✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🔙 পূর্ব লীলা 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 চতুর্থ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo4.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪১. কৃষ্ণকীর্তনের সুর ও তাল 🎵 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪১) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*কৃষ্ণকীর্তনের সুর ও তাল*
**************************
*☘প্রাচীনতর পুথিটির অনেকগুলি পদ দ্বিতীয় পুথিটিতে উদ্ধৃত হয়েছে।তা ছাড়া অন্য একটি পদও বড়ু চন্ডীদাসের নামে প্রচার করার চেষ্টা দেখা যায়।পদটি দ্বিজ চন্ডীদাসের একটি উত্তম পদ ; এটি "পদকল্পতরুতে" এবং নীলরতন বাবুর সংগ্রহে উদ্ধৃত হয়েছে। মণীন্দ্র বাবু এই পদটি তুলতে ভুলেছেন।*
*🌻বষু তালের পদাবলী, রাগিনী পটমঞ্জরী।*
*🌷এক কাল হইল মোর জমুনার জল।*
*🌷আর কাল হইল মোর কদম্বের তল।।*
*🌷আর কাল হইল মোর পাসে বৃন্দাবন।*
*🌷আর কাল হইল মোর নহলি জৌবন।।*
*🌻লঘু দুইবারে ১৪ চৌদ্দ কলা।পরে গুরু।*
*🌷আর কাল হইল মোরে ভ্রমরার বোল।*
*🌷আর কাল হইল মোরে কানু মাগে কোল।।*
*🌷আর কাল হইল মোরে তরলিয়া বাঁসি।*
*🌷আর কাল হইল মোরে কানু মুখের হাসি।।*
*🌷আর কাল হইল মোরে নয়ানের নির।*
*🌷আর কাল হইল মোর চিত নহে স্থির।।*
*🌷আর কাল হইল মোরে কোকিল্যার স্বর।*
*🌷আর কাল হইল মোর নিজ পাপ ঘর।।*
*🌷আর কাল হইল মোরে বড়ায়ের সঙ্গ।*
*🌷আর কাল হইল দানি করে কত রঙ্গ।।*
*🌷আর কাল হইল মোরে মোহনিঞা বাঁসি।*
*🌷আর কাল হইল মোরে কালা মুখের হাসি।।*
*🌷আর কাল হইল মোরে নাহিক উপায়ে।*
*🌷আর কাল হইল বটু চন্ডিদাসে গায়ে।।*
*🌹🌹গ্রন্থে যেমনটি ছিল তুলে ধরলাম🌹🌹*
*🌻এবং লঘু গুরু সকলে চৌষট্টি কলা।*
*🌳এই পদটি কৃষ্ণকীর্তনে নেই।আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে,মণীন্দ্র বাবু এই সুন্দর পদটি তাঁর বিবরণ হতে বাদ দিয়েছেন।নীলরতন বাবুর চন্ডীদাসের পদবলী ১৫৭ পৃষ্ঠায় নিম্নলিখিত পাঠ ধৃত হয়েছে।*
*পটমঞ্জরী*
*🌷একে কাল হৈল মোর নয়লি যৌবন।*
*🌷আর কাল হৈল মোর বাস বৃন্দাবন।।*
*🌷আর কাল হৈল মোর কদম্বের তল।*
*🌷আর কাল হৈল মোর যমুনার জল।।*
*🌷আর কাল হৈল মোর রতন ভূষণ।*
*🌷আর কাল হৈল মোর গিরি গোবর্দ্ধন।।*
*🌷এত কাল সনে আমি থাকি একাকিনী।*
*🌷এমন ব্যথিত নাই শুনয়ে কাহিনী।।*
*🌷দ্বিজ চন্ডীদাস কহে না কহ এমন।*
*🌷কার কোন দোষ নাই সব এক জন।।*
*🌻পদকল্পতরু (বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ সংস্করণ) ২য় খন্ড ৯৪৫ পদ এরই প্রায় অনুরূপ, ভণিতাও প্রায় এক ঃ-----*
*🌷দ্বিজ চন্ডীদাস কহে না কহ এমন।*
*🌷কারু কোন দোষ নাই সবে একজন।।*
*🌹এই পদটির ভাষা, ভাব, ব্যঞ্জনা কৃষ্ণকীর্তন হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।পাওয়া পুথির পদটিতে দ্বিরুক্তি দোষ ঘটেছে, ভণিতার কলিটি টেনে বুনে মিলিত, এইরকম মনে হয়। পদটিতে দানের পদের মধ্যে ফেলবার চেষ্টাও দেখা যায় ; কারণ ঐ পুথিতে উদ্ধৃত সবগুলি পদই দানখন্ডের।*
*🌷আর কাল হৈল মোরে বড়ায়ের সঙ্গ।*
*🌷আর কাল হৈল দানি করে কত রঙ্গ।।*
*🌺এই কলিটি যেন গানের অপরাংশ হতে আলাদা হয়ে পড়েছে। এই সব কারণে আমার মনে হয়, কৃষ্ণকীর্তন এই দুইটি পুথির সঙ্গে মিলিয়ে পড়া উচিত।তাহলে,যে ভাবধারার জন্য কৃষ্ণকীর্তন পুথিটিকে চতুর্দশ শতকের বলে গণ্য করা হচ্ছে, তার জের উনবিংশ শতকেও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাবে।সে যাইহোক,সঙ্গীতের দিক দিয়ে এই অপূর্ব পুথিত্রয়ের সম্যক্ আলোচনা হওয়া বাঞ্জনীয়।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🌻🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪২. দীন চন্ডীদাস 🍀 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪২) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*দীন চন্ডীদাস*
*স্বয়ং দৌত্য*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
*🍀প্রবাসী-সম্পাদক শ্রীযুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের সৌজন্যে আমি বাঁকুড়া হতে একটি পুথি পেয়েছি।সেই গ্রন্থে দীন চন্ডীদাসের অনেকগুলি পদ আছে।পুথিটি তাঁর ভ্রাতুষ্পৌত্র পুরুলিয়ার উকিল শ্রীযুক্ত বিমলাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রদত্ত।ইহার কতগুলি পদ সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় (১৩৪৫ সন চতুর্থ সংখ্যা )প্রকাশিত হয়েছে।পরিষৎ পত্রিকায় যে পালাটি বা পর্যায়টি প্রকাশিত হয়েছে, তার নাম কপালী মিলন। অর্থ্যাৎ কপালী (মহাদেব)বেশে শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার সঙ্গে মিলিত হবার চেষ্টা করেছেন।শ্রীকৃষ্ণ কখনও বাজীকর বেশে, কখনও মালিনী বেশে, কখনও দোকানী বেশে প্রভৃতি রাধিকার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছেন।এইজন্য এই পালা বা পর্যায় গুলির সাধারণ নাম স্বয়ং দৌত্য।এটির অন্তর্নিহিত ভাব এই যে ভগবান স্বয়ং সময়ে সময়ে ভক্তের কাছে নানা ছদ্মবেশে উপস্থিত হন।যাইহোক, এই কপালী মিলন পালাটি সম্পূর্ণ নূতন ; অন্য কোথায়ও এটি প্রকাশিত হয়েছে বলে জানি না। কিন্তু নাপিতানী মিলন একটি পুরোনো পালা। বিষয়বস্তু আর কিছুই না ; শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য নাপিতানী সেজেছিলেন।বিষয়বস্তু পুরাতন হলেও, এই পালাটি সম্পূর্ণ নূতন।নাপিতানী মিলন স্বয়ং দৌত্যের পদ হিসাবে চন্ডীদাসের ভণিতায় পদকল্পতরুতে পাওয়া যায় (তৃতীয় শাখা প্রথম পল্লব)। এই পদগুলি নীলরতন বাবুর সম্পাদিত "চন্ডীদাস" গ্রন্থেও আছে।কিন্তু নিম্নধৃত পদগুলির সঙ্গে তার একটি পদেরও মিল নাই। পদকল্পতরু ও চন্ডীদাস গ্রন্থের নাপিতানী মিলনের ব্যাপার সংক্ষেপে এই= একদিন রসিক চূড়ামণি নাপিতানীর বেশ ধরে অন্দর মহলে প্রবেশ করলেন এবং নাপিতানী পরিচয় দিয়ে শ্রীমতীকে অলক্তক (আলতা) পরালেন।নায়ক কর্তৃক নায়িকার চরণে অলক্তক পরানো ব্যাপার পুরাতন কাব্যরসে অপরিজ্ঞাত বা অজানা নহে।*
*🌷বিবুধৈরসি যস্য দারুণৈরসমাপ্তে পরিকর্মণি স্মৃতঃ।*
*🌷তমিমং কুরু দক্ষিণেতরং চরণং নির্মিত রাগমেহি মে।।*
*(কুমার সম্ভব ৪র্থ সর্গ)*
*🔴যথারীতি যাবক (আলতা) পরিয়ে ধারে ধারে শ্যামচন্দ্র নিজের নাম লিখে দিতে ভুললেন না। কিন্তু নাপিতানী তার পারিশ্রমিক চেয়ে বড় গন্ডগোল করে বসলেন।সখী এসে বললেন যে,নাপিতানী অপেক্ষা করছে সে বেতন (পয়সা) না পেলে যাবে না।শ্রীমতী তখন তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন সে কত পয়সা চাহে?তার উত্তরে চতুর শিরোমণি রসিকশেখর জানিয়ে দিলেন যে, তিনি রাধিকার স্পর্শ-সুখের প্রার্থী।এটিই নাপিতানী মিলনের কাব্যরস। দুইটি পদে এই চিত্রটি অঙ্কিত হয়েছে।তারমধ্যে একটি পদ দ্বিজ চন্ডীদাসের অন্যটি চন্ডীদাসের ভণিতায় পাওয়া যাচ্ছে।অথচ এই পদগুলি দীন চন্ডীদাসের বলে দাবী করা হচ্ছে।*
*☘নিম্নের দশটি পদের মধ্যে আটটি চন্ডীদাসের ও একটি দীন চন্ডীদাসের ভণিতায়।এই পালার মর্ম নায়ক নাপিতানীর বেশে মহলে প্রবেশ করে শ্রীমতীকে যাবক পরাচ্ছেন।(ঠিক কি ভাবে তিনি প্রবেশ করেছেন,তা জানা যায় না।গোড়ায় পদগুলি পাওয়া যাচ্ছে না)।নিপুণ শিল্পীর মত তিনি আলতা পরাতে পায়ে নানা লতাপাতা, হংস,মীন প্রভৃতির চিত্র এঁকে দিচ্ছেন। শ্রীমতী অলসের ভরে অনঙ্গমঞ্জরী নামা সখীর অঙ্গে হিলন দিয়ে ঘুমালেন।সখীগণ তাঁকে শীতল চামর দিয়ে ব্যজন করতে লাগলেন।নিদ্রাভঙ্গে রাধিকা পদে বিচিত্র চিত্রাঙ্কন দেখে ভীষণ আনন্দিত হলেন।তখন তিনি নিজের গলার মণিময় হার খুলে নাপিতানীর কন্ঠে পরিয়ে দিলেন।*
*🌷নবিন কিসোরি,রাজার কুমারি,*
*হার লঞা নিজকরে।*
*নাপিতানী গলে, দিয়া কুতূহলে,*
*মনের আনন্দ সরে।।*
*(পদকর্তার পদের ভাষা লিখিলাম)*
*🌻(মন সরে,মনের সরে,সুখের সরে,মনের আনন্দ সরে, এই কবির কবিতায় অনেক ব্যবহৃত দেখা যায়। দীন চন্ডীদাসের পদাবলী ৩৮৫--৩৮৮ পৃঃ দ্রষ্টব্য)।নাপিতানী মালা উপহার পেয়ে খুশী হল।তখন সে বলল যে,যদি ও সে নীচ ও দরিদ্র,তথাপি তার মনে সাধ হচ্ছে যে, সে কিছু প্রতিদান দেয়।শ্রীমতীর সম্মতি পেয়ে ছদ্মবেশী কৃষ্ণচন্দ্র নিজের কন্ঠের হেমময় হার তাঁর গলায় পরিয়ে দিলেন।তখন শ্রীমতী রাইধনী বুঝলেন এ আর অন্য কেউ নয়, রসিকচূড়ামণি শ্রীকৃষ্ণই বটে।*
*🌷পরশে জানিল কপট কান,*
*🌷কত ভেল তার অমিয় স্নান,*
*🌷জানল হৃদয় ভিতর আন,*
*🌷দোঁহে দোঁহা ভেল ভোরিতে?*
*🌹এই পদগুলিতে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করবার আছে।*
*🍀(১)পদগুলিতে ক্রমিক সংখ্যা =৩১১ হতে ৩২২।মাঝের কয়েকটি পদ (৩১৫-৩১৭) নাই ; দীন চন্ডীদাসের ভণিতাযুক্ত পদটিতে ক্রমিক সংখ্যা নাই।তাহলেও দীন চন্ডীদাসের পদাবলীই ক্রমিক সংখ্যার দ্বারা নির্দিষ্ট। বতর্মান ছোট পুথিতেও ক্রমিক সংখ্যা ধরে দেওয়া আছে।এই জন্যই পদগুলি দীন চন্ডীদাসের বলেই মনে হয়।*
*🌳শ্রীযুক্ত মণীন্দ্রমোহন বসু মহাশয় সম্পাদিত দীন চন্ডীদাসে এই ক্রমিক সংখ্যাগুলি নাই।তাঁর গৌণরাসের (? স্বয়ং দৌত্য) পদগুলি আরম্ভ হয়েছে,১০৪৫ হতে। পুথিতে তিনি ১০৪৫ হতে ১০৫১ পদ পেয়েছেন, কিন্তু তার পরে ২০ টি পদ তিনি অন্যত্র হতে সংকলন করে নষ্ট বা ফাঁকা পদগুলির জায়গা পূরণ করেছেন। কারণ তাঁর পাওয়া পুথিতে ১০৫১ পদের পরেই ১০৮০ পদ রয়েছে।কাজেই বুঝা যায় যে,২৮টি পদ পাওয়া যাচ্ছে না।মণীন্দ্রবাবুর ১০৫১ পদে তৈল হরিদ্রা সহ নায়কের ছদ্মবেশ গ্রহণের সঙ্কেত হওয়া সঙ্গত।*
*কিন্তু আমার এ পুথিতে ক্রমিক সংখ্যা ১১১ হতে আরম্ভ।অথচ দীন চন্ডীদাসের অন্য পালার পদ আমার এই পুথিতে ২৬৪০ পর্য্যন্ত পাচ্ছি। (মণীন্দ্রবাবু ২০০১ পর্য্যন্ত সন্ধান পেয়েছেন)।এ পুথিটি মোটেই বড় নয়। পৃষ্ঠাঙ্ক ১২ ; এখনকার খাতার মত করে মাঝে সেলাই করা। এখানে সমস্যা এই যে,মণীন্দ্রবাবুর পালা যদি দীন চন্ডীদাসের হয় তবে এ আবার কোন চন্ডীদাসের? একই চন্ডীদাস দুইটি স্বতন্ত্র পালা একই বিষয়ে লিখবেন এটি অসম্ভব না হলেও ক্রমিক সংখ্যার দ্বারা বিধিত হচ্ছে।*
*(২) দীন চন্ডীদাসের কাল অভ্রান্ত ভাবে নির্ণয় করা যায় নাই।মণীন্দ্রবাবু তাঁর পুস্তকে শুধু এইমাত্র বলেছেন যে,দীন চন্ডীদাস শ্রীচৈতন্যের পরবর্তী কালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই ধারণার হেতু এই যে দীন চন্ডীদাসের পদে চৈতন্যপ্রভাব লক্ষিত হয় এবং উজ্জ্বল নীলমণি বিদগ্ধ মাধব প্রভৃতি গ্রন্থের প্রভাবও সুস্পষ্ট। আমার এই পুথিতে স্পষ্টভাবে ১০৯৪-৯৫ সন (বাংলা) লিখিত আছে।অতএব দীন চন্ডীদাস ২৫০ বৎসর আগেই বর্তমান ছিলেন, এটিই সিদ্ধ হয়।ঠিক কত আগে তা অবশ্য বলা যায় না।*
*(৩)২৫০ বৎসর পূর্বের বৈষ্ণব কবি গৌরচন্দ্রিকা সম্বন্ধে একটিও পদ লেখেননি,এরই বা কারণ কি ; মণীন্দ্রবাবু বলেন, হয়ত লিখেছিলেন, কিন্তু সেগুলি সমস্তই হারিয়ে গেছে।এ শুধু অনুমান ছাড়া আর কিছুই না। আমার এই সংগ্রহে গৌরচন্দ্রিকা আছে কিন্তু চন্ডীদাসের ভণিতায় নহে।সংগ্রহকর্তা কি চন্ডীদাসের একটিও গৌরচন্দিকা সংগ্রহ করতে পারলেন না? এর কারণ কি? নীলরতন বাবুর সংগৃহীত চন্ডীদাস গ্রন্থে দীন চন্ডীদাসের অন্যুন ৩৪ টি পদ রয়েছে।এর মধ্যে একটিও গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদ নেই। আমার এই র্সগ্রহে আছে।এটি হতে এ অনুমান অসঙ্গত হয় কি যে দীন চন্ডীদাসগৌরচন্দ্রিকার ধার ধারেননি? যদি তাই হয়, তাহলে শ্রীচৈতনের প্রভাবযুক্ত চন্ডীদাস নামাঙ্কিত পদ দেখলেই যে তা আমরা দীন চন্ডীদাসের বলে সিদ্ধান্ত করব এরকম যুক্তি কখনও সমীচীন হতে পারে না।যে কবি চৈতন্যের প্রভাবপুষ্ট, তাঁর পক্ষে শ্রীগৌরাঙ্গ সম্বন্ধীয় গীত রচনা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক।এমন হওয়া খুবই বিচিত্র যে,তাঁর রচিত একটিও গৌরচন্দ্রিকা আজ পর্য্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি! অথচ তিনি শ্রীচৈতনের ভাবধারায় সুস্নাত বা ডুবে ছিলেন।বাঁকুড়ায় এক সময়ে যে শ্রীচৈতন্যবর্জিত সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় হয়েছিল,তাদেরকে সহজিয়াই বলি বা যে নামেই অভিহিত করি,তাও অমূলক অনুমান নয়।*
*(৪)দীন চন্ডীদাস ও দ্বিজ চন্ডীদাস যে অভিন্ন ব্যক্তি,এরকম অনুমানও যুক্তিসহ নহে।শ্রীযুক্ত মণীন্দ্রবাবু যে পুথি হতে দীন চন্ডীদাসের পদাবলী প্রকাশ করেছেন তাতে একটি জায়গাতেও দ্বিজের উল্লেখ নেই।নীলরতন বাবুর গ্রন্থে দ্বিজ ও দীন উভয়ই বিদ্যমান।*
*বাঁকুড়ার এই একটি পুথিতেও (বিমলাপ্রসাদ বাবুর) দ্বিজের নাম পাচ্ছি না। যদি দীনের পদের মধ্যে দ্বিজের এ দ্বিজের পদের মধ্যে দীনের পদ থাকত,তাহলে লেখকের অনবধানতার দোহাই দিয়ে ইনাদের একাত্মতা প্রমাণ করা যেতেও পারত। কিন্তু যতগুলি পদ পাওয়া গিয়েছে,তাতে দীন চন্ডীদাসকে দ্বিজ হতে আলাদা ব্যক্তি মনে না করে উপায় নাই।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙌🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪৩. বিদ্যাপতি 🌼 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪৩) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*🌻🌻বিদ্যাপতি🌻🌻*
************************
*🌺দ্বারভাঙ্গা জেলার অন্তর্গত বিসপী গ্রামে বিদ্যাপতির নিবাস ছিল।বিদ্যাপতির পূর্বপুরুষগণ সকলেই পন্ডিত ও বিষয়-কর্মে পটু ছিলেন।পূর্বে অনেকের ধারণা ছিল যে বিদ্যাপতি বাংলা দেশেরই লোক, কিন্তু রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ১২৮২ সালের বঙ্গদর্শনে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন তাতেই প্রথম প্রচারিত হল যে,বিদ্যাপতি ঠাকুর বাংলার লোক নন,মিথিলার লোক। বিদ্যাপতির সময় নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে।বিদ্যাপতির সময় সম্বন্ধে প্রথম প্রমাণ বিসপীর দানপত্র।এই দানপত্রে উল্লিখিত হয়েছে যে,মহারাজ শিবসিংহ বিদ্যাপতির কবিত্বে তুষ্ট হয়ে বিসপী গ্রামটি তাঁকে দান করেন।এই দানপত্রের তারিখ ২৯৩ লসং অর্থ্যাৎ লক্ষ্মণ সংবৎ।মিথিলায় সে সময় লক্ষ্মণ সংবৎ প্রচলিত ছিল।তার কারণ এই যে,তৎকালে মিথিলা বঙ্গদেশের অন্তর্গত বলে পরিগণিত হ'ত।দ্বারবঙ্গ কথাটিও এই অনুমান সমর্থন করে। যাইহোক,পন্ডিতগণের গণনা অনুসারে লক্ষ্মণ সেন ১১১৯ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুতরাং ২৯৩ লসং ১৪১২ খ্রীষ্টাব্দ দাঁড়াচ্ছে।কিন্তু মিথিলার রাজপঞ্জী অনুসারে শিবসিংহ ১৪৪৬ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন।দানপত্রে তিনি দিগ্বিজয়ী মহারাজ বলে অভিহিত হয়েছেন। তাহলে দানপত্র অনুসারে শিবসিংহ রাজা হবার অন্ততঃ ৩৪ বৎসর পূর্বে বিদ্যাপতিকে বিসপী দান করেন! সুতরাং রাজপঞ্জীর সময় সঙ্কেতে গোলযোগ আছে। এ ছাড়া দানপত্র যে জাল তা প্রমাণিত হয়েছে।দানপত্রে লসং ছাড়া আরও তিনটি অব্দের উল্লেখ আছে। যথা=শকাব্দা,সংবৎ ও হিজরি সন।এখন হিজরি সন আকবরের সময়ে এদেশে প্রচলিত হয়।বিদ্যাপতির অনেক পরে। কাজেই "দানপত্র" জাল না বলে উপায় নাই।হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় এক প্রবন্ধে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছিলেন যে,দানপত্র জাল না হতেও পারে ; শুধু হিজরি সনটি পরবর্তী কালে যোজনা।আকবরের সময়ে যখন সমস্ত ভারতবর্ষ রাজা টোডরমল্ল কর্তৃক জরিপ হয় তখন সম্ভবতঃ প্রমাণকে দৃঢ়তর করবার জন্য বিদ্যাপতির কোনও বংশধর হিজরি সনটি জুড়ে দিয়ে থাকবেন। এই রকম যুক্তির মধ্যে সারবেত্তা অপেক্ষা চাতুর্যই বেশী প্রশংসার্হ।সে যাইহোক,দানপত্রের প্রমাণিকতার উপর নির্ভর করে কোনও কথা বলা চলে না।*
*☘সন-তারিখ সম্বন্ধে যাইহোক, মিথিলার রাজপঞ্জীতে শিবসিংহ এবং বিদ্যাপতি উভয়েরই পরিচয় পাওয়া যায়। রাজপঞ্জী প্রবর্তিত হয় ১২৪৮ শকে।বিদ্যাপতি নিজহাতে বঙ্গাক্ষরে শ্রীমদ্ভাগবত নকল করেছিলেন।এই নকল ৩০৯ লসংয়ে সম্পূর্ণ হয়। এ সময়ে প্রাচীন মৈথিলগ্রন্থ সমূহ বঙ্গাক্ষরেই লিখিত হ'ত।বিদ্যাপতির আদেশক্রমে একজন পন্ডিত কাব্যপ্রকাশের টীকা নকল করেছিলেন লসং ২০১ (১৪২০)। বিদ্যাপতি রচিত লিখনাবলী সমাপ্ত হয় ১৪১৮ খৃষ্টাব্দে।বিদ্যাপতি "দূর্গাভক্তিতরঙ্গিণী" রচনা করেন রাজা নরসিংহদেবের রাজত্ব কালে।তিনি ১৩৯৫ শকে সিংহাসনে আরোহণ করে ছয় বৎসর রাজত্ব করেন বলিয়া জানা যায়।🔴রায় বাহাদুর শ্যামনারায়ণ সিংহ বলেন যে,বিদ্যাপতি বৃদ্ধ বয়সে মিথিলার রাজা ধীরসিংহের সময় দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণী রচনা করেছিলেন। Histori of Tirhoot. দূর্গাভক্তির প্রারম্ভে যে শ্লোক আছে,তা দেখে মনে হয় নরসিংহদেবের রাজত্বকালে রাজকুমার রূপনারায়ণের আদেশে এই গ্রন্থ রচিত হয়। নরসিংহদেবের তিন পুত্র।ধীরসিংহ,ভৈরবসিংহ ও রূপনারায়ণ।*
*🌻নবদ্বীপের স্মার্ত রঘুনন্দন তাঁর দূর্গোৎসব-তত্ত্বে দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণীর উল্লেখ করেছেন।রঘুনন্দন শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক ছিলেন। দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণী বিদ্যাপতির শেষ গ্রন্থ ; ইঁনার রচনাকাল সম্ভবতঃ ১৪৭৫ খৃষ্টাব্দে বা তার কাছাকাছি কোন সময়।বিদ্যাপতির জন্ম যদি ১৩৫০ খৃষ্টাব্দে ধরা যায় (নগেন্দ্র নাথ গুপ্ত ) বা ১৩৫৮ খৃষ্টাব্দ হয় (দীনেশচন্দ্র সেন) তাহলে দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণী রচনার সময় তাঁর বয়স একশ বৎসরের বেশী হয়ে পড়ে? এইরকম বৃদ্ধ বয়সে দূর্গাভক্তির মত প্রগাঢ় পান্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ লেখা সম্ভবপর বলে মনে হয় না।পরন্তু বিদ্যাপতির জন্থ যদি ১৩৯০ খৃষ্টাব্দ বলে ধরে যায়,তাহলে তাঁর তরুণ বয়সে বিসপী পেয়েছিলেন (২৯৩ লসং=১৪১২ খৃঃঅঃ)।ভাগবতের নকল ও পরিণত বয়সে দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণী লেখা, এই সবের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য রক্ষা করা সহজ হয়।*
*🍀বিদ্যাপতি বহুদিন জীবিত ছিলেন একথা সত্য এবং অদ্বৈতাচার্য্যের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল,এরকমও প্রমাণ আছে।ঈশান নাগর কৃত "অদ্বৈত প্রকাশে" ইঁনার বর্ণনা আছে। কিন্তু ঐ গ্রন্থ কতদূর প্রামাণিক তা বলা যায় না। বিদ্যাপতি যে চন্ডীদাসের সমকালে জীবিত ছিলেন,এরকম ধারণার পরিপোষক কতগুলি পদ পদকল্পতরু গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।পদকল্পতরুর সংকলয়িতা বৈষ্ণবদাস প্রায় ২৫০ বৎসর পূর্বে বতর্মান ছিলেন ; কাজেই তাঁর সংগৃহীত পদাবলী কেউ কেউ প্রামাণিক বলে মনে করেন। কিন্তু ঐ পদাবলীগুলি বিশ্লেষণ করলে বুঝতে দেরী হবে না ঐ গুলি কোনও পরবর্তী কবি কল্পনার সাহায্যে গ্রথিত করেছেন।(প্রবাসীতে আমার লিখিত প্রবন্ধ "দীন চন্ডীদাস" দ্রষ্টব্য)। বিদ্যাপতির পদাবলী যে শ্রীচৈতন্য আস্বাদন করতেন এবং তাঁর অল্প পরবর্তী মহাকবি গোবিন্দ দাস যে প্রশস্তির মালা গেঁথে বিদ্যাপতির উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য দিয়েছিলেন, এটিও বিদ্যাপতির প্রাচীনত্বের প্রমাণ বটে।গোবিন্দ দাসের বন্দনা=*
*🌷বিদাপতি পদ যুগলসরোরুহ,*
*নিস্যন্দিত মকরন্দে।*
*🌷তছু মঝু মানস মাতল মধুকর,*
*পিবইতে করু অনুবন্ধে।।*
*🌻🌻🌻বিদ্যাপতির ভাষা🌻🌻🌻*
*🌺বিদ্যাপতি ছিলেন মিথিলার মানুষ।কাজেই তিনি তাঁর মাতৃভাষা মৈথিলেই পদাবলী রচনা করেছেন, এইরকম ধারণায় স্বাভাবিক। কিন্তু এই মৈথিল কোকিলের ভাষা অনেক সময়ে মৈথিল ভাষার ব্যাকরণ ও রীতি রক্ষা করেনি দেখা যায়।হিন্দি, বাংলা ও মৈথিলীর সংমিশ্রণে তাঁর ভাষা এক নূতন রূপ পরিগ্রহ করেছে।বিদ্যাপতির সুবিখ্যাত সমালোচক ও সম্পাদক নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর কৃত সংস্করণে বিদ্যাপতির পদের মৈথিল রূপ আবিস্কার করবার চেষ্টা করে অনেক জায়গায় হাস্যাস্পদ হয়েছেন।যথা=*
*🌷জাইতে পেখলুঁ নাহলি গোরি।*
*🍀পদটিতে বিদ্যাপতি সদ্যস্নাতা গমনশীলা রাধার বর্ণনা করেছেন।ইঁনার ছন্দও কৃতস্নানা রমণীর গমনের ঝঙ্কার তুলেছে। কিন্তু নগেন্দ্র বাবু ইনাকে মৈথিল রূপ দিতে গিয়ে যা করেছেন তা ছন্দের দিক দিয়ে আদৌ শ্রুতিমধুর হয়নি।*
*🌷জাইত পেখল নহাএলি গোরি*।
*🌻এরকম বিভ্রাটের বহু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।নগেন্দ্র বাবু কতগুলি বাংলা পদকেও মৈথিলে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেছেন। অথচ সে পদগুলি যে আদৌ বিদ্যাপতির নহে এটি একরকম সর্ববাদিসম্মত।*
🦚🦚🦚🦚🦚🦚🪔🦚🦚🦚🦚🦚🦚
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪৪. বিদ্যাপতি 🌷 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪৪) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*🌻🌻বিদ্যাপতি🌻🌻*
^*^*^*^*^*^*^*^*^*^*^*^*^
*🍀বিদ্যাপতির মৈথিল পদ যে লিপিকার ও গায়কের হাতে পড়েছে,এটি কেবল নগেন্দ্রবাবুর মত নহে ; আরও অনেক বিজ্ঞ পন্ডিত এরকম মত পোষণ করেন। অনেক পন্ডিত মনে করেন যে সেই যুগে বাংলাদেশ হতে ছাত্রেরা ন্যায়শাস্ত্র পড়বার জন্য মিথিলায় যেত ; সেইসব বাঙ্গালী ছাত্র বিদ্যাপতির পদ শিখে আসিত।তারা মৈথিল ভাষা ভাল ভাবে আয়ত্ত করতে না পারার ফলে নানা ভুল ভ্রান্তি ঘটিয়েছে।তাদের ভুলের জন্য বাংলাদেশে বিদ্যাপতির পদ অশুদ্ধ আকারে প্রচারিত হতে থাকে।তারই জন্য বিদ্যাপতির ভাষায় গোলযোগ ঘটেছে। অর্থ্যাৎ অনেক পদে খাঁটি মৈথিলরূপ পাওয়া যায় না। এখানে বিচার্য্য এই যে,ন্যায়শাস্ত্রের মেধাবী ছাত্রেরা অর্থ্যাৎ তাদের মধ্যে যারা সঙ্গীতানুরাগী ছিল তারা যে ভুল করেই গান শিখবে, এরকম মনে করবার কি কারণ আছে?তারপর সে সময়ে বাংলা ও মিথিলা একই প্রদেশ বলে পরিগণিত ছিল।দ্বারবঙ্গ কথাটি তার প্রমাণ। সুতরাং একজন ভুল করে একটি ভাষা শিক্ষা করলে অন্যের দ্বারা তা সংশোধিত হবার বাধা ছিল না। কিন্তু তা না হয়ে কতগুলি অর্বাচীন ছাত্র যেমন বিদ্যাপতির গান ভুল করে প্রচার করল,অমনি সারা বাংলাদেশ সেই ভুল চিরস্থায়ী করে নিল?শুধু তাইই নয়, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিগণ সেই ভুল ভাষার অনুকরণ করে অনবদ্য কবিতা লিখতে আরম্ভ করলেন, এরকম মত যুক্তিসহ বলে বোধ হয় না।বাঙ্গালীরাই যে বিদ্যাপতির ভাষা বিভ্রাটের জন্য দায়ী,এটিও একশ্রেণীর সমালোচকের অভিমত।মৈথিল কবিকে আমরা বাঙ্গালীর সাজ-পোষাক পরিয়েছি,একথা দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় তাঁর অভ্যস্ত পরিহাস প্রিয়তার ভঙ্গীতে বলেছেন।আমরা অর্থ্যাৎ বাঙ্গালীরা,বিদ্যাপতির কুর্তাপাগড়ী খুলে ধুতি চাদর পরিয়েছি।অবশ্য সব প্রাচীন কবির বেলা যা ঘটেছে,বিদ্যাপতির বেলাও তার অন্যথা হয়নি,হয়ত কিছু কম-বেশী মাত্রায় ঘটেছে--, অর্থ্যাৎ গায়ক এবং লিপিকার অনেক সময়েঅর্থ না বুঝতে পেরে বিকৃত পাঠ ঘটিয়েছে। কিন্তু সমস্ত গায়ক এবং লিপিকার যে ষড়যন্ত্র করে বিদ্যাপতির ভাষাকে বিকৃত করেছে,এটি বিশ্বাস করা কঠিন। মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশই বিদ্যাপতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।একথা নগেন্দ্রবাবুও স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশে বিদ্যাপতির শত শত পদ পাওয়া যায় কিন্তু "গ্রীয়ার্সন সাহেব" অক্লান্ত অধ্যবসায় সত্ত্বেও ৮২টি মাত্র পদ মিথিলা হতে সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন।নগেন্দ্রবাবুই বলেছেন যে মিথিলার লোক বিদ্যাপতির কোনও সংবাদই রাখতেন না।অবশ্য পরে দ্বারভাঙ্গার মহারাজার অর্থব্যয়ে বিদ্যাপতির পদাবলী প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সে পদাবলীও নগেন্দ্রবাবুর সংগ্রহের ছায়া মাত্র বললেই চলে।অথচ বাংলাদেশ বিদ্যাপতির গানে মুখরিত।সেই নগেন্দ্র বাবুই পাঠ বিকৃতির জন্য বাঙ্গালীকে দায়ী করেছেন।এদেশের বৈষ্ণবেরা ভেঙ্গে-চুরে, গড়ে-পিটে,এক রকম করে নিয়েছেন। কিন্তু কথা এই যে পদকল্পতরু,পদামৃত সমুদ্র,কীর্ত্তনানন্দ প্রভৃতি সংগ্রহ গ্রন্থে বিদ্যাপতির বহু পদ সংগৃহীত হয়েছে।তাঁরা সকলেই এক রকমের ভুল করলেন কেন?ইঁনাদের সংগৃহীত পদের ভাষায় অবশ্য কিছু পাঠভেদ আছে বটে, কিন্তু মোটের উপর বলা যায় যে অজ্ঞতা বশতঃ ইঁনারা বিদ্যাপতির পদকে এমন বিকৃত করেননি যাতে ঐ পদ বিদ্যাপতির বলে চিনতে পারা কঠিন হয়।*
*🌳পদাবলীই বিদ্যাপতির একমাত্র রচনা নহে। বিদ্যাপতি একাধিক ভাষা অত্যন্ত নিপুণতার সহিত ব্যবহার করেছেন।তাঁর প্রথম গ্রন্থ "কীর্তিলতা" ও কীর্তিপতাকায় তিনি এক মিশ্র ভাষার ব্যবহার করেছেন।সংস্কৃত ও প্রাকৃত মিশ্রিত এই ভাষাকে তিনি "অবহট্ট" নাম দিয়েছেন।অবহট্ট বোধ হয় অপভ্রষ্ট শব্দ হতে এসেছে। বিদ্যাপতি "পুরুষ পরীক্ষা " লিখনাবলী,গঙ্গা-বাক্যাবলী, দান-বাক্যাবলী,শৈবসর্বস্বহার, দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণী প্রভৃতি গ্রন্থ সংস্কৃতে রচনা করেছিলেন।তাঁর রচিত "ভূ-পরিক্রমা" বোধহয় ভ্রমণ বৃত্তান্ত রচনার প্রথম চেষ্টা।বলরাম শাপগ্রস্ত হয়ে কাশী, কোশল, প্রয়াগ প্রভৃতি তীর্থ পর্য্যটন করছেন এই ভঙ্গীতে লেখা।দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণী তাঁর শেষ গ্রন্থ।নবদ্বীপের প্রসিদ্ধ স্মার্ত্ত রঘুনন্দন তাঁর দূর্গোৎসবতত্ত্বে দূর্গাভক্তি তরঙ্গিণীর উল্লেখ করেছেন একথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু এইসব গ্রন্থ গ্রন্থকারকে অমরত্ব প্রদান করতে পারে নাই।বিদ্যাপতি অমর হয়েছেনতাঁর পদাবলীতে।এ পর্য্যন্ত বিদ্যাপতির যত পদাবলী আবিস্কৃত হয়েছে, বোধহয় আর কোনও বৈষ্ণব কবি তত পদ লেখেন নাই।তাঁর এই পদাবলী গীতছন্দে রচিত।বস্তুতঃ শ্রীজয়দেবের পরে মিথিলায় তিনিই এ বিষয়ে পথ-প্রদর্শক।চন্ডীদাস বাংলাদেশে বসে যা করেছেন,বিদ্যাপতি মিথিলায় অক্লান্ত পরিশ্রমে সেই একই কাজ করেছেন অর্থ্যাৎ অসংখ্য গীতরচনা।চন্ডীদাস বিদ্যাপতির সাক্ষাতের যে প্রবাদটি আছে,তা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে অনেকেরই মত। সুতরাং আমরা সময়ের পারম্পর্য সম্বন্ধে জটিল প্রশ্ন উত্থাপন না করেও এখানে বলতে পারি যে,এই উভয় কবি স্বাধীনভাবে নিজ নিজ প্রতিভা-বলে একই শ্রেণীর গীতরচনা করতে প্রাণোদিত হয়েছিলেন। কিন্তু ইঁনাদের পূর্বে এই গীতের কোনও ধারা আমরা দেখতে পাই না, হয়ত বিস্মৃতির বালুকায় সে ধারা লুপ্ত হয়ে গিয়েছে।তাহলে বলতে হয় যে,ইঁনাদের সামনে কোনও আদর্শ ছিল না।বিদ্যাপতি এই পদাবলী রচনা করতে গিয়ে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছিলেন যে দেশের হৃদয়ের উপর দিয়ে কি ভাবের ঢেউ বইছে!দেশ-অর্থে মিথিলায় চতুঃসীমা মাত্র বুঝাত না। বতর্মান বাংলা,বিহার, উড়িষ্যা এবং আসাম সর্বত্রই বৈষ্ণবধর্ম প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এটি আদৌ অসম্ভব নয় যে সেইসময় বৃহত্তর মিথিলার জন্যই বিদ্যাপতির গীত রচিত হয়েছিল।সে বৃহত্তর মিথিলায় প্রতিবাসী বাংলাদেশের কতকাংশ এবং হিন্দীভাষী বিহারের কতকাংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল,এটি খুবই সম্ভবপর। উত্তরকালে এই ভাববন্যার ফলে শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব। উত্তর ভারতের উপর দিয়ে এই যে ভাব প্রবাহ হয়েছিল,তারই প্রভাবে উত্তর পশ্চিমে বল্লভাচার্য্য,সূরদাস, উড়িষ্যায় রামানন্দ রায়, আসামে শঙ্করদেব প্রভৃতির প্রাদুর্ভাব।এইসব জায়গার মধ্যে সাংস্কৃতির মিলনের সূত্র কিরকম ছিল তার ইতিহাস আমরা সম্যক্ না জানলেও এটি নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে,ইংরেজ আমলে প্রদেশ হতে প্রদেশের যে কৃষ্টিগত ব্যবধান, তা সে সময়ে ছিল না।সেইজন্য বিদ্যাপতি যখন গীত রচনা করতে রত হলেন,তখন তিনি "দেশী" ভাষায় প্রকাশের বাহনস্বরূপে ব্রবহার করলেন।দেশী ভাষার মত মিষ্ট ভাষা আর নেই।*
*🌷দেসিল ভাষা সবজন মিঠঠা।*
*🌷তে তৈসন জম্পও অবহঠঠা।*
*(জম্প-ও-জল্পনা করি)*
*🌻আমাদের কবিও বলেছেন=*
*🌷নানান্ দেশের নানান ভাষা।*
*🌷বিনা স্বদেশী ভাষা মিটে না আশা।?*
*🌹গানের ভাষা শুধু যে দেশী হবে তা নয় ; এটি সরল ও সুখবোধ্য হওয়া আবশ্যক। পান্ডিত্যপূর্ণ কট-মট ভাষায় কবিতা রচিত হতেও পারে, কিন্তু গানে এরকম ভাষা অচল। সুতরাং আমরা বুঝতে পারি বৈষ্ণব কবিতায় অন্যতম পদপ্রদর্শক, নিপুণ স্রষ্টা বিদ্যাপতি কেন এমন সুমধুর সহজ সরল ভাষায় পদরচনা করতে রত হয়েছিলেন।তাঁর অনেকগুলি পদে খাঁটি মৈথিল ভাষার শব্দকোষ হতেই কেবল তাঁর গীতের শব্দ-সম্পদ আহরণ করেছিলেন।এখনও মিথিলার কোনও কোনও অংশে বাংলা মিশ্রিত মৈথিল ভাষা ব্যবহৃত হয়, একথা বহু ভাষাবিৎ "গ্রীয়ার্সনই " বলেছেন।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🌹🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪৫. বিদ্যাপতি 🌷 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪৫)⚪বৈষ্ণব রস-সাহিত্য⚪*
*🔷🔷বিদ্যাপতি🔷🔷*
∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆
*🍀বিদ্যাপতির শ্রোতৃমন্ডল অল্প পরিসর ভূমিতে নিবদ্ধ ছিল না। বৈষ্ণবভাব বিভাবিত বাংলা ও উত্তর-পশ্চিমও তাঁর দৃষ্টি-পরিধির বাইরে ছিল না,এরকম মনে করা অসঙ্গত নহে। এর সর্বাপেক্ষা মূল্যবান প্রমাণ বাংলার বৈষ্ণব কবিগণই যোগায়েছেন গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস,বলরাম দাস প্রভৃতি বহু বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির সুমিষ্ট ভাষা আয়ত্ত করে তাতেই গীতরচনা করতে মনোনিবেশ করেছিলেন।নগেন্দ্রগুপ্ত মহাশয় ঠিকই বলেছেন যে, পৃথিবীর অন্য কোনও কবির এত অনুকরণ হয় নাই যত অনুকরণ হয়েছিল বিদ্যাপতির, আমাদের বাঙ্গালী কবির ভাষাতে সাধারণতঃ ব্রজবুলি নামে আখ্যাত করা হয়। এটি যে বিদ্যাপতির অনুকৃতি, সে সম্বন্ধেও সন্দেহ নাই। কিন্তু আমরা এক ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে মনে করে বসে আছি যে,এই ব্রজবুলি বাঙ্গালীরই সৃষ্ট এক কেতাবী ভাষা এবং এটি বিদ্যাপতির মৈথিলীর ভ্রান্ত অনুকরণ। বস্তুতঃ আমাদের শ্রেষ্ঠ কবিগণের প্রতি এটি অপেক্ষা অধিকতর অবিচার কল্পনা করা যায় না।এইসব কবি একাধারে অপূর্ব কবি-প্রতিভা সম্পন্ন ও পান্ডিত্য-মন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন।তাঁরা বিদ্যাপতির অনুকরণ করতে গিয়ে ভুলের বোঝা বহে আনবেন,এরকম কল্পনা অসঙ্গত বলেই মনে হয়।এইসব প্রগাঢ় পান্ডিত্য মন্ডিত ব্যক্তি মৈথিলের ভ্রান্ত অনুকরণ করে তাতে এমন সুন্দর কবিতা রচনা করবেন,এটি কোনও মতে বিশ্বাস করা যায় না।বিশেষ করে এই অনুকরণ বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উড়িষ্যায় রায় রামানন্দ,গোবিন্দদাস প্রভৃতির আগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন এটি স্মরণ রাখা প্রয়োজন। বিদ্যাপতির ভাষায় যে উদারতা দেখতে পাই,তা দেশকাল পাত্রের বিবেচনা ব্যতিরেকে বুঝতে পারা যাবে না। স্কটল্যান্ডের কবি বার্ণস (Burns) যেমন তাঁর প্রাদেশিক ভাষায় কবিতা লিখেছিলেন, বিদ্যাপতির মত সৃষ্টিকুশল প্রথম শ্রেণীর কবি যে তাইই করবেন,এরকম অনুমান সমর্থনযোগ্য নহে।*
*☘বিদ্যাপতির যে কয়েকটি পদ গ্রীয়ার্সনের মারফতে আমরা পেয়েছি, তার মধ্যে এমন কতগুলো পদ আছে যা ব্রজবুলি হতে বহুদূরে নহে।এটি বিদ্যাপতির "মুখবন্ধে" আমি বলতে চেষ্টা করেছি।তার পর নগেন্দ্রবাবু যে দুইটি পুথি দেখে তাঁর পদাবলী সংগ্রহ করেছিলেন, তার মধ্যে একটি পুথি নেপালে পাওয়া যায়,অন্যটি (তালপত্রের পুথি) মিথিলার অন্তর্গত তরৌনী গ্রামে তিনি পেয়েছিলেন।প্রবাদ আছে যে,এই পুথিটি বিদ্যাপতির পৌত্রের লেখা।সে যাইহোক, এই দুইটি পুথিতে বহু পদ পাওয়া যায় যা গোবিন্দদাস বা বলরাম দাসের ব্রজবুলি পদ হতে ভিন্ন লক্ষণাক্রান্ত নয়। বিদ্যাপতির প্রায় দুইশ কি আড়াইশ বৎসর পরে মিথিলার লোচন কবি "রাগতরঙ্গিণী" নামে একটি সঙ্গীত গ্রন্থ সংকলন করেন।ঐ গ্রন্থের মুখবন্ধে লোচন লিখেছেন যে,বিদ্যাপতি মিথিলার অপভ্রংশ ভাষায় প্রথমে গীত রচনা করেন।সুমতি নামে একজন কায়স্থ উত্তম কথক ও গায়ক ছিলেন।তার পুত্র জয়তঃ বিদ্যাপতির কাছে তাঁর পদাবলী গান করতে শিক্ষা করে।লোচনের রাগতরঙ্গিণীতে বিদ্যাপতির অনেকগুলি গীত উদ্ধৃত হয়েছে।ঐসব গীতের কয়েকটিতে যে সহজ সরল ভাষার প্রয়োগ দেখতে পাই,তাকে ব্রজবুলি বলতে ইচ্ছা হয়।*
*🌺বস্তুতঃ বিখ্যাত ব্রজবলির মত ভাষা বিদ্যাপতি স্বয়ং সৃষ্টি না করলে এটি কখনই পরবর্তী কবিগণ কর্তৃক অনুসৃত (অনুসরণ) হত না। বাংলায় যশোরাজ খান,উড়িষ্যার রামানন্দ রায়,আসামে শঙ্কর দেব যে সুমধুর ভাষায় পদ রচনা করেছিলেন, এটি বিদ্যাপতির দ্বারাই উদভাবিত এটি স্বীকার না করে উপায় নাই। বিদ্যাপতির নামে কতগুলি খাঁটি বাংলা পদ এদেশে প্রচলিত আছে। যথা "মরিব মরিব সখি, শুনলো রাজার ঝি" ইত্যাদি।এই পদগুলি অবশ্য বিদ্যাপতির রচিত নহে। কিছুদিন আগে শ্রীযুক্ত ডাঃ সুকুমার সেন সাহিত্য পরিষৎ-পত্রিকায় বিদ্যাপতির কতগুলি অপ্রকাশিত রাগাত্মিক বাংলা পদ প্রকাশ করেছিলেন।এইসব পদের প্রকৃত রচয়িতা কে?যদি বিদ্যাপতির মৈথিল পদকে আমরা বাঙ্গালী সাজ পরাতাম,তাহলে সবগুলি পদই বাংলা হ'ত।কাজেই মনে হয়, কোনও বাঙ্গালী কবি বিদ্যাপতির নাম দিয়ে নিজের পদ চালাতে চেষ্টা করেছেন।এরকম রচনা চলে আসছে।আমাদের দেশে ব্যাস,বাল্মীকি, কালিদাসের নামেও অজ্ঞাতনামা কবিরা কবিতা লিখে চালাবার চেষ্টা করেছেন।*
*🌻শ্রীযুক্ত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন আবিস্কার করেছেন যে,শ্রীখন্ডের একজন কবি "ছোট বিদ্যাপতি" আখ্যা পেয়েছিলেন এবং বাংলা পদগুলি তাঁরই রচিত।তিনি কবিরঞ্জন ও রঞ্জন এই নামে পরিচিত ছিলেন এবং বিদ্যাপতি ছিল ইঁনার উপাধি।*
*🌷ছোট বিদ্যাপতি বলি যাহার খেয়াতি।*
*🌷যাহার কবিতাগানে ঘুচয়ে দুর্গতি।।*
*🌹এই কবি কোনও সময়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন বলে বোধহয় "শ্রীরঞ্জন" সর্বকলানিধানঃ"। কিন্তু তিনি যে বিদ্যাপতির নাম দিয়ে পদ লিখেছিলেন তার প্রমাণ কোথায়? পদকল্পতরুতে এবং রসমঞ্জরীতে যে কবিরঞ্জন ভণিতা যুক্ত পদ আছে,তা যদি এই রঞ্জন কবির হয়,তবে তো ইনি কবিরঞ্জন নামেই পদ লিখেছেন। বিদ্যাপতি নামে পদ লিখেছিলেন,তা সিদ্ধ হয় কিভাবে?বাংলা পদগুলির বিদ্যাপতি ভণিতা দেখে অনুমান করতে হয় যে,এই রঞ্জন কবি যিনি কবিরঞ্জন ভণিতায় পদ রচনা করেছেন এবং যাঁর "ছোট বিদ্যাপতি " বলে করকঙ্কণ উর্দ্ধে তুলে (মণিবন্ধের উপরে উঠিয়ে) তাকে নিঃশব্দ করেছে। মেখলা (কিঙ্কিণী) দৃঢ়ভাবে বেঁধেছে (যাতে শব্দ না হয়); নূপুরদ্বয়ের নিঃশব্দতা যত্নে সম্পাদন করেছে ; কিন্তু প্রিয় সখী! আমার এই অভিসার উৎসবে চন্দ্র চন্ডালের মত আচরণ করে তিমিরাবগুন্ঠন অপসারিত করল!(এখন আমি কি করে যাই)?*
🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌹🌻🌻🌻🌻🌻🌻
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪৬. বিদ্যাপতি 🌼 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪৬)🌹বৈষ্ণব রস-সাহিত্য🌹*
*💧💧বিদ্যাপতি💧💧*
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
*🌺এই শ্লোক শ্রীজয়দেবের পংক্তি "মুখরমধীরং ত্যজ মঞ্জীরং রিপুমিব কেলিষু লোলং" স্মরণ করে দিবে।চাঁদ যে অভিসারে বাধা জন্মায়, তা বিদ্যাপতির রাধা অন্তরে অন্তরে বুঝেছেন।*
*🌷চন্দা জনু উগ আজু কি রাতী।*
*🌷পিয়াকে লিখিঅ পঠাওব পাঁতি।।*
*🌷অথবা রাহু বুঝাএব হঁসী।*
*🌷পিবি জনি উগিলহ সীতল সসী।।*
*🌷কোটি রতন জলধর তোহেঁ লেহ।*
*🌷আজুক রয়নি ঘন তম কএ দেহ।।*
*⚪চাঁদ,আজ রাত্রিতে তুমি উদিত হইও না। প্রিয়কে আজ (অভিসারের কথা ) লিখে চিঠি পাঠাব।•••• অথবা রাহুকে হেসে বুঝাব যে শীতল চন্দ্রকে পান করে তুমি আর উদগীরণ করিও না (চন্দ্র যেন আর না উঠে)।হে মেঘ,তুমি কোটি রত্ন গ্রহণ কর,আজকের রজনী ঘোর তমসাচ্ছন্ন করে দাও।*
*🌷চন্দা ভলি নাহি তুএ রীতি!*
*🌷এহি মতি তোহে কলঙ্ক লাগল,*
*🌷কুছ ন গুনহ ভীতি।।*
•••• •••• •••• ••••
*🌷এক মাস বিহি তোহি সিরিজিএ,*
*দএ সকলও বল।*
*🌷দোসর দিন পূনু পূর ন রহসি,*
*এহী পাপক ফল।।*
*⚪চাঁদ তোর ব্যবহার ভাল না,এই জন্যই তোর কলঙ্ক লাগিল,তোর মনে কিছুমাত্র ভয় নাই।••••বিধাতা তোকে এক মাস বসিয়া সৃষ্টি করেন,সমস্ত শক্তি দিয়ে (পূর্ণ করেন), কিন্তু দ্বিতীয় দিন আর তুই পূর্ণ থাকিস না,এই তোর পাপের ফল।*
*🌹দূতী কৃষ্ণকে বলছেন, হে মাধব!রাধা কত কষ্ট করে তোমার কাছে আসিল,*
*🌷প্রেম হেম পরখাওল কসোটি,*
*ভাদর কুহু-তিথি রাতি।।*
*⭐ভাদ্রের কুহু (অমাবস্যা) রজনীরূপ কষ্টিপাথরে প্রেমরূপ স্বর্ণের পরীক্ষা হল।রাত্রি কাজল বমন করছে (চারিদিক মসীলিপ্ত হয়েছে )(পথে) ভীম সর্প,দুর্বার বজ্রপাত হচ্ছে, সে গর্জনে মনে ভয় হ'ল।মেঘ কুপিত হয়ে জলধারা বর্ষন করছে ; অভিসারে সংশয় পড়ে গেল।•••সর্প পায়ে বেষ্টন করল,(ভালই হল)নূপুরের শব্দ আর হয় না।*
*🌷ঠামহি রহিএ ঘুমি,পরস চিহ্নিঅ ভূমি,*
*দিগমগ উপজু সন্দেহ।*
*🌷হরি হরি সিব সিব,তাবে জাইহ জীব,*
*জাবে ন উপজু সিনেহ।।*
*🌺(যেতে যেতে) ঘুরে ঘুরে একই জায়গায় আসি,(অন্ধকারে)হাতড়িয়ে জায়গা চিনি, দোলায়মান চিত্তে সংশয় হয় (ঠিক পথে যাচ্ছি তো) হরি হরি!যতদিন প্রেম উৎপন্ন না হয়,ততদিন বেঁচে থাকা ভাল (তারপর নয়)।*
*🌷নলিনী দল নির,চিত ন রহএ থির,*
*তত ঘর তত হো বহার।*
*🌷বিহি মোর বড় মন্দা,উগি জনু জাএ চন্দা,*
*সুতি উঠি গগন নিহার।।*
*🌷পথহু পথিক সঙ্কা,পয় পয় ধএ পঙ্কা,*
*কি করতি ও নব তরুণী।*
*🌷চলএ চাহ ধসি, পূনু পড় খসি খসি,*
*জালক ছেকলি হরিণী।।*
*🌹মাধব! রাধার চিত্ত নলিনীদলগত জলের মত অস্থির ; যত না ঘরে যায়,তত বাইরে আসে (তুলনীয়= ঘরের বাহিরে দন্ডে শতবার তিলে তিলে আইসে যায় --চন্ডীদাস)।বিধাতা বড়ই মূর্খ, পাছে (বিধাতার চক্রে)চন্দ্র উদিত হয়, এই জন্য শুইতে গিয়েও (পুনঃ পুনঃ) উঠে আকাশের দিকে চেয়ে দেখে।পথে যেতে কোনও পথিকের সঙ্গে হয়ত দেখা হবে, এই আশঙ্কা হয়,পায়ে পিয়ে পঙ্ক (কাদা)ধরে (তাতেও গ্রাহ্য করে না ) নবযুবতী (রাধা)কি যে করে (ভেবে পায় না )!দ্রুত চলতে চায়, কিন্তু আবার আছাড় খেয়ে পড়ে (পিছল পথে) জালে বাঁধা হরিণীর মত।*
*🌻বিদ্যাপতি এইভাবে যে চিত্রটি এঁকেছেন,তা রূপে,রসে অতুলনীয়।অভিসারের পদে বিদ্যাপতিরই প্রিয় শিষ্য গোবিন্দ দাস দুই শতাব্দী পরে তাঁকেই অনুকরণ করে অমর পদাবলী রচনা করেছেন।অনেক সময়ে পংক্তিতে পংক্তিতে এই শ্রেষ্ঠ কবিদ্বয়ের পদের তুলনা চলে।অভিসার পদে প্রধান আস্বাদ্য-- অনুরাগ। বিঘ্নসমাকুল রজনীতে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তরুণী নায়িকা প্রিয়তমের সঙ্গে মিলনের কি অসাধ্য সাধন করছেন,তাইই অভিসারে পদাবলীর মুখ্যরস।অভিসারিকা নায়িকা অবলম্বনে বিদ্যাপতির বহু পদ রয়েছে।রাধামোহন ঠাকুর ও পদামৃত সমুদ্রের টীকায় বলেছেন="শ্রীবিদ্যাপতি ঠককুর কৃত গীত প্রাচুর্য বশাৎ "।*
🪷🪷🌷🪷🪷🌷🪷🪷🌷🪷🪷🌷🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪৭. বিদ্যাপতি 🌷 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪৭)🌻বৈষ্ণব রস-সাহিত্য🌻*
*🌹🌹বিদ্যাপতি🌹🌹*
❤❤❤❤❤❤❤❤
*🍀এই অনুরাগ সম্বন্ধে বিদ্যাপতির একটি পদ আছে,যার তুলনা কোথাও পাই না।শ্রীমতী রাধারাণী যমুনায় স্নান করে উঠে দেখলেন,শ্রীকৃষ্ণ কেলিকদম্বে হিলন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হৃদয়ে প্রবল ইচ্ছে যে,একবার সেই অনুপম রূপমাধুরীসমন্বিত নটবর-শেখরকে দর্শন করেন=*
*🌷নহাই উঠল তীর রাই কমল মুখি,*
*সমুখে হেরল বরকান।*
*🌷গুরুজন সঙ্গ লাজে ধনি নতমুখি,*
*কৈসন হেরব বয়ান।।*
*🌷সখি হে,অপরুব চাতুরি গোরি*।
*🌷সব জন তেজি,অগুসরি সঞ্চরি,*
*আড় বদন তঁহি ফেরি।।*
*🌷তঁহি পুন মোতি হার তোড়ি ফেঁকল,*
*কহইত হার টুটি গেল।*
*🌷সব জন এক এক চুনি সঞ্চরু,*
*স্যাম-দরস ধনি ভেল।।*
*🌺সঙ্গে গুরুজন,লজ্জায় তাঁকে নতমুখী হয়ে থাকতে হ'ল ; (ভাবছেন) কেমন করে প্রিয়তমের অপরূপ বদন দেখবেন। কিন্তু সুন্দরীর অপরূপ চাতুরী।তিনি (ছল করে )সবার আগে গমন করলেন এবং নিজের গলার মুক্তা হার ছিঁড়ে ফেললেন।(সবাইকে ডেকে) বললেন--,আমার গলার হার কেমন করে বুঝতে পারলাম না ছিঁড়ে গিয়েছে।(এইকথা শুনে) সবাই (যমুনাতটের বালুর মধ্যে )একটি একটি করে সেই মুক্তা খুটে খুটে তুলতে লাগল।(সেই অবসরে)শ্রীমতী কৃষ্ণানুরাগিনী শ্যামদর্শন করে নিলেন।*
*🌹এই অপূর্ব পদটি পরেও যদি কেউ বলেন যে,বিদ্যাপতির পদ কেবল প্রেমের কবিতা,রাধাকৃষ্ণের সম্বন্ধ তাতে খুবই কম, তাহলে আমাদের আর কি কথা থাকতে পারে? এই বিষয়টি আরও পরিস্ফুট হবে,বিদ্যাপতির একটি মিলনের পদ হ'তে।অভিসারের পরেই মিলন।মিলনের প্রকৃতি দেখে অভিসার সম্বন্ধে প্রকৃত ধারণায় উপনীত হওয়া যেতে পারে=*
*🌹দুহু মুখ হেরইত দুহু ভেল ধন্দ।*
*🌹রাহী কহ তমাল মাধব কহ চন্দ।।*
*🌹চিতপুতলী জনু রহু দুহু দেহ।*
*🌹ন জানিঅ প্রেম কেহন অছু নেহ।।*
*🌹এ সখি দেখ দেখ দুহুক বিচার*।
*🌹ঠামহি কোই লখই নাহি পার।।*
*🌹ধনি কহ কাননময় দেখিঅ শ্যাম।*
*🌹সে কিএ গুণব মঝু পরিণাম।।*
*🌹চউকি চউকি দেখি নাগর কান।*
*🌹প্রতি তরুতর দেখ রাহী সমান*।।
*🌻দুইজন দুইজনকে দেখে সন্দেহে পড়লেন।রাইধনি বললেন--,এ কি তরুণ তমাল!মাধব বললেন--, এ কি চাঁদ (উঠিল)! দুইজনেই চিত্রপুত্তলীর মত দাঁড়িয়ে রইলেন।(এক সখী অন্যসখিকে বলছেন)সখি!দেখ দেখ দু'জনের কি বিচার! নিজের কাছেই, অথচ কেউ কাউকেও দেখতে পাচ্ছে না। ধনি বলিল একি।আমি যে কাননময় শ্যাম দেখছি, আমার দশা সে কি ভাববে?(আমি যে অনুরাগে আত্মহারা হয়ে জাতি-কুল-মান বিসর্জন দিয়ে আসিলাম, কিন্তু আমার সেই প্রেমাস্পদ কৈ? এ যে বহু শ্যাম)।নাগর চমকিয়ে চমকিয়ে দেখছেন--,প্রতি তরুতলে রাইধনি দাঁড়িয়ে (যার জন্য সঙ্কেত কুঞ্জে এসে প্রতীক্ষা করেছি,আমার সে প্রিয়তমা কোনটি)?!*
*🍀এই পদটির ভণিতায় বিদ্যাপতির নাম না পাওয়া গেলেও, সন্দেহের বেশী অবকাশ বোধহয় নাই।কেননা, বিদ্যাপতির বহু পদে শ্রীরাধার প্রেমের উৎকর্ষ সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।*
❤❤❤❤❤❤🌹❤❤❤❤❤❤
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪৮. রাইধনির ছলনা 🌼 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪৮)🍁বৈষ্ণব রস-সাহিত্য🍁*
*রাইধনির ছলনা*
•••••••••••••••••••••••••••
*🍀নব-অনুরাগিনী নানা ছলে প্রিয়তমের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য ব্যগ্র। কিন্তু সংসারে প্রতিকূলতা এবং বাধাও বহু। কাজেই প্রেমিকাকে অনেকক্ষেত্রে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে পরিত্রাণ পেতে হয়।এই চতুরতা নিয়ে অনেক কবিতা রচিত হয়েছে।মিথিলায় তার নাম "লাথ"।লাথ অর্থে ছলনা।বিদ্যাপতির একটি কবিতা এইরকম লাথের সুন্দর নিদর্শন ঃ--*
*🌷জাহি লাগি গেলি হে তাহি কহাঁ লইলি হে,*
*তা পতি বৈরি পিতু কাহাঁ।*
*🌷অছলি হে দুখ সুখ, কহহ অপন মুখ,*
*ভুসন গমওলহ জাহাঁ।।*
*🌷সুন্দরী, কি কএ বুঝাওব কন্তে।*
*🌷জহ্নিকা জনম হোইত তোহে গেলিহু,*
*অইলি হে তহ্নিকা অন্তে।।*
*🌷জাহি লাগি গেলহু সে চলি আএল,*
*তেঁ মোয়ঁ ধাএল নুকাঈ।*
*🌷সে চলি গল তাহি লএ চলিলিহু,*
*তেঁ পথ ভেল অনেআঈ।।*
*🌷সঙ্কর-বাহন খেড়ি খেলাইত,*
*মেদিনি-বাহন আগে।*
*🌷জে সব অছলি সঙ্গ, সে সব চললি ভঙ্গ,*
*উবরি আএলহুঁ অতি ভাগে।।*
*🌷জাহি দুই খোজ করইছথি সাসুহ্নি,*
*সে মিলু আপনা সঙ্গে।*
*🌷ভণই বিদ্যাপতি সুন বর জউবতি,*
*গুপুত নেহ রতি-রঙ্গে।।*
*🌹ননদিনী বধূকে জিজ্ঞাসা করছেন= তুই যার জন্য গিয়েছিলি, তা আনলি কৈ? (অর্থ্যাৎ ঘাটে জল আনতে গিয়েছিলি, জল না নিয়ে আসলি কেন?)আর সেই জলের পতির শত্রুর পিতা কোথায়? (জলের পতি=সমুদ্র ; সমুদ্রের শত্রু=অগস্ত্য ; তার পিতা =ঘট ) অর্থ্যাৎ ঘট কোথায় ফেলে আসলি?যেখানে ভূষণ (বা অঙ্গরাগ) খোয়াইয়ে বা হারিয়ে আসলি, সেখানে কি রকম সুখে দুঃখে ছিলি, নিজমুখে বল। সুন্দরী,কি বলে' কান্তকে বুঝাবি?যার জন্ম হতে তুই গেলি,তার শেষে তুই আসলি (অর্থ্যাৎ সেই কোন সকালে গিয়েছিস, আর ফিরে আসলি দিনান্তে।*
*তখন বধূ উত্তর করছেন = যা আনতে গিয়েছিলাম,সে এসে পড়ল, (জল অর্থ্যাৎ বৃষ্টি এলো ; সেজন্য ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। সে চলে গেল),তখন পথে আসতে (অনেআঈ বা অন্যায়=বিলম্ব)হলো।(বিলম্বের কারণ আর কিছুই নয়) দেখি,পথে ষাঁড়ের (শঙ্করবাহন) লড়াই বেধে গেছে--আর একদিকে এক সাপ (মেদিনীবাহন)।যারা সব সঙ্গে ছিল তারা পালিয়ে গেল।আমি অতিভাগ্যে বেঁচে এসেছি।শাশুড়ী যে দুইয়ের খোঁজ করছেন,তারা আপনার সঙ্গে মিলিল (অর্থ্যাৎ মাটিতে পড়ে ঘট চূর্ণ হয়ে মাটির সঙ্গে এবং ঘাটের জল বৃষ্টির সঙ্গে মিশিল।*
*🍁ছেলবেলায় একটি সারি গানে এইরকম উক্তি-প্রত্যুক্তি-মূলক ছলনার দৃষ্টান্ত পেয়েছিলাম।গানটি আমাদের অঞ্চলে (যশোহর) পল্লীবাসীর মুখে সেকালে খুব শোনা যেত।গানটি আমার যত দূর মনে পড়ে তাইই বলি ঃ---*
*🍁ওলো ছোট বউ,সাঁঝের বেলা*।
*🍁জল আনতি ঘাটে গেলি ফুল পালি কনে?*
*🍁ছান করতে গিয়েছিলাম শান বাঁধা ঘাটে ;*
*🍁ভাসে যাতি চাঁপা ফুল তুলে দিলাম কানে।*
*🍁ওলো ননদী,সাঁঝের বেলা।*
*🍁ওলো ছোট বউ,সাঁঝের বেলা*।
*🍁তোর চুল কেন আ'লো-থালো গাল কেন ফুলো।*
*🍁ফুলের সঙ্গে ভ্রমর ছিল অধরে দংশিল।*
*🍁ওলো ননদী,সাঁঝের বেলা।*
☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆
*🌻আমাদের দেশের ভাষা হলেও বুঝতে বোধহয় কষ্ট হবে না।এত ছেলে বেলায় গানের কথা এবং তার ইঙ্গিত যত বুঝি আর না বুঝি, সুরটি মর্ম স্পর্শ করেছিল ; সারি গানের সহজ মিষ্টত্ব থাকায় সুরটি অতি মধুর।*
*🌺ছলনা কিন্তু নাগরীগণের একচেটিয়া নয়।নাগরদেরও অনেক সময়ে ছল-চাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না।বৈষ্ণব পদাবলীতে এরকম বিপদাপন্ন নায়কের এক সুন্দর উদাহরণ পাওয়া যায়। পদটি শশিশেখরের এবং অনেকেরই সুপরিচিত।তা হলেও ঐ পদটি এখানে উদ্ধৃত করি=*
*নীলোৎপল, শ্রীমুখ মন্ডল,*
*ঝামর কাহে ভেল।*
*মদন জ্বরে , তনু তাতল,*
*জাগরে নিশি গেল।।*
*"খন্ডিতায়" শ্রীকৃষ্ণ যখন সারা নিশি চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে কাটিয়ে প্রভাতে শ্রীরাধার কুঞ্জে দর্শন দিলেন, তখন শ্রীরাধা জিজ্ঞাসা করছেন= তোমার নীলকমল সমান মুখটি আজ এত ঝামর বা বিরস হ'ল কি জন্য?শ্রীকৃষ্ণের উত্তর--,তোমার বিরহে জর্জর হয়ে সারা নিশি জাগরণে কাটিয়েছি।*
*🌹শ্রীরাধা বলছেন=*
*নখ নির্ঘাত- , ক্ষত বক্ষসি,*
*দেয়ল কোন নারী।*
*শ্রীকৃষ্ণ বলছেন=*
*কন্টকে তনু, ক্ষত বিক্ষত,*
*তোহে ঢুড়ইতে গোরি।।*
*শ্রীরাধা বলছেন=*
*সিন্দুর কাহে, অলকা পরি,*
*চন্দন কাঁহা গেল।*
*শ্রীকৃষ্ণ বলছেন=*
*গিরি গোবর্দ্ধন, গোরিক সেবি,*
*সিন্দুর শিরে নেল।।*
*🏞গিরি গোবর্দ্ধনে গেছে (তোমার জন্য ) গৌরীর পূজা করে তাঁর প্রসাদী সিন্দুর কপালে পরেছি। তখন শ্রীরাধা বলছেন=*
*নীলাম্বর, তুহু পহিরলি,*
*পীতাম্বর ছোড়ি।*
*শ্রীকৃষ্ণ বলেছন=*
*অগ্রজ সঙ্গে, পরিবর্তিত,*
*নন্দালয়ে ভোরি।।*
*❤তুমি আজ নীলাম্বর পরেছ, এ কি ব্যাপার? তুমি তো চিরদিন পীতাম্বরধারী! শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, নন্দালয়ে (বাড়ীতে) আমি আর বলাইদাদা একসঙ্গে শুয়েছিলাম।ভোরে উঠে এসেছি, ভল করে দাদার নীলাম্বরটি পরে এসেছি।*
*🌹তখন শ্রীরাধা পুনঃ বলছেন=*
*অঞ্জন কাঁহে, গন্ডস্থলে,*
*হৃদি খন্ডন অধরে।*
*উত্তর প্রতি-, উত্তর দিতে,*
*পরাজয় শশিশেখরে।।*
*⭐শশিশেখর উত্তর দতে পারেননি ; কিন্তু গোবিন্দদাসের একটি পদে এরও সমাধান আছে, ধৃষ্ট নাগর বলছেন=*
*কাজর ভরমে, মরম কিয়ে গঞ্জসি,*
*মৃগমদ-পদ পুন এহ।*
*🌻সুন্দরী! তুমি কাজল বলে ভুল করছ, কিন্তু এটি কাজল না, মৃগমদকস্তুরী। শোভার জন্য পরেছি। আর হৃদয়ে যে রক্তিম চিহ্ন দেখছ,সেটি গৈরিক চিহ্ন।তোমারই বিরহে আমার হৃদয় সংসার বিবাদী হয়ে উঠেছে।*
*গৈরিক হেরি, বৈরি সম মানসি,*
*উরপর যাবক ভানে।।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏❤🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৪৯. রায় রামানন্দ 🌻 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৪৯)🌻বৈষ্ণব রস-সাহিত্য🌻*
*🌹রায় রামানন্দ🌹*
🍀🍀🍀🍀🍀🍀🍀
*🌻সংস্কৃত নাটকের মধ্যে রায় রামানন্দ-কৃত "জগন্নাথবল্লভ নাটক" সুপরিচিত।শ্রীচৈতন্যদেব যে সব গ্রন্থ আস্বাদন করতেন,জগন্নাথবল্লভ তাদের অন্যতম।*
*চন্ডীদাস বিদ্যাপতি,রায়ের নাটকগীতি,*
*কর্ণামৃত শ্রীগীতগোবিন্দ।*
*মহাপ্রভু রাত্রিদিনে,স্বরূপ রামানন্দ সনে,*
*গায় শুনে পরম আনন্দ।।*
*(চৈঃচঃমঃ ২য় পরিঃ)*
*🍁এই পংক্তি দুইটির মধ্যে লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, মহাপ্রভুর আস্বাদ্য কাব্র বা গ্রন্থের মধ্যে তিনটি সংস্কৃতে রচিত ; বিল্বমঙ্গল ঠাকুরের শ্রীকৃষ্ণকর্ণামৃত, শ্রীজয়দেব গোস্বামীর গীতগোবিন্দ এবং রামানন্দ প্রণীত জগন্নাথবল্লভ নাটক।সমস্তই শ্রীকৃষ্ণলীলা বিষয়ক।বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের পদাবলী প্রসিদ্ধ,সে জন্য কৃষ্ণদাস কবিরাজগোস্বামী এই দুই কবির কোনও গ্রন্থের উল্লেখ না করে শুধু কবির নাম উল্লেখ করলেন।রামানন্দের জগন্নাথবল্লভ নাটকের নাম করা হয়নি বটে, কিন্তু তার কারণ এই যে,জগন্নাথ-বল্লভের আর একটি নাম রামানন্দ-সঙ্গীত নাটক।*
*শ্রীরামানন্দ রায়েণ কবিনা তত্তৎগুণালঙ্কৃতং শ্রীজগন্নাথ-বল্লভ-নাম গজপতি প্রতাপরুদ্রপ্রিয়ং রামানন্দসঙ্গীতনাটকং নির্মায়•••••*
*(জগঃ-বঃ ১ম অঙ্ক)*
*🌹আরও একটি লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে,যাঁর নাটক,তাঁকে নিয়েই মহাপ্রভু আস্বাদন করতেন।এখানে "রামানন্দ" বলতে অবশ্য রায় রামানন্দকেই বুঝতে হবে।নীলাচল লীলায় স্বরূপদামোদরের মত রামরায় মহাপ্রভুর নিত্য সঙ্গী ছিলেন। এই নাটকটি মহাপ্রভুর সঙ্গে রামানন্দের সাক্ষাতের আগেই রচিত হয়েছিল বলে মনে হয়।কারণ,এতে নান্দী বা মঙ্গলাচরণে নূপুরশোভিত চরণ,নৃত্যপরায়ণ শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি আছে, শ্রীচৈতন্যের বন্দনা নাই।অর্থ্যাৎ তখনও রামানন্দ রায়ের সঙ্গে মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ হয় নাই।গোদাবরীতটে উভয়ের মিলনেযে প্রেমের তরঙ্গ ছুটেছিল, তাতে রামানন্দ গৌরাঙ্গময় হয়ে গিয়েছিলেন বলে বেশ মনে হয়। ঐ ঘটনার পর রামানন্দ রায়ের পক্ষে শ্রীগৌরাঙ্গের বন্দনা না করা সম্ভবপর বলে মনে হয় না। রামানন্দ রায় ছিলেন,গজপতি প্রতাপরুদ্রের অধীনে একজন প্রধান রাজপুরুষ,তাঁর রাজধানী ছিল বিদ্যানগর, বতর্মান রাজমাহেন্দ্রী।ইঁনার পিতা ভবানন্দ রায় একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন।তবে তিনি বিদ্যানগরের অধীশ্বর ছিলেন কি না,তা বলা যায় না।সতীশচন্দ্র রায় লিখেছেন যে,ভবানন্দ রায় বিদ্যানগরের অধীশ্বর ছিলেন।মৃণালকান্তি ঘোষ তাঁর "গৌরপদতরঙ্গিণীর" ভূমিকায় এই মতের প্রতিবাদ করে বলেছেন যে,রায় ভবানন্দ যে রাজা ছিলেন, তার প্রমাণাভাব।মৃণালবাবু সম্ভবতঃ জগন্নাথবল্লভের "পৃথ্বীশ্বরস্য শ্রীভবানন্দ রায়স্য" লক্ষ্য করেন নাই। কিন্তু ভবানন্দ যে বিদ্যানগরের রাজা ছিলেন,তাও প্রমাণিত হয় না।*
*🌻রামানন্দ তাঁর পৃষ্ঠপোষক নরপতি গজপতি প্রতাপরুদ্রের যে পরিচয় দিয়েছেন,তাতে মনে হয়, রায় রামানন্দের মত তিনিও লীরারসিক বিদগ্ধজন ছিলেন।কবি তাঁকে "নিরুপম-কান্তি-লক্ষ্মী-লুব্ধ-লক্ষ্মী রমণাবস্থানোচিত চিত্তদুগ্ধাব্ধিনা বিভাবাদি পরিণত রস-রসালমুকুল রসাস্বাদ-কোবিদপুংস্কোকিলেন শ্রীকন্ঠহার সহচরগুণ মুক্তা-ফলমন্ডিতহৃদয়েন" বলেছেন।শ্রীকন্ঠহার অর্থ্যাৎ (শ্রীরাধাকন্ঠহারের যিনি সহচর অর্থ্যাৎ শ্রীকৃষ্ণ,তাঁর গুণরূপ মুক্তাফলে ভূষিত হয়েছে হৃদয় যাঁর)। তাহলে দাঁড়ায় এই যে,শ্রীচৈতন্য নীলাচলে গমন করবার পূর্বে প্রতাপরুদ্র বৈষ্ণবধর্মের প্রতি পক্ষপাতী হয়েছিলেন।যে কারণে লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় শ্রীজয়দেব গীতগোবিন্দ গান করে তাঁর আশ্রয়দাতার মনস্তুষ্টি সাধন করতে পেরেছিলেন, ঠিক সেই কারণেই নীলাচলের বিখ্যাত স্বাধীন ভূপতি প্রতাপরুদ্রের রাজসভায় রায় রামানন্দ জগন্নাথবল্লভ নাটক রচনা করেছিলেন।অনেকের মতে গজপতি প্রতাপরুদ্র শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে পতিত হয়ে রাজধর্মপালনে উদাসীন হয়েছিলেন, এবং বৈষ্ণবধর্মই তাঁর পরাজয়ের কারণ। কিন্তু রামরায় তাঁর আশ্রয়দাতা সম্বন্ধে যা বলেছেন,তা ঐ ধারণার অনুকূল নয়।*
*গজপতি প্রতাপরুদ্র মহারাজ পুরুষোত্তমদেবের পর ১৪৮৯ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ১৫৪০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।রামানন্দ তাঁর প্রশস্তি উচ্ছসিত ভাষায় গ্রথিত করেছেন।যথা প্রতাপরুদ্রের পরাক্রমে সেকেন্দর (সেকন্দর লোদি ১৪৮৯-১৫১৭)ভীত হয়ে গিরিকন্দরে পলায়ন করেছেন, কলবর্গ (গুলবর্গ) দেশের ভূপতি তাঁর পরিবারবর্গের রক্ষার জন্য আশঙ্কিত হয়েছেন, গুর্জরের (গুজরাটের)রাজা তাঁর রাজ্য অরণ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করেছেন এ গৌড় ভূপতি ব্যাতাতাড়িত অর্ণবপোতের আরোহীর ন্যায় ব্যাকুল হয়েছেন।এরকম পরিচয় হতে মনে হয়,তখনও বিজয়নগরের কৃষ্ণদেব রায়ের হাতে প্রতাপরুদ্রের পরাজয় ঘটে নাই।কৃষ্ণদেব রায় শুধু যে উড়িষ্যাধিপকে পরাজিত করেন তা নহে, বিদ্যানগর দুর্গ ধ্বংস করেন।মাদলাপঞ্জী অনুসারে এই ঘটনা ১৫০৫ খৃষ্টাব্দে ঘটে।তাহলে এর পৃর্বেই জগন্নাথবল্লভ নাটকের রচনা হয়েছিল বলে মনে করা অসঙ্গত নহে।রায় রামানন্দ নিজে একজন রাজা ছিলেন, কেউ কেউ বলেন, করদ রাজা ছিলেন, কাজেই তাঁর প্রশংসা গতানুগতিক প্রশস্তি-পাঠের মত না হওয়ায় স্বাভাবিক।সেই সময়ে বঙ্গে বা গৌড়ে হোসেন শাহ রাজত্ব করছিলেন।১৫১৫ খৃষ্টাব্দে মুসলমানগণ উড়িষ্যা আক্রমণ করে। উড়িষ্যার ইতিহাস হতে জানা যায় যে,তাঁরা কটক (প্রতাপরুদ্রের রাজধানী ) পর্যন্ত গিয়ে শিবির-সন্নিবেশ করেছিলেন এবং তাঁদের ভয়ে জগন্নাথের মূর্তি চটক পর্বতে নিয়ে লুকানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতাপরুদ্র সসৈন্যে দাক্ষিণাত্য যুদ্ধক্ষেত্র হতে তাড়াতাড়ি করে ফিরলেন এবং মুসলমানগণকে গড় মান্দারণ পর্যন্ত তাড়িয়ে দিলেন।এই ঘটনার পরে জগন্নাথবল্লভ রচিত হলে নিশ্চয়ই সে কথা নাট্যকার লিখতে ভুলতেন না।সেকন্দর লোদি একজন ন্যায়পরায়ণ সুলতান ছিলেন, কিন্তু তাঁর হিন্দু বিদ্বেষের জন্য হিন্দু নরপতিগণ নিশ্চয়ই তাঁকে ভাল চোখে দেখতেন না।কাজেই তাঁর উল্লেখ এই প্রসঙ্গে হিন্দু লেখকের কলমে যোগ্যই হয়েছে বলতে হবে।গুলবর্গে বাহমণি রাজবংশের শেষ রাজা বিরাজ করছিলেন।আত্মরক্ষায় তিনি তৎপর ছিলেন না বলেই মনে হয়।কারণ, কৃষ্ণদেব রায় মহাশয় এই রাজাকে পরাজিত করেন।*
🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌺🌻🌻🌻🌻🌻🌻
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🆕 👉 ৫০. রায় রামানন্দ 🚩 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 পঞ্চম ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/11/sahityo5.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(৫০) 🌹বৈষ্ণব রস-সাহিত্য🌹*
*🙏রায় রামানন্দ🙏*
🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚🦚
*🍀শ্রীমন্মহাপ্রভু এই যে জগন্নাথ ভল্লভ নাটক আস্বাদন করতেন, তা চৈতন্য চরিতামৃতে মধ্যলীলার দ্বিতীয় পরিচ্ছদেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ঠিক কোন সময়ে এই নাটকটির বৃত্তান্ত তিনি জেনেছিলেন বা অবগত হয়েছিলেন,তা জানবার উপায় নেই।নীলাচলে আসিবার দুইমাস পরেই বৈশাখমাসে মহাপ্রভু যখন দক্ষিণ ভ্রমণে গমন করেন,তখন সার্বভৌম মহাশয় তাঁকে গোদাবরী-তীরে রায় রামানন্দের সহিত সাক্ষাৎ করতে অনুরোধ করলেন।সেই প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য।*
*🌷তোমার সঙ্গের যোগ্য তেঁহো একজন।*
*🌷পৃথিবীতে রসিক ভক্ত নাহি তাঁর সম।।*
*🌷পান্ডিত্য ভক্তিরস দুয়ের তেঁহো সীমা।*
*🌷সম্ভাষিলে জানিবে তুমি তাঁহার মহিমা।।*
*🌷অলৌকিক বাক্য চেষ্টা তাঁর না বুঝিয়া।*
*🌷পরিহাস করিয়াছি বৈষ্ণব বলিয়া।।*
*(চৈঃচঃমঃ ৭ম)*
*🙏এতদিন তাঁকে বুঝতে পারিনি, তিনি বৈষ্ণব,ভক্তিরসের অধিকারী রসিক ; তাঁকে নিয়ে কত পরিহাস করেছি। কিন্তু এক্ষণে তোমার প্রসাদে বুঝিলাম যে তিনি কত বড় প্রকৃত বৈষ্ণব।ইহা হতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে,শ্রীচৈতন্যদেবের সহিত তাঁর সাক্ষাৎ হবার পূর্বেই রায় রামানন্দ বৈষ্ণব বলে খ্যাত হয়েছিলেন। কিন্তু এখানে বা শ্রীপাদ রূপ গোস্বামীর সঙ্গে ইষ্টগোষ্ঠী সময়ে বা সাধ্যসাধনতত্ত্ব বিচার প্রসঙ্গে কোনও খানে জগন্নাথ বল্লভ নাটকের নাম কেউ করেননি।এর কারণ কি?রায় রামানন্দের পক্ষে এটি বৈষ্ণবোচিত বিনয় হতে পারে। কিন্তু শ্রীরূপগোস্বামী বা মহাপ্রভুও তো ইঁনার উল্লেখ করতে পারতেন? মহাপ্রভুর যে এই নাটক ভাল লাগিত সে প্রমাণ তো আমরা পেয়েছি।আরও প্রমাণ পাচ্ছি যে,যায় রামানন্দকে মহাপ্রভু অন্তরঙ্গ বন্ধু বলে আদর করতেন।*
*পুরীর বাৎসল্য মুখ্য,রামানন্দের শুদ্ধ সখ্য,*
*গোবিন্দাদ্যের শুদ্ধ দাস্যরস।*
*(ঐ,মধ্য,২য় পরিচ্ছদ)*
*🌹অর্থ্যাৎ কবি,ভক্ত,রসিক ও দার্শনিক রামানন্দ তাঁর রাজ্যবৈভব পরিত্যাগ করে শ্রীচৈতন্যের শ্রীচরণে আত্মসমর্পণ করে তাঁকে সখ্যে বশীভূত করলেন।রামরায়ের বৈরাগ্য সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে,সনাতনের মতই তাঁর ত্যাগের মহিমা।*
*🌷তোমার যৈছে বিষয় ত্যাগ তৈছে তার রীতি।*
*🌷দৈন্য বৈরাগ্য পান্ডিত্য তাহাতেই স্থিতি।।*
*(চৈঃচঃঅন্ত্য, প্রথম)*
*🍀শ্রীপাদ রূপগোস্বামীর সহিত ইষ্টগোষ্ঠীর উপলক্ষ্য করে মহাপ্রভু একজনের অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা এবং অপরের অপূর্ব রসানুভূতি প্রকাশ করবার সুযোগ দিলেন।রস-প্রবীণ রামানন্দ প্রশ্ন-কর্তা,শ্রীরূপ উত্তরদাতা,মহাপ্রভু স্বয়ং বিচারক এবং শ্রীঅদ্বৈত,নিত্যানন্দ,হরিদাস, স্বরূপদামোদর গোস্বামী, সার্বভৌম বাসুদেব ভট্টাচার্য্য প্রভৃতি পন্ডিত ও রসজ্ঞগণ শ্রোতা।শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী এই ইষ্টগোষ্ঠীর বর্ণনায় যথেষ্ট পান্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন।প্রশ্ন ও তার উত্তর উভয়ই সাধারণের পক্ষে দুর্বোধ্য ;উদাহরণের সাহায্যে স্পষ্টীকৃত না হলে এর মধ্যে প্রকাশ করা অনেকের পক্ষেই দুঃসাধ্য ছিল।এই ইষ্টগোষ্ঠীর বিবরণ কতটা প্রকৃত ঘটনার উপর প্রতিষ্ঠিত,তা জানবার উপায় নাই, তবে কবিরাজ গোস্বামীর প্রামাণিকতা সম্বন্ধে সন্দেহের সার্থকতা আছে বলে বোধ হয় না।কারণ তিনি প্রত্যদর্শীর মত যে চিত্রটি অঙ্কিত করেছেন,তাইই এই ব্যাপারে আমাদের অবলম্বন করলে বেশী বলা হয় না। এই ইষ্টগোষ্ঠীতে আমরা দুইজন বিখ্যাত কবি ও দার্শনিকের যে পারস্পরিক সম্বন্ধের পরিচয় পাচ্ছি,তা সহজ সত্যের আভায় উজ্জ্বল। স্বরূপ দামোদর সভাস্থ লোকের সমক্ষে শ্রীরূপগোস্বামীর বিখ্যাত নাটকদ্বয় বিদগ্ধমাধব ও ললিতমাধবের পরিচয় দিচ্ছেন ; তার পূর্বে এই নাটক দুইটি অপরিজ্ঞাত ছিল বলে বোধহয়।রামরায় শ্রীরূপকে সেই সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছেন, আর শ্রীরূপ সবিনয়ে তার উত্তর দিচ্ছেন।যেখানে স্বয়ং অদ্বৈতাচার্য্য, সার্বভৌম ভট্টাচার্য্য উপস্থিত, সেখানে রামানন্দ কেন প্রশ্ন করবার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন,এটি প্রণিধানযোগ্য।বস্তুতঃ রসের বিচারে জগন্নাথবল্লভ নাটক-রচয়িতা রাম রায়ই যে সর্বাপেক্ষা যোগ্য,এটি মহাপ্রভু নিশ্চয়ই জানতেন এবং সভার সকলেরও যে ইহা অনুমোদিত নহে,এরকম অনুমান করা যেতে পারে।শ্রীরূপগোস্বামীর উক্তিতে এই সত্যটি উদঘাটিত হয়েছে।*
*🌷রায় কহে তোমার কবিত্ব অমৃতের ধার।*
*🌷দ্বিতীয় নাটকের কহ নান্দী ব্যবহার।।*
*🌷রূপ কহে কাঁহা তুমি সূর্য্যোপম ভাস।*
*🌷মুঞি কোন্ ক্ষুদ্র যেন খদ্যোত প্রকাশ।।*
*🌹এই বিনয় প্রকাশ শ্রীরূপের পক্ষে যে অত্যন্ত শোভন হয়েছিল,এই তো বৈষ্ণবত্ব।কারণ, জগন্নাথ-বল্লভ নাটকের একমাত্র সমসাময়িক তুলনাস্থল বিদগ্ধমাধব ও ললিতমাধব। শ্রীকৃষ্ণলীলা নিয়ে শ্রীজয়দেব গীতগোবিন্দ প্রণয়ন করেছিলেন, কিন্তু সেটি নাটক নহে, কাব্য।শ্রীরূপগোস্বামীর নাটকদুটি শ্রীচৈতন্যের অন্ত্যলীলায় উল্লিখিত হলেও ললিতমাধব সম্পূর্ণ হতে আরও কিছু সময় লেগেছিল।বিদগ্ধমাধব সম্পূর্ণ হয় ১৫৩২ এবং ললিলমাধব ১৫৩৭ খৃঃঅব্দে। সুতরাং জগন্নাথবল্লভ নাটক যে তার বহু আগে লিখিত হয়েছিল এবং শ্রীচৈতন্যের অপ্রকটের পূর্বেই যে তাঁর পান্ডিত্য ও যশঃ পন্ডিত-সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এইমাত্র অনুমান করা যায়।*
*জগন্নাথবল্লভে সূত্রধার বলছেন যে, তিনি এমন একটি প্রবন্ধ প্রণয়ন করতে আদিষ্ট হয়েছেন যা সম্পূর্ণ অভিনব অর্থ্যাৎ যাতে অন্য কোনও পুরাতন প্রবন্ধের ছায়া না থাকে।*
*🌹অভিনবকৃতিমন্যচ্ছায়য়া নো নিবদ্ধং•••••••*
*🍀ইহা হতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে,শ্রীরূপগোস্বামীর বিখ্যাত নাটক দুয়ের আগেই জগন্নাথবল্লভ রচিত হয়েছিল।শ্রীরূপ ও রামরায়ের কবিতার সমালোচনার জায়গা এটি নয়।তবে নান্দী শ্লোক উভয়ে যে দৈন্য প্রকাশ করেছেন,তার ভঙ্গী দেখলে ইঁনাদের ক্রম বুঝা যায়। "জগন্নাথ বল্লভ"=*
*🌷ন ভবতু গুণগন্ধোহপ্যত্র নাম প্রবন্ধে,*
*🌷মধুরিপুপদপদ্মোৎকীর্ত্তনং নস্তথাপি।*
*🌷সহৃদয়হৃদয়াস্যানন্দসন্দোহহেতু-,*
*🌷নিয়তমিদমতোহয়ং নিষ্ফলো ন প্রয়াসঃ।।*
*🌻এই প্রবন্ধে গুণলেশও না থাকতে পারে,তথাপি শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম সম্বন্ধে আমাদের এই কীর্তন সহৃদয় ব্যক্তির প্রচুর হৃদয়ানন্দের কারণ হবে অতএব এই প্রয়াস কখনও নিষ্ফল হবে না। (কিন্তু বিদগ্ধ-মাধবে )যথা=*
*🌷অভিব্যক্তা মত্তঃ প্রকৃতিলঘুরূপাদপি বুধা,*
*🌷বিধাত্রী সিদ্ধার্থান্ হরিগুণময়ী বঃ কৃতিরিয়ং।*
*🌷পুলিন্দেনাপ্যগ্নিঃ কিমু সমিধমুন্মথ্য জনিতো,*
*🌷হিরণ্যশ্রেণীনামপহরতি নান্তঃ-কলুষতাম্।।*
*🌻হে পন্ডিতগণ! আমি স্বল্প-বুদ্ধি হলেও আমার কবিতা আপনাদের অভিলাষ পূর্ণ সমর্থ হবে ;কেন না,অতি নিকৃষ্ট পুলিন্দ বা শবর কর্তৃক কাষ্ঠঘর্ষণে উৎপন্ন অগ্নি কি কাঞ্চন-সমূহের অন্তর্মালিন্য বিনাশ করে না?*
*🍀কবিত্বের দিক দিয়ে তুলনা করলে শ্রীরূপ গোস্বামীকেই শ্রেষ্ঠ আসন দিতে হয়।বস্তুতঃই রূপের তুলনা নাই।বৈষ্ণব-সাহিত্যে জগন্নাথ বল্লভের কবি অপেক্ষা রূপগোস্বামী যে বহু গুণ বেশী প্রভাব বিস্তার করেছেন,তা কে না স্বীকার করবে? তবে রূপগোস্বামীর উপর রায় রামানন্দের কাব্য কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা সম্যক্ আলোচিত হয় নাই জগন্নাথ বল্লভে রাধা পরকীয়া নায়িকা।*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
🔜 ক্রমাগত 👉 বৈষ্ণব রস-সাহিত্য প্রথম শাখা 🙇 পরম বৈষ্ণব খগেন্দ্র নাথ মিত্র 📖 ষষ্ঠ ভাগ ✍️ লিখনী সেবা- শ্রী জয়দেব দাঁ 📚 এই লিংকে ক্লিক করুন 👉 http://mrinmoynandy.blogspot.com/2023/12/sahityo6.html
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝📝
꧁👇📖 সূচীপত্র ✍️ শ্রী জয়দেব দাঁ 📖👇꧂
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️
নিবাস- বাঁশবাড়ী, কীর্তন মন্দিরের পাশে, পোঃ- বাঁশবাড়ী, থানা- ইংরেজ বাজার, জেলা- মালদহ, পশ্চিমবঙ্গ, পিন কোড- ৭৩২১০১।
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*••••━❀꧁👇 📖 সূচীপত্র 📖 👇꧂❀┅••••*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*••••━❀꧁👇📚 PDF গ্রন্থ 📚👇꧂❀┅••••*
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ
হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রীরাধেগোবিন্দ।।
*••••┉━❀꧁ 🙏 জয় জগন্নাথ 🙏 ꧂❀━┅••••*
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥
*••••┉━❀꧁ 🙏 জয় রাধাকান্ত 🙏 ꧂ ❀━┅••••*
🌷❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🌷
🏵️❀❈❀🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙇🙇🙇🙏🏻🙏🏻🙏🏻❀❈❀🏵️
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
