ট হলেন।শ্রীজগন্নাথের শারীরিক গঠন ও রূপ লাবণ্য অতি মনোহর ছিলেন ; যে দেখত সেই মুগ্ধ হয়ে যেত।জগন্নাথের যেমন রূপ তাঁর মেধাও তেমনি প্রখর ছিলেন।শ্রীহট্টের এই বালক চতুষ্পাঠীতে প্রবেশ করে,অতি যত্ন সহকারে পাঠ করতে লাগলেন।এই রূপবান বালকের স্মৃতিশক্তি,তাঁর বিনয় ও পাঠের প্রতি অনুরাগ দেখে শিক্ষক,ছাত্র ও অন্যান্য সকলে তাঁর প্রশংসা না করে থাকতে পারলেন না।নবদ্বীপে তখন চতুষ্পাঠী হতে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রদেরকে উপাধি দেওয়া হত।জগন্নাথ মিশ্রও নিজের অধ্যবসায়ের গুণে বিশিষ্টরূপে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে,""পুরন্দর"" উপাধি লাভ করেছিলেন।*
*🌻জগন্নাথ মিশ্রকে রূপে গুণে অতুলনীয় দেখে,নীলাম্বর চক্রবর্তী তাঁর কন্যা শচীদেবীর সঙ্গে তাঁকে শুভ পরিণয়ে আবদ্ধ করেন।নবদ্বীপে সে সময় শ্রীহট্টনিবাসী কয়েকজন ব্যক্তি নিজের পত্নী ও পুত্র-কন্যা সহ নগরের কোন অংশে বাস করতেন।পুরন্দর মিশ্র সেই জায়গায় গিয়ে গৃহ নির্মাণ করে শচীদেবীকে নিয়ে পরম সুখে বাস করতে লাগলেন। সে সময়ে যে সকল শ্রীহট্টবাসী সেখানে বাস করতেন,তারমধ্যে একজন তীক্ষ্ণবুদ্ধি বিশিষ্ট যুবকপুরুষ ছিলেন,তাঁর নাম মুরারি গুপ্ত। ইনি সুপন্ডিত ছিলেন।তরুণ যৌবনেই পান্ডিত্যের জন্য ইনি নবদ্বীপে পন্ডিতমন্ডলীর মধ্যে বিশেষ সুখ্যাতি লাভ করেছিলেন। কিন্তু মুরারি অদ্বৈতবাদী ছিলেন,সেজন্য তিনি পরমেশ্বরের স্বতন্ত্র সত্তা স্বীকার করতেন না।নিজেকে ভগবানের সঙ্গে অভেদাত্মা মনে করতেন। অদ্দৈতবাদীরা ভগবদ্ভক্তির আবশ্যকতা স্বীকার করেন না, মুরারিও তা করতেন না।ইনি অন্যকে আপন পথাবলম্বী করবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করতেন।শ্রীগৌর যখন অবতীর্ণ হন,তখন মুরারি গুপ্তের বয়স অনুমান পনের কি ষোল বৎসর।পরে ইনি গৌরচন্দ্রের সহিত,বিচারে নিজের অদ্বৈতমত বিসর্জন দিয়ে তাঁর ভক্তি-লীলার সহায় হয়েছিলেন।মুরারি গুপ্ত,শ্রীগৌরাঙ্গের আদি লীলা লিখে গিয়েছিলেন।শ্রীজগন্নাথ মিশ্রের সঙ্গে মুরারি গুপ্তের বিশেষ সৌহার্দ্য জন্মিয়েছিল। শচীদেবী গুণবতী ছিলেন।উভয়ের পরিণয়ে যেন মণি-কাঞ্চনের যোগ হয়েছিল।নবদম্পতি পরম সুখে সংসার-যাত্রা নির্বাহ করতে লাগলেন।দেখতে দেখতে শচীদেবীর গর্ভে ক্রমান্বয়ে আটটি কন্যা জন্মগ্রহণ করল ; কিন্তু তাঁর সমস্ত কন্যাগুলিই একে একেই কালের করালে গ্রাসে নিপতিত হল।শোকাতুরা শচীদেবী কিছুদিন পরে এক নবকুমারের মুখ দর্শন করলেন।গর্ভপ্রসূত সন্তানের মুখ দেখে তিনি কন্যাদের শোকস্মৃতি কিছুটা মন থেকে মুছে ফেলতে সমর্থ হয়েছিলেন।শিশু যখন দিন দিন বড় হতে লাগল,পিতামাতা এই কুসুম সদৃশ পুত্রের মুখ দেখে, অপার আনন্দে ভাসতে লাগলেন।এই নবকুমারের নামকরণ করলেন "বিশ্বরূপ"। তারপর পুত্র উপযুক্ত ভাবে শিক্ষা প্রদান করতে লাগলেন।তাঁরা এইরকম ভাবে সুখে বাস করছেন,এমন সময় শ্রীহট্ট থেকে শ্রীজগন্নাথের পিতা উপেন্দ্র মিশ্র, জগন্নাথকে সপরিবারে সেখানে গমন করবার জন্য একখানি পত্র পাঠালেন।পিতার পত্র পেয়ে,জগন্নাথ, শচীদেবী ও বিশ্বরূপকে সঙ্গে নিয়ে, নিজের আদি বাসভবনের জন্মভূমিতে গমন করলেন।উপেন্দ্র মিশ্র তাঁদেরকে দেখে পরম আনন্দ লাভ করলেন।তাঁদের অবস্থিতি কালে উপেন্দ্র মিশ্র জগন্নাথের পান্ডিত্য ও পুত্রবধূর বিনয়, সৌজন্য এবং পুত্র বিশ্বরূপের লাবণ্য ও জ্ঞানস্পৃহা দর্শনে,পরম আনন্দ লাভ করতে লাগলেন।*
*🌹যখন শচীদেবী শ্রীহট্টে শ্বশুরালয়ে থাকেন,তখন তাঁর গর্ভধারণের চিহ্ন প্রকাশ পেল।জগন্নাথ মিশ্র নবদ্বীপে থেকে শিক্ষা লাভ করেছিলেন বটে, কিন্তু বহুদিনের পর জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করলে মাতা,পিতা, সুহৃদবর্গ প্রভৃতির স্নেহে যেন জড়িত হয়ে পড়লেন।মাতৃভূমির মধুর আকর্ষণীশক্তি যেন তাঁর মনপ্রাণকে আকৃষ্ট করতে লাগল।তিনি পুনরায় নবদ্বীপে ফিরে আসতে অভিলাষী ছিলেন না।তাঁর হৃদয়ের মধ্যে এ-সঙ্কল্প উদিত হলেও,জননীর কথায় তাঁকে সে সঙ্কল্প বিসর্জন দিতে হয়েছিল।"শোভাদেবী" রজনীতে স্বপ্ন দেখলেন,দিব্য কান্তিযুক্ত এক মহাপুরুষ তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে বলছেন--, তোমার পুত্রবধূ শচীদেবীর গর্ভে স্বয়ং ভগবান অবতীর্ণ হয়েছেন।অতএব তুমি তোমার পুত্র ও পুত্রবধূকে তাড়াতাড়ি নবদ্বীপে যেতে বলো।শোভাদেবী নিশি-অবসানে শয্যা থেকে উঠে,এক অদ্ভুত স্বপ্ন বৃত্তান্ত সকলকে জানালেন ; এবং সন্তান জগন্নাথকে শীঘ্রই পত্নী পুত্রসহ নবদ্বীপে যেতে আদেশ করলেন।শোভাদেবীর স্বপ্ন-বৃত্তান্ত শুনে সকলেরই মনে চরম আনন্দ ও বিস্ময়ের সঞ্চার হয়েছিল।শচীদেবীর অন্তরেও আনন্দ ও বিস্ময়ের আবির্ভাব হল।মাতৃবৎসল জগন্নাথ স্নেহময়ী জননী শোভাদেবীর ঈদৃশ (এইরকম)অলৌকিক ও মনোহর স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনে বিস্মিত হলেন, এবং তাঁর নির্দেশ অনুসারে পত্নী ও পুত্রসহ নবদ্বীপ ধামে প্রত্যাগমন করলেন। যে নির্দিষ্ট সময়ে মাতৃগর্ভ হতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়,সে সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেল, তবুও শচীদেবীর গর্ভ হতে পুত্র কি কন্যা কিছুই ভূমিষ্ঠ হল না। ১৪০৬ শকে মাঘমাসে গর্ভ সঞ্চার হয়েছিল ; তারপর আরও এক মাসও উত্তীর্ণ হয়ে গেল। ফাল্গুন মাস দেখা দিল।শ্রীজগন্নাথ এই ঘটনায় চিন্তিত হয়ে,শ্বশুর নীলাম্বর চক্রবর্তীকে ডেকে আনলেন।নীলাম্বর চক্রবর্তী নবদ্বীপের মধ্যে একজন বিখ্যাত পন্ডিত ও জ্যোতিষী ছিলেন।তিনি কন্যার প্রসবের এত বিলম্ব কেন,ত্বরায় জামাতার গৃহে আগমন করলেন, এবং গণনায় রত হয়ে বললেন,খুব তাড়াতাড়িই শচীর গর্ভ হতে এক দেবোপম(দেবতুল্য) অসামান্য বালক জন্মগ্রহণ করবে।নীলাম্বর চক্রবর্তী একজন সুবিখ্যাত জ্যোতিষী ছিলেন, সেজন্য সকলেন মন হতে উদ্বেগ দূরে গেল। জগন্নাথ ও অন্যান্য সকলেই বুঝলেন,খুব তাড়াতাড়ি শচীদেবী পুত্রমুখ দেখবেন এবং তাঁর সন্তান দেবসদৃশ হয়ে সকলের চিত্ত রঞ্জন করিবেন।*
*🙏জয় জয় পতিতপাবন গৌরহরির জয়🙏*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০৫)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*মহাপ্রভুর জন্মোৎসব*
***********************
*🎂১৪০৭ শকে ফাল্গুন মাসে পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীগৌরাঙ্গ শ্রীদেবীর গর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হলেন। কিন্তু আজ চন্দ্রগ্রহের দিন।দেখতে দেখতে পূর্ণচন্দ্রের বিমল জ্যোতি ক্রমে ক্ষীণতর হয়ে আসিল।পূণ্যভূমি ভারতে নৈসর্গিক (স্বাভাবিক)সকল ঘটনাতেই নরনারী দেবতাদের নাম-কীর্তন করে থাকে।সেজন্য নবদ্বীপের হাজার হাজার পুরুষ নারী হরিধ্বনি করতে করতে ভাগীরথীর জলে স্নান করবার জন্য গমন করতে লাগলেন ;হাজার হাজার কন্ঠ হতে মধুর হরিনামের ধ্বনি উত্থিত হয়ে চারিদিক মুখরিত করতে লাগল।নীল আকাশের চন্দ্রমা রাহুর করাল গ্রাসে কবলিত হয়ে পড়লেন।এদিকে গৌরচন্দ্র সূতিকা গৃহে শোভা পাচ্ছেন।এই ঘটনা অবলম্বন করে,কোন বৈষ্ণব কবি বলেছেন--, যখন অকলঙ্ক গৌরচন্দ্র উদিত হলেন,তখন কলঙ্কযুক্ত চন্দ্রের কোন দরকার নেই ভেবে,বিধাতা তাকে আকাশের অন্তরালে একেবারে লুকিয়ে ফেললেন।যথা শ্রীচরিতামৃতে=*
*🌷চৌদ্দ শত সাত শকে মাস ফাল্গুন।*
*🌷পৌণমাসী সন্ধ্যাকালে হৈল শুভক্ষণ।।*
*🌷সিংহরাশি,সিংহলগ্ন, উচ্চ গ্রহগণ।*
*🌷ষড়্ বর্গ, অষ্টবর্গ, সর্ব সুলক্ষণ।।*
*🌷'অকলঙ্ক গৌরচন্দ্র দিল দরশন।*
*🌷সকলঙ্ক চন্দ্রে আর কোন প্রয়োজন '।।*
*🌷এত জানি চন্দ্র রাহু করিল গ্রহণ।*
*🌷"কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরি" নামে ভাসে ত্রিভুবন।।*
*🌷জগত ভরিয়া লোক বলে হরি হরি।*
*🌷সেই ক্ষণে গৌরচন্দ্র ভূমে অবতরি।।*
*🌹বিশ্বরূপের জন্মগ্রহণের দ্বাদশ বৎসর পরে,এই নবকুমারকে লাভ করে মাতাপিতার আর আনন্দের সীমা রইল না।শিশু ভূমিষ্ঠ হ'লে,পুরন্দরের গৃহে যেন আনন্দোৎসব আরম্ভ হ'ল।বাদ্যকরেরা ঢোল,সানাই প্রভৃতি এনে বাজাতে আরম্ভ করল।নারীগণ এসে আনন্দ কোলাহল করতে লাগলেন।এদিকে অদ্বৈতাচার্য্য, এ শিশু সামান্য শিশু নয় মনে করে,আপন ভবনে হরিদাস প্রভৃতি ভক্তগণকে সঙ্গে নিয়ে,আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন।"হরিবোল"বলতে বলতে সদলে মহানন্দে গঙ্গাস্নান করতে গেলেন, এবং শিশুর জন্ম উপলক্ষ্যে ব্রাহ্মণগণকে দান করতে লাগলেন।*
*সেইকাল নিজালয়ে, উঠিয়া অদ্বৈতরায়ে,*
*নৃত্য করে আনন্দিত মনে।*
*হরিদাসে লৈয়া সঙ্গে,হুঁকার কীর্তন রঙ্গে,*
*কেন নাচে কেহ নাহি জানে।।*
*দেখি উপরাগ হাসি,শীঘ্র গঙ্গাঘাটে আসি,*
*আনন্দে করিলা গঙ্গাস্নান।*
*পাইয়া উপরাগ ছলে,আপনার মনোবলে,*
*ব্রাহ্মণেরে দিলা নানা দান।।*
*🎂শচীকুমারের জাতকর্ম উপলক্ষ্যে পুরন্দরের ভবন আবার যেন উৎসবময় হয়ে উঠিল।প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনেরা শিশুকে যৌতুক দিবার জন্য,নানা দ্রব্যে তাঁর ঘর পরিপূর্ণ করে ফেলিল।অদ্বৈতাচার্য্যের পত্নী সীতাদেবী ও শ্রীবাস পত্ন মালিনীদেবী এই উপলক্ষ্যে নানা দ্রব্য সম্ভার নিয়ে দোলা আরোহণে নবদ্বীপে আগমন করলেন।পরিশেষে সকল নারী মঙ্গলধ্বনি করতে করতে ধান,দূর্বা,দধি,কলা প্রভৃতি নিয়ে শিশুকে আশীর্বাদ করলেন।*
*👌শ্রীবাসের ব্রাহ্মণী,নাম তাঁর মালিনী,*
*আচার্য্য রত্নের পত্নী সঙ্গে।*
*👌সিন্দূর হরিদ্রা তৈল,দধি কলা নারিকেল,*
*দিয়া পূজে নারীগণ সঙ্গে।।*
*🌻পূর্বে হিন্দু-পরিবারে জ্যোতিষীর দ্বারা শিশুর ভবিষ্যৎ গণনা করা হ'ত।জগন্নাথ মিশ্রও সেইজন্য শিশুর মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্তীকে ডেকে আনালেন। নীলাম্বর শিশুর ভবিষ্যৎ গণনা করে বললেন, "এ শিশুর মধ্যে বত্রিশটি শুভ চিহ্ন প্রকাশ পাচ্ছে ; এ শিশু সামান্য শিশু নহে, এর প্রভাবে নরনারী পরিত্রাণের পথে নীত হবে।*
*লগ্ন গণি হর্ষমতি,নীলাম্বর চক্রবর্তী,*
*গুপ্তে কিছু কহিল মিশ্রেরে।*
*মহাপুরুষের চিহ্ন, লগ্নে অঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন,*
*দেখি এই তারিবে সংসারে।।*
*🔴কিন্তু তিনি একটি কথা গোপন রাখলেন।তিনি গণনা করে দেখলেন যে,এই সন্তান ভবিষ্যতে সন্ন্যাসব্রত অবলম্বন করবে, এবং এর বিরহে মাতা-পিতা শোকে আকুল হয়ে পড়বেন। কিন্তু পাছে, এ আনন্দের সময় নিরানন্দের মেঘ পিতামাতার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে,সেজন্য তিনি আর গৌরের সন্ন্যাস গ্রহণের কথা উল্লেখ করলেন না।*
🙌🙌🙌🙌🙌🙌🙌🙌🙌🙌🙌🙌🙌
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০৬)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*গোরাচাঁদের বাল্য-জীবন*
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
*🍀সবে নিমাইচাঁদ হামাগুড়ি দিতে শিখেছেন।শচীদেবীর আঙ্গিনায় যখন হামাগুড়ি দিতেন,তখন শচীমা একদৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতেন।আহা!শিশুটির রূপের আর তুলনা ছিল না ; গাত্রবর্ণ যেন সোনাকেও হার মানায় ; হাত পায়ের গঠন সুগোল, চক্ষু দুইটি যেন ঢল-ঢল করছে ;মুখখানি যেন পূর্ণিমা চন্দ্রের মতো, দেখলে মনে হয়,যেন কোন শিল্পী বিরলে বসে এই শিশুটির শরীর গঠন করেছেন। শিশুটির সৌন্দর্য্যে সকলেই মুগ্ধ হ'ত ; যে দেখত, সেই নিমাইকে একবার বক্ষে নিয়ে অঙ্গ শীতল করত।প্রতিবেশী মহিলারা সর্বদাই নিমাইকে কোলে নিত,ষেজন্য শচীমা পুত্রকে বেশী সময় কোলে নিবার সুযোগ পেতেন না।*
*🌹শিশু নিমাই যখন ক্রন্দন করতেন,তখন হরিনাম করলে তাঁর ক্রন্দন থেমে যেত।এইজন্য নিমাই ক্রন্দন করলেই, প্রতিবেশী মহিলারা "হরিবোল" বলতেন, শিশু এমন মনোযোগের সঙ্গে সে-ধ্বনি শুনতেন যে,দেখলে মনে হ'ত,কে যেন তাঁর কানের কাছে বীণার ঝঙ্কার করছে। একদিন শচীদেবী গৃহের কর্মে ব্যস্ত ছিলেন,এমন সময় নিতাইচাঁদ ভয়ানক চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন।অন্য কেউ সেই ক্রন্দন থামাতে পারছেন না দেখে শচীদেবী বললেন, "তোমরা হরিনাম করো" দেখবে আপন মনেই আমার বাছার কান্না থেমে যাবে।তারা তাইই করলেন,সত্য সত্যই শচীনন্দনের ক্রন্দন থেমে গেল।শৈশব অবস্থায় হরিনামে ক্রন্দন বন্ট হয়, এই অপূর্ব বার্তা নবদ্বীপের বহুঘরে পৌঁছে গেল। তখন অনেকেই মনে করতে লাগলেন যে এই শিশুর মধ্যে এক অপূর্ব দেব-ভাব বিরাজ করছেন। শচীমা নিমাইকে যখন অলঙ্কারের দ্বারা ভাল করে সাজিয়ে দিতেন,তখন তাঁর শরীরের সৌন্দর্য্য আরও বেড়ে যেত যে তা অবর্ণনীয়।গৌর এই অলঙ্কার পরিহিত দেহে নানারঙ্গে নৃত্য করতেন।নিমাইয়ের এই নৃত্য দেখে লোকে বিমুগ্ধ হয়ে নিমাইয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন, যেন সোনার গৌরাঙ্গের নৃত্য দর্শন করছেন।কেউ কেউ "হরিবোল, হরিবোল" বলতেন, তখন নিমাই এই ধ্বনি শুনে খুবই হাসতেন, আর উৎসাহের সঙ্গে তালে তালে দুইটি বাহুতুলে নৃত্য করতেন।*
*🌺নামকরণ সময়ে ধান,পুঁথি,রজত ও সোনা নির্মিত বস্তু সব রাখা হয়েছিল। শ্রীজগন্নাথ পুত্রকে বললেন, বাপ বিশ্বম্ভর!তুমি এইসব জিনিসের মধ্যে যা ইচ্ছে হয় নিয়ে নাও।বৈষ্ণব কবি শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর বলেন, সে সময়ে নিমাই ভাগবত নিয়ে খেলা করছিলেন।*
*🌹জগন্নাথ বোলে,শুন বাপ বিশ্বম্ভর।*
*🌹যাহা চিত্তে লয় তাহা ধরহ সত্বর।।*
*🌹সকল ছাড়িয়া প্রভু শ্রীশচীনন্দন।*
*🌹ভাগবত ধরিয়া দিলেন আলিঙ্গন।।*
*🌻গৌর তখন পাঁচ বছরের শিশু, তখন বড়ই চঞ্চল হয়ে উঠলেন।তাঁকে ধরে রাখা খুবই কঠিন হয়ে গেল।বালক নিমাই যখন শচীদেবীর আঙ্গিনায় ঘুরে বেড়াতেন,নিমেষের মধ্যে কখন যে দৌড়িয়ে পথের বাহির হতেন, কখন গঙ্গার দিকে ধাবিত হতেন, কোন ঠিক ঠিকানা ছিল না।*
*গৌরহরি একদিন একটি সাপ দেখতে পেলেন এবং তাকে ধরলেন।সাপটি কুন্ডলাকৃতি হলে,গৌরহরি তার উপর বসে পড়লেন।শচীমা এই অবস্থা দেখে ভয়ে অস্থির হয়ে পড়লেন।দেখা গেল গৌরহরি সেই সাপটিকে নিয়ে যেন খেলা করছেন।এইরকম যে কত কত লীলা করেছেন তা ঠিক বলতে পারা যাবে না।*
*একদিন শচীমা নিমাইকে খই-কলা খেতে দিয়ে গৃহ কর্ম করতে লাগলেন।কিছুক্ষণ পরে এসে দেখেন,নিমাই খই কলা না খেয়ে মাটি খাচ্ছেন।বাৎসল্যময়ী শচীমা পুত্রের এইরকম কাজ দেখে বললেন,বাপ নিমাই!তুই খই কলা না খেয়ে মাটি খাচ্ছিস কেন?মায়ের কথা শুনে কলিযুগের একমাত্র উপাস্য গৌরহরি বললেন, মা!মাটিতে আর এই খাবারে কি প্রভেদ?সকলই তো মাটির বিকার মাত্র।শচীমা পুত্রের মুখ থেকে এইসব কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন।পরে বললেন,খাদ্যের দ্বারা শরীর পুষ্ট হয় আর মাটির দ্বারা অন্যান্য বস্তু নির্মিত হয়,একমাত্র।তখন নিমাই মাতৃভক্ত শিশুর মতো মায়ের কথা শুনে মায়ের দেওয়া খাবার ভক্ষণ করতে লাগলেন।বাল্যকালেই নিমাইয়ের তত্ত্বজ্ঞানের সঞ্চার হয়েছিল বলে সকল বৈষ্ণব লেখকগণ বিশ্বাস করে থাকেন।*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০৭)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*শ্রীগৌরাঙ্গের বাল্যজীবন*
*************************
*🍀শ্রীজগন্নাথ ও শচীমা নিমাইয়ের এই সব লীলা দর্শন করে,পরস্পর বলাবলি করতেন, আমার এই পুত্র তো সামান্য পুত্র নহে, আমার মনে হচ্ছে দৈবশক্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে।পরে বললেন না!আমারই ভুল হচ্ছে, নিমাই আমার আর পাঁচটি সন্তানের মত সাধারণ পুত্র।একদিন পিতা জগন্নাথ মিশ্র নিমাইকে ঘরের ভিতর থেকে একটি গ্রন্থ আনতে বললেন,গ্রন্থটি আনবার জন্য যখন নিমাই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন, তখন পিতা পুরন্দর মিশ্র শুনলেন, ঘরের মধ্যে যেন নূপুরের রুণুঝুনু শব্দ হচ্ছে।তাঁর বোধ হল যেন কোন ব্যক্তি নূপুর পায়ে দিয়ে ঘরের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।নিমাই পুস্তক নিয়ে পিতার হাতে এনে দিলেন। জগন্নাথ মিশ্র কিছুক্ষণ পরে ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন,"শ্রীবিষ্ণু-পাদ-পদ্মের, ধ্বজবজ্রাঙ্কুশ" এই ত্রিবিধ চিহ্নে গৃহতল অঙ্কিত হয়েছে। শচীমা ও মিশ্র মহাশয় এ চিহ্ন নিজ সন্তানের পদচিহ্ন বলেই বিশ্বাস করলেন ; এবং এ বালক যে দেবসদৃশ তাঁদের মনে পুনঃ এই বিশ্বাস ক্রমে বদ্ধমূল হতে লাগিল।*
*🌹একদিন কোন তৈর্থিক সাধু জগন্নাথ মিশ্রের গৃহেতে আতিথ্য গ্রহণ করেন।মিশ্র মহাশয় অতিথিকে পরম সমাদর পূর্বক গৃহে স্থান দান করেন।তাঁর ভোজনের জন্য দ্রব্যসামগ্রী আয়োজন করে দিলেন।ব্রাহ্মণ রন্ধন করতে লাগলেন।রন্ধন সমাপ্ত হলে,পাত্রে অন্ন রেখে নিবেদন করে,পরে তিনি সেই ভোগ মুখে তুলবেন, এমন সময় নিমাই কোথা থেকে দৌড়িয়ে এসে ব্রাহ্মণের ভোজনপাত্র হতে এক গ্রাস অন্ন তুলে ভক্ষণ করলেন।ব্রাহ্মণের আর আহার করা হল না। গৃহস্বামী এই ঘটনা জানতে পেরে অত্যন্ত ব্যথিত হলেন, এবং নিমাইকে প্রহার করার জন্য উদ্যত হলেন।নিমাই ছুটে পালিয়ে গেলেন। জগন্নাথ মিশ্র পুনরায় ব্রাহ্মণের আহারের জন্য দ্রব্যসামগ্রী আয়োজন করে দিলেন।ব্রাহ্মণ শ্রীজগন্নাথের অনুরোধে পুনরায় রন্ধনকার্য্য সমাধা করে ভোগ নিবেদন করে, প্রসাদ পেতে যাবেন,নিমাই পূর্বের ন্যায় আবার সেইরকম ভাবে দৌড়িয়ে এসে ব্রাহ্মণের পাত্র হতে অন্নগ্রাস তুলে নিজ মুখে প্রদান করলেন।পিতা জগন্নাথ পুনরায় এই ঘটনার কথা শুনে অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন,এবং লাঠি হাতে সন্তানকে প্রহার করবার জন্য ধাবিত হলেন।সকলে নিমাইকে প্রহার করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন "যা হবার তা হয়ে গেছে" প্রহার করে তো সমস্যার সমাধান হবে না।তখন তৈর্থিক ব্রাহ্মণও বালককে প্রহার করতে নিষেধ করলেন।পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ জানতে পারলেন তিনি সাধারণ বালক নন। কিন্তু জগন্নাথ মিশ্র অতিথির আহারের বিঘ্ন দর্শন করে অত্যন্ত দুঃখিত হলেন, এবং গালে হাত দিয়ে অতিথির আহারের বিঘ্ন বিষয় চিন্তা করতে লাগলেন।*
*⚪বিশ্বরূপ এই সব ঘটনার কথা শুনে দুঃখিত অন্তরে অতিথির নিকট উপস্থিত হলেন, এবং ছোট ভায়ের দোষের কথা উল্লেখ করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন।তৈর্থিক ব্রাহ্মণ অতি বিনীত ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন।তিনি বিশ্বরূপের কথা শুনে বললেন যে,তিনি বালকের ব্যবহারে কিছুমাত্র দুঃখিত হননি।বিশ্বরূপের অনুরোধে তিনি পুনরায় রন্ধন করে ভোজনের জন্য চক্ষু মুদিত করে যখন নিজের ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করতে বসিলেন,তখন নিমাই "বালগোপালের" রূপ ধারণ করে,তাঁর সম্মুখে প্রকাশিত হলেন।ব্রাহ্মণ সেই অপরূপ মোহন মূর্তি দেখে বিমুগ্ধ হয়ে পড়লেন, এবং জগন্নাথ মিশ্রের বালক যে সামান্য নহে, স্বয়ং নরমূর্তিধারী শ্রীকৃষ্ণ। এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে,তিনি গৌরচন্দ্রকে মনপ্রাণ সমর্পণ করলেন।*
*⚪একদিন নিমাই অত্যন্ত ক্রন্দন করতে লাগলেন। সে কান্না আর কেউ থামাতে পারেন না।পিতা জগন্নাথ ও শচীমা কত বুঝালেন,কত আদর করে কোলে নিলেন,শ্রীগৌরচাঁদ বদনে কত চুম্বন করলেন, কিন্তু তাঁদের আদর ও মিষ্ট বাক্যে নিমাইয়ের কান্না কিছুতেই থামল না, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হতে লাগল।বাৎসল্যময়ী শচীমা জিজ্ঞাসা করলেন,বাপ!তুই কি চাস বলতো?রোরুদ্যমান বা ক্রন্দনরত নিমাই তখন বললেন, "জগদীশ পন্ডিত ও হিরণ্যভাগবতের ঘরে নৈবেদ্য দেখে এসেছি আমি সেই নৈবেদ্যর দ্রব্যগুলি খাব।পরে ব্রাহ্মণগণ গৌরের নৈবেদ্য ভোজনের ইচ্ছার কথা শুনে পুলকিত অন্তরে গৌরকে এনে দিলেন। দেবতাকে নিবেদন,আর গৌরের ভোজন,একই কথা বলে তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন।*
*🔵আর একদিনের কথা, দিনে দিনে তিনি বড় হচ্ছেন আর যেন দুষ্টমি বেড়ে চলেছে।সকাল হলেই সখাদের নিয়ে চারিদিকে ছুটে বেড়াতেন।তখন এই সুন্দর শিশুটির গায়ে নানা অলঙ্কারে ভূষিত থাকতেন। একথিন দুই চোর অলঙ্কারগুলি অপহরণ করার মানসে তাঁকে ভুলিয়ে কোলে করে নিয়ে চলে গেল।এদিকে নিমাইকে দেখতে না পেয়ে পিতামাতা অস্থির হয়ে পড়লেন।কিছুক্ষণ পরে তারা এই সুন্দর অলঙ্কার শোভিত শিশুকে কোলে করে এনে গোপনে জগন্নাথের ভবনের দ্বারে রেখে চলে গেল।*
*🙏জয় শচীনন্দন গৌরহরির জয়🙏*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚
*🙏শ্রীমন্মহাপ্রভুর শাস্ত্র অধ্যয়ন🙏*
🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚
*🪷শ্রীমন্মহাপ্রভুর পঞ্চম বর্ষে বিদ্যারম্ভ করেন প্রথমে পন্ডিত শ্রীগঙ্গাদাস ভট্টাচার্যের নিকট চার বৎসরকাল ব্যাকরণ,সাহিত্য ও অলঙ্কার, দুই বৎসরকাল বিষ্ণু মিশ্রের নিকট স্মৃতি ও জ্যোতিষ, দুই বৎসরকাল শ্রীসুদর্শন পন্ডিতের নিকট ষড়্ দর্শন,দুই বৎসর সময় শ্রীসার্বভৌম বাসুদেব ভট্টাচার্যের কাছে তর্কশাস্ত্র বা ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ের পর শ্রীল অদ্বৈত-সভায় বেদপাঠ করেন।*
🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚
*অদ্বৈত প্রকাশ,১২শ।*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০৮)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ-চরিত🙏*
*শ্রীগৌরহরির বাল্যজীবন*
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
*নিমাই গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে বড়ই চঞ্চলতা প্রকাশ করতেন।গঙ্গাজলে সাঁতার দিবার সময়,ডুব দিয়ে স্নানার্থীদের পা ধরে টানতেন,বিষ্ণু উপাসকগণ পূজার জন্য পুষ্প ও নৈবেদ্য রেখে,জলে নামলে, সুযোগ বুঝে,সেখানে আসন পেতে বসতেন ; নিজে নিজেই পুষ্পগুলি গ্রহণ করতেন, এবং নৈবেদ্যর ফলমূলগুলি ভক্ষণ করে বলতেন, "আমাকে পূজো কর ; আমিই নারায়ণ "।কখনও জলকেলি করতে করতে,মুখে জল পুরে কুলি করতে করতে, অনেক ব্রাহ্মণের স্নানের পরে তাঁদের অঙ্গে মুখের কুলি জল ফেলতেন। সরলা বালিকারাও নিমাইয়ের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতেন না।তারা নদীতটে বস্ত্র রেখে, গঙ্গাজলে অবগাহন করবার সময়,কলির কৃষ্ণ গৌরহরি তাদের বস্ত্রগুলি একত্র করে ফেলতেন। কুমারীরা স্নানান্তে আপন আপন বস্ত্র নিতে গিয়েই দেখেন বস্ত্র নেই। কেবল এইসব করেই তিনি ক্ষান্ত হতেন না ; তাদের স্নান করে উঠা অঙ্গে বালি ছিটিয়ে দিয়ে নিমাই বড় আনন্দ লাভ করতেন। বালিকারা নিমাইয়ের এই ব্যবহারে খুবই কুপিত হতেন। কিন্তু বালিকারা অতি বিনম্র বচনে বলতেন, ভাই নিমাই!তুমি এমন করিও না,গ্রাম সম্বন্ধে তুমি আমাদের ভাই হও, তোমার কি আমাদের সঙ্গে এমন করা উচিৎ? আবার কেউ কেউ নিজের প্রতি ধৈর্য্য হারিয়ে নিমাইয়ের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করতেন।তখন নিমাই বলতেন, "তোমার বুড়ো বর হবে "। অল্পবয়স্কা নারীদের পক্ষে এ অভিসম্পাত বড়ই কষ্টকর বলে বোধ হত ; সে জন্য তারা নিমাইয়ের সব রকম চঞ্চলতায় কোনরকম বিরক্তিসূচক কথা বলতে সাহস করতেন না।চঞ্চল প্রকৃতি নিমাইয়ের দৌরাত্ম্য যেন দিন দিন বেড়েই যেতে লাগল।লোকে আর কতদিন সহ্য করবেন?একদিন কয়েকজন ব্রাহ্মণ শ্রীজগন্নাথ মিশ্রের কাছে ও তারপরে কয়েকটি বালিকা শচীমায়ের কাছে নিমাইয়ের নামে অভিযোগ উপস্থিত করিল। যথা,শ্রীচৈতন্য ভাগবতে=*
*🌷শুন শুন ওহে মিশ্র পরম বান্ধব!*
*🌷তোমার পুত্রের অপন্যায় কহি সব।।*
*🌹অপন্যায়=অন্যায় ব্যবহার।*
*🌷ভাল মতে না পারি করিতে গঙ্গা-স্নান।*
*🌷কেহো বোলে জল দিয়া ভাঙ্গে মোর ধ্যান।।*
*🌷আরো বোলে "কারে ধ্যান কর এই দেখ।*
*🌷কলিযুগে নারায়ণ মুঞি পরতেখ।।*
*🌻মুঞি=আমি,পরতেখ=প্রত্যক্ষ।*
*🌷কেহো বোলে মোর শিবলিঙ্গ করে চুরি।*
*🌷কেহো বোলে মোর লই পলায় উত্তরী।।*
*🌷কেহো বোলে "পুষ্প দূর্বা,নৈবেদ্য চন্দন।*
*🌷বিষ্ণু পূজিবার সজ্জ,বিষ্ণু আসন।।*
☆ ☆ ☆ ☆ ☆
*🌷কেহো বোলে "সন্ধ্যা করি জলেতে নামিয়া।*
*🌷ডুব দেই লৈয়া যায় চরণে ধরিয়া।।*
*🌷কেহো বোলে আমার না রহে সাজি ধুতি।*
*🌷কেহো বোলে "আমার চোরায় গীতা পুঁথি।।*
*🌷কেহো বোলে পুত্র অতি বালক আমার।*
*🌷কর্ণে জল দিয়া তারে কান্দায় অপার।।"*
*🌷কেহো বোলে "মোর পৃষ্ঠে দিয়া কান্ধে চড়ে।*
*🌷মুঞি রে মহেশ বলি ঝাঁপ দিয়া পড়ে।।*
*🍀উত্তরী=গায়ের চাদর বা উড়নী। চোরায়=চুরি করে।*
*🌷কেহো বোলে 'বৈসে মোর পূজার আসনে।*
*🌷নৈবেদ্য খাইয়া বিষ্ণু পূজায় আপনে।।*
*🌷স্নান করে উঠিলে বালুকা দেই অঙ্গে।*
*🌷যতেক চপল শিশু সেই তার সঙ্গে।।*
*🌷স্ত্রী-বাসে পুরুষ-বাসে করয়ে বদল।*
*🌷পহ্রিবার বেলে সভে লজ্জায় বিকল।।*
*🌹পহ্রিবার=পরিধান করবার*
*🌷পরম বান্ধব তুমি মিশ্র জগন্নাথ।*
*🌷নিত্য এইমত করে,কহিল তোমাত।।*
*🌷হেনকালে পার্শ্ববর্তী যতেক বালিকা।*
*🌷কোপ মনে আইলেন শচীদেবী যথা।।*
*🌷শচী সম্বোধিয়া সভে বোলেন বচন।*
*🌷শুন ঠাকুরাণী!নিজ পুত্রের করণ।।*
*🌷বসন করয়ে চুরি,বোলে বড় মন্দ।*
*🌷উত্তর করিলে জল দেই, করে দ্বন্দ্ব।।*
*🌷ব্রত করিবারে যত আনি ফুল ফল।*
*🌷ছড়াইয়া ফেলে বল করিয়া সকল।।*
*🌷স্নান করি উঠিলে বালুকা দেই অঙ্গে।*
*🌷যতেক চপল শিশু সেই তার সঙ্গে।।*
*🌷অলক্ষিতে আসি কর্ণে বোলে বড় বোল।*
*🌷কেহ বোলে মোর মুখে দিলেক কুল্লোল।।*
*🌻করণ=কর্ম বা কাজ। তোমাত=তোমাকে। বেলে=সময়। কুল্লোল=কুলকুচোর জল বা মুখের জল।*
*🌷ওকড়ার ফল দেয় কেশের ভিতরে।*
*🌷কেহো বোলে মোর চাহে বিভা করিবারে।।*
*🌷প্রতিদিন এই মত করে ব্যবহার।*
*🌷তোমার নিমাই কিবা রাজার কুমার।।*
*🌷পূরুবে শুনিলা যেন নন্দের কুমার।*
*🌷সেইমত সব করে নিমাই তোমার।।*
*🌷দুঃখে বাপ মায়েরে বালা যেই দিনে।*
*🌷ততক্ষণে কোন্দল ইহা তোমা সনে।।*
*🌷নিবারণ কর ঝাট আপন ছাওয়াল।*
*🌷নদীয়ায় হেন কর্ম কভু নাহি ভাল।।*
*🪷শ্রীজগন্নাথ মিশ্র নিমাইয়ের এইসব দৌরাত্ম্যের কথা শুনে একটি লাঠি হাতে করে,নিমাইকে মারবার জন্য, স্নানের ঘাটে গমন করলেন। ইতিমধ্যে নিমাই বাড়ীতে এসে উপস্থিত হলেন। জগন্নাথ পুত্রকে দেখতে না পেয়ে বাড়ীতে ফিরে এলেন।এসে দেখেন,নিমাইয়ের গায়ে তেল বা জলের কোন চিহ্নমাত্র নেই ; নিমাই মলিন শুকনো বস্ত্র পড়ে আছেন ; গায়ে বিন্দু বিন্দু কালির দাগ। জগন্নাথ মিশ্র,নিমাইয়ের গঙ্গায় স্নানে যাবার যখন কোন লক্ষণই দেখলেন না, তখন তাঁর মনে হল, অভিযোগকারীরা কিভাবে তাদের স্নানের সময় নিমাইয়ের দৌরাত্ম্যের কথা আমার কাছে এসে বলে গেল!নিমাইকেও এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করাতে,নিমাই তাঁর দেহ ও বস্ত্র দেখিয়ে, বললেন, দেখ আমি জলে গিয়েছিলাম কিনা, তাহলে তো আমার বস্ত্র ভিজে থাকবে, আমি কোন সময় খারাপ কাজ করতে পারি না।বাবা তাঁর সুচতুর উত্তরে নিমাইকে আর দোষী বলে মেনে নিতে পারলেন না। চতুরের শিরোমণি গৌরহরি আমার দ্বাপরযুগের অপ্রকট লীলা নদীয়ায় এসে প্রকট করেছিলেন।*
*🌺নবদ্বীপে বৈষ্ণবাগ্রগণ্য অদ্বতাচার্য্যের চতুষ্পাঠীতে জগন্নাথ মিশ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বরূপ অধ্যয়ন করতেন।এখন বিশ্বরূপের বয়স প্রায় দ্বাদশ বৎসর। বিশ্বরূপের রূপ, লাবণ্য, তাঁর জ্ঞানানুরাগ, বিনয় প্রভৃতি গুণ দর্শন করে অদ্বৈতাচার্য্য ও তাঁর চতুষ্পাঠীর ছাত্রেরা সকলেই তাঁকে ভালবাসতেন।বিশ্বরূপ আহারের ও শয়নের সময় ছাড়া সব সময়ই আচার্য্যের চতুষ্পাঠীতে থেকে জ্ঞান আলোচনা করতেন।দিনের বেলা সময়ে সময়ে আহারের সময় অতিবাহিত হয়ে যেত, তবুও বিশ্বরূপ চতুষ্পাঠী হতে বাড়ীতে আসিতেন না।যে পর্যন্ত সন্তান বাড়ীতে না আসত, সেই পর্যন্ত শচীমাও আহার করতেন না।বেশী বেলা হয়ে গেলে,নিমাইকে কখন কখনও বড় ভাইকে ডাকবার জন্য পাঠিয়ে দিতেন। একদিন অনেক বেলা হয়ে গেছে,শচীমা বিশ্বরূপকে ডাকবার জন্য নিমাইকে পাঠিয়ে দিলেন,নিমাই দাদাকে ডাকার জন্য আচার্য্যের সভায় উপস্থিত হলেন। সোনার পুতুলের মত আমার নিমাইচাঁদ, চতুষ্পাঠীতে উপস্থিত হলে সকলে সে রূপের প্রভা ও তাঁর বদন- -মন্ডলে এক স্বর্গীয় জ্যোতিঃ দর্শনে মোহিত হয়ে পড়লেন।অদ্বৈতাচার্য্য তাঁর প্রাণের ঠাকুরকে যে আগে হতেই ভবিষ্যৎ দিব্যচক্ষে দর্শন করছিলেন।তিনি সে মুখচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে যেন নয়ন আর ফেরাতে পারলেন না ; ইচ্ছে হল, সে রূপ প্রাণ ভরে অনেক অনেকক্ষণ দর্শন করেন।নিমাই ক্ষণকাল অদ্বৈত-সভায় দাঁড়িয়ে মধুর বচনে বিশ্বরূপকে বললেন--, দাদা! বেলা হয়েছে,বাড়ী এসো, মা আমাকে ডাকতে পাঠিয়েছেন।বিশ্বরূপ ভাইকে ভীষণ ভালবাসতেন ; তিনি তৎক্ষণাৎ পুঁথিতে ডোর বেঁধে,ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ী ফিরলেন।*
👣👣👣👣👣👣🌹👣👣👣👣👣👣
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(০৯)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*বিশ্বরূপের গৃহত্যাগ ও গৌরের পাঠ বন্ধ।*
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
*🌹শ্রীজগন্নাথ মিশ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বরূপ ও কনিষ্ঠ পুত্র বিশ্বম্ভর। দুই পুত্রই পিতামাতার নয়নতারার মত।তখনকার দিনে ১৪|১৫ বছর বয়সে ছেলেদের বিবাহ হত।বয়েস অনুযায়ী বিবাহের সময় উপস্থিত হল।শ্রীজগন্নাথ মিশ্র পুত্রের জন্য পাত্রী অন্বেষণে প্রবৃত্ত হলেন।বিশ্বরূপের কানে এই সংবাদ প্রবেশ করল।জগন্নাথের পরিবারের মধ্যে ভগবৎ প্রেমের কি এক মাধুরী যে ক্রীড়া করত তা বলা যায় না ; বিশ্বরূপ যখন শুনলেন তাঁর বিয়ের প্রস্তাব চলছে, তখন তাঁর মন বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠিল। বিশ্বরূপের যে বয়স,নবদ্বীপে সে-সময় সেই বয়সের হাজার হাজার বালক পরিবারের মধ্যে বাস করিত, কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব তাদের কাছে কখনই অপ্রীতিকর বলে বোধ হত না। বিশ্বরূপের মন বোধহয় অন্যভাবে গঠিত ; তিনি ভাবলেন,বিয়ে করলে সংসারে জড়িত হতে হবে,আর মাতাপিতার কথা অগ্রাহ্য করে সংসারে বাস করলেও নিষ্কৃতি নাই, তাঁরা পুনঃ পুনঃ এইরকম প্রস্তাব উপস্থিত করবেন এবং তা অবসেলা করলে তাঁদের মনে দারুণ কষ্ট উপস্থিত হবে!এই সব কথা চিন্তা করে বিশ্বরূপ সংসার ত্যাগ করাই শ্রেয় মনে করলেন এবং সঙ্কল্প করলেন।তিনি পিতামাতার স্নেহ, ছোট ভাই নিমাইয়ের প্রেমাকর্ষণ, প্রতিবেশীদের ভালবাসা, সবই বিসর্জন দিলেন। সন্ন্যাসী হয়ে নগরে,প্রান্তরে,বনে-উপবনে, গিরিশৃঙ্গে ও নদীতটে বিচরণ করে, বিশ্বেশ্বরের বিশ্বরূপ দর্শন করবেন, নানা জায়গায় ভক্তমেলায়,ভক্ত-সঙ্গে ও ধর্মপ্রসঙ্গে সময় অতিবাহিত করবেন,তারজন্য ব্যাকুল হয়ে উঠিলেন। কাউকে কোন সংবাদ না দিয়ে গভীর রাতে নিঃশব্দে গৃহ ত্যাগ করে চলে গেলেন।কেউ তা জানতে পারল না*
*সকালবেলা শচীমা ও পিতা জগন্নাথ দেখলেন, তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র গৃহে নেই।পিতা চারিদিকে খোঁজ করলেন, সকলকেই বিশ্বরূপের কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন,কেউ কিছুই বলতে পারলেন না। অদ্বৈতাচার্য্যের চতুষ্পাঠীতে বিশ্বরূপ প্রায় সর্বদাই থাকতেন,পিতা এইকথা মনে করে ব্যাকুর অন্তরে সেখানে ছুটে গেলেন।যে বিশ্বরূপের সৌন্দর্য্যে অদ্বৈত-সভা আলোকিত হত,পুত্রকে সেখানে দেখতে না পেয়ে নিরাশ মনে গৃহে ফিরে আসিলেন।শচীমা যখন শুনলেন পুত্রকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তিনি মূর্চ্ছিত হয়ে ভূতলে পড়ে গেলেন।পিতা জগন্নাথ যেন চারিদিকে শূন্য দেখতে লাগলেন।প্রতিবেশী সকলে দুঃখে মর্মাহত হলেন।অদ্বৈতাচার্য্য ও তাঁর শিষ্যবৃন্দ বিশ্বরূপের অভাবে হৃদয়ে দারুণ কষ্ট অনুভব করতে লাগলেন।বিশ্বরূপ চলে গেলে, জগন্নাথ পরিবারের আত্মীয়স্বজনগণ এসে বিশ্বরূপের বিচ্ছেদ যন্ত্রণা নিবারণ করবার জন্য বিশেষ প্রয়াসী হলেন।সকলেই বিশ্বরূপের জন্য মর্মাহত বটে, কিন্তু সকলেই নিমাইকে লক্ষ্য করে যেন এইকথা বলতে লাগলেন, "এমন সোনারচাঁদ ছেলেকে দেখে সকল দুঃখ তোমরা দূর করো।এমন ছেলে যার ঘরে আছে তাদের আর দুঃখ কি? এদিকে বিশ্বরূপ সংসারের সকল মায়া ত্যাগ করে পুরী সম্প্রদায়ী কোন সন্ন্যাসীর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করলেন।দীক্ষায় মনবের নবজীবন লাভ হয়,এই বিশ্বাসে প্রায় সকল স্থলেই দীক্ষার্থীর নূতন নামকরণ করা হয়ে থাকে।শ্রীজগন্নাথ পুত্র বিশ্বরূপও দীক্ষার পর নূতন নামে অভিহিত হলেন।তাঁর নাম হল শ্রীশঙ্করারণ্যপুরী।*
*জগন্নাথ মিশ্র পুত্র শোকে ভীষণ অস্থির ; অথচ সন্তান যে ব্রত অবলম্বন করেছেন সে ব্রতে যাতে ব্যাঘাত না হয়, সে জন্য তিনি বলেছেন--,এই ব্রত ভঙ্গ করে সে যেন গৃহে ফিরে না আসে।এইরকম ধার্মিক পিতা না হলে কি এইরকম ধার্মিক পুত্র জন্মগ্রহণ করতে পারে? বিশ্বরূপ চলে গেলে,বিশ্বম্ভর একদিন পান চিবাতে চিবাতে মূর্ছিত হয়ে পড়েন। এই মূর্ছিত অবস্থায় তিনি একটি স্বপ্ন দেখলেন,পরে চেতনা লাভ করে, তিনি এইরকমে স্বপ্ন বৃত্তন্তটি উল্লেখ করেছিলেন, দাদা এসে আমাকে বললেন,তুই গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ কর।দাদার এইকথা শুনে আমি বললাম, পিতামাতাকে পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করব না।দাদা এইকথা শুনে তখন বললেন, তবে তুই সংসার ধর্ম পালন কর।এইসব ঘটনার মধ্যে পিতা জগন্নাথের মনের অবস্থা কিরকম হল,তা সহজেই অনুমান করা যায়।বিশ্বরূপের সন্ন্যাস,নিমাইয়ের পান চিবোতে চিবোতে মূর্ছিত অবস্থায় বিশ্বরূপের প্রকাশ ও ভাইকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুরোধ, ইত্যাদি বিষয় তাঁর মনকে আলোড়িত করতে লাগল।*
*ক্রমাগত*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*(১০)🙏শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত🙏*
*বিশ্বরূপের সন্ন্যাস ও গৌরের পাঠ বন্ধ*
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
*শ্রীজগন্নাথ মিশ্র ভাবতে লাগলেন,বিশ্বরূপ তত্ত্বজ্ঞানের আলোচনাই সন্ন্যাসের প্রধান কারণ। মিশ্র মহাশয় এতদিন গৃহে বসে,পুত্রেকে ব্যাকরণ অধ্যয়ন করাতেন।নিমাইয়ের প্রখর বুদ্ধি, তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ; সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় সব বুঝবার চরম ক্ষমতা, এই সব লক্ষণের পরিচয় পেয়ে, তিনি সন্তানের অসাধারণত্ব বুঝেছিলেন।এই পুত্র ক্রমে ক্রমে জ্ঞানের পথে অগ্রসর হলে,পাছে সে বিশ্বরূপের পথ অবলম্বন করে, এই আশঙ্কায় তিনি নিমাইয়ের পাঠ বন্ধ করে দিলেন।তিনি নিমাইকে ডেকে বললেন, বাপ নিমাই!তোমার আর শিক্ষার প্রয়োজন নেই, তুমি খাও দাও, আর ঘরে থাকো। পিতৃভক্ত নিমাই পিতার কথার কোন আপত্তি না করে, সম্মতি দান করলেন। নিমাই স্বভাবতই কিছু চঞ্চল প্রকৃতির বালক ; তা হলেও এতদিন পিতার কাছে বসে পাঠ অভ্যাস করতেন। এখন নিমাইচাঁদ আরও চঞ্চল হয়ে উঠলেন।সকাল,দুপুর,বিকেল কেবল আহার ও স্নানের সময় ছাড়া তাীঁএ খুঁজে পাওয়া চরম কঠিন হ'ত।নিমাই বাল্যবন্ধুদের নিয়ে সর্বদাই ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।তাঁর উপদ্রবে অনেকেই বিরক্ত হয়ে শচীমা ও মিশ্র মহাশয়ের কাছে নিমাইয়ের দৌরাত্ম্যের কথা বলতে লাগলেন।পিতা পুরন্দর আর কিছুতেই নিমাইকে বশে রাখতে পারেন না।অনেকেই বলতে লাগলেন, জগন্নাথ সন্তানের পাঠ বন্ধ করে দিয়ে অন্যায় কাজ করেছেন।একদিন কোন এক ব্যক্তি,জগন্নাথকে বললেন, "তুমি ছেলের পড়া বন্ধ করে দিয়ে ভাল কাজ করো নাই। লোকের ছেলে পড়তে চায় না, আর তোমার ছেলের পাঠের প্রতি কত অনুরাগ, তুমি এমন ছেলের পড় নিষেধ করলে!পড়া বন্ধ করলে, সে দুষ্টমি করে বেড়াবে না তো কি করবে?জগন্নাথ দেখলেন,নিমাইয়ের পাঠ বন্ধ করা অবধি সে আরও চঞ্চল হয়েছে, লোকে আমায় ভাল বলছে না।*
*🌻এমন সময় একটা ঘটনা উপস্থিত হল।শচীদেবী দেখলেন,তাঁর হৃদয়ের ধন গৌরচাঁদ কতকগুলি উচ্ছিষ্ট ভাঙ্গে পড়ে থাকা হাড়ির উপর বসে রয়েছেন ; মা এইদৃশ্য দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন,এ ভাঙ্গা হাড়ির উপর তুই কেন বসলি?ছি!ছি! ঐ উচ্ছিষ্ট হাড়ির উপর কি বসতে আছে!যা বাপ!তাড়াতাড়ি স্নান করে আয়। নিমাই এইসব কথা শুনে বললেন, মা!জগতে কোন বস্তুই অস্পৃশ্য নহে ; পরমেশ্বর সকল বস্তুর মধ্যেই বাস করছেন।যিনি ভবিষ্যতে অপূর্ব কীর্তি স্থাপন করবেন, বাল্যকালে তাঁর পক্ষে এইরকম তত্ত্বজ্ঞানের পরিচয় দেওয়া কিছু আশ্চর্য্য নহে।শচীমা নিমাইয়ের মুখ থেকে এইসব কথা শুনে অবাক হয়ে পড়লেন।অবশেষে নিমাই নেজের চঞ্চলতার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, "আমাকে লেখাপড়া করতে না দিলে, আমি আর কি করব? মা, নিমাইয়ের কথা শুনে, কথাগুলি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করলেন।অন্যদিকে পিতা জগন্নাথ নিমাইয়ের এই সব ঘটনা দর্শন করে,নিমাইকে পূর্বের ন্যায় পুনরায় নিজে বিদ্যাদানে প্রবৃত বা রত হলেন।*
*জয় জয় আমার নিতাইচাঁদের জয়🙏*
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
🚩 ক্রমাগত 👉 শ্রীগৌরাঙ্গ চরিত 📖 দ্বিতীয় 🏵️ শ্রী শশীভূষণ বসু ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/08/gouranga2.html
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️
꧁ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ📱7001138871꧂
নিবাস- বাঁশবাড়ী, কীর্তন মন্দিরের পাশে, পোঃ- বাঁশবাড়ী, থানা- ইংরেজ বাজার, জেলা- মালদহ, পশ্চিমবঙ্গ, পিন কোড- ৭৩২১০১।
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
*••••┉━❀꧁ 🙏 রাধে রাধে 🙏 ꧂❀━┅••••*
*••••┉━❀꧁ 🙏 রাধে রাধে 🙏 ꧂❀━┅••••*
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ
হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রীরাধেগোবিন্দ।।
*••••┉━❀꧁ 🙏 জয় জগন্নাথ 🙏 ꧂❀━┅••••*
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥
*••••┉━❀꧁ 🙏 জয় রাধাকান্ত 🙏 ꧂ ❀━┅••••*
💮❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀💮
💮❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀💮
✧═══════════•❁❀❁•═══════════✧
