✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(১১) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*রাগানুগা ভক্তি*
********************
*🍀ভক্তি এবং জ্ঞানের প্রাধান্য নিয়ে অনেক বাদানুবাদ শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু এ সম্বন্ধে দুই একটি কথা স্মরণ না রাখলে স্বভাবতঃ যে বিষয় জটিল,তার জটিলতা আরও বেশী হয় বলে মনে হয়।প্রথমেই মনে রাখা আবশ্যক এই বিষয়টি ভগবৎ-সম্বন্ধী।অন্য কোনও প্রসঙ্গে এ প্রশ্ন উঠতে পারে না। অর্থ্যাৎ বস্তুবিচার বা তত্ত্ব-মীমাংসায় এ বিতর্কের কোনও স্থান নাই।জ্ঞানের দ্বারা বস্তুর স্বরূপ লভ্য হয়। সারসত্যের আলোচনায়ও জ্ঞানই সাধন। কিন্তু ভক্তির দ্বারা বস্তুজ্ঞান লাভ হয় না।যেখানে ভগবানই সারসত্য বা পরমার্থ তত্ত্ব, সেখানে অবশ্য ভক্তির অধিকার আছে। সুতরাং সাধারণ ভাবে বলা যেতে পারে যে, ঈশ্বর যেখানে অনুসন্ধান বা উপলব্ধির বিষয়,সেখানেই ভক্তি ও জ্ঞানের প্রাধান্য বিষয়ক প্রশ্ন উঠতে পারে। দ্বিতীয়তঃ জ্ঞান বলতে কি বুঝি, ভক্তি বলতেই বা কি বুঝি, তা স্থির না হওয়া পর্যন্ত,জ্ঞান ও ভক্তির প্রাধান্যের কথা উঠতে পারে না। প্রাথমিক এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হলে আমাদের মনস্তত্ত্ববিজ্ঞানের স্মরণ নিয়ে হবে।আমরা হয়ত নিজ নিজ মতের প্রতি পক্ষপাতিত্বের আতিশয্যে এই কথাটি অনেক সময়ে স্মরণ রাখি না।জ্ঞান ও ভক্তি উভয়ই চিত্তের ব্যাপার। সুতরাং মনস্তত্ত্ব হতেই এদের সম্বন্ধে জানা যায়।মনোবিজ্ঞান অনুসারে জ্ঞান বা ভক্তিকে পৃথক ব্যাপার বা Crocess বলেই বোধ হয়।তার কারণ এতদুভয়ের ধর্ম অনেকটা পৃথক।যদিও জ্ঞান ও ভক্তি উভয়ই পরিণত মনের ক্ষেত্রে যুগপৎ ক্রিয়াশীল,তথাপি উহাদের কাজ এবং গতি স্বতন্ত্র।জ্ঞানের বিষয়বস্তু সত্য,ভক্তির বিষয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিসাম্য-বিশিষ্ট পদার্থ।একখন্ড শর্করা জ্ঞানের বিষয়ীভূত হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তি-নিরপেক্ষ ভক্তি দেখা যায় না।মানব মনের বিশ্লেষণে যে তিনটি বিভাগ প্রধান বলে বর্ণিত হয় অর্থ্যাৎ চেতনা,অনুভূতি এবং ইচ্ছা,তারমধ্যে চেতনার পরিণতি জ্ঞানে এবং সুখদুঃখরূপা অনুভূতির অবস্থাবিশেষ ভক্তি।অতএব জ্ঞান ও ভক্তিকে পৃথীরূপে না ভেবে উপায় নাই। চিত্তের যে রসস্বরূপ একটি ধর্ম (Sentiment) আছে,ভক্তি তারই ব্যাপার।অথচ এমন অনেকে আছেন যাঁরা জ্ঞান ও ভক্তিকে এক বলে মনে করেন। তাঁদের কাছে পরিবিদ্যাও যা, পরাভক্তিও তাইই।*
*🌺মহাভারতে শান্তিপর্বে ব্রহ্মসংস্থার উল্লেখ আছে।এই "সংস্থা" ভক্তিরেব ন জ্ঞানং।শঙ্করাচার্য্যও এখানে ব্রহ্মসংস্থার অর্থ করেছেন "ব্রহ্মণি সম্যগবস্থিতিঃ।আচার্য্য শঙ্করের ব্রাহ্মীস্থিতি ভক্তির নামান্তর হতে পারে।কারণ যাঁরা যোগদৃষ্টির দ্বারা ব্রহ্মকে লাভ করেন,তাঁদের তন্ময়তা ভক্তি হতে হয়ত পৃথক না। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে ভক্তির স্বরূপ জ্ঞানের দ্বারা পরিমিত না। উপনিষৎ যখন বলেন=*
*যস্যামতং তস্য মতং মতং যস্য ন বেদ সঃ।*
*অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাতমবিজানতাম্।।*
*(কেনোপনিষৎ)*
*🍀অর্থ্যাৎ যিনি জানেন না,তিনিই জানেন,যিনি জানেন,তিনি জানেন না।তাঁর অবিজ্ঞাত এবং যিনি জানেন না,তাঁরই বিজ্ঞাত।জ্ঞানের অনুসরণে আমরা এই রহস্যবাদে উপনীত হই।যাঁকে জানবার জন্য অনাদিকাল হতে মানব-মন ছুটেছে, তাঁকেই জানা যায় না --, এটিই সিদ্ধান্ত করে নিরাশ হতে হয়।কঠোপনিষৎ বললেন যে তিনি আছেন, এইমাত্র বলতে পারা যায়=*
*🌷অস্তীতি ব্রুবতোহন্যত্র কথং তদুপলভ্যতে।*
*🌹যাঁরা তর্ক করেন, তর্কের মুখে এতটুকুও ঢোকে না। সুতরাং উপনিষৎ যখন বললেন যে,তিনি পুত্র হতে প্রিয়, বিত্ত হতে প্রিয়,অন্য সব হতে প্রিয়,তখন আমরা এক নূতন আলোকের সন্ধান পেলাম।আমরা বুঝলাম জ্ঞানের ক্ষুদ্র পরিধি, যে বিরাট পুরুষকে ছুঁই ছুঁই করেও ধরতে পারে না, তিনি প্রেমের কাছে আপনি ধরা দেন। উপনিষদের সেই আলোকে আমরা পথের কিছু সন্ধান পাই, এবং সে সন্ধান পেয়ে ধন্য হই।তাই আমাদের বরেণ্য কবি সকলের হয়ে বলেছেন=*
*🌷তোমারে বলেছে যারা পুত্র হতে প্রিয়।*
*🌷বিত্ত হতে প্রিয়তর যা কিছু আত্মীয়।।*
*🌷সব হতে প্রিয়তম নিখিল ভুবনে।*
*🌷আত্মার অন্তরতম,তাদের চরণে।।*
*🌷পাতিয়া রাখিতে চাহি হৃদয় আমার।*
*🌹ভারতীয় ভক্তিবাদের এটিই মূলসূত্র।ঋষিগণ তাই বললেন=*
*🌷ওঁ ত্রিসত্যস্য ভক্তিরেব গরীয়সী।*
*🌳পাশ্চাত্য পন্ডিত বলেছেন যে ভক্তির উপাদান দুইটি।এক প্রেম, অপর ভয়। REVERENCE IS LOVE MIXED WITH AWE. আমরা তা বলি না, আমরা বলি ভক্তি শুধুই প্রেম।"সা কস্মৈ পরমপ্রেমস্বরূপা"। ভক্তি অর্থে প্রেম,অনুরাগ,রতি,পরমাবিষ্টতা।জ্ঞান স্থির,ধীর,অচল,অটল ; ভক্তি ব্যাকুলময়ী।নারদভক্তিসূত্রে ভক্তিকে "পরম ব্যাকুলতা" বলা হয়েছে। আমরা জানি ভগবদ্ জনের নাম ভক্তি।ভগবদ্-ভজনে যে সব চিত্তবৃত্তির প্রয়োজন হয়,তারমধ্যে প্রেমই শ্রেষ্ঠ।এখানে ভক্তি জানায় কল্প্যতে।অর্থ্যাৎ যাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসা যায়,তাঁকেই সত্যরূপে জানতে পারা যায়। জ্ঞান এবং ভক্তির যোগে তখন চিত্ত বিমল শান্তি লাভ করে।"ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নত্মা ন শোচতি না কাঙ্ক্ষতি"। সব চাওয়া সব পাওয়ার শেষ এখানেই।*
*🌻যীশুখ্রীষ্ট এই ভগবৎ প্রেমের মহিমা কীর্তন করেছিলেন।যখন তাঁকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন এক তার্কিক জিজ্ঞাসা করল,আপনি তো চললে, আপনার শেষ আদেশটি কি প্রভু?যীশুখ্রীষ্ট ব্যথার কন্টকক্ষত হৃদয়ে তাঁকে অমোঘ বাণী শুনিয়ে দিলেন, ভগবানকে ভালবাসা।Love God.*
*🍀কিন্তু এই ভালোবাসা কি পদার্থ, তার সম্যক্ আলোচনা পাশ্চাত্য পন্ডিতেরা বা খ্রীষ্ট্রীয় ধর্ম-যাজকেরা করেন নাই।প্রেম তাঁদের সুপরিচিত একটি চিত্তধর্ম বলেই হোক বা যে কারণেই হোক,ঐ LOVE কথাটিকেই তাঁরা পর্য্যাপ্ত বলে গ্রহণ করেছেন। আমাদের দেশে পন্ডিতগণ কিন্তু ভক্তির প্রেমস্বরূপতা নির্দেশ করে সন্তুষ্ট নহেন। এ প্রেম যে কি বস্তু, তা বলে বুঝান যায় না। "মূকাস্বাদনবৎ"।বোবা যেমন কোনও দ্রব্য আস্বাদন করলে তা ব্যক্ত করতে পারে না,সেরকম। কিন্তু এই প্রেমের একটি গুণ এই যে এটি গুণরহিত,কামনা রহিত। সর্বোপাধি বিনির্মুক্তং তৎপরত্বেন নির্মলং (নারদ পাঞ্চরাত্র)।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🌹🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(১২) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*প্রেমধর্ম*
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
*🍀এরই ব্যাখ্যায় বলা হ'ল=*
*লক্ষণং ভক্তিযোগস্য নির্গুণস্য হ্যুুদাহৃতম্।*
*অহৈতুক্যব্যবহিতা যা ভক্তিঃ পুরুষোত্তমে।।*
*🌻নির্গুণ ভক্তিযোগের এই লক্ষণ= পুরুষোত্তমে যে অহৈতুকী ও অব্যবহিত প্রীতি তারই নাম ভক্তি।অর্থ্যাৎ এটি নির্মল এবং কামশূন্য। এরই প্রতিধ্বনি করে শ্রীপাদ রূপ গোস্বামী বললেন=*
*🌷অন্যাভিলাষিতাশূন্যং জ্ঞানকর্মাদ্যনাবৃতম্।*
*🌷আনুকুল্যেন কৃষ্ণানুশীলনং ভক্তিরুত্তমা।।*
*(ভক্তিরসামৃতসিন্ধু)*
*🍀কোনও অভিলাষ বা বাসনা বা কামনা থাকবে না,জ্ঞানের দ্বারা বিতর্কিত হবে না, কর্মের দ্বারা বাধিত হবে না এমন ভাবে শ্রীকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভজন করলে তাকে উত্তমা ভক্তি বলা যায়।*
*🌹এখন কথা হ'ল যে,কৃষ্ণের ভজন অর্থে যদি তাঁকে "একান্তভাবে আশ্রয় " করা যায়, তাহলে শ্রীমদ্ভাগবতগীতায় যে শরণাগতির কথা বলা হয়েছে,তাইই সাধনতত্ত্বের শেষ কথা বলে মানতে হবে।*
*🌷সর্ব ধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।*
*🌻কিন্তু বৈষ্ণবধর্ম যখন প্রেম ও ভক্তির মধ্যে সমস্ত ব্যবধান ঘুচিয়ে দিল অর্থ্যাৎ ভক্তি ও ভগবৎ-প্রেমের তাদাত্ম্য প্রতিস্থাপিত হ'ল,তখন প্রেম কি বস্তু তা জানবার প্রয়োজন হ'ল।যতই অনির্বচনীয় হোক,প্রেম একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞাবিশিষ্ট চিত্তবৃত্তি।কাজেই সেটির স্বরূপ কি,সেটির উপাদান কি কি প্রণালীতে সেটি পরিণতি প্রাপ্ত হয়,তা অনুসন্ধানের বিষয় হল আগেই বলেছি মনোবিজ্ঞানেই সমস্ত চিত্তবৃত্তির উৎপত্তি ও প্রকৃতি আলোচিত হয়। আমাদের দেশে এই কাজ অলঙ্কারশাস্ত্র করেছেন।পাশ্চাত্য দেশে মনোবিজ্ঞানের অস্তিত্ব সপ্তদশ খ্রীষ্ট্রাব্দের পূর্বে অপরিজ্ঞাত ছিল।অর্থ্যাৎ জানা ছিল না। কিন্তু প্রায় স্মরণাতীত কাল হতে এদেশে অলঙ্কার-শাস্ত্রসমূহ মনোবিজ্ঞানের আলোচনা করে আসছে।কাব্যের আস্বাদ্য হিসাবে প্রেমের স্বরূপ সম্বন্ধে আলোচনা এদেশের অলঙ্কারশাস্ত্রে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।তার কারণ প্রেমই কাব্যের চিরন্তন ও প্রধান আস্বাদ্য বস্তু।ভগবৎ-প্রেম যখন প্রেম পদবাচ্য, তখন এটি সাধারণ নরনারীর অনুরাগ হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হতে পারে না।অপরা অনুরক্তি আমাদের পরিজ্ঞাত।কাজেই পরানুরক্তি তারই সুচির ও চরমোৎকর্ষভূত পরিণতি মনে করতে পারা যায়।সমস্ত অসীমের কল্পনাই সসীমের উপলব্ধি হতে জাত বা জন্ম।প্রেমের যে কামনা-বাসনা-শূন্য আত্মহরা পরিণতি,তাইই ভগবদ্ জনের অনুকূল। ভগবান অনন্ত হতে পারেন, কিন্তু তাঁর পূজোর ফুল মানুষের ঘরের কাছের উদ্যানেই ফুটে।সেইরকম আদর্শ মানবীয় প্রেমের এক অনির্বচনীয় পরিণতি যে ভক্তি তাইই ভগবানকে লাভ করবার একমাত্র অথবা প্রশস্ত উপায় বলে বর্ণিত হয়েছে।তার কারণ এই যে, ভগবান যদি চৈতন্যস্বরূপ হতেন, তাহলে তাঁকে একমাত্র জ্ঞানের দ্বারা লভ্য বলে মনে করতে বাধা ছিল না। কিন্তু তিনি তো কেবল জ্ঞানস্বরূপ নহেন। তিনি সচ্চিদানন্দ-আনন্দঘন বিগ্রহ।*
*🌹ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।*
*(ব্রহ্মসংহিতা)*
*🌻সৎ,চিত্ত ও আনন্দ এই তিনগুণের সমবায়ে সেই পরম ঈশ্বর কৃষ্ণের বিগ্রহ রচিত। বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম (বৃহদারণ্যক) তিনি আনন্দস্বরূপ। আনন্দ হতেই সমস্ত জীব জন্মলাভ করেছে,আনন্দই জীবের উপজীব্য।প্রেমের গঠনে আনন্দই সর্বপ্রধান উপাদান।পাশ্চাত্য মনোবিজ্ঞানও এই কথায় বলেন।LOVE IS THE HIGHEST FORM OF DELIGHT. প্রেমে দুঃখও সুখ।
*🔵দুঃখমপ্যধিকং চিত্তে সুখত্বেনৈব ব্যজ্যতে।*
*🔵যতস্তু প্রণয়োৎকর্ষাৎ স রাগ ইতি কীর্ত্যতে।।উঃনীলমণি।।*
*🌻প্রণয়ের উৎকর্ষ হেতু যে স্থলে চিত্তমধ্যে অতিশয় দুঃখও সুখরূপে অনুভূত হয়,তাকে রাগ কহে।*
*❤মানবজীবনে প্রেমের মত আর কিছুই নাই,চন্ডীদাসের উক্তি।*
*🌷চন্ডীদাস কহে শুনহে নাগরি,*
*পিরীতি রসের সার।*
*🌷পিরীতি রসের রসিক নহিলে,*
*কি ছার জীবন তার।।*
*🌹এখানে রস অর্থে আনন্দ, আনন্দেরই নামান্তর প্রেম।*
*🔶ভগবৎ-প্রেমের করতে গিয়ে মনস্তাত্ত্বিক এই অনির্বচনীয় তত্ত্বে উপনীত হন।প্রেম জ্ঞানের মত শান্ত ও স্থির নহে ; মানুষের প্রায় সমস্ত EMOTION বা SENTIMENT চিত্তকে চঞ্চল করে তোলে।প্রেম ব্যাকুলতায় ভরা।যেখানে ব্যাকুলতা নেই,সেখানে প্রেম নেই।শান্তশিষ্টভাবে ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসা পাগল কোরে ছাড়ে এরই নাম "রাগ"।*
*🌷ইষ্টে স্বারসিকী রাগঃ পরমাবিষ্টতা ভবেৎ।*
*🌷তন্ময়ী যা ভবেদ্ ভক্তিঃ সাহত্র রাগাত্মিকোদিতা।।*
*(রাগবত্মর্চন্দ্রিকা=বিশ্বনাথ চক্রবর্তী)*
*🌹এই যে পরমাবিষ্টতা,একান্ত তন্ময়তা, এতে শ্রুতি,বুদ্ধি বা শাস্ত্র জ্ঞানের অপেক্ষা করে না।*
*🌷নাত্র শাস্ত্রং ন যুক্তিঞ্চ তল্লোভোৎপত্তি-কারণং।*
*(শ্রীপাদ রূপগোস্বামী)*
*🌷ইষ্টে গাঢ়তৃষ্ণা এই স্বরূপলক্ষণ*।
*🌷ইষ্টে আবিষ্টতা এই তটস্থ লক্ষণ।।চৈঃচঃ।।*
*❤প্রেমের লক্ষণ গাঢ়তৃষ্ণা।কাজেই ভক্তিবাদের আলোচনায় আমরা এক নূতন স্তরে উপনীত হলাম।প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে যে আবিষ্টতা দেখা যায়,যা কোনও কিছুর অপেক্ষা করে না,যা শাস্ত্রের শাসন মানে না,যা ধর্মাধর্মের বিচার রাখে না,যাতে উৎকট লোভই হয় পথপ্রদর্শক, তাইই ভক্তি।এই ভক্তির নামই রাগানুগা ভক্তি।*
*🌷কৃষ্ণ তদ্ ভক্ত কারুণ্যমাত্রলোভৈক হেতুকা।*
*🌷পুষ্টিমার্গতয়া কৈশ্চিদিয়ং রাগানুগোচ্যতে।।*
*(ভক্তিরসামৃতসিন্ধু)*
*🌻এই যে ধর্মাধর্ম নিরপেক্ষ ভক্তিবাদ এটি সর্বসম্মত হতে পারে নাই। কারণ আমরা দেখি এক দলভক্ত বলছেন যে,এতে উৎপাতের সৃষ্টি হতে পারে।*
*🌷শ্রুতি স্মৃতি পুরাণাদি পঞ্চরাত্রবিধিং বিনা।*
*🌷ঐকান্তিকী হরের্ভক্তিরুৎপাতায় কল্প্যতে।।*
*🌹যাঁরা এই রাগানুগা ভক্তির দুর্লভ এবং আশঙ্কাপূর্ণ পন্থা অনুসরণ করতে ইচ্ছে করেন না,তাঁদের জন্য বৈধীভক্তি উপদিষ্ট হয়েছে।রাগমার্গে ভজনশীল ব্যক্তিও বিধিমার্গ পরিত্যাগ করবেন না, এটিই রূপ গোস্বামীপাদের অভিমত বলে বোধ হয়।*
*🌷বস্তুতত্ত্ব লোভপ্রবর্তিতং বিধি মার্গেণ সেবনমেব রাগমার্গ উচ্যতে*।
*🍀পশ্চিমাঞ্চলে বল্লভাচার্য্য কর্তৃক পুষ্টিমার্গ উপদিষ্ট হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গদেশে বোধহয় শ্রীরূপগোস্বামী প্রথমে এর উল্লেখ করেন।অন্ততঃ শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবর্তীর সেইরকম ধারণা ছিল কারণ তিনি রাগবত্মর্চন্দ্রিকায় তাঁকেই সর্বাগ্রে নমস্কার করেছেন।*
*🌷শ্রীরূপবাকসুধাস্বাদি চকোরেভ্যো নমঃ নমঃ।*
*🌷যেষাং কৃপালবৈর্বক্ষ্যে রাগবত্মনি চন্দ্রিকাম্।।*
*শ্রীপাদ কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীচৈতনের শ্রীমুখ দিয়ে এই রাগানুগা ভক্তির ব্যাখ্যা শুনিয়েছেন।*
*🌷রাগানুগাভক্তির লক্ষণ শুন সনাতন।*
☆ ☆ ☆ ☆
*🌷ইষ্টে গাঢ়তৃষ্ণা রাগ-স্বরূপ লক্ষণ।*
*🌷ইষ্টে আবিষ্টতা, এই তটস্থ লক্ষণ।।*
*🌷রাগময়ী ভক্তির হয় রাগাত্মিকা নাম।*
*🌷তাহা শুনি লুব্ধ হয় কোন ভাগ্যবান।।*
*🌷লোভে ব্রজবাসী-ভাবে করে অনুগতি।*
*🌷শাস্ত্রযুক্তি নাহি মানে রাগানুগার প্রকৃতি।।*
*🌷বাহ্য অন্তর ইহার দুই ত সাধন*।
*🌷বাহ্যে সাধক দেহে করে শ্রবণ কীর্তন।।*
*🌷মনে নিজ সিদ্ধ দেহ করিয়া ভাবন।*
*🌷রাত্রি দিনে করে ব্রজে কৃষ্ণের সেবন।।*
*🙏এটি কৃষ্ণভজন প্রণালীর সঙ্কেত এবং ভক্তির ব্যাখ্যায় এটিই এ পর্যন্ত সর্বশেষ স্তর বলে মনে হয়।*
🦚🦋🙏🪔🌷🦜🌸🪷🦚🦋🪔🌷🌸🪔
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(১৩) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেমের আদর্শ*
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
*🌹বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেমের যে আদর্শ স্থাপিত হয়েছে,অন্য কোথায়ও তার তুলন মিলে না।অন্য অনেক সাহিত্যেও প্রেমের বর্ণনা আছে, আস্বাদন আছে,তাতেও আমাদের মন মুগ্ধ হয়। কিন্তু প্রেম যেমন বৈষ্ণবের সর্বস্ব,জোর গলায় বলতে পারি এমনটি আর কোথাও নাই।বৈষ্ণবের আরাধ্য প্রেম,বৈষ্ণবের ভজন প্রেম, বৈষ্ণবের সাধন প্রেম,বৈষ্ণবের স্বর্গও প্রেম।বৈষ্ণব সাহিত্য প্রেমের কবিতা, বৈষ্ণবের গান প্রেমের গান,বৈষ্ণবের ভগবান প্রেমময়, "প্রেম দিয়ে গড়া তনু"।তাঁদের মতে সংসারের পঞ্চম পুরুষার্থ প্রেম।তাঁরা ভুক্তি বা ভোগের কামনা করেন না,মুক্তিরও কামনা করেন না।আনন্দকন্দ শ্রীনন্দনন্দনই তাঁদের একমাত্র কাম্য।*
*🌻ভগবানের সহিত মানুষের যে প্রেমের সম্বন্ধ, সে কথা অন্য অনেক ধর্মে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বৈষ্ণবগণ যেমন প্রেমের তত্ত্ব উপলব্ধি করেছিলেন, অন্য কোনও মতবাদে তার শতাংশের একাংশও পাওয়া যায় না।বৈষ্ণবগণ তত্ত্বের দিক দিয়ে প্রেমকেই ধর্মের ভিত্তি করেছেন।ধর্মে প্রেমের প্রয়োজন আছে বলিয়া তাঁরা ক্ষান্ত হন নাই,প্রেমকেই ধর্মে পরিণত করেছেন।এই পরিণতির ফলে বৈষ্ণব কাব্যের গূঢ় অর্থ হয়েছে এই যে,এটি উপাস্যেরই স্তুতি।বৈষ্ণব সঙ্গীত মাত্রই ভজন।ভজনই ভগবৎ-প্রাপ্তির একমাত্র উপায়।কাজেই বৈষ্ণব সাহিত্যের মণিমন্দির এই প্রেম-কবিতায় ভরে গেল।পূজার ফুলের মত এই কবিতার রাশি বাঞ্জিতের চরণোপান্তে সঞ্চিত হয়ে স্তূপাকার হয়েছিল। গানে গানে দেশের আকাশ বাতাস একদিন পূর্ণ হয়েছিল।কারণ গীতায়, ভাগবতে বলা হয়েছে যে,"একমাত্র ভক্তির দ্বারাই তাঁকে লাভ করা যায় "।এই ভক্তিই প্রেম।যার নাম ভক্তি তাইই যখন প্রেম বলে নিরাকৃত হল,তখন কাব্যে,কবিতায় প্রেমের নির্ঝর উচ্ছসিত হয়ে উঠিল।*
*🌺আমরা সাধারণ ভাবে স্থির করে নিয়েছি যে, সংসারে নরনারীর মধ্যে যে সর্বগ্রাসী আকর্ষণ,তাইই বৈষ্ণবদের প্রেম।কথাটা যে একেবারে অমূলক,তা হয়ত নয়। কারণ ভাষা মানুষের স্বাভাবিক মনোভাব প্রকাশ করবার জন্যই কল্পিত হয়। আমরা প্রিয়তমের জন্য যে মালা গাঁথি,তাইই আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য।কাজেই দেবতার উদ্দেশ্যে আমরা যা নিবেদন করি তাও আমাদের সেই বিরলে গাঁথা মালাখানি, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন=*
*🌷প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই,*
*🌷তাই দিই দেবতারে,আর পাবো কোথা?*
*🌹কিন্তু বৈষ্ণবগণ এই পার্থিব গন্ডী অতিক্রম করে তাঁদের প্রেমকে এক অনাস্বাদিতপূর্ব অপ্রাকৃত জগতে নিয়ে গিয়েছেন।তাঁরা বলেন, এ প্রেম বুঝানো যায় না, এটি এক অনির্বচনীয় ব্যাপার। নারদ ভক্তিসূত্রে বলেছেন, "অনির্বচনীয়ং প্রেমস্বরূপং"। একজন হিন্দী কবি তার প্রতিধ্বনি করে বললেন=*
*🌷প্রেম হৃদয়কী বস্তু হ্যায় পরমগুহ্য আনমোল।*
*🌷কথনীমে আবৈ নহী সকৈন কোউ বোল।।*
*🌹ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এই গুহ্যাতিগুহ্য প্রেম,এটি অনুভবের বস্তু অর্থ্যাৎ হৃদয়ে (ভাগ্যগুণে) যদি বা অনুভূত হয়,কথায় তা প্রকাশ করা যায় না।আর একজন ভক্ত কবি এই প্রেমের লক্ষণ বলেছেন=*
*🌷রসময় স্বাভাবিক বিনা স্বারথ অচল মহান্।*
*🌷সদা এক রস বঢ়ত নিত শুদ্ধ প্রেম রসখান।।*
*🌻এই "রসখান" একজন পাঠান ছিলেন।উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে ইনি একজন ধনী গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন। ঘটনাচক্রে শ্রীকৃষ্ণের রূপ দেখে রসখান মুগ্ধ হলেন।ইঁনার কবিতায় যে ভক্তিভাব ফুটেছে,তা সত্যই অদ্ভুত। যাইহোক,উপরে যে কাব্যাংশ উদ্ধৃত হয়েছে,তা হতে বুঝা যায় যে,প্রেমের স্বরূপ সম্বন্ধে বাংলার বাইরেও বৈষ্ণবদের ধারণা কত উচ্চে উঠেছিল।প্রেম বিশুদ্ধ,সহজ,নিঃস্বার্থ, অচল ও মহান, নিত্য বৃদ্ধিশীল এবং চির-আনন্দ-স্বরূপ।ভক্তিসূত্রেও এই লক্ষণ আমরা দেখতে পাই=*
*গুণরহিতং কামনারহিতং প্রতিক্ষণ বর্দ্ধমানং,*
*অবিচ্ছিন্নং সূক্ষ্মতরমনুভবস্বরূপম্*।
*(নারদ ভক্তিসূত্র=৫৪)*
*❤এই প্রেম সূক্ষ্মাদপিসূক্ষ্ম এবং কেবল অনুভূতিবেদ্য।*
*🌹প্রেম যে কি বস্তু,তা নির্দেশ করাও যায় না, অথচ বৈষ্ণবগণের চেষ্টারও অবধি নাই।যা সহজে জানা যায় না,তাইই জানবার জন্য মানুষের অফুরন্ত কৌতূহল। কিন্তু বৈষ্ণবদের মত এত কৌতূহল আর কেউ দেখাননি, আর এত বিশ্লেষণও অন্য কোন জায়গায় দেখা যায় না। শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে শ্রীরূপ গোস্বামীর মিলন প্রসঙ্গে যে প্রেমতত্ত্ব ব্যাখ্যা আমরা পাই,তা মনস্তত্ত্বের দিক দিয়েও বিস্ময়কর। মহাপ্রভু বলেছেন যে =*
*🌷সাধন ভক্তি হৈতে হয় রতির উদয়।*
*🌷রতি গাঢ় হৈলে তারে প্রেম নাম কয়।।*
*🌷প্রেম বৃদ্ধিক্রমে নাম স্নেহ মান প্রণয়।*
*🌷রাগ অনুরাগ ভাব মহাভাব হয়।।*
*🌺অর্থ্যাৎ প্রেম হৃদয়ে সঞ্জাত বা জন্ম হলে সেটি স্নেহমান প্রণয় রাগ অনুরাগের মধ্য দিয়ে ভাব ও পরে মহাভাবে পরিণত হয়। সুতরাং প্রেমের স্তর বিন্যাসে মহাভাবই প্রেমের পরাকাষ্ঠা।এই মহাভাব আবার দুইপ্রকার=রূঢ় ও অধিরূঢ়।গোপীকাগণের যে প্রেম তার নাম "অধিরূঢ়" মহাভাব।এর মধ্যেও আবার বিরহে যে অধিরূঢ় মহাভাব হয় তার নাম "মোহন"। মোহনাখ্য মহাভাবে দিব্যোন্মাদ হয় যাতে সমস্তই কৃষ্ণময় হয়ে যায়, এমনকি নিজেকেও কৃষ্ণ বলিয়া ভ্রম হয়।*
*🌷অনুখন মাধব মাধব সোঙরিতে,*
*সুন্দরি ভেলি মাধাই। বিদাপতি*।
*🍀আবার এর বহু পূর্বে শ্রীজয়দেব গোস্বামী লিখেছেন=*
*🌷মুহুরবলোকিত-মন্ডনলীলা,*
*🌷মধুরিপুরহমিতি ভাবনশীলা।।*
*🌻এই দিব্যোন্মাদই প্রেমের বিবর্তনে শেষ কথা। তখন ভক্ত =*
*🌷স্থাবর জঙ্গম দেখে না দেখে তাঁর মূর্তি।*
*🌷যাঁহা যাঁহা নেত্র পড়ে তাঁহা কৃষ্ণস্ফূর্তি।।*
👣👣👣👣👣👣🙏👣👣👣👣👣👣
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(১৪) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেমের আদর্শ*
********************************
*🌹বৈষ্ণব অলঙ্কার শাস্ত্রে প্রেম নামক চিন্ময় রসের যে স্তর-পরম্পরা বর্ণিত হয়েছে,তা অন্য কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। সুতরাং প্রেম বৈষ্ণবগণের আদর্শ বা লক্ষ্য,এটি বলিলেই সব বলা হল না। যে প্রেম ঈশ্বর-প্রাপ্তির একমাত্র সাধন বা উপায়,তার স্বরূপ নির্ণয় করা বড় সহজ নহে। বর্তমান প্রবন্ধে আমি শুধু এইই বলতে চাই যে,বৈষ্ণব তত্ত্ববিদগণ প্রেমের সুর এইরকম উচ্চগ্রামে বেঁধেছিলেন বলেই বৈষ্ণব কাব্যে এর এত প্রসার দেখতে পাই। "বৈষ্ণব পদকর্তাগণ প্রেমের কথা বলতে অজ্ঞান।কোনও উপমাই ইঁনাদের বাদ পড়ে নাই,তথাপি যেন তৃপ্তি নাই।এত বলেও বলার শেষ নাই। প্রেম যে অনির্বচনীয় বস্তু,কাব্য কথার স্বর্ণসূত্রে সে গাঁথা পড়তে চাহে না। (বিদ্যাপতির রাধা উপমার পর উপমা সাজিয়েছেন,পঞ্চ প্রদীপের মত আরতি করে তাঁর প্রেমকে উজ্জ্বল করে তুলেছেন, কিন্তু কিছুতেই তৃপ্তি হচ্ছে না)।*
*🌷হাথক দরপণ মাথক ফুল।*
*🌷নয়নক অঞ্জন মুখক তাম্বুল।।*
*🌷হৃদয়ক মৃগমদ গীমক হার।*
*🌷দেহক সরবস, গেহক সার।।*
*🌷পাখীক পাখ,মীনক পানি।*
*🌷জীবক জীবন হাম তুহুঁ জানি*
*🌷তুহুঁ কৈসে মাধব কহ তুহুঁ মোয়*।
*🌷বিদ্যাপতি কহ দুহুঁ দোহা হোয়।।*
*🌻হে রাধে প্রিয়তম তুমি আমার হাতের আরসী,মাথার ফুল,আঁখির কাজল,অধরের তাম্বুল,হিয়ার মৃগমদচিত্র,গলার মালা,দেহের সর্বস্ব, সংসারের সার,পাখীর পাখা,মীনের নীর,জীবনের জীবন, এত বলেও বলার শেষ হল না। শেষে বলছেন,তুমি কেমন আমাকে বলে দাও।বিদ্যাপতি বলছেন, তোমরা উভয়ে উভয়ের তুলনা, অর্থ্যাৎ তোমাদের তুলনা নাই।*
*🌺চন্ডীদাস রাধাকৃষ্ণ প্রেমের তুলনার জন্য প্রকৃতির ভান্ডার উজাড় করেছেন,তথাপি সে প্রেমের নাগাল পাওয়া গেল না।*
*🌷এমন পিরীতি কভু দেখি নাহি শুনি।*
*🌷পরাণে পরাণ বান্ধা আপধা আপনি।।*
*🌷দুহু কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।*
*🌷আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।।*
*🌷জল বিনু মীন যেন কভু নাহি জীয়ে।*
*🌷মানুষে এমন প্রেম কোথা না শুনিয়ে।।*
*🌷ভানু কমল বলি সেহো হেন লয়।*
*🌷হিমে কমল মরে ভানু সুখে রয়।।*
*🌷চাতক জলদ কহি-- সে নহে তুলনা।*
*🌷সময় নহিলে সে না দেয় এক কণা।।*
*🌷কুসুমে মধুপ কহি সেহো নহে তুল।*
*🌷না আইলে ভ্রমর আপনি না যায় ফুল।।*
*🌷কি ছার চকোর চান্দ দুহুঁ সম নহে।*
*🌷ত্রিভুবনে হেন নাহি চন্ডীদাস কহে।।*
*🌹এইসব উপমা সম্বন্ধে বিদাপতি ও চন্ডীদাসের মধ্যে অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু ত্রিভুবনে এর তুলনা হয় না। মুরারি গুপ্ত সেইজন্য বলেছেন=*
*খাইতে শুইতে রৈতে,আন নাহি লয় চিতে,*
*বঁধূ বিনা আন নাহি ভায়।*
*মুরারি গুপতে কহে,পিরীতি এমনি হৈলে,*
*তার গুণ তিন লোকে গায়।।*
*🌻বিদ্যাপতির একটি উপমা মামুলি বুলি ছড়িয়ে গিয়েছে।*
*🌷খোঁজলুঁ সকল মহীতল গেহ।*
*🌷খীর নীর সম ন হেরল নেহ।।*
*🌷যব কোই বেরি আনল মুখ আনি।*
*🌷খীর দন্ড দেই নিরসত পানি।।*
*🌷তবহুঁ খীর উমড়ি পড় তাপে।*
*🌷বিরহ বিয়োগে আগ দেই ঝাঁপে।।*
*🌷যব কোই পানি আনি তাহি দেল।*
*🌷বিরহ বিয়োগ তবহি দূর গেল*।।
*🌷ভণই বিদ্যাপতি এহেন সুনেহ।*
*🌷রাধামাধব ঐসন নেহ।।*
*🌹সমস্ত পৃথিবী খুঁজিলাম দুগ্ধ ও জলের মধ্যে যে প্রেম, তার তুলনা দেখলাম না।যদি কেউ জলমিশ্রিত দুধ আগুনে চাপিয়ে দেয় এবং জল শুকিয়ে দেয়(নিরসত),তাহলে দুধ উথলিয়ে জলের বিরহে আগুনে ঝাঁপ দেয়।তখন যদি কেউ তাতে একটু জল দেয়, তখন বিরহ দূরে যায় এবং দুধ শান্ত ভাব অবলম্বন করে। বিদাপতি বলছেন যে,এরই নাম প্রেম এবং রাধামাধবের প্রেম এইরকমই।*
*🌺গোবিন্দদাসের রাধা যখন বিরহে কাতর,মিলনের আর কোনও আশাই দেখা যায় না, তখন মরণে মিলন কামনা করছেন।*
*🌷যাঁহা পহুঁ অরুণ চরণে চলি যাত।*
*🌷তাহাঁ তাহাঁ ধরণি হইয়ে মঝু গাত।।*
*🌷যো সরোবরে পহুঁ নিতিনিতি নাহ।*
*🌷মঝু অঙ্গ সলিল হোই তথি মাহ।।*
*🌷এ সখি বিরহ মরণ নিরদন্দ।*
*🌷ঐছন মিলই যব গোকুল চন্দ*।।
*🍀হে সখি!আজ বিরহ মরণ নির্দ্বন্দ্ব হোক,যাতে আমি (মরণের মধ্য দিয়ে ) আমার প্রিয়তমকে লাভ করতে পারি। আমার শরীরের পঞ্চভূত পঞ্চভূতে মিশে যাক এবং আমার অঙ্গপ্রিয়তমের গমন পথের মৃত্তিকা হোক।যে সরোবরে প্রিয়তম নিত্য স্নান করেন, আমার অঙ্গের সলিলাংশ যেন সেই সরোবরের সলিল বা জল হয়।*
*🙏এ প্রেম কি এতই সহজ? ভগবদগীতা যে বলেছেন "মামেকং শরণং ব্রজ" সেই "কৃষ্ণৈকশরণ" কি কথার কথা?*
*পীরিতি পীরিতি, সব জন কহে,*
*পীরিতি সহজ কথা।*
*বিরিখের ফল, নহে তো পীরিতি,*
*নাহি মিলে যথাতথা।।*
*(সংস্কৃত কাব্যের অনুকরণে এ কবিতা রচিত)।*
*পিরীতি লাগিয়া, আপনা ভুলিয়া,*
*পরেতে মিশিতে পারে।*
*পরকে আপন, করিতে পারলে,*
*পিরীতি মিলয়ে তারে।।*
*দুই ঘুচাইয়া, এক অঙ্গ হও,*
*থাকিলে পিরীতি আশ।*
*পিরীতি সাধন, বড়ই কঠিন,*
*কহে দ্বিজ চন্ডীদাস।।*
*🍀বৈষ্ণব কবিদের মধ্যে চন্ডীদাসের মত পিরীতি পাগল আর কেউ ছিলেন কিনা সন্দেহ আছে।চন্ডীদাসের প্রেমের আদর্শ আজও অম্লান শুভ্রতায় সদ্যঃপ্রস্ফুটিত যুঁই ফুলের মত দেবতার বেদীমূলে উজ্জ্বল হয়ে আছে।প্রেমে-- এমন কি মানবীয় প্রেমে, যে তন্ময়তা আনে,তারই চরম বিকাশ চন্ডীদাসের প্রেমে। গীতায় যেমন ভগবান বলেছেন=*
*যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি।*
*তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি।। ষষ্ঠ অঃ।।*
*🌺এই রকম প্রেমিক ভক্ত প্রকৃত প্রম উপলব্ধি করতে পারেন।তাঁর চিত্ত কৃষ্ণময় হয়ে যায়।চক্ষু কৃষ্ণ বিনা আন কিছু দেখে না,কান মধুরাতিমধুর ব্রহ্মময়ী বেণুধ্বনি বিনা আর কিছুই শুনে না।নাসিকা সেই অঙ্গ-সৌরভে পাগল হয়।জিহ্বা সবসময়ই তাঁরই নামলীলারসে বিভোর হয়।এরই নাম কৃষ্ণপ্রেম।তখন দিনরাত্রি ঘরপর কিছুই আর জ্ঞান থাকে না।*
*🌷ঘর কৈনু বাহির বাহির কৈনু ঘর।*
*🌷পর কৈনু আপন আপন কৈনু পর।।*
*🌷রাতি কৈনু দিবস দিবস কৈনু রাতি।*
*🌷বুঝিতে নারিনু বঁধূ তোমার পিরীতি।।* *(চন্ডীদাস)*
*📿কলঙ্ক সে তো গলার হার।গরব করে কলঙ্কের হার পরতে সাধ হয়।কারও কথায় কিছু আসে যায় না।বিধি নিষেধেরও তখন অধিকার থাকে না।*
*🌺বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে,*
*ভিতর দুয়ার খোলা।*
*🌺(তোরা)নিসাড়া হইয়া আইলো সজনি,*
*আঁধার পেরিয়ে আলা।।*
*🌻যে সেই সমুদ্রে ডুব দিয়েছে,তার পক্ষে বাহির জগতের অস্তিত্ব লুপ্ত হয়েছে।বাহির জগৎ খোলা খোলা থাকতে তো অনুভূতি প্রাণে জাগে না। যোগে যেমন চিত্তবৃত্তি নিরোধ হয়, এই প্রেমের যোগীরও সেইরকম সর্বেন্দ্রিয়বৃত্তি প্রেমাস্পদের অনুভূতিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তোরা কথা কহিস না, অনুভূতির নেশা ছুটে যাবে।ক্ষণিকের জন্য হয়ত মনে হবে যে,বহির্জগৎ হতে চিত্ত বিযুক্ত হলে বুঝি আর কিছুই রইল না, শুধু অন্ধকার। কিন্তু তা না,কিছুক্ষণ পরেই চিত্তে প্রেমের যে নির্মল জ্যোতি ফুটে উঠবে,তাতে জীবনের সমস্ত আঁধার, সমস্ত সংশয় নিমেষে অন্তর্হিত হয়ে যাবে।*
*🍀আর একজন কবি কি ভাবে এই একান্ত আত্ম-বিলয়ের কথা বলেছেন, এই বলেই প্রেমের কথা বিরাম দেব।*
*🌻শ্রীমতী বলছেন=*
*🌷নব রে নব রে নব নবঘন-শ্যাম*।
*🌷তোমার পিরীতিখানি অতি অনুপাম।।*
*🌷তোমার পিরীতি-সুখ-সায়রের মাঝ।*
*🌷তাহাতে ডুবিল মোর কুলশীল লাজ।।*
*🌷কি দিব কি দিব বন্ধু মনে করি আমি।*
*🌷যে ধন তোমারে দিব সে ধন আমার তুমি।।*
*🌷তুমি যে আমার বন্ধু আমি যে তোমার।*
*🌷তোমার ধন তোমারে দিব কি যাবে আমার।।*
*🌹ত্বদীয়তাময় এবং মদীয়তাময় প্রেমের দুইটি ধারা এখানে একত্র মিশে গিয়েছে।এই নিত্য নবায়মান প্রেমে তুমি-আমির পালা শেষ হয়ে এক অখন্ড,অনবছিন্ন, সম্পূর্ণ,কেবলানন্দময় অনুভূতি জাগরিত হয়।*
*হৃদয় মন্দিরে মোর, কানু ঘুমাওল,*
*প্রেম প্রহরী রহু জাগি।*
*(গোবিন্দ দাস)*
*🌷আমার হৃদয় মধ্যে প্রমময় ভগবান একাত্ম হয়ে মিশে গিয়েছেন, প্রেমই শুধু জেগে আছে।*
🙏🌸🪔🦚🌷🦋🦜🪷🌷🦚🪔🌸
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(১৫) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*ভক্তিবাদ ও শ্রীমদ্ভাগবত*
••••••••••••••••••••••••••••••••
*🙏ভক্তিবাদ অতীব প্রাচীন। বতর্মানে যে সব ধর্মমতের প্রতি লোকের আস্থা দেখা যায়,তার সবগুলির মধ্যেই ভক্তিবাদ অল্পাধিক পরিমাণে মিশ্রিত আছে। কিন্তু এমন এক সময় ছিল,যখন ভক্তিবাদ লোকের মন আকৃষ্ট করবার জন্য বিশেষভচেষ্টিত হয়েছিল। ভগবদ্ গীতায় এর কিছু আভাস পাওয়া যায় ; চতুর্থ অধ্যায়ে উক্ত হয়েছে ঃ---*
*🌷ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্।*
*🌷বিফস্বান্ মনবে প্রাহ মনুরিক্ষাকবেহব্রবীৎ।।*
*🌻ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বরছেন যে,তিনি পূর্বে এই অব্যয় যোগ সূর্য্যকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, সূর্য্য তাঁর পুত্র মনুকে এবং মনু ইক্ষাকুকে বলেছিলেন। নিমি প্রভৃতি রাজর্ষিগণ পরম্পরাক্রমে এই যোগ অবগত হয়েছিলেন। কিন্তু কালবশে এই যোগ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।আজ আমি তোমাকে সেই পুরাতন যোগের কথা বলছি।*
*🌷স এবায়ং ময়া তেহদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ।*
*🌷ভক্তোহসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্।।*
*(গীতা=৪র্থ অঃ)*
*🍀অর্জুনের মনে সংশয় হল।তিনি বললেন,তুমি তো আধুনিক অর্থ্যাৎ এখন বতর্মান, বিবস্বান্ (সূর্য্য) প্রাচীন কালের একজন, তুমি কিভাবে তাঁকে এই যোগ শিক্ষা দিলে? তার উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, "আমি অজ হয়েও বহুবার জন্মগ্রহণ করেছি,তুমিও তাই।আমি সেসব রহস্য জানি, তুমি অবিদ্যার অধীন বলে ভুলে গিয়েছ। যাইহোক, গীতারও বহু পূর্বে যে এই ভক্তিতত্ত্ব ভারতে সুবিদিত ছিল,তা বুঝা যায়।গীতার রচনাকাল নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে সুপ্রসিদ্ধ পন্ডিত জ্যাকোবি প্রভৃতির মতে গীতা মহাভারতের অংশ হলেও সেটিতে প্রথমে কোন ধর্মতত্ত্ব ছিল না। গীতার যে সমস্ত শিক্ষা সভ্যজগতের বিস্ময় ও শ্রদ্ধা উৎপাদন করেছে, সেটি নাকি পরবর্তী কালের যোজনা! এরকম মতবাদের সারবত্তা সম্বন্ধে পন্ডিতগণের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, ভক্তিবাদ যে খ্রীষ্ট-জন্মেরও পূর্ব হতে ভারতে পরিজ্ঞাত ছিল,এটি অস্বীকার করা যায় না।*
*🌹ভক্তিবাদের প্রধান প্রচারক ছিলেন পাঞ্চরাত্র সম্প্রদায়।মহাভারতের শান্তিপর্বে যে "হরিগীতং পুরাতনম্" আছে, তা এই পাঞ্চরাত্র সম্প্রদায়েরই মত।শান্তিপর্ব এবং তদন্তর্গত মোক্ষধর্ম ও নারায়ণীয় পরবর্তীকালে সংযোজিত বলে কোন কোন পন্ডিত মত প্রকাশ করেছেন।এইরকম প্রক্ষেপবাদ হতে পরিত্রাণ পাওয়া অবশ্য সুদুষ্কর। কিন্তু অনেক জায়গায় দেখা যায়, এরকম মতবাদের ভিত্তি নিতান্তই শিথিল। দক্ষিণদেশের একটি জায়গা বোধহয় উত্তর-ভারতের পদাবলী।এইসব তামিল দেশীয় ভক্তকবি খ্রীষ্টীয় তৃতীয় হতে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে আবির্ভূত হন বলে জানা যায়।ইঁনাদের ভক্তিবাদ "দ্রাবিড়াম্নায়" নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।এর এক অংশ দ্রাবিড় সামবেদ নামে কথিত।শঠারি,শটকোপ বা নম্মা আলবার এই সামবেদের রচয়িতা।নম্মা আলবার সম্বন্ধে কথিত আছে যে তিনি ষোল বৎসর বয়স পর্যন্ত মৌন ছিলেন।এই সময়ে তিনি এক বকুল বৃক্ষের তলে বসে থাকতেন এবং ভগবান অনেক সময়ে তাঁকে দেখা দিতেন।ষোল বৎসরের পর তিনি যখন "প্রকাশ" হলেন তখন লোকে দেখল যে তাঁর দেহে নানা অলৌকিক ভাব প্রকটিত হয়।অশ্রুকম্প,পুলক প্রভৃতি সাত্ত্বিক লক্ষণগুলি দেখা দিল।তিনি কখনও হাসেন, কখনও কাঁদেন, কখনও নৃত্য করেন, আবার কখনও গান করেন।এই সমস্ত দেখে লোকে তাঁকে অসাধারণ ব্যক্তি বলে বুঝতে পারল।কেউ কেউ তাঁকে বিষ্ণুর অবতার বলতেও কুন্ঠিত হতেন না। নম্মা আলবারের শিষ্য মধুরকবি নামক আলবার বলেছেন যে, ব্রজরমণীগণের যে ভাব ছিল শ্রীকৃষ্ণে, শঠারি মুনিরও সেই সব ভাব দেখা যেত। ভাগবতেও আমরা অনুরূপ ভাবের বর্ণনা পাই।*
*🌷এবং ব্রতঃ স্বপ্রিয় নামকীর্ত্ত্যা,*
*জাতানুরাগো দ্রুতচিত্ত উচ্চৈঃ।*
*🌷হসত্যথ রোদিতি রৌতি গায়,*
*তুন্মুত্তবৎ নৃত্যতি লোকবাহ্যঃ।।*
*(ভাঃ=১১|২|৪০)*
*🌻তামিল দার্শনিক কবি বেদান্তদেশিকাচার্য্য "তাৎপর্য্য রত্নাবলী" নামক গ্রন্থ, শঠারি সম্বন্ধে বলেছেন যে, তিনি ব্রজরমণীগণের রীতি অবলম্বনে ভগবানকে আস্বাদন করেছিলেন=*
*🌷ব্রজযুবতীগণ-খ্যাতনীত্যাহন্বভুংক্ত।*
*🌹অর্থ্যাৎ ব্রজযুবতীগণ যে ভাবে শ্রীকৃষ্ণকে আস্বাদন করেছিলেন,ইনি (শঠারি) সেই বিখ্যাত নীতিতে ভগবান কে উপভোগ করেছিলেন। এখানে আমরা মধুর ভাব বা কান্তাভাবের উপাসনা-পদ্ধতির সর্বপ্রথম পরিচয় লাভ করেছে।আলবারদের মধ্যে ১২ জন খুব বিখ্যাত হয়েছিলেন।ইঁনাদের শেষ ব্যক্তি তিরুমঙ্গই আলবার খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে বতর্মান ছিলেন।অন্যান্য আলবাররা ইঁহার পূর্বে পাঁচ কি ছয় শত বৎসরের মধ্যে প্রাদুর্ভাব হয়েছিলেন।নম্মা আলবার এই দ্বাদশ জনের মধ্যে পঞ্চম স্থান অধিকার করে আছেন। সেই অতি প্রাচীন কাল হতে দক্ষিণ ভারতে ভক্তিধর্মের এই অভ্যুত্থান দেখে বুঝতে পারা যায় যে, ভাগবতধর্ম সারা ভারতবর্ষে কি অদ্ভুত প্রেরণা যোগিয়েছিল।গ্রীকদূত কর্তৃক খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে বাসুদেবের নামে দাক্ষিণাত্যে বেসনগর স্তম্ভ উৎসর্গীকৃত হয়েছিল, কবি ভাস শ্রীকৃষ্ণের লীলা অবলম্বন করে বালচরিতম্ লিখিলেন, মহাকবি কালিদাস মেঘদূতে শ্রীকৃষ্ণের নবঘনশ্যামরূপের উল্লেখ করলেন, এ সমস্ত ব্যাপারই ইহা হতে বুঝতে পারা যায়। তামিল ভাষার প্রাচীন গ্রন্থ "কুরল" এই গ্রন্থে প্রেমের যে বিশ্লেষণ আছে তা রাধাকৃষ্ণের লীলাই স্মরণ করিয়ে দেয়।প্রণয়,মান, মানান্তে মিলন প্রভৃতির সুন্দর চিত্র এই গ্রন্থে পাওয়া যায়।*
*🌻ভক্তিধর্মের অভ্যুত্থানের যে অদ্ভুত ইতিহাস আমরা দক্ষিণ ভারতে পাই,অন্যত্র তার তুলনা নাই।পরবর্তীকালে বাংলায় যে প্রেমভক্তির অভ্যুদয় হয়েছিল,পাঞ্জাবে এবং উত্তর পশ্চিমে যে ভক্তিধর্মের ধারা নানকজী, মীরাবাঈ প্রভৃতির মধ্যে দেখতে পাই, তার মূল উৎস অনুসন্ধান করতে সম্ভবত দক্ষিণ ভারতেই যেতে হবে।পূর্বে আলবারদের কথা বললাম,তাঁদের মধ্যে একজন মহিলা ছিলেন, তাঁর নাম আন্ডাল।এই মহিলা আলবারের পিতা পেরি আলবরও প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন।আন্ডালের এই অভিমান ছিল যে,শ্রীরঙ্গনাথ তাঁর স্বামী! এই হেতু তাঁর পিতা আন্ডালের বিয়ে দেননি।আন্ডালের বিগ্রহ এখনও শ্রীরঙ্গনাথের মন্দিরে পূজিত হয়।মীরাবাঈ আন্ডালেরই যেন প্রতিমূর্তি এইরকম মনে হবে।এই দুই মহিলার চরিত্রে এইরকম সাদৃশ্য দেখা যায় যে,একই উৎস হতে অনুপ্রাণনা এসেছিল এরকম মনে না করে উপায় নাই।*
*ক্রমাগত*
🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻🌻
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(১৮) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*শ্রীচৈতন্য ও পদাবলী*
***********************
*🍀সমাজের দিক দিয়ে,শ্রীচৈতন্য প্রচারিত ধর্ম শুধু জাতিভেদ এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাবের শিথিলতা সম্পাদন করেই ক্ষান্ত হয়নি, নীচুজাতিদের উন্নত করতেও ইহা বহুল পরিমাণে কৃতকার্য্য হয়েছিলেন।বৌদ্ধধর্মের অবনতির যুগে যে সব পঙ্কিলতা সমাজদেহকে কলুষিত করেছিল,তার কুফল কতদূর গড়াত,তা বলা যায় না, যদি সেই সময়ে বৈষ্ণবধর্ম বাধা না জন্মাত।আমরা ইতিহাস হতে জানতে পারি যে,শ্রীমন্নিত্যানন্দের পুত্র বীরচন্দ্র প্রভু বহু নেড়ানেড়ি ও তথাকথিত সহজিয়াকে বৈষ্ণব ধর্মে স্থান দান করেছিলেন।এও জানা যায় যে, পরবর্তীকালে এতে বৈষ্ণবধর্মে কতকটি ময়লা প্রবেশ করেছিল, কিন্তু তা শ্রীচৈতন্যের সংকল্পিত আদর্শের দোষে নয়।কারণ বৈষ্ণবধর্মের আদর্শ সেই যুগে যে উচ্চ ধাপে স্থাপিত হয়েছিল, তা যে কোন যুগে যে কোনও দেশের পক্ষে গৌরবজনক এটি নিঃসংকোচে বলা যায়।*
*🌷অসৎসঙ্গ ত্যাগ এই বৈষ্ণব আচার।*
*🌷স্ত্রীসঙ্গী এক অসাধু কৃষ্ণাভক্ত আর।।*
*(শ্রীচৈঃচঃমধ্যলীলা)*
*🌹স্ত্রীলোকের কাছে ভিক্ষা-গ্রহণের জন্য মহাপ্রভু প্রিয়ভক্ত ছোট হরিদাসকে বর্জন করেছিলেন।সেই উচ্চ আদর্শ যে পরবর্তীকালে অনুসৃত হয়নি, তাইই বৈষ্ণব ধর্মের অবনতির অন্যতম কারণ, এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। সংসারে থেকে এরকম আদর্শ পালন করা অসম্ভব বলে শ্রীচৈতন্য এবং তাঁর প্রসিদ্ধ সঙ্গীগণ সংসারের মায়ামোহ হেলায় উপেক্ষা করে চলে গিয়েছিলেন।*
*🍀কিন্তু একটি লক্ষ্য করবার বিষয়ে এই যে,ইঁনারা সন্ন্যাসী হয়েও সংসারকে অবজ্ঞা করেননি। সংসার পাপের কুন্ড অতএব সংসার ছেড়ে না গেলে মুক্তিলাভ অসম্ভব, এই চিন্তা নিয়ে শ্রীচৈতন্য সংসার ত্যাগ করেননি। পক্ষী যেমন বায়ুভরে উর্দ্ধ আকাশে উড়ে সস্নেহে নিচের পৃথিবীর দিকে চেয়ে থাকে,শ্রীচৈতন্য ও তাঁর পারিষদগণের অন্তরও সেইরকম জগতের প্রতি করুণায় পরিপূর্ণ ছিল।দুর্গত মানুষের উপায় কি হবে?তারা কি উপায়ে সহজে উন্নততর জীবনের স্বাদ লাভ করবে,এটিই তাঁদের সন্ন্যাসপূত জীবনের একমাত্র কাম্য ছিল বললে বেলী বলা হবে না।জগতের জন্য কেঁদেই মহাপ্রভু জগতের হৃদয় জয় করেছিলেন।প্রেম যার কাছে পরম পুরুষার্থ স্নেহপ্রণয়রতি যার সমস্ত কামনা সমস্ত কল্পনার সার বস্তু,জগৎ তার কাছে এক নূতন সত্যরূপে প্রতিভাত হবে,এতে বিচিত্র কি?সংসারের অসারতা, জগতের অনিত্যতার কথা নিত্য শুনে শুনে মানুষের মনে যে অনপনেয় দৈন্য,যে নৈরাশপূর্ণ কষ্ট এসেছিল,তা কতকটা এই নূতন ধর্মের শিক্ষায় দূর হতে লাগল।সংসার দুঃখময়,এর হাত হতে পরিত্রাণ লাভই একমাত্র কাম্য, এই শিক্ষায় যে কুফল ফলে,তা আমরা মর্মে মর্মে বুঝেছি।শ্রীচৈতন্যের প্রেমধর্ম এই শিক্ষায়মোড় ফিরাতে চেষ্টা করেছিলেন। মানুষকে সবরকম হীনতা হতে মুক্ত করে শ্রীচৈতন্য তাকে সংসারের মধ্যে স্থাপন করলেন।সবার উপরে মানুষ সত্য। ভগবানের যত লীলা আছে,তার মধ্যে সর্বোত্তম নরলীলা, নরবপু তাহার স্বরূপ। মানুষকে এমন করে মর্য্যাদা দান আর কেউ কখনও করেনি। ভগবান মানুষের সঙ্গে মানুষ সেজে লীলাখেলা করেন। মানুষ হেয় নহে,অসার নহে,মানুষ ভগবানের নিত্য দাস।এই দাসত্বই তার সারাজীবনের সারকামনা। "গোপীভর্ত্তুশ্চরণ কমলয়ো র্দাসদাসানুদাসঃ "।*
*জীব যে কৃষ্ণের নিত্য দাস তা ভুলে গিয়েই যত গন্ডগোল বাধিল এবং মায়া তখনই তার গলায় ফাঁস পরাল।তা না হলে মানুষ নিজ স্বরূপে অবস্থান করে সংসারের দুঃখ শোক মোহ হেলায় অতিক্রম করতে পারত?যে ভগবৎপ্রেম মানুষের পক্ষে পরম কাম্য তা তার জন্মগত অধিকার।এ অধিকার কষ্টসাধ্য তপ জপ আসন প্রাণায়ামের দ্বারা লাভ করা যায় না।আপনা হতেই এই মনুষ্য জন্মেই ভগবানের দান হিসাবে এটি লাভ করেছে।*
*🌷নিত্য সিদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম সাধ্য কভু নয়।*
*🌹সংসার দুঃখময় কে বলিল? যে সংসারে থেকে এই মানুষ দেহেই কৃষ্ণসেবার অধিকার লাভ করা যায়, তা হতে পলায়ন করাই যে শ্রেয়ঃ এরকম মনে করবার কি কারণ আছে? বৈষ্ণবগণ এই জন্য মুক্তি চাহেন না।এই যে দৃষ্টিভঙ্গী জগতের সম্বন্ধে,সমাজের সম্বন্ধে,মানবজীবনের সম্বন্ধে এটি সম্পূর্ণ অভিনব। ভগবান প্রেমময়, তিনি জগৎ সংসারকে দুঃখ-কষ্টের আগার করে সৃষ্টি করবেন কেন? ভগবান মধুর,এই জগৎ মধুর, তুমি মধুর, আমিও মধুর।মাধুর্য্যভরা এই জগতের মাঝখানে মানুষকে স্থাপন করে ভগবান তার প্রেম লুন্ঠন করবার জন্য সর্বদা লালায়িত।❤যেমন খদ্দের না থাকলে দোকানের কি মূল্য!ভক্ত না থাকলে ভগবানের কি কদর! এই মাধুর্য্যবাদ সাহিত্যে,সঙ্গীতে,শিল্পে বিকশিত হয়ে উঠেছিল শ্রীচৈতন্যদেবের শিক্ষায়। বাংলাদেশে সাহিত্য যে প্রেরণা লাভ করিল,তার ফলে অসংখ্য কবি অসংখ্য কবিতার অর্ঘ্য রচনা করলেন প্রেমের উদ্দেশ্যে, প্রেমময়ের উদ্দেশ্যে।সেই যুগে অর্থ্যাৎ শ্রীচৈতন্যের পরবর্তী যুগে কাব্য সাহিত্যে যেরকম বান বা বন্যা ডেকেছিল, তেমন আর কোনও দেশে,কোনও যুগে দেখা যায় নাই।চন্ডীদাস,বিদ্যাপতি পদ রচনা করে যুগলভজনের প্রশস্ত পথ প্রস্তুত করে দিয়ে গিয়েছিলেন।শ্রীমন্মহাপ্রভুর পরে সেই পথে অসংখ্য লোক প্রেমের পথে যাত্রা করিল।অধিকন্তু নূতন যুগে সেই যাত্রাপথের পুরোভাগে সর্বসম্মতিক্রমে স্থাপন করল ল্রীচৈতন্যদেবকে।সেই হতে গৌরচন্দ্রিকায় সাহিত্যের আর এক বিরাট পর্ব আরম্ভ হল।গৌরাঙ্গলীলা স্বতন্ত্রভাবেও সাহিত্যে একটি সুপরিসর জায়গা করে নিল।খেতরির মহোৎসব হতে আজ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশ বৎসর বৈষ্ণব কবিতায় শ্রীগৌরাঙ্গের অপ্রতিহত প্রভাব চলে আসছে। এখানেও আমরা দেখি যে,শ্রীচৈতন্য সম্বন্ধে বাংলা কাব্যসাহিত্যে যে দরদ তার তুলনা আমরা আর কোথাও পাই না।*
*পূর্বে শ্রীচৈতন্যের প্রবর্তিত সাম্যবাদের কথা বলেছি।এই সময়ের পদাবলী সাহিত্যে সেই অখণ্ড সাম্যবাদের প্রকৃষ্ট বা উত্তম পরিচয় পাওয়া যায়।মহাপ্রভুর পূর্ববর্তী পদকর্তাদের পরিচয়ে দেখি "দ্বিজ" "বড়ু" (ব্রাহ্মণতনয়) প্রভৃতি আভিজাত্যবোধক শব্দের ছড়াছড়ি। কিন্তু শ্রীচৈতন্য পরবর্তী সাহিত্যে সকলেই সমান।সকলের উপাধি "দাস"।ব্রাহ্মণ,বৈদ্য,কায়স্থ প্রত্যেক বর্ণই দাস-সংজ্ঞায় অভিহিত হতে চেয়েছেন।এটিকে "বিনয়"মাত্র মনে করলে ভুল করা হবে।এখন অনেক জায়গায় বৈষ্ণবদের দৈন্য বা বিনয় উপহাসের বিষয় হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে,বিনয় মিলনের পক্ষে একান্ত পরিহার্য্য।যতক্ষণ মনে অভিমান বা অহংকার থাকে,ততক্ষণ কোনও রকম সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।সমাজের মধ্যে যে অসংখ্য প্রকার উচনীচ ভেদ চলে আসছে,তাকে সমভূমিতে নিয়ে আসতে না পারলে সমস্ত সাম্য চেষ্টাই ব্যর্থ হতে বাধ্য।এই নিগূঢ় মনস্তত্ত্ব শ্রীমন্মহাপ্রভু ও তাঁর পরিকরগণ বুঝিয়েছিলেন। আমরা কিন্তু এখনও তা বুঝতে পারিনি।জগতে মানুষে মানুষে যদি,কখনও ভালবাসা সম্ভফ হয়,তবে তার প্রথম সোপান রচিত হবে এই বিনয়ের মধ্য দিয়ে ; সনাতন রক্ষণশীলতার অপ্রতিহত প্রভাব সেই জায়গায় ব্যর্থ। হাজার হাজার টোলে বাংলা ও ভারতের নানাস্থান হতে ছাত্রেরা নবদ্বীপে এসে ন্যায়শাস্ত্র,দর্শনশাস্ত্র,কাব্য,স্মৃতির আলোচনা করে ; বিদ্যার বিলাসই সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্রাহ্মণদের জীবনের প্রধান আনন্দ।জাতিভেদের কঠিন নিগড়ে বা শিকলে সমস্ত সমাজ বাঁধা, ব্রত নিয়ম অনুষ্ঠান,আচার ও প্রথার নির্মম অনুশাসনে সমাজ জীবন নিষ্প্রভ, মানুষের চলার পথ শত বাধানিষেধে কন্টকিত।শ্রীগৌরাঙ্গ প্রথমেই সেই প্রাণহীন আচার অনুষ্ঠানের অচলায়তনের নির্মমভাবে আঘাত করলেন,শুকনো তর্ক ও বিদ্যাবিলাসের মোহকে ছিন্ন করতে রত হলেন,ছুৎমার্গের নাগপাশকে শিথিল করে দিলেন। তিনি নির্ভীকভাবে প্রচার করলেন,ঈশ্বরে ভক্তিই ধর্ম,জ্ঞান ও তর্কের পথে এই ধর্মলাভ হয় না। ভগবানের দৃষ্টিতে উচনীচ জাতিভেদ নেই।প্রেমধর্মের মধ্য দিয়ে মানুষকে তিনি নূতন মর্য্যাদা দিলেন,হিন্দু সমাজের সামনে তিনি নূতন আদর্শ স্থাপন করলেন।সমাজের যে অস্পৃশ্য অন্ত্যজ,দীনাতিদীন, সেও তার প্রেমস্পর্শে আত্ম উপলব্ধি করতে শিখিয়েছিল।মহাপ্রভু তাঁর অমোঘ ভাষায় বলে দিলেন=*
*🌷যে-ই ভজে,সে-ই বড় অভক্ত হীন ছার।*
*🌷কৃষ্ণ ভজনে নাহি জাতি কুলাদি বিচার।।*
*🌹অর্থ্যাৎ মানুষ মানুষের সঙ্গে মিলতে পারে একমাত্র প্রশস্ত ক্ষেত্রে ; সেই ক্ষেত্র হচ্ছে ধর্মের বিস্তৃত প্রাঙ্গণ।ধর্ম বাহিরের বস্তু নয়,প্রাণের বস্তু।প্রাণের মিলনই সত্যকার মিলন। সুতরাং ভারতবর্ষে সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠা করতে হলে শ্রীচৈতন্যের শিক্ষায় অবলম্বন করতে হবে।অর্থের জন্য, সুযোগ সুবিধার জন্য যে মিলন তা সাময়িক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও তার স্থায়িত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🌻🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(১৯) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*শ্রীচৈতন্যের বিদ্যাবিলাস*
**************************
*🍀শ্রীচৈতন্যদেবকে যাঁরা ভগবানের স্বরূপ বলে মনে করেন,তাঁদের কাছে তিনি কতদূর লেখাপড়া শিখেছিলেন, এ প্রশ্ন একান্ত অবান্তর ও অনাবশ্যক। যিনি সর্বজ্ঞ এবং সর্ববিভূত্বমন্ডিত,যিনি সরস্বতিপতি ও অন্তর্য্যামী,তাঁর সমস্ত জ্ঞান করাকমলবৎ,সমস্ত বিদ্যা অধীত। কিন্তু জগন্নাথ মিশ্র তনয় বিশ্বম্ভর, শচীর আদরের দুলাল, ব্রাহ্মণ পন্ডিত মেখলা পন্ডিত নবদ্বীপের অধ্যাপক নিমাই কোন্ কোন্ বিদ্যায় পারদর্শী হয়েছিলেন,তা জানতে কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে নবপ্রকাশিত একটি গ্রন্থে বলা হয়েছে যে,চৈতন্যের বিদ্যার দৌড় ছিল কলাপ ব্যাকরণ,কিছু কাব্য ও কিছু অলঙ্কারশাস্ত্র এই পর্যন্ত।*
*💧His(Chaitanya's) Studies,however,appear to have been chiefly onfined to sanskrit Grammar especially kalapa Grammar and some literature and rhetoric to which allusion is made.*
*Padyavali=By Rupa Gosvamin edited by professor Sushil Kumar De Interduction, page xviii.*
*It is misdirected zeal which invest him (chaitanya) with the false lory of scholastic eminence •••••••••••. lbid p, xxxiv.*
*🌺শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে শ্রীপাদ কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন ঃ---,*
*🌷হয় ব্যাখ্যা নয় করে নয় করে হয়।*
*🌷সকল খন্ডিয়া শেষে সকল স্থাপয়।।*
*🍀এইরকম পান্ডিত্য গ্রীস দেশে সক্রেতিসের সম্বন্ধে শুনতে পাওয়া যায়। সেকালে ঐ দেশে আরও কতকগুলি পন্ডিত আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁরা শুধু তর্কের জোরে এইরকম "হয়"কে "নয়" এবং "ধয়"কে "হয়" করতে পারতেন।তাঁদের নাম ছিল "সফিষ্ট"(Sophist)।এইসব পন্ডিতের সম্বন্ধে আর যাই বলা যাক না কেন,তাঁরা যে অসাধারণ পান্ডিত্য লাভ করেছিলেন,সে সম্বন্ধে কারও সন্দেহ নাই।*
*🌹অধ্যাপক হয়ে নিমাই পন্ডিত শত শত ছাত্র পড়াতেন।*
*🌷শত শত শিষ্য সঙ্গে সদা অধ্যাপন।*
*🌷ব্যাখ্যা শুনি সর্বলোকের চমৎকার মন।।*
*(শ্রীচৈঃচঃ ১৬ পরিচ্ছেদ)*
*🌺নিমাই পন্ডিত তাঁর পিতার মৃত্যুর পরে একবার পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে বাহির হয়েছিলেন।তখন সেই বাইশ বছরের "বালক" পন্ডিত কিরকম সম্মান পেয়েছিলেন,তাও চিন্তা করবার বিষয়। সেখানে---*
*🌷বিদ্যার প্রভাবে দেখি চমৎকার চিত্তে।*
*🌷শত শত পড়ুয়া আসি লাগিল পড়িতে।।*
*কিছুদিন পূর্ববঙ্গে ভ্রমণ করে যথেষ্ট ধন উপার্জন করে নিমাই নবদ্বীপে ফিরে আসিলেন।*
*🌷ঘরেতে আইলা প্রভু নানাধন লঞা।*
*🌷মাতৃস্থানে দিল ধন হরষিত হঞা।।*
*(লোচনদাসের চৈঃমঃ আদি)*
*☘লোচনদাসের মতে অধ্যাপক গঙ্গাদাস পন্ডিত ব্যতীত বিষ্ণু পন্ডিত এবং সুদর্শন পন্ডিতের কাছে চৈতন্যদেব পাঠাভ্যাস করেছিলেন*
*🌷হেনমতে নবদ্বীপে প্রভু বিশ্বম্ভর।*
*🌷পড়িবারে গেলা বিষ্ণু পন্ডিতের ঘর।।*
*🌷সুদর্শন আর গঙ্গাদাস যে পন্ডিতে।*
*🌷পঢ়িলা জগত-গুরু তা' সভার হিতে।।ঐ,ঐ।।*
*🌹এর দ্বারা বোধ হয় চৈতন্যদেব গঙ্গাদাসের কাছে ব্যাকরণ এ বিষ্ণু পন্ডিত এবং সুদর্শনের কাছে কাব্য,দর্শন ও অলঙ্কার ইত্যাদি পড়েছিলেন।*
*🌺এইসময়ে একজন দিগ্বিজয়ী পন্ডিত বহুস্থান হতে জয়পত্র নিয়ে নবদ্বীপে আসিলেন।তিনি অনেক হাতী ঘোড়া দোলা লোকজন নিয়ে দিগ্বিজয়ে বাহির হয়েছিলেন।সম্ভবতঃ তিনি কোন রাজার সভাপন্ডিত ছিলেন।তা না হলে ব্রাহ্মণ পন্ডিতের এইরকম বিভব হওয়া সম্ভবপর নয়।যাইহোক,গঙ্গাতীরে এসে তিনি নিমাই পন্ডিতের সঙ্গে তর্ক যুদ্ধে রত হলেন। দিগ্বিজয়ী বললেন ঃ--"*
❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧
*(২০) বৈষ্ণব রস-সাহিত্য*
*শ্রীচৈতন্যের বিদ্যাবিলাস*
****************************
*🍀দিগ্বিজয়ী বললেন=*
*🌷ব্যাকরণ পড়াও নিমাই পন্ডিত তোমার নাম।*
*🌷বাল্য শাস্ত্রে লোক কহে তোমার গুণগ্রাম।।*
*🌷ব্যাকরণ মধ্যে জানি পড়াহ কলাপ।*
*🌷শুনিল ফাঁকিতে তোমার শিষ্যের সংলাপ।।*
*(শ্রীচৈঃচঃ আদি)*
*🌹এবারে দিগ্বিজয়ীর গঙ্গাস্তব শুনে নিমাই পন্ডিত তার অলঙ্কার দোষ ধরলেন।দিগ্বিজয়ী বিদ্রূপ করে বললেন=*
*🌷ব্যাকরণিয়া তুমি নাহি পড় অলঙ্কার।*
*🌷তুমি কি জানিবে এই কবিত্বের সার।।*
*🍀কিন্তু শেষমেষ এই অলঙ্কারের বিচারেই দিগ্বিজয়ী পরাভব স্বীকার করতে বাধ্য হলেন।ইঁনারা সকলেই যখন নিমাইকে কলাপ ব্যাকরণের পন্ডিত বলছেন,তখন অধ্যাপক সুশীল কুমার বললেন, তা আর বিচিত্র কি? কিন্তু কথা এই যে,যাঁরা নিমাই পন্ডিতকে ব্যাকরণিয়া বলেছেন,তাঁরাই আবার তাঁকে সর্বশাস্ত্রে পন্ডিত বলেছেন।কাজেই তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণ করলে সমস্তটাই গ্রহণ করতে হয়।এক অংশ গ্রহণ করে অন্য অংশ বর্জন করা সাক্ষ্য সম্বন্ধীয় আইন (Evidence Act) ও অনুমোদন করে না।*
*🌺শ্রীমন্মহাপ্রভু যখন নীলাচলে গমন করলেন,তখন সার্বভৌম বাসুদেব ভট্টাচার্য্য সেই অপরিণত বয়স্ক সন্ন্যাসীকে দেখে কিছু সদুপদেশ দিতে রত হলেন।সার্বভৌম প্রবীণ পন্ডিত।তিনি সমস্ত উত্তরভারতে পান্ডিত্যের খ্যাতি অর্জন করে উড়িষ্যার স্বাধীন নরপতি গজপতি প্রতাপরুদ্রের রাজপন্ডিত পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।এটি শুধু বাসুদেব সার্বভৌমের ব্যক্তিগত গৌরব নহে,এটি বঙ্গদেশের গৌরব। সার্বভৌম বললেন,সন্ন্যাস গ্রহণে কি লাভ?এতে কেবল অহঙ্কার,দাম্ভিকতা বাড়ে।সন্ন্যাসী হলেই তাঁকে মহাজ্ঞানী সাজতে হয়।মহাভাগবতগণ সন্ন্যাসী দেখলেই প্রণাম করেন।অথচ তাঁদের প্রণাম গ্রহণ করা মহাপাপ।তুমি এমন কাজ করবে কেন?কৃষ্ণভক্ত যে হয়,সে সকলকেই প্রণাম করে। শিখাসূত্র ঘুচিয়ে লাভ হয় এই যে,কাউকেও প্রণাম করতে হয় না, সকলের প্রণাম গ্রহণ করা হয়। তখন মহাপ্রভু বললেন, আমি সন্ন্যাসী এ-কথা আপনাকে কে বলল?আপনি আমাকে কৃপা করে কৃষ্ণপ্রেম দান করুন।*
*🌷সন্ন্যাসী করিয়া জ্ঞান ছাড় মোর প্রতি।*
*🌷কৃপা কর যেন মোর কৃষ্ণে হয় মতি।।চৈঃভাঃ।।*
*🙏মহাপ্রভু আবার বিনীতভাবে বললেন=*
*🌷----মোর এক আছে মনোরথ।*
*🌷তোমার মুখেতে শুনিবাঙ ভাগবত।।*
*🍀সার্বভৌম জিজ্ঞাসিলেন=*
*🌷বল দেখি তোমার সন্দেহ কোন স্থানে।*
*🌷আছে তাহা যথাশক্তি করিব বাখানে।।*
*🌹শ্রীমন্মহাপ্রভু তখন তাঁকে "আত্মারামাশ্চ মনয়ে" ইত্যাদি শ্লোকের অর্থ বলতে বললেন, সার্বভৌম ভাগবতের এই প্রসিদ্ধ শ্লোকের তের রকম ব্যাখ্যা করলেন। তখন=*
*🌷ঈষৎ হাসিয়া গৌরচন্দ্র প্রভু কয়।*
*🌷যত বাখানিলে তুমি সব সত্য হয়।।*
*🌷এবে শুন আমি কিছু করিয়ে ব্যাখান।*
*🌷বুঝ দেখি বিচারিয়া হয় কি প্রমাণ।।চৈঃভাঃ।।*
*🌻অর্থ্যাৎ সার্বভৌম যে তের প্রকার ব্যাখ্যা করেছিলেন, তার পরেও শ্রীচৈতন্যদেব আরও অনেক রকম ব্যাখ্যা করে সার্বভৌমকে স্তম্ভিত করলেন। ইহা হতেই বুঝা যায় যে,নিমাই পন্ডিত শুধু কলাপ ব্যাকরণে পন্ডিত ছিলেন না, তিনি নানা শাস্ত্রে অসাধারণ পান্ডিত্য লাভ করেছিলেন।*
*🌺জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে আছে=*
*গৌরাঙ্গ সুন্দর, পঢ়ে নিরন্তর,*
*ভোট কম্বলে বসিঞা।*
*কলাপে আলাপ, করয়ে প্রলাপ,*
*ঈষৎ হাসিয়া।।*
☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆
*সটীক ব্যাস বৈ, কাব্য অলঙ্কার,*
*নাটক তর্ক সাহিত্যে।*
*না দেখি না শুনি, বেদশাস্ত্র বাখানি,*
*সভা মোহে কবিত্বে।।*
*🌹মহাপ্রভু দক্ষিণাপথে বৃদ্ধকাশী দর্শন করে যখন এক গ্রামে আসিলেন,তখন ব্রাহ্মণগণের সঙ্গে শাস্ত্র বিচারে শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর পারদর্শিতা সপ্রমাণ করেছিলেন=*
*🌷তার্কিক মীমাংসক মায়াবাদীগণ।*
*🌷সাংখ্য পাতঞ্জল স্মৃতি পুরাণ আগম।।*
*🌷নিজ নিজ শাস্ত্রোদগ্রাহে সবাই প্রচণ্ড।*
*🌷সর্বমত দূষি প্রভু করে খন্ড খন্ড।।চৈঃচঃমঃ।।*
*🍀মহাপ্রভুর পান্ডিত্যের কথা শুনে পাষন্ডীরা আসিল।পাষন্ডী অর্থে বৌদ্ধ নাস্তিক প্রভৃতি বুঝাত।মহাপন্ডিত বৌদ্ধাচার্য্য স্বয়ং এসে তর্কে রত হলেন। সুতরাং ভক্তির দোহাই দিয়ে ইঁনাকে নিরস্ত করা সম্ভব হল না।*
*🌷তর্কপ্রধান বৌদ্ধশাস্ত্র নবমতে।*
*🌷তর্কেই খন্ডিল প্রভু না পারে স্থাপিতে।।*
*🌷বৌদ্ধাচার্য্য নব নব প্রশ্ন উঠাইল।*
*🌷দৃঢ় যুক্তি তর্কে প্রভু খন্ড খন্ড কৈল।।ঐ ঐ।।*
*🌻গোবিন্দ দাসের কড়চার প্রমাণও এই প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করা যেতে পারে।কড়চাকে অনেকে প্রামাণ্য বলে স্বীকার করেন না। কিন্তু অধ্যাপক সুশীল কুমার দে কড়চা হতে যখন প্রমাণ উদ্ধৃত করেছেন, তখন আমরাও তাঁর অনুসরণ করে দেখাব যে গোবিন্দ দাসের প্রমাণ অনুসারেওমহাপ্রভু একজন অসামান্য পন্ডিত ছিলেন।তিনিও শ্রীপাদ কবিরাজ গোস্বামীর মত নানা জায়গায় শাস্ত্রবিচারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।দাক্ষিণাত্য-ভ্রমণে মহাপ্রভুর উদ্দেশ্য ছিল সকলকে হরিনাম লওয়াতে। যাঁরা তাঁর প্রেমাশ্রু দেখে গলে যেতেন,তাঁদেরকে সহজেই নিজ মতে নিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যারা তার্কিক,মায়াবাদী বা নাস্তিক তাঁদের সঙ্গে বিচার করতে হত। গোবিন্দ দাস লিখেছেন যে =*
*🌷কখন তামিল বুলি বলে গোরারায়।*
*🌷কভু বা সংস্কৃত বলি শ্রোতারে মাতায়।।*
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🌻🙏🙏🙏🙏🙏🙏
✧══════════•❁❀🙇❀❁•══════════✧